দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা ‘বড় মসজিদ’ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। সুষ্ঠু তদারকির অভাবে বৃহত্তর সুনামগঞ্জের এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার গৌরব হারাতে বসেছে। ১৯৩১ সালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলা রায়পুরের মহাজন ইয়াসীন মির্জা এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। টানা ১০ বছর মসজিদের নির্মাণকাজ চলে। মসজিদের প্রধান মিস্ত্রি আনা হয় অবিভক্ত ভারতের কলকাতা থেকে। প্রধান মিস্ত্রিসহ জোগালিরা ছিলেন ভারতের। পাশাপাশি মসজিদ নির্মাণে এলাকার লোকজনও সহায়তা করেন। এলাকার লোকজন এ মসজিদকে রায়পুর ‘বড় মসজিদ’ হিসেবে জানে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর দ্বিতল এ মসজিদে রয়েছে তিনটি আকর্ষণীয় গম্বুজ।
শামস শামীম ও আলমগীর হোসেন
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা ‘বড় মসজিদ’ December 14, 2009
বাংলাদেশে হেমন্তের উত্সব December 4, 2009
লিখেছেন সাইমন জাকারিয়া ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো‘য়
সারা অঙ্গে তার শীতল ভাব, অথচ কিছুতেই সে শীত নয়। ঘাসে, গাছের পাতায়, ঘরের চালে শিশির ঝরিয়ে শীতের সূচনা করে হেমন্ত। বাংলার ফসলের এই ঋতুকে কেন্দ্র করে কয়েকটি উত্সবের বর্ণনা দিয়েছেন সাইমন জাকারিয়া
একসময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উত্পাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে তাতে পাক ধরে। কার্তিকের শেষ দিকে তাই গ্রামের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণে সেই কাটা ধান মাড়াই করা হয়।
এরপর শুরু হয় নবান্নের আয়োজন। এই আয়োজনে চাঁদ-সূর্য কিংবা গ্রহ-নক্ষত্রের তিথিকে অনুসরণ করা হয় না। নবান্নের আয়োজনের পুরোটাই নির্ভর করে ফসল ঘরে ওঠার ওপর। তাই একেক গ্রামে একেক সময় নবান্ন উত্সব হয়। সাধারণত কার্তিকে কাটা ধান অগ্রহায়ণে মাড়াই করে ধান থেকে আতপ চাল তৈরি করা হয়। ওই চাল থেকে তৈরি গুঁড়া দিয়ে শুরু হয় নবান্নের উত্সব।
রান্না করা হয় ক্ষীর-পায়েস। চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি করা হয় চিতই, পাটিসাপটা, পুলি, কুলসি হরেক রকমের পিঠা। আগের চেয়ে নবান্নের উত্সব বাংলাদেশে এখন কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। তবে এখনো অনেক জেলাতেই সাড়ম্বরে নবান্ন উত্সব করা হয়। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলায় নবান্ন উপলক্ষে বিবাহিতা মেয়েরা সন্তান-স্বামীসহ বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।
নবান্ন উত্সব এখন একটি সাংস্কৃতিক উত্সব হিসেবে ঢাকা মহানগরেও আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক বছর ধরে ঢাকায় নবান্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রা বের হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় দিনব্যাপী নবান্ন উত্সবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়। এসব শহুরে সংযোজনের পাশাপাশি গ্রামের পিঠা-পুলি উত্সবের একটি শহুরে রূপও এখানে দেখা যায়।
লালন স্মরণোত্সব
১৮৯০ সালে কার্তিকের, তথা হেমন্তের প্রথম দিনটিতেই কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে নিজের আখড়াবাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন লালন সাঁই। বাংলার এই অসামান্য বাউলসাধকের তিরোধান উপলক্ষে পয়লা কার্তিককে কেন্দ্র করে ছেঁউড়িয়ায় লালন সমাধি চত্বরে তিন দিনব্যাপী লালন উত্সব পালিত হয়।
লালন স্মরণোত্সবের নিজস্ব কিছু চরিত্র আছে, যা অন্যদের থেকে একে আলাদা করে ফেলে। এটা মূলত লালনপন্থী সাধুদের সম্মিলন উত্সব। মেলার এক প্রান্ত জুড়ে থাকে বাউলদের বাদ্যযন্ত্র বিক্রির দোকান। এসব দোকানে একতারা, দোতারা, ডুগি, প্রেমজুড়ি বা কাঠজুড়ি, মন্দিরার মতো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয়। লালন স্মরণোত্সবে লালনপন্থী সাধুদেরই তাঁতে তৈরি গামছা-লুঙ্গিও দিব্যি বিক্রি হয়। বিক্রি হয় সাঁইজির গানের ক্যাসেট ও গানের বই।
অন্যদিকে প্লাস্টিকের সামগ্রী, কারু দারু পণ্য থেকে আসবাবসামগ্রী, পাটি, মাটির পুতুল, মাটির হাঁড়ি, গয়না এসবও বেশ বেচাকেনা চলে মেলায়। মেলায় জমিয়ে বিক্রি হয় কুষ্টিয়ার তিলের খাজা। খাজার প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে লালনের গান, ‘হায় রে মজার তিলের খাজা/খেয়ে দেখলি নে মন কেমন মজা’!
ছেঁউড়িয়ার লালন স্মরণোত্সব ও দোলপূর্ণিমায় লালন সাধুসঙ্গের অনুষ্ঠান বর্তমানে যে চেহারা পেয়েছে তা খুব বেশি দিন আগের নয়। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত লালন উত্সব ছিল অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। সে উত্সব ছিল সাধু-ভক্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তখন দোলপূর্ণিমা কিংবা লালন স্মরণোত্সব ছিল মূলত সাধুসেবার অনুষ্ঠান—বাউল-ফকির সম্মিলন, সেবা ও সংগীত এবং দীক্ষানুষ্ঠান। সে সময় এখানকার অনুষ্ঠানের একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল।
কিন্তু ষাটের দশকে লালন আখড়ার অনুষ্ঠান দুটি প্রশাসনিক সহায়তায় আস্তে আস্তে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে পড়ে। তবুও কোনো কোনো বছর এই মেলার মধ্যেই চলে সাধুদের ‘দীক্ষা’ বা ‘ভেক খিলাফতের’ অনুষ্ঠান।
এই অনুষ্ঠানে লালন সাঁইয়ের মাজারকে সামনে রেখে খেলাফতের সাদা কাপড় পরিয়ে দেওয়া হয় লালন অনুসারীকে। এরপর সমাধিকে সাতবার প্রদক্ষিণের ভেতর দিয়ে দীক্ষা বা খেলাফতের অনুষ্ঠান পালিত হয়। খেলাফতের অনুষ্ঠানের মধ্যে ভিক্ষাপর্বে গান গেয়ে সাধুভক্তদের কাছ থেকে নতুন খেলাফতধারীরা ভিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
দুবলার মেলা
বাগেরহাট জেলার এই রাস উত্সবটি আলোচ্য তার অবস্থানের কারণে। সুন্দরবনের দক্ষিণে পশুর নদীর মোহনায় দুবলার চর নামে এক চরে প্রতিবছর রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে এক বিরাট মেলা বসে। ১৯২৩ সালে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত হরিভজন (১৮২৯—১৯২৩) এই মেলার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিবছর অসংখ্য পুণ্যার্থী রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে এখানে সমুদ্রস্নান করতে আসেন।
দুবলার চরে সূর্যোদয় দেখে সমুদ্রের জলে ফল, মূল ভাসিয়ে দেন ভক্তরা। সমুদ্র ও সূর্যের দিকে তাকিয়ে জীবনের শান্তি ও স্বস্তি ভিক্ষা করেন তাঁরা। কেউ কেউ আবার হারমোনিয়াম-মৃদঙ্গ-করতাল বাজিয়ে ভজন-কীর্তন গেয়ে নীরব দুবলার চরকে মুখর করে তোলেন। দুবলার চরের রাসমেলায় শুধু গ্রামীণ ও বনবাসী ভক্তকুল সমবেত হন না, দূর-দূরান্তের শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুবলার চরের মেলায় অংশ নিয়ে থাকেন।
দুবলার চর ছাড়াও বাংলাদেশে রাসমেলার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো—বাগেরহাটের খানপুর রাসপূর্ণিমার মেলা, ফরিদপুর ওড়াকান্দির রাসমেলা, দিনাজপুর কান্তনগর রাসমেলা, বরিশালের গোশিঙ্গা রাস উত্সবের মেলা, সিলেটের লামাবাজার রাস উত্সব মেলা।
রাসলীলা
অনেকে হেমন্ত ঋতুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন মনে করেন মণিপুরি জনগোষ্ঠীর রাস উত্সবকে। হেমন্ত ঋতুতে অনুষ্ঠিত মহারাস বাংলাদেশের মণিপুরি জনগোষ্ঠীর প্রধান উত্সব।
রাসপূর্ণিমার দিন রাত ১২টার দিকে মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠী আদমপুর ও মাধবপুর গ্রামের কিছু মণ্ডপে মহারাস পালন করে। মূলত মণিপুরি কিশোরীরাই মহারাসে অংশ নেয়। উত্সবের শুরুতেই বাদ্যকর ও গায়েন-দোহারদের সম্মিলিত ঐকতান। তারপর থাকে সম্মিলিত কণ্ঠে একটি রাগাশ্রিত ভক্তিমূলক গান। এরপর আসে আগমনী।
আগমনীতে একটি কিশোরী নাচের পোশাকে শ্রীরাধার সখী বৃন্দা সেজে এসে মণ্ডপে নৃত্য শুরু করে। বৃন্দার আগমনী নৃত্যগীতি শেষ হলে প্রদীপ আরতি শুরু হয়। তারপর বাঁ হাতে একটি কাচের স্বচ্ছ গ্লাস তুলে নেয়। গ্লাসের মধ্যে গোলাপি রঙের পানিতে সুগন্ধি মেশানো থাকে। হাতে একটি পাতাবাহারের পাতাসমেত ডাল নিয়ে মাঝেমধ্যে সুগন্ধি ছিটাতে থাকে।
এরপর সে ফুলের থালা হাতে নাচতে নাচতে ফুল সংগ্রহে বের হয় এবং মণ্ডপে রাখা ফুলগাছ থেকে কয়েকটি কাগজের ফুল সংগ্রহ করে মালা গাঁথে। এর পর মঞ্চে একটি আসন পেতে দিয়ে বিদায় নেয় বৃন্দা।
এরপর মণ্ডপে আবির্ভাব হয় কৃষ্ণরূপী এক বালকের। প্রথমেই দেখা যায়, কৃষ্ণ ঘুমিয়ে আছে। তার এক হাতের মুঠোর মধ্যে জরি দিয়ে সাজানো একটি বাঁশি। একসময় ঘুম থেকে উঠে নাচ শুরু করে কৃষ্ণ। সঙ্গে সঙ্গে গায়েনদের কণ্ঠের গানও বদলে যায়। কৃষ্ণ নাচ শেষ করে বৃন্দার রেখে যাওয়া আসনে বসে পড়ে। এভাবে কৃষ্ণর আসনে বসার ভেতর দিয়ে শেষ হয় রাসের দ্বিতীয় অঙ্ক। রাসের তৃতীয় অঙ্ক থাকে রাধা ও তার সখীদের দখলে।
কৃষ্ণ আসনে বসার পর সখীরা দলবেঁধে রাধাকে নিয়ে গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে মণ্ডপে প্রবেশ করে, ‘যাত্রা কইরো বামস্বরে বামপদ তুলি/যাত্রা কইরো বিনোদিনী।/মুখে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি/বামস্বরে বামপদ তুলি\’ বলা হয়ে থাকে এটি হচ্ছে ‘রাধা ও তার সখীদের আগমন গীত।’
একপর্যায়ে রাধা যখন কৃষ্ণের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন কৃষ্ণ প্রশ্ন করে, ‘কোন কারণে আইছো বৃন্দাবনে, গভীর-নিঘোর রাতে?’ উত্তরে রাধারানী লজ্জা পেয়ে যায়। আর সখীরা রাধার হয়ে কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে। কৃষ্ণ তাদের ক্ষমা করে দিয়ে প্রসন্ন বদনে এবার রাধার দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা যুগল মূর্তিতে প্রকাশ পায়।
গোষ্ঠলীলা
সাধারণত কার্তিক মাসেই রাসপূর্ণিমার চাঁদ ওঠে। এই পূর্ণিমার দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মৌলভীবাজার জেলার আদমপুর ও মাধবপুরে চলে গোষ্ঠলীলার উত্সব। মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সারা দিন এলাকা মাতিয়ে রাখে উত্সবে।
গোষ্ঠলীলা করা হয় পৌরাণিক চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠভূমিতে গোচারণকে স্মরণ করে। এদিন খুব সকাল থেকেই আদমপুর-মাধবপুরের বাড়ি বাড়ি তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। অনেক বাড়ির ‘মাংকোলে’ বা ঘরের বারান্দায় কৃষ্ণ অথবা রাখাল সাজানো হয়। তার মাথায় তুলে দেওয়া হয় ময়ূরের বহুবর্ণ চূড়া, নিচে লাল রঙের লেট্রেং, কপনাম। আর মাথার চূড়া থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় জোড়াফুল, জুড়া বা চুল। গলায় ফুলদান বা মালা পরিয়ে পাঙপঙ বেঁধে দেওয়া হয় দুই বাহুতে। এরপর থাবেরেত, থবল, ঘুঙুর, খাড়ু, আঙটি আর পিছনদারীতে রাজকীয় ভঙ্গিমায় সাজানো হয় কৃষ্ণ বা রাখালকে।
সাজসজ্জা শেষ হতেই কৃষ্ণ বা রাখাল গোষ্ঠলীলার অনুষ্ঠানে রওনা দেয়। জোড়মণ্ডপে পৌঁছে তার জন্য নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসে। এ সময়ই প্রথম বোঝা যায়, কে কৃষ্ণ আর কে রাখাল। কারণ, কৃষ্ণ থাকে একদিকে একা। আর রাখালেরা থাকে দলবেঁধে। কৃষ্ণের পাশে মৃদঙ্গ-করতাল বাদক এবং মা যশোদারূপী দুজন নারী বসে থাকেন।
বাদ্যকর-গাহকেরা এবার বন্দনায় কৃষ্ণকে ডেকে চলে—‘এসো হে কানাই এসো/বলি বারে বারে\’ এমন বন্দনাগীত শুনে কেউ কেউ আবেগে আসরে ছুটে এসে শিশু কৃষ্ণের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন। তখন অন্য কেউ এসে তাঁকে উঠিয়ে ভক্তদের মধ্যে নিয়ে যায়।
বন্দনাগীত শেষে বাঁশি হাতে দুই-দুইজন করে মোট চারজন সখা এসে কৃষ্ণ ও যশোদার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শিশুদের মতো ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বাদ্যের সঙ্গে বলতে থাকে—‘চলো গোষ্ঠে/চলো গো কানাই…।’ কৃষ্ণ বাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়—‘আর যাব না গোষ্ঠে/মাতার কথার বোল বলে/পিতার কথার বোল বলে/বলি আমি গোষ্ঠে আর যাব না।’ কৃষ্ণের কথা শেষ হতেই সখাদের উদ্দেশে এবারে মা যশোদা গেয়ে ওঠেন—‘তোমরা যাও হে/আর গোপাল দিব না গোষ্ঠে।’
সখারা পাল্টা গেয়ে ওঠে—‘শোনো বলি এবার/কানাই সঙ্গে নিতে চাই/গোষ্ঠে কানাই বাঁশি বাজায়/আমরা সবাই ধেনু চরাই/কানাই বিনে গোষ্ঠ কেমনে হয়…!’ এরপর কৃষ্ণ বলে ওঠে—‘মাগো মা তোর চরণ ধরি/গোষ্ঠে যাইতে বিদায় দে মা জননী/এই মিনতি করি।’
শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের কথায় এবং তার সখাদের দাবিতে কৃষ্ণকে গোষ্ঠে যাওয়ার অনুমতি দেন যশোদা। জোড়মণ্ডপ থেকে কৃষ্ণ ও তার রাখালসখারা এবার কদমতলার গোষ্ঠে চলে যায়। এবার গোষ্ঠের মূল আয়োজন শুরু হয়। এ আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ অসংখ্য রাখালের সম্মিলিত নাচ। নিরবচ্ছিন্নভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নাচ চলে। গোষ্ঠলীলার রাখালনৃত্যে কৃষ্ণের অসুর নিধন, সন্ন্যাসী ও দই বিক্রেতার সঙ্গে নাট্যাংশ অভিনীত হয়। সন্ধ্যায় মা যশোদার আরতিতে গোষ্ঠলীলায় রাখালনৃত্য শেষ হয়।
মহাভারতের বাস্তবানুগ পাঠ December 3, 2009
মহাভারতের মহারণ্যে
লেখক: প্রতিভা বসু
প্রকাশক: বিকল্প প্রকাশনী, কলকাতা
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ১৯৯৮
প্রচ্ছদের ছবি: নন্দলাল বসুর স্কেচ ‘দুর্যোধন’
মূল্য: ৬০ টাকা
পৃষ্ঠা: ২১৪
ভারতবর্ষে এমন কিছু নেই যা মহাভারত-এ অনুপস্থিত—এ রকম এক প্রবচন জানার পর এ মহাগ্রন্থের প্রতি আকৃষ্ট হই। তত দিনে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রত্বে উন্নীত হয়েছি। রাজশেখর বসুর সারানুবাদ দিয়ে শুরু। তারপর অনার্সে পা দিয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ। প্রায় বছরখানেক কাটে তাঁর লাইনে লাইনে হাঁটাহাঁটিতে।
গ্রন্থটি আয়তনে এত বিশাল, এত সুদূরে এর বিস্তার যে একবার পাঠে তা আয়ত্তে আনা দুরূহ। আর হূদয়ঙ্গমের জন্য চাই আরও গভীরে ডুব, শতপাঠ। জীবিকার তাগিদ সে সৌভাগ্য থেকেও বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই যতটুকু সম্ভব আয়ত্তে আনার জন্য প্রাসঙ্গিক বইয়ের দ্বারস্থ হই। হাতের কাছে যা পাই, সাধ্যে যা কুলোয়, তা সংগ্রহ করি। এর কোনোটা সঙ্গে সঙ্গে পাঠ হয়ে যায়, আবার কোনোটা আলমারিতে বসে বয়স বাড়ায়, যেমন প্রতিভা বসুর মহাভারতের মহারণ্যে।
মহাভারত-এর মতো মহাগ্রন্থ পাঠে যে-কারও মনে অনেক প্রশ্ন জাগে, হাজারো বৈপরীত্যের জোড় মেলে না। সাধারণ পাঠক হিসেবে আমাকেও সে ঘূর্ণিবায়ুতে পড়তে হয়েছে। তা থেকে বের হওয়ার দরজা খুঁজছিলাম। হাতড়াচ্ছিলাম প্রাসঙ্গিক বই। প্রতিভা বসু যেন সে দরজা দেখিয়ে দিলেন। অনেক প্রশ্নের উত্তর, শত বৈপরীত্যের জোড় মিলে গেল।
প্রতিভা বসু তাঁর বইয়ে কোনো কল্পকাহিনীকে প্রশ্রয় দেননি। মহাভারতজুড়ে অ্যাখ্যান-উপাখ্যান, রূপকথা-উপকথার যে বিশাল মেলা রয়েছে, তা ছেঁটে ফেলে মূল কাহিনী নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার অলৌকিক ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা খুঁজেছি।’
এ বাস্তবধর্মী ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে গিয়ে তাঁকে তৈরি করতে হয়েছে অনেক নতুন পথ। আর তাঁর ইট-পাথরের যুক্তি একে করেছে সুদৃঢ়। যেমন আমরা জানি, মহাভারত হচ্ছে ‘ভরতবংশ’র ইতিহাস। এর চূড়ান্ত মুহূর্ত কুরুক্ষেত্রে ভাইয়ে ভাইয়ে, কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষের মধ্যে মহাযুদ্ধ। কিন্তু প্রতিভা বসু তা মনে করেন না। তাঁর মতে, ‘মহাভারত নামত ভরতবংশের ইতিহাস হলেও, প্রকৃতপক্ষে সত্যবতী-দ্বৈপায়নের বংশের ইতিহাস। হয়তো সে জন্যই দ্বৈপায়ন লোকগাথায় বেঁধে সেই মূল আখ্যানটিকে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, সত্যবতীর পুত্র হচ্ছে মহাভারতের রচয়িতা দ্বৈপায়ন, তাঁর পুত্র বিদুর এবং তাঁর পুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁকে হস্তিনাপুরের তথা ভারতবর্ষের অধিপতি করার জন্য শুরু থেকে নানা উদ্যোগ-আয়োজন চালায় মাতা-পিতা ও পিতামহ। আর সে পথে একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায় কৌরব পক্ষের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর জন্মের পর থেকেই চলে হাজারো অপপ্রচার। জন্মের পরপরই তাঁর গায়ে লাগানো হয় ‘পাপাত্মা’র তকমা। সহস্র সহস্র বছর ধরে তাই সবাই তাঁকে মহাভারত-এর ভিলেন হিসেবে বিশ্বাস করে এসেছে। আর যিনি ‘ধর্মাত্মা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, তিনি নিজে অক্ষম হয়েও অপরের পারঙ্গমতার সাহায্যে তাঁর নিজের লোভ চরিতার্থের জন্য যেকোনো পাপকর্মে অন্যদের লিপ্ত হতে দিতে মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করেননি’, সেই যুধিষ্ঠির গিয়ে দাঁড়িয়েছেন নায়কের কাতারে।
মহাভারত-এর আরেক নায়ক অর্জুন, তৃতীয় পাণ্ডব। তাঁর বীরত্বের কাহিনী ভুবনজোড়া। তবে প্রতিভা বসুর বাস্তবানুগ কাহিনীর আয়নায় তাঁর যে ভূমিকা ফুটে উঠেছে, তা হচ্ছে, ‘সারা মহাভারতে কোটি কোটি অক্ষরের প্রকাশে যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই অর্জুন কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রকৃতপক্ষে কোনো বড় যোদ্ধার সঙ্গেই শঠতা ব্যতীত বীরত্বের প্রমাণ দেননি।’ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুরুক্ষেত্রে কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ। কর্ণ যেহেতু অঙ্গীকার করেছিলেন, পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে অর্জুন ছাড়া আর কাউকে বিনাশ করবেন না, তাই অন্যদের বাগে পেয়েও ছেড়ে দেন। কিন্তু যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে তাঁর রথের একটি চাকা মাটিতে দেবে যায়। এ সময় তাঁকে আঘাত করা যুদ্ধরীতি ও ক্ষত্রীয় ধর্মবিরোধী। কিন্তু অর্জুন তা মানেননি, বরং কর্ণ যখন অস্ত্রহীন হয়ে রথের চাকাটা তোলার চেষ্টা করছিলেন, তখন কৃষ্ণের প্ররোচনায় কাপুরুষের মতো তাঁর মস্তক ছেদন করেন।
মহাভারত-এর সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র কৃষ্ণ। তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার যেমন শেষ নেই, তেমনি তাঁকে অবতার ভেবে পুজোপাদ্য দেওয়ারও ক্ষান্তি নেই। তবে প্রতিভা বসুর মনে হয়েছে, ‘কৃষ্ণ অনৃতবাক্য উচ্চারণে যেমন বিমুখ নন, তেমনি যেকোনো হীনকর্ম করতেও দ্বিধাহীন।’
আর দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের ঘটনার সঙ্গে রয়েছে অলৌকিকত্বের ছোঁয়া। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মুড়ে তাকে বাস্তবানুগ করার কোনো চেষ্টাই করেননি প্রতিভা বসু। তবে তাঁর মতে, রাজসভায় দ্রৌপদীকে অপমানের ঘটনা ছিল পাণ্ডবদের হিংসার বদলে কৌরবদের প্রতিহিংসা মাত্র। আর পঞ্চস্বামী গ্রহণ, একেক বছরের জন্য একেকজনের শয্যায় যাওয়াকে মনে হয়েছে, ‘নারী দেহ তো নয়, যেন খেলার বল।’
তবে প্রতিভা বসুর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার দুর্যোধন। তাঁর মতে, তাঁর আসল নাম ‘সূর্যধন’। রচনায় দ্বৈপায়ন এবং রাজসভায় বিদুর একজোট হয়ে অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে দুর্যোধন করেছেন। কেননা কোনো পিতাই তাঁর সন্তানের এ নাম রাখতে পারেন না, সে যে যুগের দোহাই পাড়া হোক না কেন।
আর মহাভারতজুড়ে তাঁর ঘাড়ে এত সহস্র অপকর্মের দোষ চাপানো হয়েছে যে এর নিচে চাপা পড়ে গেছে তাঁর যত সুকীর্তি ও সুকর্ম। অথচ তিনি ছিলেন সুশাসক, প্রজাবত্সল এবং বিশাল বীর। প্রতিভা বসুর তাই আক্ষেপ—‘যদি বলি দুর্যোধন স্বভাবতই কিছুটা সংযত ও সহিষ্ণু চরিত্রের মানুষ, তাহলে শতকরা ১০০ জনই হয়তো অট্টহাস্য করে উঠবেন। কেননা, কেবল শুনে শুনে, প্রচারের মহিমায়, তার উল্টো কথাই সবাই বিশ্বাস করে এসেছেন সহস্র সহস্র বছর যাবত্।’
সুতরাং যারা মেদহীন বাস্তবানুগ মহাভারত পড়তে আগ্রহী, তাদের জন্য মহাভারতের মহারণ্যে অবশ্যপাঠ্য।
লিখেছেন জিয়া হাশান
বাংলাদেশে এইডসের ঝুঁকি বাড়ছে December 1, 2009
দেশের এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ জরিপ প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখছে না। জরিপ শেষ হয়েছে ২০০৭ সালের জুনে। প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছিল ওই বছরই। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেখে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এক বছর আগে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এই প্রতিবেদন কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা তা বলতে পারেননি।
এইচআইভি/এইডস নিয়ে কাজ করে এমন এনজিও ও জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা অভিযোগ করছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নেতৃত্বহীনতার কারণে দেশে এইচআইভি/এইডসের ঝুঁকি বাড়ছে।
সর্বশেষ জরিপ বলছে, ঢাকা শহরের একটি অঞ্চলে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের (ইনজেক্টিং ড্রাগ ইউজার—আইডিইউ) ১১ শতাংশ এইচআইভি-সংক্রমিত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পাঁচ শতাংশ কোনো রোগে সংক্রমিত হলে তাকে মহামারি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে তা দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আমলাতন্ত্র কাজ আটকে দিয়েছে: আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে দেশের এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি নিয়ে জরিপ শুরু করে। রক্তের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সেরো সার্ভিলেন্স’ নামের এই বিশেষ জরিপ শেষ হয় ওই বছরের জুন মাসে।
সরকারি-বেসরকারি একাধিক সূত্র বলছে, ২০০৭ সালের আগস্টে আইসিডিডিআরবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জরিপ প্রতিবেদন জমা দেয়। এর ১৬ মাস পর অর্থাত্ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এইডস-বিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটি সেই প্রতিবেদন অনুমোদন করে। এরপর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় আজও তা প্রকাশ করেনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও এইচআইভি ভাইরাস বিশেষজ্ঞ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান জরিপ করে প্রতিবেদন তৈরি করে। কারিগরি কমিটি সেই প্রতিবেদন দেখেছে। তিনি বলেন, ‘একটি জরিপ তথ্য প্রকাশের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন কেন দরকার তা বুঝতে পারি না। আর এত দিন অনুমোদনের অপেক্ষায় রাখাও ঠিক হচ্ছে না।’
জাতিসংঘের একটি অঙ্গ সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, জরিপের মাধ্যমে এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি জানা যায়। জরিপের উপাত্তের ভিত্তিতে কর্মসূচি পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়। কিন্তু আড়াই বছর ধরে এসব বন্ধ।
গতকাল সোমবার যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব দেশের বাইরে। একজন যুগ্ম সচিব জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর আলী বেলালের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। আলী বেলাল এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি কয়েক দিন আগে এই পদে যোগ দিয়েছেন, বিশেষ কিছু জানেন না।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রায় এক বছর ধরে হাতি (এইচআইভি অ্যান্ড এইডস টার্গেটেড ইন্টারভেনশন) প্রকল্প বন্ধ আছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ২০০৪ সাল থেকে হাতি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছিল (শুরুতে নাম ছিল এইচআইভি অ্যান্ড এইডস প্রিভেনশন প্রজেক্ট-হ্যাপ)। ইউনিসেফ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। ইউনিসেফ সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, ২০০৮ সালে প্রকল্পের একটি পর্যায় শেষ হয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে নতুনভাবে প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এনজিও নির্বাচনের কাজ শেষ করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাই সরকারের অুনরোধে ইউনিসেফ ২০০৯ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্প চালিয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংক ১৬ জুন সরকারকে চিঠি দিয়ে দ্রুত প্রকল্প শুরু করতে বলে। আর তা না করলে কী বিকল্প ব্যবস্থা নেবে তা বিশ্বব্যাংককে জানাতে বলে। ২৫ জুন বিশ্বব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সভা হয়, তাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় মন্ত্রী দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করার পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। দেড় লাখের বেশি মানুষ এই প্রকল্প থেকে সরাসরি সেবা পেত। প্রকল্প বন্ধ থাকায় দেশে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টরের কার্যালয় থেকে এই প্রতিবেদককে বলা হয় যে এনজিও বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে।
ঝুঁকি বাড়ছে: সরকার, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আইসিডিডিআরবির সর্বশেষ জরিপে ঢাকা শহরের একটি এলাকায় শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের ১১ শতাংশ এইচআইভি-সংক্রমিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচ শতাংশ মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাকে ‘কেন্দ্রীভূত মহামারি’ (কনসেন্ট্রেটেড এপিডেমিক) বলে। এর বিপদ হচ্ছে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে ভাইরাস যেকোনো সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের কাছ থেকে এ রোগ দ্রুত অন্য মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী বা স্ত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০০৮ সালের আঙ্গাস (ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেমব্লি স্পেশাল সেশন অন এইচআইভি/এইডস) প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০০ সালে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের ১ দশমিক ৪ শতাংশ এইচআইভি-সংক্রমিত ছিল। ২০০১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে তা ১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০২ ও ২০০৪ সালে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে চার শতাংশে দাঁড়ায়। দাতাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ নিয়ে চোখধাঁধানো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে সংক্রমণ হ্রাস বা বন্ধ করা যায়নি। ২০০৫ সালে সংক্রমণের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশে এবং ২০০৬ সালে সাত শতাংশে পৌঁছায়।
অসন্তোষ: সরকারের কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতো বিশেষজ্ঞরা। নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ছোট একটি এলাকায় ক্রমাগতভাবে সংক্রমণের হার বাড়বে, এটা সহজে মেনে নেওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, কর্মসূচিতে কোনো গলদ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দরকার আছে। কর্মসূচি হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে সমস্যা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিনি নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দেন।
শনাক্তকৃত এইচআইভি-সংক্রমিত ব্যক্তি বা এইডস রোগীদের একটি বড় অংশ বিদেশ ফেরত, প্রধানত প্রবাসী শ্রমিক। এসব শ্রমিককে উদ্দেশ করে সরকারের বা এনজিওদের কোনো কাজ নেই।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) গত সপ্তাহে প্রবাসী নারী শ্রমিক ও এইচআইভি সংক্রমণ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হচ্ছে, ২০০২ সালে এইচআইভি-সংক্রমিতদের ৫১ শতাংশ ছিলেন বিদেশ ফেরত শ্রমিক। ২০০৪ সালে সরকার সারা দেশে নতুন ১০২ জন সংক্রমিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে, তাঁদের মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন প্রবাসী শ্রমিক।
নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিদেশে শ্রমিকদের ঝুঁকি কী, তাঁদের করণীয়—এসব বিদেশে যাওয়ার আগেই শ্রমিকদের জানানো দরকার।
প্রবাসী শ্রমিকদের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে ইউএনডিপি।
নিষ্ক্রিয় জাতীয় কমিটি: সাড়ে তিন বছর ধরে জাতীয় এইডস কমিটির কোনো সভা হয় না। দেশের সর্বোচ্চ এই কমিটির মূল কাজ এইচআইভি/এইডস বিষয়ে নীতিনির্ধারণ, দেশের এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং জাতীয় কর্মসূচি দেখভাল করা। ৬১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সভাপতি রাষ্ট্রপতি এবং সদস্যসচিব স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী। এই কমিটি সর্বশেষ সভা করেছিল ২০০৬ সালের মে মাসে। জাতীয় এইডস কমিটি গঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। আর দেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলেছে, জাতীয় এইডস কমিটি সক্রিয় নয় বলে এইডস-বিষয়ক কার্যক্রমে নানা অসংগতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেশন ম্যাকানিজম (৪০ সদস্য), কারিগরি কমিটি (২৯ সদস্য), পর্যবেক্ষণ উপকমিটি (১২ সদস্য), প্রচার উপকমিটি (২১ সদস্য)—এ ধরনের বেশ কয়েকটি কমিটি আছে। কিন্তু এগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা দেখার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
প্রতিবছর ঈদ এগিয়ে আসে কেন November 14, 2009
ঈদ, রোজা, মহররমসহ ইসলাম ধর্মীয় দিনগুলো প্রতিবছর এগিয়ে আসে। গত বছরের চেয়ে এবার ১১ দিন আগে ঈদ হবে। এর কারণ, আরবি (ইসলামি) ক্যালেন্ডার বা হিজরি সাল ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন কম। হিজরি সালের প্রতিটি মাস শুরু হয় অমাবস্যার পরের সন্ধ্যায় প্রথম চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে। মাসের প্রথম চাঁদ সূর্যাস্তের পর পরই পশ্চিমাকাশে উদিত হয়। দেখতে খুব সরু কাস্তের একটি ফালির মতো। এ চাঁদ আকাশে ক্ষণস্থায়ী হয়। এরপর প্রতি সন্ধ্যায়ই চাঁদ বড় হতে থাকে। ক্রমে পূর্ণিমা এবং এরপর কৃষ্ণপক্ষে চাঁদ ক্রমে ছোট হয়ে আকাশে দেখা দেয়। আসলে চাঁদ ছোট-বড় হয় না, আকাশে চাঁদের যে অংশ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে, সেটা বাড়ে বা কমে। চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে বলেই এ রকম হয়। এই ঘোরার পথে রাতে পৃথিবীর বিপরীত পাশে অবস্থিত সূর্যের আলোয় আলোকিত চাঁদের অংশ বাড়ে বা কমে। পৃথিবীও যেহেতু ২৪ ঘণ্টায় নিজ অক্ষরেখার চারপাশে একবার করে ঘুরে আসে, তাই প্রতি রাতেই আকাশে চাঁদ দেখা যায়, শুধু অমাবস্যার সময় চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর একই দিকে চলে যায় বলে ওই রাতে চাঁদ দেখা যায় না। চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয়, সেটা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের প্রায় সাড়ে ২৯ দিনের সমান। কিন্তু যেহেতু মাসের হিসাবে দিনের ভগ্নাংশ থাকে না, তাই আরবি মাস চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৯ বা ৩০ দিনে হয়। ১২ মাসে মোট দিনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫৪ (২৯.৫x১২)। কিন্তু ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসাব করা হয় সৌরবছর দিয়ে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে প্রায় ৩৬৫ দিন লাগে। তাই প্রতিবছর ইসলাম ধর্মীয় দিবস ও মাস ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। সে জন্যই গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঘুরে ঘুরে সব ঋতুতেই ঈদ আসে। প্রায় ৩৩ বছর পর পর বছরের একই সময়ের কাছাকাছি সময়ে ঈদ হয়। যেমন: এবার কোরবানির ঈদ হচ্ছে নভেম্বর মাসের শেষ দিকে। ২০৪২ সালে আবার প্রায় এই সময়ে কোরবানির ঈদ আসবে।
বিশ্বের একমাত্র November 14, 2009
আব্রাহাম লিংকন একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যাঁর নামে কোনো প্যাটেন্ট আছে। লিংকন জাহাজ টেনে তোলার একটি হাইড্রোলিক যন্ত্র আবিষ্কার করে এই প্যাটেন্ট লাভ করেন।
১৭৩০ সালের আগ পর্যন্ত ভারত ছিল হীরা প্রাপ্তির একমাত্র উত্স।
অ্যান্টার্কটিকা একমাত্র মহাদেশ, যেখানে কোনো সাপ বা সরীসৃপ নেই।
ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি চারবার নির্বাচিত হয়েছেন।
জিরাফই একমাত্র প্রাণী, যার জন্মের সময়ই শিং থাকে।
গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি হোয়াইট হাউসেই বিয়ে করেছিলেন।
হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র রাজ্য, যেখানে কফি জন্মে।
জেমস বুচানন একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি বিয়ে করেননি।
লিবরা বা তুলা হচ্ছে রাশিগুলোর একমাত্র প্রতীক, যা জড় পদার্থ।
লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়া একমাত্র রাজধানী, যেটির নামকরণ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের (জেমস মনরো) নামে হয়েছে।
মানুষ বাদে ব্লাড হাউন্ড একমাত্র প্রাণী, মার্কিন কোর্টে যার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।
পেঙ্গুইন একমাত্র পাখি, যেটি সাঁতার কাটতে পারে কিন্তু উড়তে পারে না। এ ছাড়া এটি একমাত্র পাখি, যেটি ঋজু ভঙ্গিতে হাঁটে।
চার (Four) একমাত্র সংখ্যা, ইংরেজিতে যা লিখতে একই সংখ্যক অক্ষর লাগে।
ওয়েবসাইট অবলম্বনে
সামসুল আলম
হজ্বের মাহাত্ম্যপূর্ণ দোয়া সমূহ October 30, 2009
আবদুলস্নাহ আল বাকী
বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলালস্নাহি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইলস্না বিলস্নাহ্।
অর্থঃ আলস্নাহ্র নামে তাঁরই উপর নির্ভর করে বের হচ্ছি। তাঁর সাহায্য ছাড়া কোন সৎ কাজই সমাধা হয় না এবং অসৎ কাজ হতেও বেঁচে থাকা যায় না। মক্কায় হারাম শরীফে প্রবেশকালে পড়বেনঃ
আলস্নাহুম্মা হাযা আম্নুকা ওয়া হারামুকা ওয়ামান দাখালাহু কানা আমিনা। ফাহার্রিম লাহ্মী ওয়া দামী ওয়া আযামী ওয়া বাশারী আলান্নার।
অর্থঃ হে আলস্নাহ্! ইহা তোমার সুরৰিত পবিত্র স্থান। এখানে যে-ই প্রবেশ করে, সে-ই তোমার আইনে নিরাপত্তা পায়। সুতরাং আমার রক্ত, গোশ্ত, অস্থি ও চর্মকে দোযখের আগুনের জন্য হারাম করে দাও।
কা’বা শরীফ দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্র এ দো’আ পাঠ করবেনঃ
লাব্বাইকা আলস্নাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারিকা লাক্। আলস্নাহুম্মার যুক্নী বিহা কারারান্; ওয়ার যুকনী ফীহা রিয্ক্বান হালাল।
অর্থঃ আমি হাজির, হে আলস্নাহ! আমি হাজির, আমি হাজির, কোন শরীক নাই তোমার, আমি হাজির, নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই, আর সকল সাম্রাজ্যও তোমার, কোন শরীক নাই তোমার। হে আলস্নাহ! এখানে আমাকে স্থিতি এবং হালাল রম্নযী দাও।
মাকামে ইব্রাহীমের নিকটে গিয়ে পড়বেন
আলস্নাহুম্মা ইন্নাকা তা’লামু সিররী ওয়া আলানিয়্যাতী ফাআক্বীল মা’যিরাতি, ওয়া তা’লামু হাজাতী, ফাতিনী সু’আলী ওয়া তা’লামু মা ফী নাফসী ফাগফির্লী যুনুবী। আলস্নাহুম্মা ইনি্ন আসআলুকা ঈমানাই ইউবাশিরম্ন ক্বাবলী ওয়া ইকীনান্ সাদিকান্ হাত্তা আ’লামা আন্নাহু লাইউসিবুনী ইলস্না মা কাতাবতা লী ওয়া রিযাআমমিনকা বিমা কাস্সামতালী, আনতা ওয়ালিয়্যী ফিদ্ দুনইয়া ওয়াল আখেরাহ, তাওয়াফ্ফানী মুসলিমান ওয়াআলহিকনী বিস্সালিহীন।
অর্থঃ হে আলস্নাহ! তুমি আমার গোপন ও প্রকাশ্য সবই জান। সুতরাং আমার অনুসূচনা গ্রহণ কর। তুমি আমার চাহিদা সম্পর্কে সম্যক অবগত, সুতরাং আমার আবেদন কবুল কর, তুমি আমার অনত্দরের কথা জান, সুতরাং আমার গুনাহসমূহ মোচন কর। হে আলস্নাহ্! আমি তোমার কাছে চাচ্ছি এমন ঈমান- যা আমার অনত্দরে স্থান লাভ করবে এবং সাচ্চা ইয়াকীন- যাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে আমার জন্য যা তুমি নির্ধারিত করে রেখেছো।
তা-ই আমার জীবনে ঘটবে তুমি যা আমার ভাগ্যে রেখেছ, তাতে যেন আমি রাযী থাকতে পারি। ইহ-পরকালে তুমিই আমার সহায়। আমাকে মুসলমান হিসাবে মৃতু্য দিও এবং সৎকর্মশীলগণের সাথী করো।
মুলতাযামের দো’আঃ
আলস্নাহুম্মা ইয়া রাব্বাল্ বায়তিল আতিক, রিকাবানা ওয়া রিকাবা আবা-ইনা ওয়া উম্মাহাতিনা ওয়া ইখওয়ানিনা ওয়া আওলাদিনা মিনান্নার, ইয়া জাল জুদি ওয়াল কারামী ওয়াল ফাদলী ওয়াল মান্নী ওয়াল আতায়ী ওয়াল ইহ্সান। আলস্নাহুম্মা আহসিন আকিবাতান না ফিল উমুরী কুলিস্নহা ওয়া আজির্না মিন খিয্য়ীদ দুন্ইয়া ওয়া আযাবীল আখিরাহ্।
অর্থঃ হে আলস্নাহ্! হে প্রাচীনতম ঘরের মালিক! আমদিগকে, আমাদের পিতা-মাতাকে, আমাদের ভাই-বোনদিগকে, সনত্দান-সনত্দতিকে জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি দাও। হে দয়ালু দাতা, করম্নণাময়! মঙ্গলময়! হে আলস্নাহ্! আমাদের সকল কর্মের শেষ ফলকে সুন্দর করে দাও। ইহকালের অপমান ও পরকালের শাসত্দি হতে আমাদিগকে বাঁচাও। যমযমের পানি পান করার দো’আঃ
আলস্নাহুম্মা ইনি্ন আস্আলুকা ইলমান্ নাফিয়ান্ ওয়া রিযকান্ ওয়াসিয়ান্ ওয়া শিফায়ান্ মিন কুলিস্ন দাইন্।
অর্থঃ হে আলস্নাহ্! আমি তোমার নিকট ফলপ্রসূ ইল্ম সচ্ছল জীবিকা এবং সকল রোগের নিরাময় কামনা করছি।
সায়ীর দো’আসমূহ
সাফা পাহাড়ে উঠতে উঠতে পড়বেনঃ
ইন্নাস্সাফা ওয়াল মারওতা মিন শা’আ-ইরিলস্নাহ ফামান হাজ্বাল বায়তা আবি’ তামারা ফালা জুনাহা আলাইহি আইয়াঁত্তাওয়াফা বিহিমা, ওয়ামান তাতাওওয়াআ খায়রান ফাইন্নালস্নাহা শাকিরম্নন আলীম।
অর্থঃ নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আলস্নাহর নিদর্শনসমূহের অনত্দভর্ুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি বায়তুলস্নায় হজ্ব্ব কিংবা ওমরা করবে এ দু’টির তাওয়াফ-এ (সায়ীতে) তার জন্য দোষ নাই, কেউ স্বেচ্ছায় ভাল কাজ করলে নিশ্চয় আলস্নাহ পুরস্কারদাতা সর্বজ্ঞ।
সাফা মারওয়ায় সায়ী করার সময় সবুজ পিলারদ্বয়ের মাঝে দ্রম্নত চলার সময়ের দো’আঃ
রাবি্বগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতাল আ’আয্যুল আকরাম।
অর্থঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ৰমা কর, দয়া কর, তুমি মহা পরাক্রমশীল, মহাসম্মানী।
আলস্নাহু আকবারম্ন কাবীরান ওয়াল হামদু লিলস্নাহি কাসীরান। ওয়া সুবহানালস্নাহিল অযীমি ওয়া বিহামদিহিল কারীমি বুকরাতা ওঁয়াআসীলা ওয়া মিনাল লাইলি ফাসজুদ লাহু ওয়া সাবি্বহ্হু লাইলান তাবিলা। লা ইলাহা ইলস্নালস্নাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়াহদাহু ওয়া নাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহ্দাহু লা শাইআ কাবলাহু ওয়া বায়দাহ্ ইউহ্য়ী ওয়া ইউমিতু ওয়া হাইয়ুন দাইমুন লা-ইয়ামূতু বিয়াদিহিল খায়রম্ন ওয়া ইলাইহিল মাসীর, ওয়া আলা কুলিস্ন শায়্যিন কাদির। রাবি্বগফির ওয়ারহাম ওয়া’ফু ওয়া তাকাররাম ওয়া তাজাওয়াজা আম্মা তা’লাম ইন্নাকালস্নাহু তা’লামু মালা না’লাম ইন্নাকা আনতাল আআয্যুল আকরাম।
অর্থঃ আলস্নাহ্ অতি মহান আর অগণিত প্রশংসা তারই প্রাপ্য। মহান আলস্নাহ্র পবিত্রতা বয়ান করছি, দয়ালু আলস্নাহর প্রশংসা বর্ণনার সাহায্যে সন্ধ্যা ও সকালে, (হে মানব) রাতের কোন সময়ে উঠে তার দরবারে সিজদা কর। আর দীর্ঘ রাত ধরে পবিত্রতা বয়ান কর। আলস্নাহ ছাড়া আর কেউ মাবুদ নেই। তিনি অদ্বিতীয়। (অতীতে) তিনি ওয়াদা পালন করেছেন, তাঁর বান্দা [মুহাম্মদ (সা:)]-কে একাই তিনি সাহায্য করেছেন আর পরাজিত করেছেন কাফিরদের দলগুলোকে। তিনি অনাদি, অননত্দ, তিনিই জীবন দেন এবং নেন, তিনি চিরঞ্জীব, অৰয়, অমর, তিনি কল্যাণময় ফিরে যেতে হবে তাঁরই নিকট সকলকে আর সব কিছুর উপর তাঁর ৰমতা অপ্রতিহত। প্রভু ৰমা কর, দয়া কর, গুনাহ্ মাফ কর, অনুগ্রহ কর, আর তুমি যা জান, তা মার্জনা কর। হে আলস্নাহ! তুমি সবই জান, যা আমরা জানি না তাও জান, তোমার শক্তি আর অনুগ্রহের তুলনা নেই।
শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহ্মদ October 30, 2009
পল্লীগীতির কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহ্মদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর মেয়ে বিখ্যাত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান
আব্বাকে তো সবাই একজন শিল্পী হিসেবেই জানে। আমি জানি বাবা হিসেবে। আদর্শ বাবা। কিন্তু তিনি কেমন স্বামী ছিলেন—কথাটা মা বেঁচে থাকলে ভালো বলতে পারতেন। হয়তো কোনো সময় বলেছেনও। আমি সন্তান হিসেবে যতটুকু দেখেছি, আব্বা সত্যিই ভালো স্বামী ছিলেন। মাকে তিনি আলাদা সম্মান করতেন।
মার আসল নাম লুত্ফুন্নেছা। আব্বা আদর করে আলেয়া ডাকতেন।
প্রায় সব সময়ই দেখা যেত, যেকোনো ব্যাপারে আব্বার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু একটিবারের জন্য হলেও তিনি মাকে জিজ্ঞেস করতেন, আলেয়া তুমি কী বলো?
এটা আমার খুব ভালো লাগত। এখানে আব্বার একটা রোমান্টিকতা প্রকাশ পেত। আব্বার মতো প্রেমিক স্বামী পাওয়া যেকোনো নারী জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।
ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ব্যাপারে আব্বা সব সময় মার সহযোগিতা নিতেন। মা যে খুব শিক্ষিত নারী ছিলেন, তা কিন্তু নয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পরের বছর আমার বড় ভাই মোস্তফা কামালের জন্ম।
মার সঙ্গে বাবার একেবারে ঝগড়া হয়নি, এটা ঠিক না। কিন্তু আমরা টের পেতাম না। উঁচু কণ্ঠে চিত্কার কখনো শুনিনি। মাঝেমধ্যে দেখতাম, মা হয়তো কোনো কারণে অভিমান করেছেন। আব্বা সেটা বুঝতেন। তারপর মাকে নিয়ে রিকশায় করে কোথাও ঘুরতে চলে যেতেন। কিংবা সিনেমা দেখে আসতেন। যাওয়ার আগে বলতেন, ‘মাগো তোমরা পড়ো। আমরা একটু ঘুরে আসছি।’
আব্বা ধর্মভীরু ছিলেন, কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। নামাজের ব্যাপারে বেশ তাগিদ দিতেন। প্রতিদিন মাগরিবের নামাজটা আমরা এক সঙ্গে আদায় করেছি। তাই যেখানেই থাকতাম, মাগরিবের সময় বাসায় ফিরতাম।
পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসার পর আমার চাচা-চাচিরাও চলে এলেন। আব্বা নিজের বাড়িতে তাঁদের রেখেছেন। আমাদের পুরানা পল্টনের বাড়িটা একটা মেলার মতো ছিল। খুব আত্মীয়স্বজন আসত। বছরের বেশির ভাগ সময় আমরা নিজেদের বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ পেতাম না। যেখানে পড়েছি, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়তাম। কেউ ছুটি কাটাতে, কেউ চিকিত্সার জন্য, কেউ ভর্তি হতে কিংবা চাকরির জন্য আসত। এসব কাজে আব্বার কোনো কার্পণ্য ছিল না।
আব্বা কাউকে হেয় করে কথা বলতেন না। বেদারউদ্দিন চাচা, সোহরাব চাচা, শামসুদ্দিন চাচা, লতিফ চাচা, শেখ লুত্ফর রহমান—এঁদের যে কী স্নেহ করতেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সামনে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা আর পেছনে হিংসা, সমালোচনা—এটা কিন্তু তখন দেখিনি। আব্বা বলতেন, কেউ কারও জায়গা নিতে পারবে না। প্রত্যেকের জায়গা আলাদা।
আব্বা খুব আমুদে ছিলেন। লায়লা আপা—লায়লা আরজুমান্দ বানু—খুব তাড়াতাড়ি কণ্ঠে গান তুলতে পারতেন। আব্বার সেটা খুব ভালো লাগত। তিনি বলতেন, ‘ওর মতো হওয়ার চেষ্টা করো। একটা গান একবার শুনলেই মেয়েটার হয়ে যায়। ও একটা ব্লটিং পেপার।’ লায়লা আপাকে তিনি ডাকতেন ‘ব্লটিং পেপার’। তাঁরা এক সঙ্গে দেশের বাইরে অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন।
আভা আলম বলে একটি মেয়ে খুব ভালো গান করতেন। আব্বা তাঁর গানের খুব প্রশংসা করতেন। কোনো শিল্পীকে তুলে আনার ব্যাপারে আব্বার কোনো জুড়ি ছিল না। একবার যদি তিনি বুঝতে পারতেন, একে দিয়ে কিছু হবে, তাহলেই হলো। আব্বা নিজে তো ভাওয়াইয়া গান করতেন। তিনি কিন্তু একা রেকর্ড করে ক্ষান্ত হননি। সেই বলরামপুর, তুফানগঞ্জ, কোচবিহারের গ্রামগঞ্জ থেকে শিল্পীদের কলকাতায় এনে গান রেকর্ড করিয়েছেন। তিনি বলতেন, একা আব্বাসউদ্দীন থাকলে হবে না। আরও শিল্পী তৈরি করতে হবে।
আব্বা আমাকে পল্টন ময়দানে ঈদের নামাজে নিয়ে যেতেন। যতটুকু মনে পড়ে, সেই ছোট বয়সে চার-পাঁচবার অন্য দুই ভাইয়ের সঙ্গে আমাকেও ঈদের নামাজে নিয়ে গেছেন। ঈদটা তো এক দিনের। কিন্তু ঈদ পুনর্মিলনী ছিল একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। এর রেশ থেকে যেত আরও অনেক দিন। এটা আমাদের কাছে খুব আনন্দের ছিল।
তুখোড় ছাত্র ছিলেন আব্বা। সব সময় প্রথম, কখনো দ্বিতীয় হননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল, তাঁর ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনায় খুব ভালো হবে। আমার বড় ভাই আব্বার মতো তুখোড় ছাত্র ছিলেন। পরের ভাই মুস্তাফা জামান আব্বাসীও সমান তালে ভালো করেছেন। আমিও করেছি মোটামুটি।
আমি পড়তাম কনভেন্ট স্কুলে। সেখানে ক্লাসে সব সময় প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতাম। আব্বা সব সময় বলতেন, মাগো পড়ো। তাঁর খুব শখ ছিল, আমি গড়গড় করে বিলেতি মেম সাহেবদের মতো ইংরেজি বলব।
তখন অন্য স্কুলের তুলনায় কনভেন্ট স্কুলের পড়াশোনাটা একটু ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। এর পরও তিনি আমাকে সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে আর আব্বাসী ভাইকে পাশের সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হই, তখন আমার বয়স ছয়-সাত বছর। প্রথম দিন পড়তে হয়েছিল, ‘আই ক্যান সিং, মাদার ক্যান সিং, ক্যান ইউ সিং।’ আমার এখনো মনে আছে, আব্বা একটা বড় খাতা তৈরি করে পুরো ইংরেজি বইয়ের প্রতিটা শব্দের অর্থ আলাদা করে নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, ‘মাগো মানেগুলো মুখস্থ করো।’
সত্যি বলতে, প্রথম তিন মাসের মধ্যে আমি ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে উঠলাম। এমনভাবে আব্বা আমাকে পড়ালেন, আমার ইংরেজি খুব ভালো হয়ে গেল। আমি গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারলাম। আব্বার স্বপ্ন পূরণ হলো।
আমি পরীক্ষায় প্রথম কী দ্বিতীয় হলাম, তাতে আমার চেয়ে বেশি আনন্দ হতো আব্বার। সবার কাছে তা বলতেন। তবে একটা ব্যাপার দেখেছি, তিনি আমাদের সামনে কখনো প্রশংসা করতেন না। বলতেন, ছেলেমেয়েদের সামনে যদি প্রশংসা করো, তাহলে তারা মাথায় উঠে যাবে। আরও ভালো করার চেষ্টাটা তখন থাকবে না।
আমাকে কনভেন্ট থেকে বলা হলো, তোমার তো বয়স হয়নি। আরও দুই বছর পর সিনিয়র ক্যামব্রিজ দিতে হবে। তখনো আমার ১৫ বছর হয়নি। আব্বা বললেন, তুমি বাংলা স্কুলে ভর্তি হও। ছয় মাসের মধ্যে মেট্রিক পরীক্ষা দাও। পড়াশোনার সঙ্গে যেন বয়সের মিল থাকে।
তিনি আমাকে কনভেন্ট স্কুল থেকে ছাড়িয়ে বাংলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। স্কুলের নাম ছিল বাংলাবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। ওখানে ভর্তি হয়ে জানতে পারলাম, মেট্রিক পরীক্ষার মাত্র ছয় মাস বাকি।
এখানে বিষয়গুলো সব আলাদা। সিনিয়র ক্যামব্রিজে যা পড়েছিলাম, তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। যেমন: ইতিহাস। এটা কখনো পড়িনি। এ রকম অনেক বিষয় ছিল। তবে আমার পড়াশোনার মানটা ছিল সেই কনভেন্ট স্কুলের মতো। তাই পরীক্ষায় সব কটি বিষয়েই স্টার মার্কস পেলাম। সংগীতে পেলাম ৯৫। ওটা ছিল সে বছর সর্বোচ্চ নম্বর। আব্বার ভয় ছিল, মেয়ে তো ইতিহাসে গোল্লা খাবে। কিন্তু এই বিষয়ে আমি লেটার নম্বর পেয়েছিলাম। আমি সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধা তালিকায় সপ্তম হয়েছিলাম। আমাদের পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছিল ২৬ জুন। ১৯৫৬ সাল। দুই দিন পর ২৮ জুন, আমার জন্মদিন। আব্বা বেশ ঘটা করে জন্মদিন উদ্যাপন করার আয়োজন করলেন। অনেক শিল্পী এলেন। সেই অনুষ্ঠানের কথা আমি আজও ভুলিনি। এর আগে আমার কোনো জন্মদিন পালন করা হয়নি।
খুব মজা করতেন আব্বা। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। কবি গোলাম মোস্তফার সঙ্গে আব্বার খুব বন্ধুত্ব ছিল। আমরা চাচা ডাকতাম। তাঁর পুরো পরিবারের সঙ্গেই ছিল আমাদের দারুণ সম্পর্ক। তখন আমরা খুব ছোট। এক দিনের ঘটনা—সবাই ঘুমিয়েছে। আব্বা লুঙ্গিটা ওপরে টেনে মালকোচা দিলেন। গায়ে সরিষার তেল মাখলেন। মুখটা অন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলেন। তিনি চোরের মতো করে সাজলেন। ওই সাজে তিনি মোস্তফা চাচার ঘরে ঢুকে গেলেন। সেখানে ট্রাংক নিয়ে টানাহেঁচড়া করার সময় আওয়াজ হলো। মোস্তফা চাচা টের পেয়ে দিলেন বেদম মার। সেই গল্প যতবারই আব্বা কিংবা গোলাম মোস্তফা চাচা বলতেন, ততবারই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার জোগাড় হতো।
আব্বার সঙ্গে কবি জসীমউদ্দীন চাচার একটা টক্কর থাকত। গল্প করতে করতেই লেগে যেত ঝগড়া। আব্বা তাঁকে খ্যাপাতে পছন্দ করতেন। কিছুক্ষণ রাগারাগির পর আবার গলাগলি, বন্ধুত্ব। এরপর মাকে ডেকে বলতেন, ‘আলেয়া মুড়ি মাখা দাও।’ এটা তাঁরা খুব পছন্দ করতেন। পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ আর বেশ সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে দিতেন মা। যত ভালো খাবারই থাক না কেন, ওই মুড়ি মাখা থাকলে তাঁদের আর কোনো খাবার লাগত না।
আব্বা খুব স্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করতেন। লাউটা ছিল খুব পছন্দ। আব্বা বলতেন, এটা যতই খাও, ক্ষতি নেই। ফল কেনার বেলায় আব্বা ছিলেন ওস্তাদ। আম, কমলা, কলা যাই কিনুক, কিনেছেন শ ধরে।
আমাদের জন্য তখন একটা কষ্টকর খাবার ছিল খাসির পায়ার স্যুপ। চার আনায় খাসির ৮-১০টা পায়া পাওয়া যেত। বাসায় রোজ পায়া আসত। সকালে সবার নাস্তা হয়ে যাওয়ার পর মা এক হাড়ি পানিতে সেই পায়াগুলো গোলমরিচ আর লবণ দিয়ে কয়লার চুলায় বসিয়ে রাখতেন। বিকেলে ওটা বেশ ঘন হয়ে যেত। সেটা আমাদের অবশ্যই খেতে হতো। প্রতিদিন সেই খাবারটা খাওয়া আমাদের জন্য যে কী কষ্টকর ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। আব্বার মতে, জিনিসটা শরীরের জন্য খুব উপকারী। তাই যত কষ্টই হোক, খেতে হবে।
মাছ ছিল তাঁর খুব প্রিয়। বাজারে গেলে কয়েক পদের মাছ কিনে আনতেন। শিলং, পাঙাস, চিতল, ইলিশ—এগুলো ছিল তাঁর পছন্দ। একদিন তো সবগুলো পদের মাছই তিনি কিনে আনলেন। তখন তো আর ফ্রিজ ছিল না। মাকে তিনি বললেন, ‘আলেয়া যতটুকু পারো রান্না করো।’ তাঁর বন্ধুদের খবর দিলেন। তাঁরা সবাই পরিবার নিয়ে চলে এলেন। রান্না হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে, শেষে খুব হইহুল্লোড় করে খাওয়া হলো। এগুলো আব্বা খুব উপভোগ করতেন।
খাবারের মধ্যে বড় মুরগি ছোট ছোট টুকরা করে টকটকে লাল রান্না খুব পছন্দ করতেন। এ ছাড়া খুব পছন্দের মধ্যে ছিল ইলিশ মাছ আর লাউ-চিংড়ির তরকারি। আব্বা নিজে খুব ভালো রান্না করতেন। কোথাও হয়তো কিছু খেয়ে ভালো লাগলো। বাসায় এসে সেটা আবার আমাদের রান্না করে খাওয়াতেন।
ছোটবেলায় আমরা খুব ক্যারম খেলতাম। আব্বাও খেলতেন। খেলতে বসে তিনি অন্য কোনো ঘুঁটির দিকে তাকাতেন না। কখন লালটা ফেলবেন, সেটাই ছিল একমাত্র চেষ্টা। ওদিকে আমরা সব ঘুঁটি ফেলে দিলাম। আব্বার খেয়ালই নেই, তিনি সেই লাল নিয়েই আছেন। বড় হওয়ার পর বাড়ির সামনের উঠানে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। হঠাত্ তিনি আমাদের খেলতে বলে রান্নাঘরে চলে যেতেন। সেখানে আলু, ফুলকপিসহ আরও অনেক কিছু সিদ্ধ করে তার সঙ্গে কিছু মশলা দিয়ে চটপটির মতো তৈরি করতেন। খেলা শেষ হওয়ার পর তা খেতে দিতেন।
আব্বা কিন্তু খুব সিনেমা দেখতেন। আমরা যখন বড় হলাম, তখন ছিল উত্তম-সুচিত্রার যুগ। তাঁদের সব ছবিই দেখতেন। যে ছবির গান কিংবা গল্প খুব ভালো লাগত, সেটি কয়েকবার দেখতেন। প্রথম তিনি মাকে নিয়ে দেখে আসতেন। এরপর আমাকে আর আব্বাসী ভাইকে পাঠিয়ে দিতেন দেখে আসার জন্য। কোনো গান যদি খুব ভালো লাগত, তাহলে সেটা আমাকে কয়েকবার দেখাতেন। তখন তো গানপ্রধান ছবি বেশি হতো। যেসব ছবির গান পছন্দ হতো, সেই গানের রেকর্ড কিনে আনতেন। গানটা কণ্ঠে তুলে নেওয়ার জন্য বলতেন। ইংরেজি ছবিও দেখতেন, উর্দু ছবি তত না।
ঢাকায় আসার পর রূপমহল, আজাদ প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখতে যেতাম। পল্টনে আসার পর গুলিস্তান সিনেমা হল তো আমাদের চোখের সামনে হলো। রূপমহলেই বেশি ছবি দেখা হয়েছে। ওখানে বাংলা ছবিই বেশি দেখানো হতো। আর মেয়েদের জন্য ছিল আলাদা বসার ব্যবস্থা। এখানে মায়ের সঙ্গে ছবি দেখতে যেতাম। টিকিটের দাম ছিল চার আনা কী আট আনা। আসলে তখন তো বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা। তাই সিনেমাটাই বেশি দেখা হতো।
আব্বা আমাদের বেড়াতে নিয়ে যেতেন। সেই ছোটবেলায় তিনি আমাদের দার্জিলিং বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর অনেকবার বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। দার্জিলিংয়েও গিয়েছি। কিন্তু আব্বার সঙ্গে সেই প্রথম যাওয়ার অনুভূতিটা এখনো ভুলতে পারি না।
আমাদের বেড়ানোটা হতো সাধারণত শীতকালে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পর, ডিসেম্বরে। নিজে যখন নিয়ে যেতে পারেননি, আমাদের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিতেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে। অসম্ভব সুন্দর জায়গা। ওখানে আমার চাচা থাকতেন। সেখানে ১৫-২০ দিন বেড়িয়ে আসতাম। আবার নানা বাড়িতেও যেতাম। এই বেড়ানোটা আব্বার নিয়মের মধ্যে ছিল। তাঁর মতে, ছেলেমেয়েরা একটু বেড়িয়ে এলে জানুয়ারি থেকে আবার নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করতে পারবে।
আব্বার ডায়েরির একটা লেখা আমার ভালো লাগে। তিনি বেঁচে থাকতে কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি। এ ব্যাপারে তিনি লিখেছেন, ‘এতে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। আমি যা পেয়েছি, তা হলো মানুষের ভালোবাসা। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আমি জানি, কোনো না কোনো সময় সরকার আমার কাজের মূল্যায়ন করবে।’ হয়েছেও তাই, মৃত্যুর পর তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।
আসলে আব্বা যা বলে গেছেন, তার প্রায় সবই আমার নিজের জীবনে ফলতে দেখেছি। তাঁর মতো দূরদর্শী মানুষ আর দেখি না।
সাতটি রাস্তা যেখানে মিলেছে সেখানটায় চা-লাড্ডু-বনরুটি-পান-সিগারেটের দোকানগুলো ঘিরে কিছু লোক তার পরও খামোখা থেকে যায়। ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের ধরবে বলে পনেরো-বিশটা রিকশাও মোটামুটি জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চালকেরা সাধারণত বগুড়ার পুবের যমুনার নদীভাঙা এলাকার কৃষক। লোকে বলে ‘পুবা’। বাদবাকিদের বেশির ভাগই রংপুর-কুড়িগ্রামের আধিয়ার। তখনো ঢাকার লোকেরা ‘মফিজ’ বলে এদের নাম ফাটায়নি। তবে তারা পরস্পরের ‘বাহে’, মানে ‘বাবা হে’। তাদের দেশ-গ্রামের পরিচয়ও নাকি ‘বাহের দেশ’।
যাত্রী না আসা পর্যন্ত এই বাহেরা রিকশার হ্যান্ডেলে পা, পিঁড়ির মতো সিট আর যাত্রীর আসনে শরীরটা এলিয়ে সটান শুয়ে জিরোয়। থানার দিকে যে রাস্তাটা গেছে তার গোড়ার ফ্রেন্ডস অডিওতে তখনই ফুল ভলিউমে বাজতে শুরু করবে বাবুল কিশোরের বিচ্ছেদী গান, ‘আমি কেমন করে পত্র লিখি গো’, কিংবা ফেরদৌসী রহমান কি আর কারও কণ্ঠে ভাওয়াইয়া, ‘ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’। এই মধ্যরাতে বিক্রিবাট্টার আশা না থাকলেও কী আশায় দোকান খুলে রেখে গানে গানে পত্র লেখা বা কাজল ভোমরার কথা বলে বোঝা ভার। হয়তো আমারই মনের খেয়াল, কিন্তু মনে হয় বিদেশ-বিভুঁইয়ে আছে বলেই ওরা এমন উতলা। ওদিকে ফেরদৌসী তাঁর পরমা গলায় গাইতে শুরু করেন—
‘ও কি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে\
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মোর বুরিয়া রয় রে\
ও কি গাড়িয়াল ভাই
কত কাঁদিম মুই নিধুয়া-পাথারে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে।’
তারা কি তবে নিধুয়া-পাথারে হাহাকার করে বেড়ানো কোনো নারীর জন্য পথে পথে বাওকুংটা বাতাসের মতো ‘ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে’? যখন আর সে মৈষাল নয়, নয় গাড়িয়াল বন্ধু; সে যখন ওই গরু বা মহিষের ঢংয়েই দুই উরু আর পাছা নাচিয়ে রিকশা চালায়, তখন তার চ্যাংড়া মনে কিসের ফাপর গুমরে মরে কে জানে?
‘মইষ চড়ান মোর মইষাল বন্ধু রে
বন্ধু কোন বা চরের মাঝে
এলা কেনে ঘণ্টির বাজন
না শোনেঙ মুই কানে মইষাল রে।’
কৃষ্ণের বাঁশি শুনে নয়, গাড়িয়ালের গরুর গলার ঘণ্টি শুনে আকুল হয়ে বাড়ির বাহির হয় ভাওয়াইয়া রাধা। কিন্তু গাড়িয়ালের গাড়ি কি আর এ পথে আসে? মৈষাল গেছে সেই চেংড়িদের দেশে, যারা ‘জানে ধুলা পড়া’, যারা ‘ছল করিয়া কাড়িয়া নিবে/হাতের দোতরা মইষাল রে।’ এবং ‘সেই না দেশে পুরুষ বান্ধা/থাকে নারীর কেশে রে।’ কিন্তু আমাদের রাধাও কম যায় না। ওঝা যেমন সাপের বিষ ঝেড়ে নামায়, তেমনি ‘মুই অভাগী ঝারেঙ বন্ধুক/ক্যাশের আগাল দিয়া রে।’
বাহেদের পূর্বপুরুষ ছিল কৃষিসমাজের সবচেয়ে তলাকার মৈষাল-গাড়িয়াল—মূলত রাখাল। ভাওয়াইয়া গানের মর্মে যে বিরহ-বেদনার গল্প, তার নায়ক এই মৈষাল আর নায়িকা তার ‘যুবা নারী’। এরাই বাহের দেশের রাধা-কৃষ্ণ। তিস্তা বা ধরলা এদের যমুনা। নিধুয়া-পাথার এদের বৃন্দাবন, শিমিলা বৃক্ষ (শিমুল) এদের কদম, বগাবগি কিংবা ডাহুকডাহুকি এদের শুকসারি। আর চিলমারীর বন্দর এদের মথুরা। কৃষ্ণ যেমন মথুরায় গিয়ে আর ফেরে না, ভাওয়াইয়া নারী তার গাড়িয়াল বন্ধুকেও তেমনি হারায় চিলমারীর বন্দরে বা আরও ওপরে কোচবিহারের গোয়ালপাড়ায় কিংবা আসামের কামাখ্যা পাহাড়ে। কিংবা সে বান্ধা পড়ে ব্রহ্মপুত্র কি তিস্তার কোনো চরে জোতদারের বাথানে—
‘বাথান বাথান করেন মৈষালরে
মৈষাল, বাথান কইরচেন বাড়ি—
যুবা নারী ঘরে থুইয়া,
কায় করেন চাকিরি মৈষাল রে।…
বাথান ছারেক, বাথান ছারেক রে
ও মৈষাল ঘুরিয়া আইসেক বাড়ি,
গলার হার বেচেয়া দিম মুঞি
ঐ চাকিরির কড়ি মৈষাল রে।’
মৈষাল আর তার যুবা নারীর প্রেম-দাম্পত্য মিলনহীন। তারা যেন চিরবিরহী ডাহুক-ডাহুকি। সামন্ত সমাজে মৈষালের স্বাধীন কোনো ভূমিকা নেই। বাপ-ভাই আর স্বামীর শাসনে নারীটি অবরুদ্ধ। তার প্রেমিক পেটের টানে দূরের দেশে ঘোরে কিংবা আটকে যায় চাকরির ফাঁদে। এই করুণ জীবনের মর্মব্যথা ফুটে ওঠে আব্বাসউদ্দীনের গলায়—
‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে।
উড়িয়া যায়রে চকোয়া পঙ্খি
বগীক বলে ঠারে
তোমার বগা বন্দী হইছে ধর্লা নদীর পারে।
এই কথা শুনিয়া বগী দুই পাখা মেলিল—
ওরে ধর্লা নদীর পাড়ে যায়া দরশন দিলরে;
বগাক দেখিয়া বগী কান্দেরে
বগীক দেখিয়া বগা কান্দেরে।’
ভাওয়াইয়া নারী-পুরুষ এভাবে তাদের সমাজের বন্ধন আর জমিদারি শোষণের ফাঁদে বন্দী হয়ে পরস্পরের জন্য কাঁদে। কিংবদন্তির গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন, ‘এইসব ছবি কালিদাসের বা রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে কোনো দিনই আসতে পারে না।’ কারণ, ‘প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও মিলনের সম্পর্ক যে জনসমাজের, তাদের কণ্ঠেই এই ধরনের গান জাগতে পারে।’ (গানের বাহিরানা) তাই ভাওয়াইয়া উত্তরের জনসমাজের জাতীয় গীত।
জনসমাজ বললে আসলে তেমন কিছু বোঝায় কি? আঠারো/উনিশ শতক পর্যন্ত বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর-কোচবিহার অঞ্চলে ব্যাপক আকারে নতুন জনবসতি ও আবাদের পত্তন হতে থাকে। বন কেটে পতিত জমি হাসিল করতে গিয়ে কোচ ও রাজবংশী জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বাঙালি কৃষিজীবীরা একাকার হয়ে যায়। এদের বিরাট অংশ মুসলমানও হয় (রিচার্ড ই ইটন, রাইজ অব ইসলাম ইন বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার)। রাজবংশী ও কোচ সমাজের কৌম জীবনের ছাপ তাই ভাওয়াইয়া গানের পরতে পরতে। সংস্কৃতির ভেতর সমন্বয়ের মধ্যে সংঘাতের লক্ষণগুলো চামড়ায় বসন্ত দাগের মতো এখনো ধরা পড়ে। মৈষাল, গাড়িয়াল বা মাহুতের স্বাধীন বিচরণের আকাঙ্ক্ষা আর দরিদ্র কৃষক-কন্যার প্রণয়-প্রতিবাদ সেই ইশারাই করে।
এক নদীতে কয়েকটি স্রোতের মধ্যে একটি যেমন প্রধান, ভাওয়াইয়ার আবহে নারী-মনের বাসনা-বেদনা-বিদ্রোহ তেমনই এক প্রধান স্বর। নারীর এই নিরন্তর আকুলতাই ভাওয়াইয়া গানের প্রাণভোমরা। তাদের মনে তখনো কৌম সমাজের সাম্য ও প্রকৃতিবাসের টান ফুরায়নি। গণনাট্য সংঘের অন্যতম প্রাণপুরুষ হেমাঙ্গ বিশ্বাস মনে করেন, নারীর স্বাধীন প্রেমকে রক্ষণশলীতার নিগড়ে বাঁধার চেষ্টা হলে ভাওয়াইয়া নারী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বাপ-ভাই যখন তাকে বাল্য বয়সে স্বামী নামক এক অচেনা লোকের কাছে টাকা নিয়ে বিয়ে দেয়, সেই অভাগিনী তখন বাবা-ভাই ও সেই স্বামীকে ক্ষমা করে না। মন পোড়ে তার বগার জন্য, মৈষাল বা গাড়িয়াল বন্ধু বা প্রেমিক কাজল ভোমরার জন্য। মদাসক্ত স্বামীর অত্যাচারে জর্জরিত এই নারীর আশ্রয় তখন চ্যাংড়া দেবর।
‘ও মোর ভাবের দেওরা
থুইয়া আয় মোক বাপ ভাইয়ার দেশে রে
বাপ ভাই মোর দুরাচার
বেচেয়া খাইছে মোক দুরান্তর রে
বেচেয়া খাইছে মোক মদকিয়ার ঘরেরে।’
তার কাছে, ‘স্বামী আমার যেমন তেমন/দ্যাওরা আমার মনের মতোন/দ্যাওরা মরলে হবো পাগল, হবো দেশান্তরী রে’। তার এমন প্রণয়ই তার প্রতিবাদ। সমাজপতিদের চাপে তার আপনকীয়া প্রেম যেখানে অবরুদ্ধ, সেখান থেকেই তা পাহাড়ের তলার ঝরনার মতো পরকীয়া প্রেমের খাতে বইতে শুরু করে। তার আপনকার প্রেমের কথাই সে বলে রাধা-কৃষ্ণের বরাতে। কিন্তু তার এই প্রেম রাধা-কৃষ্ণের লীলা নয়, এ তার ব্যক্তিগত ‘সোনার চান্দ’কে পাওয়ার বাসনা। আমরা দেখব, কৌম সমাজের আপনকীয়া প্রেম যখন নিয়ম ও শাস্ত্রের চাপে আর প্রকাশিত হতে পারছে না তখন তার প্রেমিক কালা হয়ে যায় কৃষ্ণ, আরও পরে প্রেমিক কৃষ্ণ প্রভু কৃষ্ণে রূপান্তরিত হন। কিন্তু ভাওয়াইয়া নারীর প্রেম নিজেকে বদলাতে অস্বীকার করে। তার মৈষাল তার আপনকীয়াই, পরকীয়া নয়। কীর্তন-পদাবলি ইত্যাদির সঙ্গে এখানেই তার তফাত। এ পার্থক্য কেবল সুরে বা ভাষায় নয়, এখানেই ভাওয়াইয়া নারীর নিজস্ব স্বর ও আবেগের বিশিষ্ট গড়নটিকে প্রেমের অন্যান্য আখ্যান থেকে আলাদা করা যায়।
দুই.
ভাওয়াইয়ার সুর-কাঠামো আধুনিক গান তো বটেই ‘লোকগীতি’র অন্য অন্য ধারা থেকেও আলাদা। অনেকে একে আর্য ঘরানার বাইরে অনার্য বাহিরানা হিসেবে চিনতে চান। লালনের গান বাউলে গাইলে এক রকম, ভাটিয়ালির ঢংয়ে গাইলে এক রকম আর রাবীন্দ্রিক ভঙ্গিতে গাইলে আরেক রকম। মনের ভাব প্রকাশেও পার্থক্যটা স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ যদি বলেন, ‘আমার মন কেমন করে’, ভাওয়াইয়া নারী বলবে, ‘সোনা বন্ধু বাদে রে কেমন করে গাও রে’। প্রেয়সীর বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ হলে ভাওয়াইয়া বলবে, ‘তুই কালা যেমন দান্তাল হাতি/মুঞিও নারী তেমন ভর যুবতীরে।’ এমন জীবন্ত আর মন-দেহের সপ্রাণ প্রকাশে কীর্তন বা বৈষ্ণব গানের কৃষ্ণের দেহজ কামের বর্ণনাকেও পানসে মনে হতে পারে। ভাব প্রকাশের সকল উপাদান ও রূপক কর্মের আর চারপাশের দেখা জগত্ থেকে নেওয়া। বিমূর্ততার কোনো সুযোগ সেখানে নেই।
বাহের দেশের প্রকৃতি চড়া সুরে বাজে। এই গান মানব-মানবীর ভাবাবেগকে প্রকৃতির উচ্ছ্বাস দিয়েই বোঝে। নিধুয়া-পাথারের রুক্ষতা আর তিস্তা বা ধরলার খরস্রোতের মতোই তাদের জীবন। প্রকৃতির লীলার মধ্যেই তারা তাদের জীবনের অর্থ ও মনের ভাষা খুঁজে পায়। মানবশরীর আর প্রকৃতিশরীরের আলোড়ন-বিলোড়ন ছাড়া কিছুই প্রকাশ হতে পারে না সেখানে। হয়তো তাদের মধ্যে তখনো শরীর আর মনের ভেদ জাগেনি। এ দুয়ের টানাপোড়েনে ভোগা বা এদের শাসন করার ধাত তাদের নয়।
তিন.
একটি প্রশ্ন তার পরও উঠতে পারে: গানের কল্পনা আর জীবনের বাস্তবতার মধ্যে কি কোনো যোগাযোগ ধরতে পারা সম্ভব? জীবনের কোন অভিজ্ঞতা থেকে আসে এই আবেগ, কীসে গড়া হয় ভাবনার ভুবন? দিগন্তে যেভাবে আকাশ আর মাটিকে মিলতে দেখেও সেই মিলন অধরা রয়ে যায়, শিল্প আর জীবনের সম্পর্কের সুতাটিও কি তেমনই অধরা? গীতিকার সুরকার আব্দুল লতিফের আত্মজীবনীতে বলা একটি ঘটনায় সেই সুতার একটা প্রান্ত যেন সহসা মিলে যায়। সেই গল্প দিয়েই শেষ করি: ভাষা আন্দোলনের পরে আব্দুল লতিফ হুলিয়া মাথায় পালিয়ে গিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের এক গ্রামে, বন্ধুর বাড়িতে। গ্রামের সম্পন্ন কৃষক পরিবার। আদর-যত্নের কমতি নেই। কিন্তু বিড়ম্বনা শুরু হলো সেই বাড়ির পরিচারিকা মেয়েটিকে নিয়ে। চৌদ্দ-পনেরো হবে বয়স। দিনের বেলা সেবা-যত্ন যা করার করে, কিন্তু রাতে সে তাঁর ঘরে শুতে আসে। হাত-পা টিপে দিতে চায় ইত্যাদি। এহেন দশায় পড়ে তিনি ধরলেন শিল্পী বন্ধুকে। বন্ধু ততোধিক বিব্রত হয়ে যে ব্যাখ্যা দেন তা অনেকটা এ রকম। ওই অঞ্চলের রীতি হলো, অতিথি এলে বাড়ির ‘দাসী-বাঁদীদের’ দিয়ে তাঁকে খুশি রাখতে হয়। লতিফ সাহেব তারপর মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেন এবং জানতে পারেন তার বাড়ি রংপুরে। খুবই গরিব তারা। বাপ-ভাই তাকে এক রকম বেচেই দিয়েছে এদের কাছে। বলতে বলতে মেয়েটি কাঁদে।
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাওয়াইয়া গানের সংকলন ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি বইয়ে একটি গান দেখে চমকে উঠি। মনে হয় এটি যেন সেই মেয়েটিরই দুর্বিষহ জীবনের কথা—যা কাউকে বলা যায় না, এমনকি মাকেও না। গানটিতে এক অভাগিনী নারী বলছে—ও কাক তোমার হাতে আমি এই চিঠি তুলে দিলাম। তুমি এই চিঠি মাকে দিও। কিন্তু মা যখন জলের ধারে যাবে, তখন এ চিঠি দিয়ো না, মা জলে ঝাঁপ দিয়ে মরবে। মা যখন ভাত রাঁধে তখনো দিয়ো না, তাহলে মা অনলে ঝাঁপ দেবে। যখন মা শাড়ি পরবে, তখনো না, মা তাহলে সেই শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস নেবে। গানটির শেষে মেয়েটি বলছে—
‘যখন মাও মোর নিদ্রারে যাইবে
পত্র থুইবেন কাগা সিথানের পরে
ওকি কাগা দেইখবে মাও মোর সকালে উঠিয়ারে।’
গানের সুরে ও ভাষায় এক বিষাদসিন্ধুর কলকল ধ্বনি কি আমরা শুনতে পাচ্ছি? আব্দুল লতিফের বর্ণিত কাহিনীর মেয়েটিই যেন লিখেছে ওই চিঠি?
শিল্প ও জীবন হয়তো কোথাও মিলে আছে আমাদের অগোচরে; এমনকি ইতিহাসও। বাংলার লোকগীতি আসলে বাংলার পল্লী পরিবেশে বয়ে যাওয়া কৃষক জীবনের আখ্যান, আঞ্চলিকতার খোপে খোপে বেড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডের মানবিক ইতিহাস। সেই মানুষের আদমসুরত ওখান থেকেই এঁকে নেওয়া সম্ভব। আমাদের নিম্নবর্গীয় সমাজের লিখিত সাহিত্য নেই বললেই চলে। যা আছে তা তাদের নিজস্ব লিখন নয়। একমাত্র লোকগান-লোকসাহিত্যই সেই আধার, সেখানে তাদের আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-ভালোবাসার খাঁটি বয়ান আমরা শুনতে পারব। পাব সেই দেশজ মনের খোঁজ যা হয়তো বিদেশি শাসনে, নানান বিপরীত সাংস্কৃতিক চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি, বিকৃত হয়নি। আমাদের যৌথ মনের শৈশব জানতে তার কাছে তাই ফিরতেই হয়।
বাহের দেশ দূরের কোনো অঞ্চল নয়, কুড়িগ্রামের সীমান্তে তিস্তা, ধরলা আর ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে আড়াই হাজার বছর পুরোনো চিলমারীর বন্দর আজও আছে। সেই বন্দরে এখনো অজস্র দেশি নৌকা ভেড়ে। তার পরও চিলমারীর পথে-বন্দরে পা রেখে মনে হয় সেটা যেন অন্য কোনো জগত্, অন্য কোনো সময়। তার বাস যতটা বাস্তবে মনের গভীরেও ততটাই। গাড়িয়াল-মৈষাল-মাহুত বন্ধুরা সেখান থেকে আর ফিরতে পারে না। ভাওয়াইয়া নারী তার কাছে কিরা কাটে, ‘কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যান কয়া যান রে’। কিন্তু সে ফেরে না। কারণ, ‘মইষের চাকরির ভীষণ দায়, মনের বাঘ মইষালক ধরিয়া খায় রে’।
পিছুডাক মৈষালকে ছাড়ে না। সময়ের খাদ থেকেও কে যেন ফের জিজ্ঞেস করে, ‘ও তোমরা গেলে কি আসিবেন, আমার মাহুত বন্ধুরে।’
স্ট্যাচু অব লিবার্টি October 30, 2009
১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তত্কালীন বেডলোস দ্বীপে স্থাপন করা হয়েছিল ফরাসি উপহার স্ট্যাচু অব লিবার্টি। কালক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা এই বিশাল মূর্তি আজও দুনিয়ার এক বিস্ময়কর দ্রষ্টব্য। শতবর্ষেরও বেশি বয়স হয়ে যাওয়া এই মূর্তির গল্প শুনিয়েছেন শামীম আমিনুর রহমান
মানুষ মানুষকে উপহার দেয়। এক পরিবার আরেক পরিবারকে উপহার দেয়, এমনকি এক দেশও আরেক দেশকে উপহার দেয়। কিন্তু সে উপহারটা আকারে কত বড় হতে পারে?
একটা টেলিভিশন, ফ্রিজ থেকে শুরু করে আস্ত বাড়ি উপহারের কথা চিন্তা করা যায়। কিন্তু উপহারের ওজন যদি হয় ২০৪.১ মেট্রিক টন? উপহারটির উচ্চতা যদি হয় ৩০৫ ফুট ৬ ইঞ্চি! ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে এমনই ‘বিকটাকার’ একটি উপহার দেওয়া হয়েছিল ফ্রান্সের তরফ থেকে। সেই উপহারটিই স্ট্যাচু অব লিবার্টি—দ্য লেডি!
এই যুগান্তকারী উপহারের পরিকল্পনার শুরু একটা নৈশভোজের টেবিলে। ১৮৬৫ সালের এক রাতের কথা। ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি ও তাঁর বন্ধু এডওয়ার্ড ডি ল্যাবোলেঁ সেদিন ল্যাবোলেঁর বাড়িতে বসে নৈশভোজ-পরবর্তী আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই আড্ডাতেই কথায় কথায় ল্যাবোলেঁ তাঁর একটা গোপন স্বপ্নের কথা বলে ফেললেন বার্থোল্ডিকে।
ব্যক্তিগত জীবনে ল্যাবোলেঁ ছিলেন শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ, সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রপ্রেমিক। ল্যাবোলেঁর স্বপ্ন, ফরাসি-মার্কিন বন্ধুত্বের চিহ্ন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বড়সড় একটা উপহার দেওয়া; মার্কিনিদের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ফরাসিদের যে বিপুল অবদান, সেটাকে কোনোভাবে স্মরণীয় করে রাখা।
পরিকল্পনাটা শুনে বার্থোল্ডি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তিনিও তো এমন একটা সুযোগ খুঁজছিলেন! বার্থোল্ডির স্বপ্ন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল না। তিনি বিরাটাকার কোনো একটা স্থাপনা তৈরির সুযোগ খুঁজছিলেন। সম্ভব হলে সেটা কোনো সমুদ্র-উপকূলে স্থাপন করারও স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
১৮৩৪ সালের ২ আগস্ট ফ্রান্সের কোলমার শহরে জন্মগ্রহণ করা বার্থোল্ডি চিরটা কালই বড় স্থাপনার নেশায় কাটিয়েছেন। বয়স বিশ পার হতে না হতেই বিরাট আকারের ভাস্কর্য ও স্থাপনা নির্মাণের স্বপ্ন বার্থোল্ডির পাগলামিতে পরিণত হয়।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপযুক্ত স্থান ও পৃষ্ঠপোষক খুঁজতে দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন তিনি। ১৮৫৬ সালে মিসরে গিয়েছিলেন প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দেখার জন্য। ওই যাত্রাপথে সুয়েজ খাল মনে ধরে গেল তাঁর। পরে মিসর সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন সুয়েজের মুখে একটা বিরাট নারীমূর্তি স্থাপনের অনুমতি দিতে। কিন্তু সে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।
বার্থোল্ডির মনে এরপর দাগ কাটে নিউইয়র্ক শহরের পোতাশ্রয়। ১৮৭১ সালে প্রথম আমেরিকা সফরের সময় শহরটিতে ঢুকতে গিয়েই তাঁর মনে হয়েছিল, এখানে হতে পারে স্বপ্নের সেই স্থাপনা। স্থাপনাটি মশাল হাতে একটি নারীমূর্তি হবে, এমন কল্পনাও করেছিলেন তিনি।
কল্পনাটা কল্পনাই থেকে যেত। কিন্তু ল্যাবোলেঁর প্রস্তাব শুনে নড়েচড়ে বসলেন বার্থোল্ডি—এবার স্বপ্ন সত্যি হবে। স্বপ্ন অবশ্য এত সহজে সত্যি হলো না। এই পরিকল্পনার প্রায় ১০ বছর পর ফ্রান্সের সরকার পরিবর্তনের পরই তা সম্ভব হয়েছিল।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ল্যাবোলেঁ ও তাঁর বন্ধুরা মিলে গঠন করলেন ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নই সম্ভাব্য মূর্তিটির জন্য চাঁদা তুলতে শুরু করল।
চাঁদার টাকায়ই প্যারিসে শুরু হলো পরবর্তীকালের সবচেয়ে উঁচু ও বিখ্যাত ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ। প্রথমে তার নাম দেওয়া হলো ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’, যা পরে ‘দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রথমেই এল ভাস্কর্যের মুখের জন্য মডেল নির্বাচনের পালা। এই কাজটি নিয়ে অনেক গল্পে আছে। বার্থোল্ডি আসলে ঠিক কার মুখ অনুসরণ করে ‘দ্য লেডি’র মুখটা তৈরি করেছিলেন, তা কখনো বলেননি। তবে অনেকে অনুমান করেন, বার্থোল্ডির বন্ধু এক সমকালীন ব্যবসায়ীর বিধবা স্ত্রীর মুখ ব্যবহূত হয়েছে মডেল হিসেবে। আবার কারও অনুমান, এটি আসলেবার্থোল্ডির মায়ের মুখ।
সে যা-ই হোক, এরপর বার্থোল্ডি কাঠামোর নকশা করার জন্য অনুরোধ করলেন সে সময়ের বিখ্যাত স্থপতি ভাইয়োলে-লি-ডাককে। ডাক হয়তো কাজটা করতেনও, কিন্তু কাঠামোর নকশা শেষ করার আগেই তিনি মারা যান করেন। এবার ডাক পড়ে আরেক কিংবদন্তি আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেলের। সে সময়ে আয়রন ব্রিজের নকশা করে আইফেল বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। পরে তো প্যারিসে নিজের নামে এক টাওয়ারের নকশা করে অমর হয়ে গেছেন।
এবার প্যারিসে শুরু হলো টুকরো টুকরো অংশের কাজ। সবার আগে শেষ করা হলো মশাল ধরা ডান হাতটি। এবার সেটি পাঠিয়ে দেওয়া হলো আমেরিকায়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রেও তখন তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ১৮৭৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় পাঠানো এই ডান হাত আবার ফেরতও পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ওদিকে ১৮৮২ সালে মূর্তিটির পাদমূল তৈরির জন্য দায়িত্ব পান মার্কিন স্থপতি রিচার্ড মরিস হান্ট। তিনি কাজ শুরু দেন।
বিশাল এই মহাযজ্ঞ অবশেষে ১৮৮৪ শেষ হয়। প্যারিসে পরীক্ষামূলকভাবে মূর্তির সব অংশ জুড়ে দাঁড় করিয়েও ফেলা হয়। এবার উপহার দেওয়ার পালা।
দুই সরকার এবার এগিয়ে এল এই কর্মকাণ্ডে। ফ্রান্সে আমেরিকার প্রতিনিধি লেভি পি মরটুন ১৮৮৪ সালেই আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়নের কাছ থেকে গ্রহণ করলেন ভুবন নাড়ানো এ উপহার। পরের বছর জাহাজে টুকরো টুকরো অবস্থায় ফ্রান্স থেকে নিউইয়র্ক যাত্রা করল ‘দ্য লেডি’।
শুরু হলো সংযোজনপর্ব। নিউইয়র্ক পোতাশ্রয়ের কাছে নির্ধারিত দ্বীপে এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলা পাদমূলের ওপর ধীরে ধীরে জোড়া দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেলা হলো স্ট্যাচু অব লিবার্টি। অবশেষে এল ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর।
অভূতপূর্ব এক লোকসমাগম হলো। ধারণা করা হয়, সব মিলে প্রায় ১০ লাখ লোকের সমাবেশ হয়েছিল সেদিন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ধনী ব্যক্তি এই ‘পাগলামি’তে একটি পয়সাও দেননি, তাঁরাও এলেন উত্সব দেখতে।
এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড উন্মোচন করলেন দ্য লেডির মুখ!
কিন্তু হায়! এমন দিন আর দেখে যেতে পারলেন না সেই ল্যাবোলেঁ। স্ট্যাচু অব লিবার্টির উদ্বোধনের তিন বছর আগে ১৮৮৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মারা যাওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ‘এক শ বছর পর আমরা বিস্মৃত ধূলিকণা হয়ে যাব। কিন্তু ভাস্কর্যটি টিকে থাকবে।’
না, ল্যাবোলেঁ ধূলিকণা হননি। নিজের স্বপ্নের ভেতর দিয়েই টিকে আছেন এই স্বপ্নদ্রষ্টা।
কাঠামো প্রকৌশলী: গুস্তাভ আইফেল
পাদমূলের প্রকৌশলী: রিচার্ড মরিস হান্ট
অবস্থান: লিবার্টি দ্বীপ, নিউইয়র্ক সিটি
বিস্তৃতি: ১২ একর
তদারককারী প্রতিষ্ঠান: যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্ক সার্ভিস
ফ্রান্সে নির্মাণ শুরু: ১৮৭৫
নির্মাণ শেষ: জুন, ১৮৮৪
পরিবহন সম্পন্ন: ১৮৮৫
পরিবহনকারী জাহাজ: ফরাসি ফ্রিগেট ইসেরে
পরিবহনের সময়ে টুকরোর সংখ্যা: ৩৫০
স্থাপন: ২৮ অক্টোবর, ১৮৮৬
জাতীয় সৌধ হিসেবে স্বীকৃতি: ১৫ অক্টোবর, ১৯২৪
পাদমূলের উচ্চতা: ৮৯ ফুট
পাদমূল থেকে টর্চের উচ্চতা: ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি
ভিত্তি: ৬৫ ফুট
মাটি থেকে টর্চের উচ্চতা: ৩০৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
গোড়ালি থেকে মাথার উচ্চতা: ১১১ ফুট ৬ ইঞ্চি হাতের দৈর্ঘ্য: ১৬ ফুট ৫ ইঞ্চি
তর্জনী: ৮ ফুট ১ ইঞ্চি এক কান থেকে আরেক কান: ১০ ফুট
দুই চোখের দূরত্ব: ২ ফুট ৬ ইঞ্চি নাক: ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি
কোমর: ৩৫ ফুট মুখ: ৩ ফুট
মূর্তিতে ব্যবহূত তামা: ২৭.২২ মেট্রিক টন ব্যবহূত স্টিল: ১১৩.৪ মেট্রিক টন
মোট ওজন: ২০৪.১ মেট্রিক টন
হাতে ধরা বই: দৈর্ঘ্য ২৩ ফুট ৭ ইঞ্চি, চওড়া ১৩ ফুট ৭ ইঞ্চি, পুরুত্ব ২ ফুট
বইয়ে লেখা: JULY IV MDCCLXXVI (৪ জুলাই ১৭৭৬)
মুকুটে জানালার সংখ্যা: ২৫ মুকুটে কাঁটার সংখ্যা: ৭
সাত কাঁটার অর্থ: সাত মহাদেশ (মতান্তরে সাত সাগর)
টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি লিডারস পুরস্কার পেলেন মনিকা ইউনূস October 29, 2009
‘আউটস্ট্যান্ডিং হিউম্যানিট্যারিয়ান’ বিভাগে মনিকাকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। মনিকা তাঁর কর্মজীবনের শুরু থেকেই ‘সবারই কিছু দেওয়ার আছে’ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করছেন। যেকোনো মানুষের মধ্যেই কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে—এটাই এ ধারণার মূল কথা।
৩০ অক্টোবর কাতারের দোহায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ পুরস্কার দেওয়া হবে। ৩১ অক্টোবর কাতারের রাজপরিবারের আমন্ত্রণে এক নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।
মনিকাসহ এ বছর স্যার বব জেলডফ কেবিই, স্যার কিংসলে সিবিই, জোশ হার্টনেট, ড্যানি বয়েল, ক্রিশ্চিয়ান কোলসন, সেরেনা উইলিয়ামস, ভেনাস উইলিয়ামস ও স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন এ পুরস্কার পেয়েছেন। ওয়েবসাইট।


















Recent Comments