খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

আজম খান এর সাক্ষাতকার December 3, 2009

Filed under: Azam Khan,People — rezowan @ 7:10 pm
লিখেছেন কবির বকুল

এখন তাঁর বয়স ৬০ বছর। ২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পা দেবেন ৬১তে। সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি বড় ভালোবাসেন তাঁর দেশকে। তাই দেশের জন্য ১৯৭১-এ হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। দেশ স্বাধীন করে ফিরেছেন ঘরে। তারপর নিবেদিত হয়েছেন সংগীতে। গানের জগতের অনেকেই তাঁকে ডাকেন ‘গুরু’ বলে। শুধু ডাকেনই না, গুরু বলে মানেনও। বিজয়ের মাসে সেই গুরুর কাহিনীই শুনি।

কমলাপুর জসীমউদ্দীন রোডে তাঁর বাড়ি। সামনে যেতেই চোখ চলে যায় একতলা বাড়ির ছাদে। ভরদুপুরে ছাদে হাঁটছেন তিনি। পরনে লুঙ্গি আর গায়ে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই হাঁটা থামালেন। নিয়ে গেলেন দোতলার ছোট বাড়িতে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানেই থাকেন। ঢুকতেই সরু একটা ঘর। ঘরে এক সেট সোফা আর একটি খাট। দেখেই বোঝা যায়, বড় সাধারণ জীবনযাপন তাঁর। এই ঘরেই আমাদের বসালেন।
কেমন আছেন আপনি?
‘আছি মোটামুটি।’ কথায় সেই চেনা সরলতা।
রাতে কখন ঘুমান, সকালে কখন ওঠেন?
‘রাত সাড়ে আটটার মধ্যে ঘুমাতে যাই আর সকালে উঠি সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। ব্যায়াম করি। এরপর প্রথম আলো পড়ি। ছোলাটোলা খাই। ঘরের টুকটাক কাজ করে বাজারে চলে যাই।’
প্রতিদিন?
‘হ্যাঁ, মাসের ৩০ দিনই। এমনকি ঈদের দিনও। কিছু না কিনলেও ওই দিক থেকে ঘুরে আসি।’
তাঁর নিয়মিত এমন অভ্যাসের তালিকাটা বেশ লম্বা। প্রতিদিনই সুইমিং পুলে যাওয়া, বাচ্চাদের সঙ্গে সাঁতার কাটা, বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির মাঠে গিয়ে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও খেলেন কখনো কখনো। ১৯৯১—২০০০ সালে তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলতেন গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে। তাঁর অধিকাংশ সময় কেটেছে ব্যাংক কলোনি আর মতিঝিল কলোনিতে।
‘আমার জন্ম আজিমপুরে। থাকতাম আজিমপুর ১০ নম্বর কলোনির পাশে। ওখানে গাবগাছে তক্ষক ছিল। রাতে ডাকত, আমার ভয় লাগত। ৫০ বছর পর এখনো ওই গাছটা তেমনই আছে। ছোটবেলা কেটেছে মতিঝিলে। তারপর ব্যাংক কলোনি। ১৯৫৬তে বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানান, তার পর থেকে এখানেই। এখানে বন্ধুবান্ধব বেশি আরকি! তবে পবিত্র দিনগুলোতে আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত করি। আমার জন্মস্থানটা দেখে আসি।’
কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতেও তাঁর ছোটবেলার অনেক সময় কেটেছে। বললেন, ‘ওই বাড়িতে আপেল আর আঙুর ছাড়া সব গাছ আছে। প্রায় সাড়ে চার বিঘার ওপর বাড়িটা। কামরাঙা, পেয়ারা, লিচু ছিল। পেড়ে খেতাম। কোনো সময় ফল কিনে খাইনি, ওই ফল খেয়ে বড় হয়েছি।’
তাঁর বন্ধুবান্ধবের তালিকাটাও দীর্ঘ। বললেন, ‘ফুয়াদ, নিলু, রানা, বুলু, শাহজাহান, জাহাঙ্গীর আরও অনেকে ছিল। সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। দেখা হয় মাঝেমধ্যে।’
স্মৃতিকাতরতায় পেয়ে বসে তাঁকে। বলেন, ‘আমাদের বাড়িটা কমলাপুর রেলস্টেশনের খুব কাছে। তবে এখানে আগে রেলস্টেশন ছিল না। পুকুর, বিল-ঝিল ছিল। আমরা সেখানে গোসল করতাম। ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম। খুব মজা করতাম। রাজা রাজা খেলতাম, অনেক ঢিবি ছিল। ওখানে সাঁতার কাটতে যাইতাম। যে ওখানে উঠতে পারত আগে, সে-ই রাজা। এরপর নৌকায় চড়তাম। ছোট ছোট কাঁঠাল এক আনায় কিনে সবাই মিলে খেতাম। এখন তো সেই কাঁঠাল ১০০ টাকা!’
ফিরে যাই তাঁর ছোটবেলায়। জানতে চাই ছোটবেলার ঈদের মজার কোনো স্মৃতি।
‘তখন আমার বয়স সাত কি আট। মনে আছে, ওই বয়সে কোরবানির ঈদে হাটে হাটে বেড়াতে যেতাম। দেখতাম কোনটা বড় গরু। দাম কত। এটা একটা আনন্দ। তবে রোজার ঈদটা বেশি আনন্দের। ঈদে নতুন কাপড় কিনতাম, কাউকে দেখাতাম না। ঈদের জন্য আমরা আগে পয়সা জমাতাম। আব্বা পয়সা দিতেন। ঈদের দিন সেটা খরচ করতাম। চাঁদ রাতে পাড়ায় ফাটাফাটি আনন্দ হতো। মানুষ কম ছিল। সবাই সবাইকে চিনত। মায়াদয়া ছিল। এক অন্য রকম আনন্দ! চাঁদ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতাম ভোরে ওঠার জন্য। নামাজে যেতে হবে। আমাদের পাড়ায় এক অবাঙালি থাকতেন। নাম এ কে খান। তাঁর কাছে গেলে বখশিশ পেতাম। দল বেঁধে যেতাম। ওই আমলে পাঁচ টাকা সালামি দিতেন। তাতে সারা দিনের খরচ চলে যেত। আত্মীয়স্বজনকে সালাম করতাম। বন্ধুবান্ধব মিলে ঠিক করতাম, কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। ট্রেনে চড়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী দেখতাম। লঞ্চে উঠতাম। নৌকায় চড়তাম। এয়ারপোর্ট যেতাম, তখন এটা তেজগাঁওয়ে ছিল।
‘একবার ক্যান্টনমেন্টে ঢুকে গিয়েছিলাম। সেটি ছিল আমের মৌসুম। আমগাছে ঢিল মারলাম। একজন সেনাসদস্য দেখে ধমক দিল। আমরা দিলাম দৌড়। ধরতে পারে নাই। সেই দৌড়ের কথা এখনো ভুলিনি। সন্ধ্যা হলে স্টেডিয়ামের হোটেলে গিয়ে মোগলাই খেতাম। তখন মোগলাই ছিল আট আনা। ভাগাভাগি করে খেতাম। রাতে বাসায় ফিরে আসতাম। আর ভাবতাম, প্রতিদিন যদি ঈদের দিন হতো, তবে কত না মজা হতো।’
প্রসঙ্গ পাল্টাই। বলি, আপনি গানের দিকে ঝুঁকলেন কীভাবে?
‘আমি কোনো দিন তবলা, গিটার, কি-বোর্ড বাজিয়ে গান শিখিনি। কোনো ওস্তাদের কাছেও যাইনি। আমাদের বংশে গান আছে। মাও ভালো গান গাইতেন। বাবা ও আত্মীয়রাও গান গাইতেন। আমাদের বংশে কমবেশি সবাই গান করতেন। ছোটবেলায় গান করতাম। হেমন্ত, মান্না দে, কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্রের গান হুবহু পারতাম। তাঁদের অনুকরণ করতাম। ছোটবেলায় পাড়ায় ফেরিওয়ালা, ফকির যেভাবে ডাকত, তা হুবহু করতে পারতাম। বন্ধুরা মজা পেত। বন্ধুরা ছিল হুজুগে। সবাই মিলে পুরান ঢাকায় চলে যেতাম। এক আনা দিয়ে চা ভাগ করে খেতাম। হোটেলটা ছিল নিশাত সিনেমা হলের পাশে। ওইটার নাম এখন মানসী। ম্যানেজার হিট গান ছাড়তেন। ওগুলো শুনতাম, পরে গাইতাম। আবার চলে যেতাম মুন্সিগঞ্জে, নরসিংদীতে, টঙ্গিতে ট্রেনে করে। ট্রেনে গান করতাম। ছাত্রজীবনে এলাকার মেনন ভাই, রনো ভাই বাম রাজনীতি করতেন। তাঁদের প্রভাব ছিল। তাঁদের একটা শিল্পীগোষ্ঠী ছিল। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। ওই দলে গান করতাম। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আইয়ুব খান। বুঝতাম, তাঁরা আমাদের ঠকায়; চাকরিতে, সেনাবাহিনীতে তাঁদের প্রাধান্য ছিল বেশি। আমরা বিপ্লবী হয়ে উঠি। সবাই ঠিক করলাম, গণসংগীত গাইব। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় গান গাইতে যেতাম। ফকির আলমগীর ছিল আমাদের দলে। একবার পুলিশ ধাওয়া করল। পালিয়ে গেলাম। সারা রাত নৌকায় ছিলাম।
‘মহল্লায় একটু একটু মাস্তানিও করতাম। পাড়ায় পাড়ায় মারামারিও করতাম। সে সময় মারামারির কায়দা ছিল ভিন্ন। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ার্নিং দিতাম। রাতবিরাতে আড্ডার কারণে গ্রেপ্তারও হয়েছিলাম। পরে ছেড়ে দিয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধের গল্পও উঠে আসে। স্মৃতি হাতড়ে বলেন, “একাত্তরে ২৫ মার্চের পর সারা শহরে কারফিউ। আর্মিদের জ্বালায় থাকতে পারতাম না। পালিয়ে থাকতাম। বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে নয়। মরলে যুদ্ধ করেই মরব। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ভারতে গিয়ে ট্রেনিং করব। যুদ্ধ করব। যে যার মতো চলে গেল। আমি যেদিন গেলাম, সেদিন আমার সঙ্গে ছিল দুই বন্ধু শাফি আর কচি। বেলা সাড়ে ১১টা। মা প্রয়াত জোবেদা খানমকে (এই সাক্ষাত্কার নেওয়ার পরদিন মারা যান) গিয়ে বললাম, ‘মা, যুদ্ধে যেতে চাই।’ মা বললেন, ‘ঠিক আছে, তোর বাবাকে বল।’ বাবা প্রয়াত আফতাব উদ্দীন খান ছিলেন কলকাতার প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কাঁপতে কাঁপতে গেলাম বাবার সামনে। মাথা নিচু করে বললাম, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। চিন্তা করলাম, এই বুঝি লাথি বা থাপড় দেবেন। বাবা বললেন, ‘ঠিক আছে, যুদ্ধে যাইবা ভালো কথা। দেশ স্বাধীন না কইরা ঘরে ফিরতে পারবা না।’ আমার ছোট ভাই খোকাও মুক্তিযোদ্ধা ছিল। যাই হোক, ট্রেনিং নিতে চলে গেলাম। ট্রেনিং নিয়ে ফিরে প্রথম ফাইট করলাম কুমিল্লার সালদা ক্যাম্পে। সম্মুখযুদ্ধ। আমাদের বলা হলো, যারা ঢাকায় যুদ্ধ করবে, তাদের সরাসরি যুদ্ধ করে পোক্ত হতে হবে। তা না হলে যুদ্ধ করব কীভাবে? পরে জাকির নামের একটা ছেলে যুদ্ধে মারা গেলে আমাদের ওখান থেকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ক্যাম্পে ফিরে গেলাম। তখন প্রথম ভারতীয় ৭৫ টাকা করে বেতন পেলাম। সেই টাকায় আগরতলায় গিয়ে বিরানি খাই, সিনেমা দেখি, ঘোরাঘুরি করি। এর কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে আসি। আমি সেকশন কমান্ডার ছিলাম। ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে পাঠিয়ে দিত। আমার নাম আর্মিরা জানত। আমাকে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে গিয়েছিল। অনেকবার বাড়িতে এসে খুঁজে গেছে। ঢাকার আশপাশে অনেকগুলো যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। একবার গ্রামবাসী খবর দিল, মাদারটেকের ত্রিমোহনীতে সকাল ১০টার দিকে নাকি পাকিস্তানি আর্মিরা আসছে। শুনে যে যার মতো ছুটে গেছি সেখানে। গুলশান হয়ে বালু নদ শীতলক্ষ্যায় পড়ছে। চাঁদের মতো নদী। ওরা যখন রাস্তা দিয়ে আসছে, আমরা চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলি। ওরা ফাঁদে পড়ে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অনেক পাকিস্তানি আর্মি মারা যায়। অনেকে পালিয়ে যায়। অনেক অস্ত্র উদ্ধার করি। কয়েক দিন পর ওদের লাশ পচে পানিতে ভেসে ওঠে। মানুষ লাশকেও গালি দেয়।”
প্রশ্ন করি, আপনাদের ওই জেদটা কি এখনো আছে?
‘ওই জেদটা এখন নেই। আমরা জেদটা ধরে রাখতে পারি নাই। এ জন্যই তো এ অবস্থা।’
কী অবস্থা?
‘আমরা যুদ্ধ করেছি ভালো থাকার জন্য, স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন দেশটা ভালোই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পৃথিবীর সব দেশের করুণা হলো আমাদের ওপর। অনেক সাহায্য এল। কিন্তু সেগুলো পাচার হয়ে যেতে থাকল ট্রাকে ট্রাকে। সেই যে শুরু হলো, এখনো তা চলছে, তাই তো আমরা দুর্নীতিতে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হলাম।’
এটা আপনাকে পীড়া দেয়?
‘হ্যাঁ, পীড়া দেয়। আমরা যে জন্য দেশ স্বাধীন করেছি, তা পূরণ হয়নি। এ দেশ এত দিনে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত হতো। আমাদের নেতারা তা নষ্ট করেছেন।’
মুক্তিযোদ্ধা আজম খান সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখেন। মনে করেন, সাধারণ মানুষই একদিন ইতিবাচকভাবে বদলে দেবে দেশের ভাগ্য।
স্বপ্ন দেখেন?
দেখি।
কোনো অজপাড়াগাঁয়ে একটি স্কুল গড়ার।
ঘণ্টা বাজছে। ক্ষেতের আল বেয়ে বই-খাতা হাতে নিয়ে দৌড়ে আসছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। তাদের মায়া মায়া চোখে আমি দেখছি একটি নতুন বাংলাদেশ।

 

আজম খানের পাঁচটি গানের নেপথ্য কাহিণী November 27, 2009

Filed under: Azam Khan,People — rezowan @ 9:55 pm

এ দেশে পপসংগীতকে তুমুল জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টায় যিনি অগ্রণী, তিনি আজম খান। এ কারণেই তাঁর নামের আগে ব্যবহূত হয় ‘পপসম্রাট’। তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান তরুণ তো বটেই, সব ধরনের শ্রোতার পছন্দের তালিকায় রয়েছে। সেই তালিকা থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে পাঁচটি গান। আজম খান এই গানগুলো সৃষ্টির পেছনের গল্প বলেছেন কবির বকুলের কাছে।


১. পাপড়ি কেন বোঝে না…
পাপড়ি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এটা বাস্তব। ১৯৭৫ সালের কথা। পাপড়িদের পরিবার ভাড়া থাকত ঢাকার কমলাপুরে, ১২ জসীমউদ্দীন রোডে, আমার বড় ভাইয়ের বাড়ির দোতলায়। তখন ওর উঠতি বয়স। পাড়ার ছেলেরা ওকে দেখলেই এটা-সেটা বলত, বিরক্ত করত। মহল্লার ছেলে হিসেবে আমার একটু দাপট ছিল। যখন শুনলাম পাপড়িকে দেখলে পোলাপান ইয়ার্কি-ফাজলামো করে, তখন একটু রাগই হলো। একদিন ওদের ডেকে ধমক দিয়ে বললাম, আর কোনো দিন যেন ওর দিকে চোখ তুলে না তাকায়।
এর পর থেকে পাপড়ির সবকিছু খেয়াল রাখা যেন আমার প্রতিদিনের কাজ হয়ে গেল। এই করতে করতে কখন যে আমি নিজেই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি, টের পাইনি। টের পেলাম তখন, যখন পাপড়িও আমাকে ভালোবাসতে শুরু করল। কিন্তু আমাদের দুই পরিবারের কেউ এটা মেনে নিতে পারল না। একদিন পাপড়ি আমাকে বলল, ‘চলো, আমরা পালিয়ে যাই।’ কিন্তু বিষয়টা আমার পছন্দ হলো না। মেয়ের মতিগতি ভালো ঠেকল না ওর মায়ের। তিনি কিছু একটা আঁচ করতে পেরে পাপড়ির ঘরে তালা মেরে দিলেন। ঘরের ভেতরই খাওয়া-দাওয়া। বাইরে যাওয়া বন্ধ। একদিন সকালে দেখি ওরা বাসা বদলাচ্ছে। এরপর পাপড়িরা চলে গেল। কই গেল, জানতেও পারলাম না। আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। সকাল ভালো লাগে না, বিকেল ভালো লাগে না, রাত ভালো লাগে না।
আমার এক বন্ধু অনু। ওর প্রেমিকা ছিল জলি। অনুরও আমার মতো দশা। আমরা দুজন মিলে দুঃখ ভাগাভাগি করি। ওই সময়ই আমি গানটা বানাই। ‘সারা রাত জেগে কত কথা ভাবি আমি।’ দুঃখমনে সেই গান গাই। আর পাপড়ির কথা মনে করি।
হঠাত্ একদিন মনে হলো, এই গানটা পাপড়ির মা শুনে যদি বলে, ‘আমার মেয়েরে নিয়া গান করছ কেন?’ এ জন্য মনে মনে উত্তর ঠিক করলাম যে, ওনাকে তখন বলব, ‘আমি চোখের পাপড়ির কথা বলছি। পাপড়ি কেন বন্ধ হয় না। এই কারণে ঘুম আসে না।’ গানটার সৃষ্টি ১৯৭৫ সালে। কিন্তু গানটা বিটিভিতে প্রথম গাই ১৯৭৭ সালে। তারপর তো গানটা সুপার হিট।
১৯৮৪-৮৫ সালে আমি চট্টগ্রামে একটা অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেছি। হঠাত্ এক লোক এসে আমাকে বলল, ভাই, একজন ভদ্রলোক আপনাকে খুঁজছে। আমি দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি পাপড়ির স্বামী।’ তিনি আমাকে জোর করে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। পাপড়ির সঙ্গে আবার আমার দেখা হলো ১০ বছর পরে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই খুব রসিক। ওদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করলাম। এর পর পাপড়ি বলল, ‘চট্টগ্রামে এলে আমার বাসায় ছাড়া অন্য কোথাও উঠতে পারবেন না।’ গানের প্রসঙ্গও এল। ‘পাপড়ি’ গানটা নিয়ে নাকি ওকে সবাই খেপায়। যা-ই হোক, সেই থেকে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত। পাপড়িরা ঢাকায় এলে আমার বাসায় আসে। আমার মেয়েরা ওর বাড়িতে যায়। পাপড়ি এখন দাদি হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ওর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। (আমার ‘বাধা দিয়ো না’ গানটিও পাপড়িকে নিয়েই লেখা।)


২. আলাল-দুলাল…
এটা আড্ডারই গান। এই গানটা হলো আমাদের বন্ধুদের সম্মিলিত প্রয়াস। কবি জসীমউদ্দীনের বাড়ির বাগানের দেবদারু গাছতলায় প্রতিদিনই বন্ধুরা আড্ডা দিতাম। গিটার নিয়ে টুংটাং করতাম। আমাদের দুই বন্ধু শাহজাহান আর জাহাঙ্গীর; আপন দুই ভাই ওরা। ওদের ‘আলাল-দুলাল’ বলে খেপাত আমাদের আরেক বন্ধু আলমগীর। শাহজাহান হলো আলাল আর জাহাঙ্গীর হলো দুলাল। ওদের খেপানোর নানা রকম ভাষা থেকেই পরে ‘আলাল-দুলাল’ গানের সৃষ্টি। আমরা মজা করে গাইতাম, শুনে লজ্জায় শাহজাহান আর জাহাঙ্গীর মাথা নিচু করে থাকত। প্রথম প্রথম গাইতাম, ‘আলাল দুলাল, তাদের বাবা হাজি চান, প্যাডেল মেরে ওই পুলে পোঁছে বাড়ি’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তখন একটা পুল ছিল। আমাদের আড্ডা থেকে পুলটা দেখা যেত। আমার মেজো ভাই আলম খান (সংগীত পরিচালক) গানটি শুনে বললেন, ‘ওই পুলে’র জায়গায় ‘চানখাঁর পুল’ শব্দ দুইটা দে, শুনতে ভালো লাগবে। তাই করলাম। একদিন চিন্তা করলাম, গান যখন গাই, এটা গাইছি না কেন। বিটিভিতে ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ স্যারের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের (সম্ভবত ‘চারুপাঠ’) জন্য গানটা রেকর্ড করলাম; কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে। সেই গানও দেখি রাতারাতি হিট।
মজার বিষয় হলো, পুরান ঢাকার চানখাঁর পুলে সত্যি সত্যি ‘হাজি চান’ নামের এক মুরুব্বি ছিলেন। গান শুনে তিনি তো বেজায় খুশি। মনে করলেন, গানটি তাঁকে নিয়েই লেখা হয়েছে। তিনি আমাদের এক বন্ধুকে পেয়ে বললেন, ‘আজম খান তো গানটা জব্বর গাইছে। গানের ম্যাজিকটাও (মিউজিক) ভি ফাটাফাটি হইছে। ওরে লইয়া একদিন মহল্লায় আহ। আমার দাওয়াত।’ তারপর আমরা বন্ধুরা মিলে একদিন তাঁর বাড়িতে যাই। গানবাজনা করি।
কিছুদিন আগে অমিতাভ রেজা ফোন করে বলল, “আপনার ‘আলাল দুলাল’ গানটা একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহার করতে চাই। আমি বললাম, ‘তুমি তো ভালোই বানাও। ঠিক আছে, ব্যবহার করো।’ অমিভাভ বলল, ‘একটা সমস্যা, গানটা নতুন করে কাকে দিয়া গাওয়াই।’ আমি বললাম, ‘নতুন কাউকে নিলে সে কেমন গাইবে, তার চাইতে বরং আমিই গেয়ে দিই।’ শুনে অমিতাভ বলল, ‘আপনি গাইলে তো ভালোই হয়।’ বিজ্ঞাপনচিত্রের জন্য গানটা আবার গাইলাম।

৩. অভিমানী তুমি কোথায়
এটা আমারই লেখা, ১৯৭৩ সালের দিকে সৃষ্টি। আমি খাতাকলমে কোনো দিন গান লিখতাম না। হঠাত্ মাথায় এসে পড়লে মুখে মুখেই বানিয়ে ফেলতাম। আমরা আড্ডা দিতাম চিটাগং হোটেলের সামনে। আমাদের সঙ্গে একটা গিটার থাকত। আমরা যেখানে গান করতাম, সেখানে এক ভারতীয় পাগল ছিল। সে সুরে সুরে একটা গান গাইত আর নাচত, ‘ইতলের বিনা, বিনারে ভাগি, বিনা চালা গ্যায়া।’ ঠান্ডা পাগল ছিল। শুনে খুব মজা লাগত। এই গান থেকে আমি পেয়ে গেলাম সুর। হঠাত্ই মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল, ‘অভিমানী, তুমি কোথায় হারিয়ে গেছ…’।


৪. ওরে সালেকা ওরে মালেকা
এটা পাকিস্তান আমলের গান। জসীমউদ্দীন রোডে ঢুকতেই চিটাগং হোটেলের পাশে ছিল টাওয়ার হোটেল। ওটা একতলা থেকে দুইতলা হয়েছে। সেখানে একটা পানির ট্যাংক ছিল। আমাদের বন্ধু নীলু। গিটার বাজাত। ছোট বাঁশের স্টিক দিয়ে পানির ট্যাংকটাকে ও ড্রাম বানিয়ে বাজাতে লাগল। সেই রিদমের তালে তালে আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু মজা করছি। নীলুর বিটের তালে আমার মুখ থেকে হঠাত্ বের হলো, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা, ওরে ফুলবানু পারলি না বাঁচাতে’। কোনো কারণ ছাড়াই। এ গান নিয়ে পরে দেড় ঘণ্টা মজা করলাম। এভাবে গানটা বের হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে আমরা যখন পপগান করি, তখন হঠাত্ মনে হলো, এই গানটা করি না কেন। এরপর গানটা নতুন করে গাইলাম। তারপর তো গানটা সুপারহিট।


৫. রেললাইনের ওই বস্তিতে…বাংলাদেশ
১৯৭৪ সালের দিকে দেশে দুর্ভিক্ষ লাগল। ভালো মানুষ খাবারের আশায় শহরে এসে ফকির হয়ে গেল। তখন কমলাপুর থেকে নটর ডেম কলেজের ফুটপাত মানুষে ভরপুর। মানুষ মারা যাচ্ছে। ছোট বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। কবর দেওয়ার মানুষ নেই। কে দাফন করবে। মা তাঁর দুধের সন্তানকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষুধার জ্বালায় বাচ্চাকে বিক্রিও করে দিচ্ছেন। তখন নতুন নতুন গান করতাম। আমি নিয়মিত পাঞ্জাবি পরতাম। বড় বড় চুল ছিল। ফুটপাতের বাচ্চাগুলো আমারে দেখলে মামা মামা বলে ডাকত। একদিন দেখি একটা বাচ্চা কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হইছে?’ একজন বলল, ‘মা বাচ্চাটারে রাইখা পলাইছে।’ সব শুনে বুকটা ফেটে গেল। মনে মনে তখনি গানের লাইন খুঁজে পেলাম, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে…’।

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.