খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

মাওবাদী আন্দোলন October 5, 2009

ভারতের বিশিষ্ট কবি ও কলেজের অধ্যাপক ভারাভারা রাও ভাবাদর্শগতভাবে একজন নকশালপন্থী। অন্ধ্র প্রদেশে নকশাল বা মাওবাদী আন্দোলন তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সশস্ত্র বিদ্রোহ একদিন ভারতে স্বাধীনতা আনবে, যেমনটি এনেছেন মাও সে-তুং কমিউনিস্ট চীনে। ২০০৪ সালে সরকারের সঙ্গে মাওবাদীদের আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারাভারা রাও। সম্প্রতি সাংবাদিক দ্বৈপায়ন হালদারের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন সিপিআই (মাওবাদী) নেতা কোবাদ ঘেন্দির গ্রেপ্তার ও মাওবাদী আন্দোলনের ভবিষ্যত্ প্রসঙ্গে।

কোবাদ ঘেন্দির গ্রেপ্তার ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বিরাট পুরস্কার। এটা কি মাওবাদী আন্দোলনের জন্য একটি বড় আঘাত?
কোবাদ সিপিআইয়ের (মাওবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁর গ্রেপ্তার নিশ্চয়ই আন্দোলনের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তবে একজন নেতা গ্রেপ্তার হলে মাওবাদী আন্দোলনে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। তাঁর গ্রেপ্তার হওয়াটা দলের জন্য একটি আদর্শিক ক্ষতি।
আপনি কি বলতে চাইছেন তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় কৌশলগত ক্ষতির চেয়ে আদর্শিক ক্ষতি বেশি হয়েছে?
পুলিশকে দেখে মনে হচ্ছে তারা কোবাদ ঘেন্দির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে যাচ্ছে। যদি সত্যিই তারা তাঁর কাছ থেকে তথ্য পায়, তাহলে তা দলের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর হবে, সেটা বলা মুশকিল। যেকোনো দলেই কৌশলগত ও আদর্শগত ব্যাপারটা ভিন্ন। আমি এটা বলতে চাই, একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ মাওবাদী আন্দোলন থামিয়ে দিতে পারবে না।
অতীতে বহু নকশাল নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু কোবাদ ঘেন্দি গ্রেপ্তার হলে হইচইটা যেন একটু বেশি হয়েছে। সেটা কি তিনি দুন ও অক্সফোর্ডে শিক্ষিত বলে?
অবশ্যই এটা একটা কারণ। কোবাদের গ্রেপ্তারের ঘটনাটা সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রধান শিরোনাম হয়েছে। তিনি কোনো বড় করপোরেট অফিসের প্রধান হতে পারতেন। তা না হয়ে তিনি নকশাল নেতা হলেন। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের ব্যাপক আগ্রহ তাঁকে নিয়ে।
শহরাঞ্চলে নকশালবাদ কি তার আকর্ষণ হারাচ্ছে? কোবাদ ঘেন্দির মতো আর কেউ কি আসছে মাওবাদীদের সংগঠনে?
একজন কোবাদ গেছে, আরও বহু কোবাদ তৈরি হবে। দুঃখের কথা হলো, অর্থনীতির বাজারটি দখল করে রেখেছে বুর্জোয়া শ্রেণীর যুবকেরা। অন্যদিকে প্রান্তিক শ্রেণীর যুবকেরা যেমন, মুসলিম ও দলিতরা বাজার শক্তিতে পরিণত হয়নি, কারণ তারা দেখেছে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। এ জন্য তারা এই আন্দোলনের ওপর বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এখন ভারতে কোনো ক্যাম্পাস সংস্কৃতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া ছাড়াই এখন যে কেউ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারে। একটি ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। সেই সংস্কৃতি এখন মারা যাচ্ছে।
কিন্তু এখন শহরে যুবকেরা কীভাবে মাওবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, যখন মাওবাদকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
ভারতে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অন্ধ্র প্রদেশে মাওবাদী কার্যক্রম বেশি হয়। যদি আপনি নকশালপন্থী বা নকশালবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা সাধারণ একজন নাগরিক অধিকার কর্মী হন, তাহলে আপনাকে জেলে যেতে হবে অথবা সাজানো বন্দুকযুদ্ধে নিহত হবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ১৯৯২ সালে সাংবাদিক গোলাম রসুল একটি উর্দু দৈনিকে ভূমি সমস্যা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন। এর পরই পুলিশের সাজানো বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। পুলিশ তাঁকে অভিহিত করে নকশাল হিসেবে। ওই বন্দুকযুদ্ধে গোলাম রসুলের একজন বন্ধুও নিহত হন। একইভাবে যেসব চিকিত্সক সুবিধাবঞ্চিতদের চিকিত্সা করছেন বা যেসব আইনজীবী প্রান্তিক লোকজনের পক্ষে কথা বলছেন, তাঁরা জেলে যাচ্ছেন বা নিহত হচ্ছেন।
কিন্তু খোদ কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করেছে যে নকশালবাদ একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে
এগুলো হচ্ছে কেতাবি কথা। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, নকশালবাদ উদ্বেগের একটা কারণ। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ধারণাকেও সমর্থন করছেন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ফলে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। অনেক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। দেখুন না, সিঙ্গুরে কী ঘটল বা ঘটছে। এ ধরনের সমস্যার সমাধান যত দিন না হবে, তত দিন নকশালবাদ টিকে থাকবে।

ভাষান্তর: রোকেয়া রহমান। প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায়।

 

এক ব্যতিক্রমী মাওবাদী বিপ্লবী October 5, 2009

বাবা বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চবেতনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কলেজপড়ুয়া ছেলে কোবাদের জন্য তিনি একদিন শখ করে সোনার চেইনওয়ালা একটি ঘড়ি কিনে দেন। ঘড়িটি বাবার দেওয়া শখের উপহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দের ছিল তার। তাই ঘড়িটি সারাক্ষণ আগলে রাখত ছেলেটি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিবারের সদস্যরা লক্ষ করল, কোবাদের হাতে ঘড়িটি নেই। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘড়িটি কি হারিয়ে ফেলেছ?’ কোবাদ শান্ত গলায় জবাব দিল, ‘ঘড়িটি আমি পাশের বাসার কাজের ছেলেটাকে দিয়ে দিয়েছি। ওর ওটা খুব পছন্দ হয়েছিল।’ ওই দিন কোবাদের এমন জবাব শুনে পরিবারের সবাই আকাশ থেকে পড়ে। তাদের আশঙ্কা, ছেলেটা হয়তো পাগল হয়ে যাচ্ছে! অথচ তারা জানত না গরিবের জন্য দরদি এই ছেলেটার মনে রয়েছে একজন মহান বিপ্লবী।
এতক্ষণ কোবাদ নামের যে ছেলেটার কথা বলা হলো, আসলে তিনি হলেন ভারতের নকশালপন্থী বিপ্লবী নেতা কোবাদ ঘেন্দি (৫৮)। ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে—পরিবারের এমন আশঙ্কা অবশ্য শেষ পর্যন্ত সত্য হয়নি। তবে সেই কোবাদ মহাপাগল হয়েছিলেন। কোবাদের বন্ধুদের মতে, ওই মহাপাগল হতদরিদ্রদের অধিকার আদায়ে বিপ্লবের পথে নেমেছিলেন। ঘুণে ধরা সমাজে তিনি দেখেছেন কীভাবে ভূমিহীন আর দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ দিন দিন আরও দরিদ্র হচ্ছে, বিপরীতে ধনীরা কীভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। তিনি দেখেছেন বঞ্চিত কৃষক কীভাবে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে, কীভাবে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সমাজের ওই উঁচুতলার মানুষজনই নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্রকে। তারা শুধু গরিবের অধিকার আদায়ের কথা বলে, কিন্তু কাজ করে অভিজাত শ্রেণীর জন্যই। কোবাদ নিজেও ছিলেন উঁচুতলার মানুষ। তাই হয়তো হতদরিদ্রদের নিপীড়নের চিত্র খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলেন। বিলাসী সুখের জীবন ত্যাগ করে তাই একদিন নাম লেখান ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে। কোবাদ চেয়েছিলেন, মহা ঝড় তুলে সমাজকে একেবারে গুঁড়িয়ে দেবেন। এরপর সেখানে আবার গড়া হবে নতুন এক সমাজ, যেখানে থাকবে সাম্য আর ন্যায়বিচার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না তিনি। ৩০ বছর গোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ড) বিপ্লবের বীজ বুনে ২০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন এই বিপ্লবী। নকশালদের কাছে যে কোবাদ এক আদর্শের নাম!
কোবাদদের পারসি পরিবারে অভাব বলতে কিছু ছিল না। সমাজের উঁচুতলার মানুষ বলতে যা বোঝায়, কোবাদরা তাই-ই। কোবাদের এক ভাই প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সুনীল শনবাগ। সুনীল বলেন, ‘আমাদের পরিবারে কোবাদের প্রভাব স্পষ্ট। মাওবাদী রাজনীতিতে জড়ানোর পরও তাঁর জন্য আমাদের পরিবারের সমর্থনে কখনো ভাটা পড়েনি। কারণ আমরা ভালো করেই জানি, কোবাদ গণমানুষের জন্য মুক্তির সংগ্রামে নেমেছে।’
কোবাদ পড়ালেখা করেছেন অভিজাত দুন স্কুল এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এরপর উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন লন্ডনে। সেখানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পাস করেছেন ভালো ফল নিয়ে।
কোবাদের এক বন্ধু রাজনীতিক পি এ সেবাস্তিয়ান বলেন, মূলত ইংল্যান্ডে পড়ালেখার সময়ই তিনি দেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫-৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থা জারি করলে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ওই সময় তিনি গড়ে তোলেন কমিটি ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইট (সিপিডিআর) নামের সংগঠন। আসগর আলী ইঞ্জিনিয়ারের মতো আরও অনেক রাজনীতিক তখন এই সিপিডিআরে নাম লেখান।
আরেক বিপ্লবী এবং কোবাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু সুসান সেবাস্তিয়ান বলেন, ‘সমাজের অভিজাত শ্রেণী থেকে আসার পরও কোবাদের মধ্যে কখনো আভিজাত্যের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। সদাহাস্য মানুষটি সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর স্ত্রী অনুরাধা শনবাগও ছিলেন যোগ্য সহযোদ্ধা। স্বামীর সঙ্গে তিনিও বেছে নিয়েছিলেন বিপ্লবের পথ। জঙ্গলে জঙ্গলে আর বনবাদাড়ে ঘুরতে ঘুরতে শরীরে ম্যালেরিয়া বাসা বেঁধেছিল তাঁর। এ অবস্থায় গত বছর মারা গেছেন তিনি। গত বছর বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে কোবাদ বলেছিলেন, ‘ভারতে এখনকার সমাজব্যবস্থাটা হলো আধাসামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক। এ সমাজকে খাঁটি গণতান্ত্রিক পথে আনতে হবে। তাই আমাদের সংগ্রাম হলো ভূমিগ্রাসী আর গরিব-দুঃখীদের ব্যবহার করে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তাদের বিরুদ্ধে। গ্রামের হতদরিদ্রদের অধিকার আদায়ের আগ পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবেই।’

মহারাষ্ট্র পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নাগপুর ও চন্দ্রপুরে কোবাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ মেলেনি।
এরই মধ্যে কোবাদ ঘেন্দির মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন প্রচার শুরু করেছে। তারা বলেছে, কিছু কিছু গণমাধ্যম কোবাদ ঘেন্দিকে ভুলভাবে তুলে ধরছে। এমন একটি সংগঠনের এক নেতা বলেন, কোবাদ কোনো রক্তলোলুপ সন্ত্রাসী নন। তিনি একজন শান্তিকামী বিপ্লবী। অথচ অনেকে তাঁকে ভুলভাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করে। এটা বড় হতাশাজনক।
সমাজকর্মী ও লেখক জ্যোতি পুণ্যানী বলেন, ‘আমরা যখন দুন স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম, তখন জানতামই না যে, কোবাদেরা এত বড়লোক। ওরলি এলাকায় তাঁদের বিশাল বাড়ি ছিল। পরে যখন বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে আসে, তখন তাঁর কাঁধে থাকত কাপড়ের একটি ঝোলা। তাতে থাকত নানা ধরনের বই। একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। অথচ ওই সাধারণ মানুষটাই সবার সঙ্গে করতেন অসাধারণ আচরণ। সবার মাঝে মিশে যেতেন তিনি অবলীলায়। করতেন হাসি-তামাশা। সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর স্ত্রীও গোটা জীবনটাই দিয়ে গেলেন হতদরিদ্র মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পেছনে। কোবাদ সম্পর্কে এ মুহূর্তে শুধু একটি কথাই বলতে চাই, তিনি কোনো মনীষী নন, বরং একজন বড় মাপের ভাবাদর্শী। গ্রেপ্তার হলেও তাঁর ওই আদর্শের মৃত্যু হবে না। এতে অনুপ্রাণিত হবে পরিবর্তনপ্রত্যাশী ভারতের লাখো বিপ্লবী।’

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.