লেখা ও ছবির সূত্র: দৈনিক আজকের কাগজ, জুলাই ৫, ২০০৭
সাদা বাঘ December 20, 2009
বাঘ November 25, 2009
টাইগার শব্দটা এসেছে গ্রীক শব্দ টাইগ্রিস থেকে। টাইগ্রিস নদীর ওপারে পারস্য রাজত্ব থেকে এশিয়াকে কল্পনা করতো গ্রীকরা।
বাঘের মোট ১১টা সাব স্পিসিসকে চিহ্নিত করা গেছে। এর মাঝে ৭ টি প্রজাতি এখন টিকে আছে (সুত্র wwf)। এগুলো হলো
১। সাইবেরীয়ান টাইগার অনেকে আমুল টাইগার বলে ডাকে। প্রায় ৩ মিটার লম্বা এবং ওজন প্রায় ৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। আকৃতিতে সব প্রজাতীর মধ্যে এরাই বৃহত্তম। ফ্যাকাশে সোনালী বর্নের এই বাঘ সাইবেরিয়া, কোরিয়া এবং চিনের তুষারবৃত অঞ্চলে বাস করে।অস্তীত্ব নিয়ে সবচাইতে হুমকিতে থাকা প্রাণীদের একটি এরা, সারাপৃথিবীতে মাত্র ৪৩০-৫০০টি সাইবেরিয়ান টাইগার আছে। বিভিন্ন ভাষায় এর নাম
Russian: Амурский тигр
Mongolian: Сибирийн бар
Persian: ببر سیبری
২। ইন্দোচাইনিজ টাইগারঃ মুলত থাইল্যান্ডে পাওয়া যায়, তবে ভিয়েতনাম, লাওস, চীন, বার্মাতেও পাওয়া যেতে পারে। সারা পৃথিবীতে ৭০০-১০০০টি ইন্দোচাইনিজ টাইগার আছে। অন্যান্য ভাষায় এর নাম….
Vietnamese: Hổ Đông Dương
Thai: เสือโคร่งอินโดจีน
৩। সুমাত্রিয়ান টাইগারঃ বাঘ প্রজাতির মধ্যে সবচাইতে ক্ষুদ্রাকৃতির এবং সবচেয়ে বিরল এবং অস্তীত্ব সঙ্কটে ভোগা প্রানী হচ্ছে সুমাত্রিয়ান টাইগার। ইন্দোনেশীয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ৪০০টি বাঘ টিকে আছে।
৪। জিয়ামিন টাইগারঃ Xiamen tiger বা সাউথ চাইনিজ টাইগারের অস্তীত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে। ১৯৫০ সালের রিপোর্টে ৪০০০ বাঘের কথা বলা হলেও গত ২৫ বছরে একটিও দেখা যায় নি।
৫। মালায়ান টাইগারঃ মালয়শিয়ার কিছু অরন্যে এবং ইন্দোনেশিয়ায় সামান্য কিছু মালয় টাইগার আছে। সর্বোচ্চ ৫০০বাঘ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে।এরা South China tiger or South Chinese tiger, Chinese, Amoy tiger নামেও পরিচিত।
৬। বেংগল টাইগারঃ রয়াল বেঙ্গল টাইগার পৃথিবীর বাঘ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয় অভিজাত চেহারা, ভয়ঙ্কর শিকার কৌশল এবং অনন্য সাধারন ক্যামোফ্লেজের কারনে বিখ্যাত। লম্বায় প্রায় ৯ ফিট পর্যন্ত হতে পারে। ওজন প্রায় ২৫০-৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালে বেঙ্গল টাইগার পাওয়া যায়। wwfএর হিসাবে ভারতে ১৪০০, বাংলাদেশে ২০০, নেপালে ১৫০, ভুটানে ১০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার দাবী করে ৫০০ বাঘের। একে বাংলা, ইংরেজী, হিন্দীতে একই নামে ডাকা হয়..যথাক্রমে
বেঙ্গল টাইগার, Bengal Tiger, बंगाल बाघ ।
লেজ সহ পুরুষ বাঘেরা লম্বায় ২৭৫-৩১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর লেজটার দৈর্ঘ্য ৮৫-৯৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাঘগুলোকে দাড়িপাল্লায় ওঠালে একেকটার ওজন ১৮০-২৭০ কেজির কম হয় না। তবে মেয়ে বাঘ গড়ে ১৪১ কেজির মত হয়ে থাকে। এ যাবৎকালে সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান বাঘটা পাওয়া গিয়েছিল ভারতের উত্তর প্রদেশে। ডেভিড হেসিঙ্গার নামের এক শিকারী গুলি করে এই বাঘকে। সারা শরীর কমলা আর ধূসর রঙ তার উপর কালো ডোরাকাটা। পুরোদস্তুর রাজকীয় ব্যাপার স্যাপার।
চালচলন যেমন রাজকীয় তেমনি খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও সে রাজকীয়। দিনে ত্রিশ কেজি পর্যন্ত মাংশ অনায়াসে হজম করতে পারে একেকটা বাঘ। মাংশের জন্য এরা হরিণ, খরগোশ, মহিষ, বানর, জলহস্তী, ময়ূর, শুকর, মাছ সহ অনেক পশুই তাদের জীবন বাঘের ধারালো দাঁতের আঘাতে হারায়। আবার খাদ্যের অভাব দেখা দিলে মানুষ খেতেও দ্বিধা করে না এর। এই উপমহাদেশে একসময় মানুষখেকো বাঘদের বেশ উৎপাত ছিলো সেটা হয়তো অনেকেই জানো। তবে এমনিতে বাঘ মানুষখোকে হয় না। সাধারণত বয়েসে বৃদ্ধ বাঘ যখন শিকার করার শক্তি হারিয়ে ফেলে তখনই এদের মধ্যে মানুষ শিকার করার প্রবণতা দেখা যায়। আবার আহত বাঘও সহজলভ্য খাবারের আশায় মানুষখেকো হয়ে উঠতে পারে।
একেকটা বাঘ আট থেকে দশ বছর রাজত্ব করে তবেই মারা যায়। তবে বাঘরা কিন্তু একা একা থাকতেই পছন্দ করে। ক্ষুধা লাগলে মাইলের পর মাইল খুঁজতে থাকে শিকার। তারপর চুপ করে লুকিয়ে থেকে হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাড়টা মটকিয়ে কাবু করে ফেলে শিকারের। এতো শক্তি থাকলেও তারা কিন্তু সাধারণত মানুষদের সামনে মোটেই আসতে চায় না। কেন যেনো দুপেয়ে মানুষদের ওরা পছন্দ করে না।
মেয়ে বাঘরা একেসাথে দুইটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। বাচ্চাদের বয়স যখন আঠারো মাস হয় তখনই তারা শিকারে যায়। তার আগে পর্যন্ত মায়ের আনা খাবারের উপরেই নির্ভর করে।
বাঘ যখন হালুম করে শব্দ করে সেটার শব্দ তিন কিলোমিটার দূর পর্যন্ত শোনা যায়। এ শুনেই বনের হরিণ, মহিষ আর অন্যান্য প্রাণীরা দেয় এক দৌড়। বাঘদের আবার পানি খুব পছন্দ। গরম লাগলেই হলো নদী খাল যাই থাক শরীরটা এলিয়ে দেয় তাতে। ওদের সাঁতার কাটার ব্যাপারটা দারুন মজার। তারা কখনোই বাঁকা পথে সাঁতার কাটে না।
শিকারের সময় বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগ তাকে বেশ সাহায্য করে। এই দাগের কারণে এ সময় সে বনের লম্বা ঘাসের মধ্যে সে নিজেকে সহজেই লুকিয়ে রাখতে পারে।
পুরুষ বাঘ সাধারণত একা একাই চলাফেরা করে। আর প্রস্রাব করে নিজের সীমানা চিহ্নিত করে রাখে।
এছাড়া বালী টাইগার, জাভা টাইগার, কাস্পিয়ান টাইগার, ১৯৫০ সালের পরে পৃথিবীতে আর দেখা যাবার রেকর্ড নেই। কাস্পিয়ান টাইগার Persian tiger, Turanian tiger, Mazandaran tiger বা Hyrcanian tiger নামেও পরিচিত। আর Trinil Tiger পৃথিবী থেকে ১.২ মিলিয়ন বছর আগেই হারিয়ে গেছে।
ভারতের জাতীয় প্রানী Panthera tigris, একধরনের বেঙ্গল টাইগার। P. tigris tigris বেঙ্গল টাইগারের কর্দমাক্ত এবং লবনাক্ত ম্যানগ্রোভ অরন্যচারী বেঙ্গল টাইগার আমাদের দেশের জাতীয় প্রানী।
বেংগল টাইগারের খাদ্য তালিকায় আছে বন্য শুকর, গয়াল, মহিষ, গরু, গৃহপালীত প্রানী, শেয়াল, খরগোশ, মাছ, পাখি এবং বানর। তবে হাতি এবং গন্ডার শিকারের ঘটনাও রেকর্ডে আছে।
জীন দুষনঃ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আকর্ষনীয় দেহ শৈলীর কারনে শতাব্দি ধরে বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চাহিদা অনেক। অন্যপ্রজাতির বাঘের সাথে মিলনের ফলে এদের মধ্যে জীন দুষন ঘটছে। এর মাঝে তারার ঘটনা বেশ আলোচিত। ইংল্যান্ডের এক চিড়িয়াখানা থেকে তারা নামের বিশালদেহী এক বেঙ্গল বাঘিনীকে শিকার করে জীবন ধারন করা শিখিয়ে পড়ে ভারতের দুধোয়া ন্যাশনাল পার্কে ছেড়ে দেয়া হয় বন্য পরিবেশে ১৯৭৬সালে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতিতে (সুত্রঃ উইকিপিডিয়া)। বিজ্ঞানীরা প্রমান করতে চেয়েছিলেন চিড়িয়াখানায় বেড়ে ওঠা একটা বাঘিনীকেও বন্য পরিবেশে মুক্ত করা সম্ভব। ১৯৯০ সালে বিজ্ঞানীরা দুধোয়া ন্যাশনাল পার্কের অনেক বেঙ্গল টাইগারের মাঝে সাইবেরিয়ান টাইগারের বৈশিষ্ট ফ্যাকাশে হলুদ চামড়া (রয়েল বেঙ্গলের চামড়া উজ্জ্বল সোনালী) কিংবা রোমশ দেহ পাওয়া যায়। পরে গবেষনায় এদের দেহে সাইবেরিয়ান টাইগারের জীনোটাইপ পাওয়া যায়। পরে প্রমান হয় ১৯৭৬সালে বিজ্ঞানীরা কি বিশাল অবিবেচক কাজ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা বেঙ্গল টাইগার হলেও চিড়িয়াখানায় বাঘেদের প্রজননের ব্যাপারে কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না। হয়তো তারার পুর্বপুরুষ কেউ কোন সাইবেরিয়ান টাইগারের সাথে মিলিত হয়েছিল, তারা আসলে একটি শঙ্কর বাঘিনী ছিল।
২০০০ সালে জন ভার্টি নামের আরেকজন বিজ্ঞানী আরেক অদ্ভুত গবেষনা শুরু করে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে। ন্যাশনাল ডিসকভারী চ্যানেলের অর্থায়নে এই প্রজেক্টে কিছু বেঙ্গল টাইগার শাবককে সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন চিড়িয়াখানা থেকে এদেরকে ট্রেনিং দেয়া হয় কিভাবে বন্য পরিবেশে শিকার করে জঙ্গলে ফিরে যাওয়া যায়। এদেরকে আফ্রিকার জঙ্গলে ছেড়ে দেয়া হয়। লিভিং উইথ টাইগার্স নামের একটা টিভি শো তৈরি করে ডিসকভারী চ্যানেল। যেটা ২০০৩ সালে সেরা প্রোগ্রামের টাইটেল পায়। বর্তমানে আফ্রিকার জঙ্গলে ৪টা বেঙ্গল টাইগার শাষন করছে এবং আরো দুটো এই লাইনে আছে। অভিজ্ঞরা দাবী করেন প্রকৃতির নিয়মের বাইরে এই পুরো ব্যাপারটাই আপত্তিকর। ঐ চারটি বাঘ জেনেটিক্যালি খাটি বেঙ্গল টাইগার নয়। পরে প্রমান হয়, রি ওয়াইল্ডিং প্রসেস পুরোটাই ধাপ্পা বাজী ছিল। প্রকৃতপক্ষে কয়েকপুরুষ ধরে চিড়িয়াখানায় থাকা এবং বিভিন্ন প্রজাতীর সংমিশ্রনে জন্ম নেয়া শঙ্কর বেঙ্গল টাইগার গুলো আসলে শিকার করতে পারতো না। ফলে পুরো ব্যাপারটাই শাবক গুলোর জন্যে নির্মম হয়ে ওঠে।
এছাড়া মানুষের আনন্দের জন্যে বিভিন্ন চিড়িয়াখানা এবং পার্কে বাঘ এবং সিংহের সংমিশ্রনে টাইগন (টাইগার+লায়ন) এবং লাইগার(লায়ন+টাইগার) তৈরির হচ্ছে। মেন্ডেলের সুত্র অনুযায়ী স্বাভাবিক ভাবে এই অদ্ভুত প্রানী গুলো জন্ম বোবা এবং প্রজননে অক্ষম হয়। যতোদুর মনে আছে ঢাকা চিড়িয়াখাতেও এধরনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বাঘিনী এবং সিংহকে দির্ঘ দিন একই খাচায় রাখা হয়েছিল। সৌভাগ্যের বিষয় বাঘিনীটি এবং পুরুষ সিংহটা একে অন্যকে সহ্য করতে পারতো না এবং প্রায় মারামারি করতো দেখে বাধ্যহয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ প্রজেক্টটা বাদ দেয়।




















Recent Comments