খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

হিজড়া সম্বন্ধে জানুন আরো কিছু December 3, 2009

Filed under: Hijra(হিজড়া) — rezowan @ 10:28 pm

গ্রাম অঞ্চলে বা শহরতলীতে কোন বাচ্চার জন্ম হলেই এরা দলে দলে এসে ভিড় করে
বলে ওঠে “দে নারে তোর মনিটারে একটু নাচাই” এই বলে নবজাতক কোলে করে নাচিয়ে বখশিষ নেয়, কিংবা শহরে মাঝে মাঝেই দেখা যায় এরা দলে দলে এসে বিভিন্ন দোকান থেকে চাঁদা তোলে। সমাজে ওরা খুব অবহেলিত, সভ্য মানুষরা ওদের বলে হিজড়া। আমি আমার এই টিউনে হিজড়া কাদের বলে, কেন হিজড়া হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যাখা, এদের চিকিৎসার সাফল্যের রেকর্ড, ছাড়াও এদের সম্বন্ধে আরো কিছু তথ্য দিতে চেষ্টা করবো।


হিজড়া
হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবী হিজরত বা হিজরী শব্দ থেকে যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা Migrate বা Transfer। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশে বিশেষ এক ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধীদের হিজড়া বলে মূলত শারিরীক লিঙ্গের ত্রুটির কারনে এদের সৃষ্টি। এদের প্রধান সমস্যা গুলো হল এদের লিঙ্গে নারী বা পুরূষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে না। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় লিঙ্গ নির্ধারক অঙ্গ থাকে না। এসবের উপর নির্ভর করে তাদেরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায।


হিজড়া এর প্রকারভেদ
শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে এদেরকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানষিক ভাবে নারী বৈশীষ্ট্য এর অধীকারী হিজড়াদের বলা হয় অকুয়া, অন্য হিজড়াদের ভরা হয় জেনানা, আর মানুষের হাতে সৃষ্ট বা ক্যাসট্রেড পুরুষদের বলা হয় চিন্নি।


কেন হিজড়া হয় এর বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা
এক্স এক্স প্যাটার্ন ডিম্বানুর সমন্বয়ে কন্যা শিশু আর এক্স ওয়াই প্যাটার্ন থেকে সৃষ্ট হয় ছেলে শিশু। ভ্রুনের পূর্ণতার স্তর গুলোতে ক্রোমোজোম প্যাটার্নের প্রভাবে ছেলে শিশুর মধ্যে অন্ডকোষ আর কন্যা শিশুর মধ্য ডিম্ব কোষ জন্ম নেয়। অন্ডকোষ থেকে নিসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্ব কোষ থেকে নিসৃত হয় এস্ট্রোজেন। ভ্রুনের বিকাশকালে নিষিক্তকরন ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই। এর ফলে বিভিন্ন গঠনের হিজড়া শিশুর জন্ম হয়।


এদের শারিরীক গঠন কি?
মূলত এটি একটি শারীরিক গঠনজনিত সমস্যা যা অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মতই কিন্তু প্রতিবন্ধকতার স্থানটি ভিন্ন হওয়াতেই তারা হিজড়া। হিজড়াদের শারীরিক গঠন মূলত ৩ প্রকার।
• ১. নারীদের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও নারী জননাঙ্গ থাকে না।
• ২. পুরুষের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও পুরুষ জননাঙ্গ থাকে না।
• ৩. উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
তবে ব্যাপারটি সমালোচিত হতে পারে তাই আমি আর এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখার সাহস করছি না।


হিজড়ারা কি চিকিৎসা করে সুস্থ হতে পারে?
ব্যাপারটি হয়তো অনেকেই জানেনা কিন্তু হিজড়া বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো কোন শিশুর যদি পরিনত বয়সে যাওয়ার আগে চিকিৎসা করা হয় তাহলে বেশীভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব। কিন্তু যখন আসলে বোঝা যায় সে সাধারন আর দশজনের থেকে আলাদা তখন আসলে অনেক দেরী হয়ে যায়।


চিকিৎসায় সাফল্যের রেকর্ডঃ
পরিনত বয়সে যাওয়ার আগে যাদের চিকিৎসা করা হয় তাদের ক্ষেত্রে সাফল্যের সূচকটি স্পষ্ট করে না বলা গেলেও এটা বলা যায় এর পাল্লা বেশ ভারী। তবে পূর্ন বয়সে যাদের চিকিৎসা করা হয়েছে তাদের মধ্যে আমার জানামতে একটিই সাফল্যের রেকর্ড। সেটা ঘটেছিল ভারতের অমলার ক্ষেত্রে। সেটা একটু সবার সাথে শেয়ার করব।


কি ঘটেছিল অমলার ক্ষেত্রে?
অমলা ছিল ভারতের একজন। সে হিজড়া হলেও ছিল অপূর্ব সুন্দরী স্বাভাবিকভাবে তাকে কেউ বুঝতে পারত না এবং সে স্বাভাবিক ভাবেই চলাফেরা করতে পারত। এভাবেই একদিন সে গ্রামের একটি বিয়েতে যায় সেখানে তাকে দেখে গ্রমের এক যুবক যার নাম কার্তিক। সে তাকে পরবর্তীতে বিয়ে করতে চায় কিন্তু অমলা তার সমস্যার জন্য কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। তবে কার্তিকও নাছোড়বান্দা পিছু হটবার পাত্র সে নয়। শেষ পর্যন্ত আর কোন উপায় না দেখে অসলা এ ব্যাপারটি তাকে জানায়। সে জানার পরও তাকে বিয়ের ব্যাপারে পিছু হটে না তার যুক্তি শারীরিক এর চাইতে মনের ভালবাসা অনেক বড় তাই সে তাকে বিযে করবেই। এরপর অমলার পরিবারের সহযোগীতায় বিয়ে হয় কিন্তু কার্তিক সমাজ ও তার পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়। তাদের বিযের পর বেশকিছুদিন গেলে কার্তিক একদিন পত্রিকা দেখে জানতে পারে এরকম একটি শিশু চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে এটা জানতে পেরে সে অমলাকেও সেখানে নিযে যেতে চায়। অমলা যেতে না চাইলও কার্তিকের জোরাজুরিতে সে হার মানে। সেই ডাক্তার অমলাকে দেখে জানায় এই বয়সে এটা চিকিৎসার মাধ্যমে সফল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু কার্তিক এর আবেগ এর কাছে হার মেনে ডাক্তার তার সমস্যাটি দেখে এবং দেখার পর ডাক্তার অমলার অপারেশনের উদ্দ্যেগ নেয়। অস্ত্রোপচার এর পর অমলা একজন সম্পূর্ণ নারীতে পরিনত হয় এবং পরবর্তীতে সে সন্তানের জন্মও দেয়। এ ব্যাপারে সেই ডাক্তারের অভিমত আসলে অমলার ব্যাপারটি তিনি কার্তিকের অনুরোধে দেখেন এবং দেখার পরই সে খেয়াল করে আসলে অমলার ত্রুটিটি খুবই সামান্য এবং তার মধ্য নারী বৈশিষ্ট্য প্রকট ভাবে বিদ্যমান তাই সে অস্ত্রোপচার করেন। তবে কার্তিক মনে করেন তার ভালবাসার্ জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাকে পুরস্কৃত করেছেন।


কিভাবে একজন হিজড়া অন্য হিজড়াদের সাথে মিশে যায়
আসলে যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে সে হিজড়া তখন সে পরিবার, সমাজ সব জায়গায় অবহেলা আর অবজ্ঞার স্বীকার হয়। রংমহলে একটি লেখায় পড়েছিলাম একজন এরকম শার্টের নিচে মেয়েদের বিশেষ পোশাক পড়ে স্কুলে যাওয়ায় শিক্ষকরা তাকে প্রচন্ড মেরেছিল যে কারনে এরপর আর সে স্কুলে যায়নি। যখন একজন মানুষ এরকম অবহেলার স্বীকার হয় সব জায়গায় তখন সে তার দুঃখ শেয়ার করার জন্য তার মত যারা তাদের সাথে মিশে যায় এটাই স্বাভাবিক ব্যাখা। তবে এর বাইরেও বিভিন্ন কারন আছে।


হিজড়া রা কিভাবে নিজেদের দল ভারী করে?
কথিত আছে যখন কারো হিজড়ে বাচ্চা হয় তখন তা যদি হিজড়েরা জানতে পারে তবে তারা ওৎ পেতে থাকে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্। একসময় ঠিকই তাকে হিজড়াদের দলে নিযে যায়। আরো একটা কথা প্রচলিত আছে যদি না নিতে পারে তাহলে তারা দলবদ্ধভাবে এসে হাতেতালি বাজাতে থাকে যা তারা সবসময়ই বাজায় আর এ হাতেতালিতে নাকি কি এক অমোঘ আকর্ষন আছে যা শুনে অন্য হিজড়ারা আর ঠিক থাকতে পারেনা সেও এসে তাদের এই হাতেতালিতে যোগ দেয় যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নাই। এছাড়াও ভারতের কিছু কিছু জায়গায় আরো কয়েকদশক আগে খোজা পুরুষ বানিয়ে দল ভারী করত।


খোজা পুরুষ কিভাবে করত?
একসময় (আরো কযেক দশক আগে) ভারতের কিছু ক্লিনিক ছিল যারা টাকার বিনিমযে পুরুষদের খোজা পুরুষ বা ক্যাসট্রেড হিজড়ায় পরিনত করত। একশ্রেণীর দরিদ্র পুরূষরা এটা করত বেঁচে থাকার তাগিদে আয রোজগারের আশায়। আর তারা ছাড়াও অনেক হিজড়া দল ছিল (মূলত ভারতে) যারা শিশু অপহরন করত তারপর তাকে ১০ দিন নির্জন স্থানে আটক রেকে ১১ তম দিনে লাল শারী পরিয়ে ক্যাসট্রেশন করে হিজড়াদের দলে ভেড়াত।
ভারতে নানা অসামাজিক কাজকর্মের সাথে যুক্ত হতে দেখেছি বা শুনেছি ৷ জোর করে ব্যবসায়ীদের থেকে তোলা আদায়, ট্রেনের যাত্রীদের থেকে তোলা আদায়, ইত্যাদি ৷ একবার আজতক হিন্দি খবরের টেলিভিসান চ্যানেলে একবার এদের সম্বন্ধে একটা ভিডিও দেখেছিলাম ৷ তাতে দেখিয়েছিল যে কি করে এরা নানা সমর্থ পুরুষ (মূলত ১৬-১৮ বছর বয়স্ক) ধরে এনে তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে তাদের হিজড়া বানায় ৷ একটা লোকের সাক্ষাৎকারও ছিল যে কিনা “খানদানী পেশা” হিসাবে এই কাজ করে ৷ এরপর মাস খানেক পর থেকে এরা টাকা রোজগারে নেমে পড়ে গুরু মায়ের জন্য ৷ দিল্লীর গুরু মায়ের কথাও মিডিয়াতে এসেছে অনেকবার ৷ তার নাকি ৪টে ছেলেমেয়ে ৷ আসলে পুরুষ কিন্তু ছেলেদের কিডন্যাপ করে হিজড়া বানিয়ে আজ কোটিপতি ৷

কয়েকদিন আগে আমাদের ব্যাঙ্গালোরের একটা কলেজে পড়া ছেলেকে হিঁজড়ারা মাইশোরে নিয়ে গিয়ে পুরুষাঙ্গ কেটে নেয় আর হরমোন ইনজেকসান দেয় স্তন বের কারার জন্য ৷ প্রায় দু তিনদিন ধরে ছেলেটা নাকি অবছন্ন ছিল নেশার ওষুধের জন্য ৷ পরে ওখান থেকে পালাতে সব ধরা পড়ে ও কাগজে ব্যাপারটা ওঠে ৷

হিজড়াদের কি বিয়ে হয়?
হিজড়াদের জন্য যৌন কাজ আইনত শ্বাস্তিযোগ্য অপরাধ কিন্তু মানুষ হিসেবে তাদেরও তো আছে এসব তো অনুভূতি। যেখানে পশুরও আছে এই অধিকার সেখানে মানুষ হয়ে কেন এটা শ্বাস্তি যোগ্য অপরাধ তা যারা এই আইন করেছে তারাই ভালো জানেন। তবে হিজড়াদেরও বিয়ে হয় সেটা হয় একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায়। এ অঞ্চলের (দক্ষিণ এশিয়া) হিজড়ারা বেশীর ভাগ মুসলিম হলেও তারা হিন্দুদের এই পুজাটি করে যার মাধ্যমে তারা ভগবানের সাথে নিজের বিযে দেয় এরপর সারাদিন তারা সংসার সংসার খেলে। সন্ধ্যা এলে তারা বিধবা হয় সাদা শারী পড়ে। পুরো বিধবাবেশ ভূষা গ্রহন করে স্বামীর মৃত্যু শোক করে। অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। তাদের সে কান্নায় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়। কিন্তু তাদের কান্না কি বিধবা হওয়ার জন্য? আমরা সবাই বুঝতে পারি তাদের এরকম অঝোর ধারায় জল ঝড়ার কারন।


তাদের আয়ের উৎস
মূলত তারা তাদের এলাকার বিভিন্ন দোকান পাট আর বাজারে গিয়ে টাকা তোলে এই অর্থকে তারা তোলা বলে এছাড়াও কোন নবজাতকের জন্ম হলে সেখানে গিয়ে নাচ-গান করে চাঁদা তোলে তারা। তারা তাদের জমাকৃত সকল টাকা তাদের গুরুর কাছে দিয়ে দেয় এরপর গুরু যা দেয় তা থেকে প্রসাধনী কেনে আর ব্যাংকে জমা রাখে। তাদের খাবারের বন্দোবস্ত তাদের গুরুই করে।


রাখিবন্ধন
হিজড়ারা মূলত তাদের আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন তাকে। তাদের বাবা-মা এর সাথে তাদের সম্পর্ক থাকে না। তাদের প্রত্যকের দলে থাকা গুরুকেই তারা তাদের অভিভাবক মানে সেই তাদের সব। তারা যখন দলে যোগ দেয় তখন গুরু তাদের আগের পোশাক থেকে শাড়ি পড়িয়ে দেয় এবং তাদের কপালে আশীর্বাদ স্বরুপ আচঁল ছুয়ে দেয় আর মন্ত্র পড়ে ফুক দেয় এটাকে তারা বরে রাখি বন্ধন। এরপর তারা তার অধীনেই চলে সে যা বলে তা করে নিজেদের টাকা তার কাছে দিয়ে দেয়।


ঢাকার হিজড়া সম্প্রদায়
সারা বিশ্বেই হিজড়ারা একটি কমিউনিটি মেইনটেইন করে এবং নকণ কমিউনিটি এর মধ্য তারা আবার যোগাযোগ রক্ষা করে। ঢাকাতেও তার বিকল্প নয়। ঢাকাতে হিজড়ারা মূলত পাঁচটি দলে বিভক্ত এক দলের হিজড়ারা অন্য দলের এলাকায় গিযে তোলা তুলতে পারবে না। তাদের এই পাঁচটি দলের প্রত্যেকটিতে আছে একজন করে গুরু। এসব এলাকা আর তাদের গুরু হচ্ছে।
• ১. শ্যামপুর, ডেমড়া ও ফতুল্লা, গুরু- লায়লা হিজড়া।
• ২. শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুরু- হামিদা হিজড়া।
• ৩. সাভার, ধামরাই, গুরু- মনু হিজড়া।
• ৪. নয়াবাজার ও কোতোয়ালী, গুরু- সাধু হিজড়া।
• ৫. পুরোনো ঢাকা,গুরু- দিপালী হিজড়া।


হিজড়াদের কোথায় সমাহিত করা হয়?
আগেই বলেছি হিজড়ারা অনেকেই মুসলিম হলেও তারা অনেক হিন্দু রীতি নীতিতে বিশ্বাষ করে। তাই তাদের যদিও কবর দেয়া হয় কিন্তু তারা মনে করে তাদের আবার পূণঃজনম হবে। প্রত্যেক হিজড়াকে কবর দেয়া হয় তারা যে বিছানায় থাকে তার নিচে এটাই তাদের রীতি (তবে বর্তমানে স্থান সংকুলানের জন্য তাদের অন্যত্রও কবর দেয়া হয়)। কিন্তু তাদের কবর দেয়ার নিয়মটি খুব অদ্ভুত তাদের কবরে প্রথমে ঢালা হয় লবন তারপর লাশ তারপর দেয়া হয় ফুল তারপর আবার লবন। এটার মূল কারন হল তাদের বিশ্বাষ এভাবে কবর দিলে তাদের আগের সকল পাপ ধুয়ে পরবর্তী জনমে তারা পূর্ণ নারী বা পুরূষ হিসেবে জন্ম গ্রহন করতে পারবে।
তাদেরও কি সামাজিক অধিকার প্রাপ্য নয়?
আমাদের দেশে তারা কখনোই একজন মানুষের মর্যাদাতো দূরে থাক কুকুর বিড়ালের অধিকার পায় না। কিন্তু হিজড়াদের সামাজিক অধিকার প্রাপ্য কিনা সেটা সবার উপর ছেড়ে দিলাম। তবে একটা কথা বলি আমাদের দেশে হিজড়াদের ভোটার হওয়ার নিয়ম না থাকলেও ভারতে কিন্তু লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন হিজড়া শবনম মৌসি।


সুত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট, উইকিপিডিয়া, ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের ওযেবসাইট, বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন চিকৎসক, মুম্বাই পুলিশের ওয়েবসাইট, স্টার নিউজ, ড. আজমল ও আসমতের লেখা প্রাণীবিদ্যার কিছু বই,মাসিক দেশ (কলকাতা) এর ১৯৮৬ সালের একটি সংখ্যা, মাসিক সানন্দা (কলকাতা) এর ১৯৯৭ এর একটি সংখ্যা, সাপ্তাহিক ২০০০ এর ২০০৮ সালের একটি সংখ্যা, দৈনিক প্রথম-আলো, দৈনিক ইনকিলাব এবং ঢাকার বেশ কয়েকজন হিজড়া।


টেকটিউন থেকে শাকিল আরেফিনের লেখা

 

হিজরা ভিডিও November 4, 2009

Filed under: Hijra(হিজড়া) — rezowan @ 12:16 am
 

হিজড়া সম্প্রদায় তৃতীয় লিঙ্গ নয় কেন – - ঝর্না রায় November 4, 2009

Filed under: Hijra(হিজড়া) — rezowan @ 12:12 am

সাপ্তহিক ২০০০ এর বিশেষ প্রতিবেদন
কাব্যে উপেক্ষিতা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন বাল্মীকি তাঁর রামায়ণে ঊর্মিলা সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখেননি বলে। ঊর্মিলা ছিলেন রামের অনুজ লক্ষ্মণের স্ত্রী। কবি ও সাহিত্যিকদের কলমে আরেক উপেক্ষিত হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়। তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি; ব্যতিক্রম নাসিমা আনিসের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’। হিজড়াদের নিয়ে ইংরেজি উপন্যাসও চোখে পড়েনি। খুশবন্ত সিংহের দিল্লি উপন্যাস এক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ভাগবতী হিজড়া। হিজড়ারা সমাজে থার্ড জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি চায়। তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লিখেছেন ঝর্না রায়

শৈশবে ওদের শারীরিক ত্রুটি তেমনভাবে ধরা পড়ে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ত্রুটি ধরা পড়ে। ছোটবেলার আদরের নামও অনেক ক্ষেত্রে ঘুচে যায়। পরিবর্তন হয় পরিচয়। ওদের পরিচয় হয় ‘হিজড়া’। পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে তো বটেই, পরিবারের কাছেও তখন এরা নেহাত ফালতু ছাড়া আর কিছুই নয়। শুরু হয় এক অভিশপ্ত জীবন। ওদের প্রতি নিজেদের বাবা-মায়ের আচরণও পাল্টে যায়। পরিবারের আপনজনদের কাছ থেকে দিনের পর দিন অবহেলা, অবজ্ঞা সয়ে সয়ে শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। এক সময় এই হিজড়া সন্তানটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিশে যায় তার মতো যারা, তাদের দলে। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে দুই-এক টাকা চেয়ে কিংবা নাচ-গান করে বাঁচার লড়াই শুরু করে। হিজড়াদের দেওয়া তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে দেড় লাখ হিজড়া রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে প্রায় পনের হাজার। দিন দিনই ওরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। দাবি জানাচ্ছে ওদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। লৈঙ্গিক ত্রুটির জন্য হিজড়ারা পুরোপুরি পুরুষও নয়, নারীও নয়। ওরা ভিন্ন ধরনের মানুষ।

এদের শারীরিক গঠন ছেলেদের মতো হলেও মন-মানসিকতা সম্পূর্ণভাবে নারীর মতো। সে সর্বক্ষণ নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ নারী হিসাবে দেখতে পছন্দ করে।

বিভিন্ন সূত্রমতে, হিজড়ার দুইটি বৈশিষ্ট্যগত ধরন রয়েছে। মেয়ে ও পুরুষ। নারী হিজড়ার মধ্যে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকলেও তার স্ত্রীজননাঙ্গ না থাকায় তার শারীরিক গঠন অস্বাভাবিক। একই অবস্থা পুরুষ হিজড়াদেরও। হিজড়া নারী বা পুরুষই হোক, নিজেদের নারী হিসাবে বিবেচনা করে। জীববিদ ও চিকিৎসাবিদরা লৈঙ্গিক, মনসত্মাত্ত্বিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রকৃতি প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ৬টি ধরন চিহ্নিত করেছেন। সারা পৃথিবীর প্রকৃতি প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ধরন একই রকম। যারা শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের তাদের বলা হয় অকুয়া। অন্য হিজড়াদের বলা হয় ‘জেনানা’। মানুষের হাতে সৃষ্ট হিজড়াদের চিন্নি বলা হয়। এরা সামাজিক প্রথার শিকার হয়ে খোজা পুরুষে পরিণত হয়।
রাজতন্ত্র চালু হওয়ার পর অভিজাত সমাজ তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই ক্লীবপুরুষ সৃষ্টি করে। এরা খোজা হিসাবে পরিচিত। হিজড়ারা এদের বলে চিন্নি। খোজারা কাজ করত হেরেমের প্রহরী হিসাবে। এমন কথাও চালু রয়েছে যে দল ভারী করার জন্য হিজড়ারাও সুশ্রী শিশুপুত্র অপহরণ এবং তাদের খোজা বা পুরুষত্বহীন করে।
চেহারা বা আচরণ দেখে হিজড়া বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ চিহ্নিত করা যায়। স্বভাবত নারীদের ঢং, পোশাক পরিচ্ছদ ও গহনা সাজগোজ তাদের প্রিয়। তারা কৃত্রিম স্তন এবং চাকচিক্যময় পোশাক ব্যবহার করে। তারা নিজেকে একজন পুরুষের কাছে আকর্ষণীয় করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তারা স্বাভাবিক শ্রমজীবীদের মতো উপার্জনের জন্য কাজ করতে চায় না। স্বকীয় পন্থায় তারা জীবিকা অর্জন করে। নাচ-গান আর বাজারে তোলা আদায় তাদের প্রধান আয়ের উৎস। তারা হাটে-বাজারে তোলা উঠানোর পাশাপাশি বিনামূল্যে নানা ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করে। বিয়ের অনুষ্ঠানে কমেডিয়ান বা চিত্তরঞ্জক হিসাবে তাদের আমন্ত্রণ করা হয়। আবার এদের মধ্যে কিছু হিজড়া যৌন পেশাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
তারাও মানুষ
শারীরিক অস্বাভাবিকতার কারণে হিজড়ারা জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের কামনা-বাসনা আছে, নেই ইচ্ছা পূরণের ক্ষেত্র। তাদের জীবনের একটা হচ্ছে এক গভীর গোপন ট্র্যাজেডি। জীবনের প্রয়োজনে, আর্থিক প্রয়োজনে কেউ কেউ সমর্পিত হয় সুস্থ মানুষগুলোর বিকৃত রুচির কাছে। ব্যবহৃত হয় ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হিসাবে। পুরুষের কাছে নিজেকে নারী হিসাবে উপস্থাপন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। এ কারণে সমাজের সাধারণ নারী পুরুষের ওপর ক্ষিপ্ত থাকে সারাক্ষণ। নিজেদের যেহেতু মেয়ে মনে করে, সেহেতু একজন হিজড়া একজন পুরুষকেই তার জীবনসঙ্গী হিসাবে দেখতে চায়। কেউ কেউ পুরুষদের সঙ্গে সেক্স পার্টনার হিসাবে দিনের পর দিন বসবাস করে।

যেভাবে পরিবার ছাড়ে
নিজের জন্মের জন্য দায়ী না হলেও সমাজ মনে করে হিজড়ারা অভিশপ্ত। সমাজ তো দূরের কথা ভাই-বোন, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনরাও তাদের ফালতু ভাবে। সবাই তাদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়, কানাকানি, হাসি-তামাশার পাত্র হয়ে দাঁড়ায়। গালি দেয় হিজড়া বলে। একজন হিজড়া ব্যক্তিগতভাবে যেমন প্রতিষ্ঠা পায় না, তেমনি কোনও প্রতিষ্ঠা পায় না সমাজ, সরকারের কাছ থেকেও। এই সমাজের মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে হিজড়া বলে শিশুটিকে কোনও স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। তার সঙ্গে নিজের সন্তানদের খেলতে দেওয়া যাবে না। এমনকি পরিবারের লোকজন হিজড়া সন্তান হওয়ার লজ্জা ঘোচাতে হিজড়া সন্তানটিকে ছেলে সাজাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা আর কতদিন। তার শরীর, মন তো হিজড়ার মতো আচরণ করে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা, লোকলজ্জা, কুসংস্কারের কারণে ওই হিজড়া সন্তানটির আর পড়াশোনা হয় না। সে শৈশবে তার ইচ্ছাগুলো পূরণ না করতে পেরে একসময় সুযোগ বুঝে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। মিশে যায় এদের মতো কোনও হিজড়ার দলে। তারপর বাড়ি বাড়ি নাচ-গান করে মানুষের কাছে হাত পেতে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করে। চিরদিনের মতো এই পরিবার তার আদরের সন্তানটিকে হারিয়ে ফেলে।
রাখিবন্ধন
একজন হিজড়ার কাছে তার রক্তের সম্পর্ক বড় নয়। তার কাছে গুরুই সব। দলে ভিড়ে সে গ্রহণ করে বয়স্ক হিজড়ার শিষ্যত্ব। তাকে শ্রদ্ধা করে গুরু বলে। কারণ দলভুক্ত হয়ে থাকতে হলে তাকে গুরুর শিষ্য হতেই হবে। এই গুরুকে কেউ কেউ নানি, দাদি বলেও ডাকে। তিনিই তখন শিষ্যদের সব। শিষ্য হওয়ার সময় গুরু তার কাপড়ের আঁচল শিষ্যের মাথায় স্পর্শ করে দেয় মন্ত্রজপের মাধ্যমে। এবং সাধারণ ছেলের পোশাকগুলো খুলে পরিয়ে দেয় নতুন শাড়ি। সেই শাড়ি পরতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত। এসব নিয়মের পর থেকেই হয়ে যায় ‘রাখি বন্ধন’। রাখি বন্ধনের ব্যাপারটি হিজড়াদের কাছে খুবই পবিত্র। এই রাখি বন্ধন অনুষ্ঠান নতুন শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে উৎসবের মতো। ওদের বিশ্বাস কোনও শিষ্য যদি তার শাড়ির আঁচল গুরুর মাথায় ছুঁয়ে দেয় তবে সেই শিষ্যও গুরু হয়ে যেতে পারবে। গুরু তার শিষ্যদের সব কিছুর হর্তাকর্তা। অন্যায়, অবিচার, বিরোধের বিচারক। তার আদেশ, নিষেধ শিষ্যদের অবশ্যই মান্য। শিষ্যরাই তাকে আয়-উপার্জন করে খাওয়ায়। গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকবেন। এক এলাকার অধীনস্থ হিজড়া শিষ্যরা অন্য এলাকায় গিয়ে উপার্জন বা নাচ-গান করবে না।
হিজড়ারা নিজস্ব সমাজের নিয়ম-কানুন মেনে চলায় কঠোর। হিজড়াদের শাসন পদ্ধতি ভিন্ন প্রকৃতির। রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় একজন করে সর্দার থাকে। তারা সাধারণ হিজড়াদের নিয়ন্ত্রণ করে। জানা যায়, রাজধানীতে পাঁচ গুরুর আওতায় প্রায় পনের হাজার হিজড়া রয়েছে। সর্দারের বা গুরুর আদেশ ছাড়া কোনও দোকানে কিংবা কারও কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে পারবে না। গুরুই শিষ্যদের এলাকা ভাগ করে দেয়। প্রতিটি গুরুর অধীনে ৮/১০টি দল থাকে। একটি দলে ৫/৬ জন থাকে। প্রতিদিন সকালে গুরুর সঙ্গে দেখা করে দিক-নির্দেশনা শুনে প্রতিটি দল টাকা তোলার জন্য বের হয়ে পড়ে। বিকাল পর্যন্ত যে টাকা তোলা হয়। প্রতিটি দল ওই টাকা সর্দারের সামনে এনে রেখে দেয়। গুরু ওই টাকার অর্ধেক নিয়ে বাকি টাকা শিষ্যরা ভাগ করে নেয়। প্রতি সপ্তাহে হিজড়াদের সালিশি বৈঠক হয়। ১৫/২০ সদস্যের সালিশি বৈঠকে গুরুর নির্দেশ অমান্যকারী হিজড়াদের কঠোর শাস্তি পর্যন্ত দেওয়া হয়। বেত দিয়ে পেটানোসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন এবং কয়েক সপ্তাহের জন্য টাকা তোলার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জরিমানা হয় অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। দন্ডিত হিজড়াকে তার নির্ধারিত এলাকা থেকে তুলে এই টাকা পরিশোধ করতে হয়। এ শাস্তি হিজড়ারা মাথা পেতে মেনে নেয় এবং কোনও ধরনের প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না।

পঞ্চগুরুর রাজধানী
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হিজড়ারা দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। সাধারণভাবে অধিকাংশ হিজড়ার নোংরা বস্তিতেই বসবাস ও আড্ডা। রাজধানীর শ্যামপুর, সূত্রাপুর, ডেমরা, আজিমপুর, খিলগাঁও, ধামরাই, মিরপুর এলাকা ঘুরে জানা যায়, পুরো রাজধানীকে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়েছে। এবং এর দায়িত্বে রয়েছে পাঁচজন হিজড়া গুরু। একেকজন গুরুর আওতায় অর্ধশতাধিক হিজড়া শিষ্য রয়েছে বলে জানা যায়। কেউ কারও এলাকায় যাবে না এবং তোলা ওঠাবে না- এমনকি নাচ-গান পর্যন্ত করবে না।

পাঁচ গুরুর একজন গুরু লায়লা হিজড়া। রাজধানীর শ্যামপুর, ডেমরা এবং ফতুল্লার কিছু অংশের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। তার রয়েছে অর্ধশতাধিক শিষ্য বা সাগরেদ। শিষ্যরা সপ্তাহে ১ দিন বাজারে তোলা উঠিয়ে এনে গুরুকে খাওয়ায়। শিষ্যদের বিপদে-আপদ সকল উদ্ধারকর্তা তিনি। লায়লা হিজড়া জানান, কাজ করতে গিয়ে যত বিপদ আপদ ঝক্কি ঝামেলা সব আমাকে সামলাতে হয়।
তিনি জানান, তার পৈতৃক বাড়ি ছিল শ্যামপুরে। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় মারা যান। এরপর থেকে তিনি হিজড়াদের দলে যোগ দেন। দেশে বিদেশের অনেক হিজড়াদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। রাজধানীর শ্যামলী,আদাবর, মোহাম্মদপুর, মিরপুরের গুরু হামিদা। মোহাম্মদ হামিদ থেকে তার নাম হয় হামিদা। তার রয়েছে প্রায় ২শ শিষ্য। সাভার, ধামরাই এলাকা মনু হিজড়ার দখলে। আরামবাগের এক খানসামা তার পিতা ছিলেন বলে জানা যায়। চার সন্তানের মধ্যে মনু ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি জানান তিনি পড়াশোনা করেননি। ৬/৭ বছর থেকেই তার আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করে বাবা-মা যতই তাকে ছেলে হিসেবে রাখতে চায় ততই সে মেয়েদের সাজগোজ, মেয়েলি আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এরপর দশবছর বয়সে এলাকায় আসে যাত্রাদল। যাত্রা শিল্পীদের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে যাত্রাদলে যাবার ইচ্ছা হয়। পালিয়ে তিনবছর যাত্রা দলে কাটান। এরপর যখন নিজের শারীরিক অস্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য করেন তখনই হিজড়ার দল খোঁজেন এবং দলে যোগ দেন। এখন তিনি গুরু। তার আওতায় রয়েছে প্রায় অর্ধশত হিজড়া শিষ্য। তিনি জানান, এদেশে হিজড়াদের মূল্য নেই, তাদের সম্মান করে না। সব সময় হিজড়া বলে গাল দেয়। ছেলেরা অশ্লীল কথা বলে। তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠা চান। পুরনো ঢাকা ও সূত্রাপুরের দায়িত্বে রয়েছেন দিপালী হিজড়া। তারও রয়েছে বিশাল হিজড়া বাহিনী। তার গুরুর মৃত্যুর পরে তিনিই গুরুর দায়িত্ব পান। মাওয়া নয়াবাজারসহ কোতোয়ালির দায়িত্বে রয়েছেন সাধু হিজড়া।

হিজড়াদের জীবনযাপন
এই অস্বাভাবিক হিজড়া মানুষদের জীবনাচরণ যেমন কৌতূহল উদ্দীপক তেমনি তাদের মনমানসিকতাও অস্বাভাবিক। এরা যেহেতু নিজেদের নারী মনে করে, সেহেতু নিজেকে সুন্দরী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করে মৃত্যু পর্যন্ত। হিজড়ারা সাধারণত বস্তি বা নোংরা এলাকায় বসবাস করে। কারণ সাধারণ বাড়ি মালিকরা তাদেরকে বাসা ভাড়া দিতে চায় না। ফলে দালালের মাধ্যমে বস্তি এলাকায় কম খরচে ১/২টি রুম ভাড়া নিয়ে কয়েকজন মিলে একত্রে থাকে। হিজড়ারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নবজাতক কোলে নিয়ে নাচ গান করে আর বাজারের দোকানপাট থেকে তোলা উঠিয়ে যা আয় করে তার অর্ধেক পান হিজড়া গুরু। আর বাকি টাকা শিষ্যরা ভাগ করে নেয়। দৈনন্দিন খাবারের বাজারও তোলা থেকেই ওঠানো হয়। নিজেদের রান্না নিজেরাই করে। সকালে গুরুকে সালাম করে দিকনির্দেশনা নিয়ে শুরু হয় ওদের কর্মযজ্ঞ। যা আয় হয় তা দিয়ে কসমেটিকস ক্রয় করে আর ব্যাংকে জমা রাখে। প্রায় হিজড়ার ব্যাংকে সঞ্চয় রয়েছে। এরা চাকচিক্যময় শাড়ি গহনা আর সাজগোজ পছন্দ করে।

তবে সাধারণ মানুষের লজ্জা, রম্নচি ও সৌজন্যবোধ থাকে। কিন্তু হিজড়াদের মধ্যে এসব আশা করা অবান্তর। কারণ শারীরিক দিক দিয়ে অঙ্গহীন হওয়ায় তাদের মনে প্রচন্ডভাবে দুঃখ কষ্ট ক্ষোভ থাকে। ফলে লজ্জাহীনতাই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেই সঙ্গে অশ্লীলতা, উৎপাত, ব্যভিচারের ঘটনাও শোনা যায়। কোনও বাড়িতে সন্তান জন্ম হলে উৎসবের অংশ হিসাবে হিজড়াদের আসর বসে। তারপর গৃহকর্তা হিজড়াদের চাহিদা অনুযায়ী সন্তুষ্ট করতে না পারলে দলবেধে চলে এসে নগ্ন হয়ে নাচতে শুরু করে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হিজড়া
হিজড়া হওয়ার কারণ সম্পর্কে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কেউ এটাকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে, কেউ বলে পিতামাতার দোষ কিংবা প্রকৃতির খেয়াল। কিন’ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে মাতৃগর্ভে একটি শিশুর পূর্ণতা পেতে ২৮০ দিন সময়ের প্রয়োজন। এক্স এক্স প্যাটার্ন ডিম্বাণু বর্ধিত হয়ে জন্ম দেয় নারী শিশুর। আর এক্স-ওয়াই প্যাটার্ন জন্ম দেয় পুরুষ শিশুর। ভ্রূণের পূর্ণতা প্রাপ্তির একটি স্তরে ক্রোমোজম প্যাটার্নের প্রভাবে পুরুষ শিশুর মধ্যে অন্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর মধ্যে ডিম্বকোষ জন্ম নেয়। অন্ডকোষ থেকে নিঃসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্বকোষ থেকে নিঃসৃত হয় এস্ট্রোজন। পরবর্তী স্তরগুলোতে পুরুষ শিশুর যৌনাঙ্গ এন্ড্রোজেন এবং স্ত্রী শিশুর যৌনাঙ্গ এস্ট্রোজনের প্রভাবে তৈরি হয়। ভ্রূণের বিকাশকালে এই সমতা নানাভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। প্রথমত ভ্রূণ নিষিক্তকরণ এবং বিভাজনের ফলে কিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সূচনা হতে পারে। যেমন এক্স-ওয়াই ওয়াই অথবা এক্স এক্স, ওয়াই। এক্স ওয়াই ওয়াই প্যাটার্নের শিশু দেখতে নারী শিশুর মতো। কিন্তু একটি এক্সের অভাবে এই প্যাটার্নের স্ত্রী শিশুর সব অঙ্গ পূর্ণতা পায় না। একে স্ত্রী হিজড়াও বলে। আবার এক্স এক্স ওয়াই প্যাটার্নে যদিও শিশু দেখতে পুরুষের মতো কিন্তু একটি বাড়তি মেয়েলি ক্রোমোজম এক্সের জন্য তার পৌরুষ প্রকাশে বিঘ্নিত হয়। একে পুরুষ হিজড়াও বলে। প্রকৃতির খেয়ালে হোক আর অভিশাপেই হোক এই হিজড়া ঘোচাবার উপায় এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রওশন আরা বলেন, আমরা একেবারে পরিণত বয়সে হিজড়াদের হাতে পাই। তখন এদের চিকিৎসা করতে সমস্যা হয়। হিজড়া শিশুটিকে তার অভিভাবক যদি ৪/৫ বছর বয়সে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসে তাহলে এই শিশুটি অন্তত রাস্তায় নামতে পারে না। অপারেশনের পর সে স্বাভাবিক মানুষের মতো পড়াশুনা করে জীবন যাপন করতে পারে। সে হয়তো সন্তান ধারণ করতে পারবে না। আসলে তাকে এমন একটা পর্যায়ে আমরা হাতে পাই যেখানে সে পরিবারের বাইরে চলে যায়। তবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানগুলো বাইরে কম যায়। নিম্নশ্রেণীগুলোই বাইরে যায়। তখন তার জীবনধারা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়। না পারে নারী হতে না পারে পুরুষ হতে। তারা হোমোসেক্সে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
হিজড়াদের সংগঠন

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি সংগঠন। কয়েকটি সংগঠনের কর্ণধারও হিজড়া। তারা সমাজে চলার জন্য সামাজিক নিয়মকানুন, মানুষকে কোনও কিছুতে বাধ্য না করাসহ হিজড়া থেকেই সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন, যৌন সচেতনতা ও নাচ-গান সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও তারা এখন এগিয়ে। এ প্রসঙ্গে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে লাইট হাউসের নির্বাহী পরিচালক মোঃ হারম্নন অর রশিদ বলেন, বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি সংগঠন হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের কাজের পরিধিও ব্যাপক নয়। আমরা যারা এই গোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করি তারা শুধু একটা অংশ নিয়ে কাজ করি। সঙ্গত কারণেই পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারি না। এ জন্য টাকার প্রয়োজন। হিজড়াদের জন্য সরকারি/ বেসরকারিভাবে কোনও ফান্ড নেই। আমরা এদের নিয়ে কাজগুলো করে থাকি সেটা এইচআইভি/এইডস প্রোগ্রাম। এদের একটা বিরাট অংশ সমকামিতার সঙ্গে যুক্ত। এইচআইভি ভাইরাস থেকে দূরে রাখতে এবং সচেতন করতে আমরা এদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দিয়ে সচেতনতার বিষয়টি জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া তাদের বিনামূল্যে কনডমসহ যাবতীয় সামগ্রী দিয়ে সচেতনতা করা হয়। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই আমরা এদের নিয়ে কাজ করব।
সরকারের কর্মসূচি
হিজড়াদের নিয়ে সরকারের কোনও কার্যক্রম নেই। দেশের জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন কারণে একটা ছোট অংশ অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। যুগ যুগ ধরে অবহেলা অবজ্ঞা আর ঘৃণা টিটকারী টিপ্পনি খেয়ে এই সমাজেই বেঁচে আছে এই গোষ্ঠী। এমনকি হিজড়াদের নিয়ে সরকারের কোনও পরিসংখ্যানও নেই। নেই অর্থ বরাদ্দ। অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা চেয়ে নিজের খাবার জোগাড় করে। পরিবারের সমাজের হেলা-ফেলায় হিজড়া দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। নাগরিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এতে তারা খুশি নন, তারা হিজড়া বা থার্ড জেন্ডার হিসাবে স্বীকৃতি চায়। হিজড়াদের দেওয়া তথ্যে বাংলাদেশে বর্তমানে হিজড়ার সংখ্যা দেড় লাখ, এদের মধ্যে শুধু রাজধানীতে আছে প্রায় পনেরো হাজার হিজড়া।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একটা সময় ছিল হিজড়াদের কেউ মানুষ হিসাবেই ধরত না। এখন তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন তারা ভোটার হচ্ছে। ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনও প্রকল্প নেই এদের নিয়ে। পরিকল্পনা আছে এদের নিয়ে কিছু একটা করার, সেমিনারে-সভায় কথা উঠেছে এদের বিষয়ে।
ওদের দাবি
ওরা চায় সমাজে ওদের মানুষ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো ওরা সমাজের সঙ্গে, পরিবার পরিজনদের সঙ্গে বসবাস করতে চায়। ওরা দেশ ও দশের সেবা করতে চায়। চায় একটা সামাজিক, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ওরা হিজড়া নামেই স্বীকৃতি চায়। হিজড়াদের মধ্যে কেউ কেউ নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে একটু-আধটু পড়াশোনা করেছে। এরা বিভিন্ন এনজিওর হয়ে কাজও করছে। এদের মধ্যে কথা হিজড়া একজন। বাবা-মা যার নাম রেখেছিলেন ইভান মাহমুদ। তিনি কাজ করছেন নারীপক্ষ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে। কথা বলেন, ফার্স্ট ও সেকেন্ড জেন্ডার নারী ও পুরুষ আমরা ‘থার্ড জেন্ডার’ চাই। আমাদের ‘থার্ড জেন্ডার’ বলতে অসুবিধা কোথায়?
ওরা এইডস সচেতন
হিজড়াদের একটা বড় অংশ পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। এরা সস্তা দামের পারফিউম দিয়ে দিনে রাতে পার্কে কিংবা জনবহুল জায়গাগুলোতে খদ্দেরের আশায় ঘুরে বেড়ায়। সামান্য কয়েক টাকার জন্য বিকৃত রুচির কিছু পুরুষের কয়েক মুহূর্তের শয্যাসঙ্গী হয়। ফলে এরা এইচআইভি/এইডস ঝুঁকিপূর্ণ। এদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং এইচআইভি ভাইরাস যাতে না ছড়ায় এ বিষয়ে সচেতন করতে কয়েকটি সংগঠন কাজে করছে। ওরা এখন অনেক সচেতন।
শেষ কথা
মানুষ হিসাবে অবশ্যই হিজড়াদের জীবন-যাপনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমান সমাজে এরা বাস করে খুবই অবহেলিতভাবে। সরকার যেখানে প্রতিবন্ধীদের কথা ভাবছে সেখানে মানবাধিকারের দিক চিন্তা করে হিজড়াদের জন্যও পুনর্বাসন কর্মসূচি ও তাদের থার্ড জেন্ডার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

 

হিজড়া November 3, 2009

Filed under: Hijra(হিজড়া) — rezowan @ 11:45 pm

হিজড়া, প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালের এক দুর্ভাগা শিকার !

রণদীপম বসু

স্মৃতি হাতড়ালে এখনো যে বিষয়টা অস্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে, শৈশবের অবুঝ চোখে সেইকালে বুঝে উঠতে পারতাম না, কারো বাড়িতে সন্তান জন্ম নিলে শাড়ি পরা সত্ত্বেও বিচিত্র সাজ-পোশাক নিয়ে কোত্থেকে যেসব মহিলা এসে নাচগান বা ঠাট্টা-মশকরা করে তারপর বখশিস নিয়ে খুশি হয়ে চলে যেতো, এদের আচার আচরণ ও বহিরঙ্গে দেখতে এরা এমন অদ্ভুত হতো কেন ! শৈশবের অনভিজ্ঞ চিন্তা-শৈলীতে পুরুষ ও নারীর পার্থক্যের জটিলতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা না জন্মালেও স্বাভাবিকতার বাইরে দেখা এই অসঙ্গতিগুলো ঠিকই ধরা পড়েছে, যা প্রশ্ন হয়ে বুকের গভীরে জমে ছিলো হয়তো। পরবর্তী জীবনে তা-ই কৌতুহল হয়ে এক অজানা জগতের মর্মস্পর্শী পীড়াদায়ক বাস্তবতাকে জানতে বুঝতে আগ্রহী করে তুলেছে। আর তা এমনই এক অভিজ্ঞতা, যাকে প্রকৃতির নির্মম ঠাট্টা বা রসিকতা (a natural mystery) না বলে উপায় থাকে না !

অনিঃশেষ ট্র্যাজেডি

দেহ ও মানসগঠনে পূর্ণতা পেলে প্রাণীমাত্রেই যে মৌলিক প্রণোদনায় সাড়া দিয়ে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেটা যৌন প্রবৃত্তি। অনুকুল পরিবেশে এই প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা যেকোন স্বাভাবিক প্রাণীর পক্ষেই অত্যন্ত সাধারণ একটা ঘটনা। মানব সমাজের প্রমিত বা ভদ্র উচ্চারণে এটাকেই প্রেম বা প্রণয়ভাব বলে আখ্যায়িত করি আমরা। পুরুষ (male) ও স্ত্রী (female), লিঙ্গভিত্তিক দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়া প্রাণীজগতে এই মৌলিক প্রণোদনার সমন্বিত সুফল ভোগ করেই বয়ে যায় প্রাণীজাত বংশধারা। অথচ প্রকৃতির কী আজব খেয়াল ! কখনো কখনো এই খেয়াল এতোটাই রূঢ় ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠে যে, এর কোনো সান্ত্বনা থাকে না। মানবসমাজে প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালের সেরকম এক অনিঃশেষ ও দুর্ভাগা শিকারের নাম ‘হিজড়া’(hijra)। সেই আদি-প্রণোদনায় এরা তাড়িত হয় ঠিকই, কিন্তু তাদের জন্মগত লিঙ্গ-বৈকল্যধারী অক্ষম ক্লীব (neuter) বা নপুংশক দেহ যা তৃপ্ত করতে সম্পূর্ণ অনুপযোগী ! এরা ট্রান্সজেন্ডার (trans-gender), না-পুরুষ না-স্ত্রী। অর্থাৎ এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থা যা দৈহিক বা জেনেটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতেই পড়ে না।

আমার অফিস পাড়ায় সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিনে দেখি সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি পরিহিত তরুণীর মতো এদের কয়েকজন এসে প্রতিটা দোকান থেকে অনেকটা প্রাপ্য দাবির মতোই ঠাট্টা-মশকরা করতে করতে দু’টাকা-চার টাকা-পাঁচ টাকা করে স্বেচ্ছা-সামর্থ অনুযায়ী তোলা নিয়ে যায়। এই তোলাটুকু দিতে কোন দোকানির কোনো আপত্তিও কখনো চোখে পড়েনি। বরং সহযোগিতার মায়াবি সমর্থনই চোখে পড়েছে বেশি। পুরনো কৌতুহলে আমিও তাদের সেই রহস্যময় গোপন জগতের সুলুক-সন্ধানের চেষ্টা করি। তাদের নীল কষ্টগুলো সত্যিই নাড়া দিয়ে যায় কোন এক কষ্টনীল অনুভবে।

মুছে যায় পুরনো পরিচয়

জন্মের পর পরই যে ত্রুটি চোখে পড়ে না কারো, ধীরে ধীরে বড় হতে হতে ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকা সেই অভিশপ্ত ত্রুটিই একদিন জন্ম দেয় এক অনিবার্য ট্র্যাজেডির। সমাজ সংসার আত্মীয় পরিজন পরিবার সবার চোখের সামনে মুছে যেতে থাকে একটি পরিচয়। আপনজনদের পাল্টে যাওয়া আচরণ, অবহেলা, অবজ্ঞাসহ যে নতুন পরিচয়ের দুঃসহ বোঝা এসে জুড়তে থাকে দেহে, তাতে আলগা হতে থাকে পরিচিত পুরনো বন্ধন সব, রক্তের বন্ধন মিথ্যে হতে থাকে আর ক্রমেই মরিয়া হয়ে একদিন সত্যি সত্যি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পরিবার থেকে সে। অভিশপ্ত নিয়তি এদের ফেরার পথটাও বন্ধ করে দেয় চিরতরে। কারণ অভ্যস্ত সমাজের বাইরে তার একটাই পরিচয় হয়ে যায় তখন- হিজড়া !
কই যায় সে ? সেখানেই যায়, যেখানে তাদের নিজস্ব জগতটা নিজেদের মতো করেই চলতে থাকে, বেদনার নীল কষ্টগুলো ভাগাভাগি করে নীল হতে থাকে নিজেরাই। হিজড়া পল্লী। কেননা পরিবারের মধ্যে থেকে বড় হতে হতে তার যে পরিবর্তনগুলো ঘটতে থাকে, তা অন্য কারো চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই ধরা পড়ে যায় ভ্রাম্যমান অন্য হিজড়াদের চোখে। তাদের দুর্ভাগ্যের আগামী সাথী হিসেবে আরেকটা দুর্ভাগা প্রাণীকে তারা ভুলে না। এরা উৎফুল্ল হয় আরেকজন সঙ্গি বাড়ছে বলে। একসময় এরাই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় তাদের নিজেদের পল্লীতে। পল্লী মানে সেই বস্তি যেখানে সংঘবদ্ধ হয়ে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বাস করে হিজড়ারা। যেখানে তাদের নিজস্ব সমাজ, নিজস্ব নিয়ম, নিজস্ব শাসন পদ্ধতি, সবই ভিন্ন প্রকৃতির।

অন্য জীবন

যে সমাজ তারা ছেড়ে আসে সেই পুরনো সমাজ এদের কোন দায়-দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে প্রস্তুত নয় কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি দিতে ইচ্ছুক নয় বলে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে যায় মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে সাহায্য ভিক্ষা করা। এভাবে অন্যের কৃপা-নির্ভর বেঁচে থাকার এক অভিশপ্ত সংগ্রামে সামিল হয়ে পড়ে এরা। স্বাভাবিক শ্রমজীবীদের মতো উপার্জনের কাজে এদেরকে জড়িত হতে দেখা যায় না। নিজস্ব পদ্ধতিতে হাটে বাজারে তোলা উঠানোর পাশাপাশি বিনামূল্যে ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করেই এরা জীবিকা নির্বাহ করে। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কৌতুককর মনোরঞ্জনকারী হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে নাচগানে অংশ নিয়ে থাকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বিকৃত যৌনপেশাসহ নানান অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ে।
হিজড়াদের সমাজে প্রতিটা গোষ্ঠীতে একজন সর্দার থাকে। তারই আদেশ-নির্দেশে সেই গোষ্ঠী পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে হিজড়াদের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ বলে জানা যায়। তবে এই ক্ষেত্রে হিজড়াদের প্রকৃত জনসংখ্যা নিয়ে কিছুটা ধুয়াশা থেকেই যায়। কারণ নিজেদেরকে আড়ালে রাখা অর্থাৎ বহিরঙ্গে অপ্রকাশিত হিজড়াদের পরিসংখ্যান এখানে থাকার সম্ভাবনা কম। বাইরে থেকে যে চেহারাটা প্রকট দেখা যায় সেই লিঙ্গে আত্মপ্রকাশ করে এই বিরূপ সমাজে অনেকেই নিজেদেরকে সযত্নে ঢেকে রাখেন বলে বাইরের মানুষ তা জানতে পারে না। যে ক্ষেত্রে এই বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট অর্থাৎ ঢেকে রাখার মতো নয় এবং বাইরে থেকে বুঝা যায়, কেবল সেক্ষেত্রেই মানুষ নিজেকে হিজড়া হিসেবে প্রকাশিত করে এবং পরিবার থেকে বের হয়ে যায়। রাজধানী ঢাকাতে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় পনের হাজার। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত হিজড়ারা পাঁচ থেকে পঞ্চাশজন হিজড়া সর্দারের নিয়ন্ত্রণে গোষ্ঠীবদ্ধ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য। সর্দারদের নিজস্ব এলাকা ভাগ করা আছে। কেউ অন্য কারো এলাকায় যায় না বা তোলা ওঠায় না, এমনকি নাচগানও করে না। একেকজন হিজড়া সর্দারের অধীনে অন্তত অর্ধশতাধিক হিজড়া রয়েছে। হিজড়া সর্দারের অনুমতি ছাড়া সাধারণ হিজড়াদের স্বাধীনভাবে কিছু করার উপায় নেই। এমনকি সর্দারের আদেশ ছাড়া কোন দোকানে কিংবা কারো কাছে হাত পেতে টাকাও চাইতে পারে না এরা। সর্দারই ৫/৬ জনের একেকটি গ্রুপ করে টাকা তোলার এলাকা ভাগ করে দেয়। প্রত্যেক সর্দারের অধীনে এরকম ৮ থেকে ১০ টি গ্রুপ থাকে। প্রতিদিন সকালে সর্দারের সঙ্গে দেখা করে দিক নির্দেশনা শুনে প্রতিটি গ্রুপ টাকা তোলার জন্য বের হয়ে পড়ে। বিকেল পর্যন্ত যা টাকা তোলা হয়, প্রতিটি গ্রুপ সেই টাকা সর্দারের সামনে এনে রেখে দেয়। সর্দার তার ভাগ নেয়ার পর গ্রুপের সদস্যরা বাকি টাকা ভাগ করে নেয়।
প্রতি সপ্তাহে বা নির্দিষ্ট সময় পর পর হিজড়াদের সালিশী বৈঠক বসে। ১৫ থেকে ২০ সদস্যের সালিশী বৈঠকে সর্দারের নির্দেশ অমান্যকারী হিজড়াকে কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় বেত দিয়ে পেটানোসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন এবং কয়েক সপ্তাহের জন্য টাকা তোলার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। কখনো কখনো জরিমানাও ধার্য্য করা হয় ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। দণ্ডিত হিজড়াকে তার নির্ধারিত এলাকা থেকে তুলে এই টাকা পরিশোধ করতে হয়। এই শাস্তি হিজড়ারা মাথা পেতে মেনে নেয় এবং কেউ এর প্রতিবাদ করে না।

হিজড়া কেন হিজড়া ?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, মূলত তারাই হিজড়া। জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হিজড়াদের কামনা বাসনা আছে ঠিকই, ইচ্ছাপূরণের ক্ষেত্রটা নেই কেবল। এদের শারীরিক গঠন ছেলেদের মতো হলেও মন-মানসিকতায় আচার আচরণে সম্পূর্ণ নারীর মতো (she-male)। তাই তাদের সাজ-পোশাক হয়ে যায় নারীদের সালোয়ার কামিজ কিংবা শাড়ি। অনেকে গহনাও ব্যবহার করে। কৃত্রিম স্তন ও চাকচিক্যময় পোশাক ব্যবহার করতে পছন্দ করে এরা।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, হিজড়াদের নাকি বৈশিষ্ট্যগতভাবে দুইটি ধরন রয়েছে, নারী ও পুরুষ। নারী হিজড়ার মধ্যে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকলেও স্ত্রীজননাঙ্গ না থাকায় তার শারীরিক গঠন অস্বাভাবিক। পুরুষ হিজড়াদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে হিজড়ারা নারী বা পুরুষ যাই হোক, নিজেদেরকে নারী হিসেবেই এরা বিবেচনা করে থাকে। সারা বিশ্বে প্রকৃতি প্রদত্ত হিজড়াদের ধরন একইরকম। শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারীস্বভাবের হিজড়াদেরকে বলা হয় ‘অকুয়া’। অন্য হিজড়াদেরকে বলা হয় ‘জেনানা’। এছাড়া সামাজিক প্রথার শিকার হয়ে আরব্য উপন্যাসের সেই রাজ-হেরেমের প্রহরী হিসেবে পুরুষত্বহীন খোজা বানানো মনুষ্যসৃষ্ট সেইসব হিজড়াদেরকে বলা হয় ‘চিন্নি’।
হিজড়া থেকে কখনো হিজড়ার জন্ম হয় না। প্রকৃতিই সে উপায় রাখে নি। কুসংস্কারবাদীদের চোখে একে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ কিংবা পিতামাতার দোষ বা প্রকৃতির খেয়াল যাই বলা হোক না কেন, আধুনিক বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অন্যরকম। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী মাতৃগর্ভে একটি শিশুর পূর্ণতা প্রাপ্তির ২৮০ দিনের মধ্যে দুটো ফিমেল বা স্ত্রী ক্রোমোজোম এক্স-এক্স প্যাটার্ন ডিম্বানু বর্ধিত হয়ে জন্ম হয় একটি নারী শিশুর এবং একটি ফিমেল ক্রোমোজোম এক্স ও একটি মেল বা পুরুষ ক্রোমোজোম ওয়াই মিলে এক্স-ওয়াই প্যাটার্ন জন্ম দেয় পুরুষ শিশুর। ভ্রূণের পূর্ণতা প্রাপ্তির একটি স্তরে ক্রোমোজোম প্যাটার্নের প্রভাবে পুরুষ শিশুর মধ্যে অণ্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর মধ্যে ডিম্বকোষ জন্ম নেয়। অণ্ডকোষ থেকে নিঃসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্বকোষ থেকে নিঃসৃত হয় এস্ট্রোজন। পরবর্তী স্তরগুলোতে পুরুষ শিশুর যৌনাঙ্গ এন্ড্রোজেন এবং স্ত্রী শিশুর যৌনাঙ্গ এস্ট্রোজনের প্রভাবে তৈরি হয়। ভ্রূণের বিকাশকালে এই সমতা নানাভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। প্রথমত ভ্রূণ নিষিক্তকরণ এবং বিভাজনের ফলে কিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সূচনা হতে পারে। যেমন এক্স-ওয়াই-ওয়াই অথবা এক্স-এক্স-ওয়াই। এক্স-ওয়াই-ওয়াই প্যাটার্নের শিশু দেখতে নারী-শিশুর মতো। কিন্তু একটি এক্সের অভাবে এই প্যাটার্নের স্ত্রী-শিশুর সব অঙ্গ পূর্ণতা পায় না। একে স্ত্রী-হিজড়াও বলে। আবার এক্স-এক্স-ওয়াই প্যাটার্নে যদিও শিশু দেখতে পুরুষের মতো, কিন্তু একটি বাড়তি মেয়েলি ক্রোমোজম এক্সের জন্য তার পৌরুষ প্রকাশে বিঘ্নিত হয়। একে পুরুষ হিজড়াও বলে।
প্রকৃতির খেয়ালে হোক আর অভিশাপেই হোক, এই হিজড়াত্ব ঘোচাবার উপায় এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নাগালে। চিকিৎসকদের মতে শিশু অবস্থায় চিকিৎসার জন্য আনা হলে অপারেশনের মাধ্যমে সে স্বাভাবিক মানুষের মতো পরিবারের মধ্যে থেকেই জীবন-যাপন করতে পারে। হয়তো সে সন্তান ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে না হয়তো। দেখা গেছে যে অসচ্ছল নিম্নশ্রেণীর পরিবার থেকেই বাইরে বেরিয়ে যাবার প্রবণতা বেশি। তখন তাদের জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এরা না পারে নারী হতে, না পারে পুরুষ হতে। ফলে অন্যান্য অনেক অসঙ্গতির মতো হোমোসেক্স বা সমকামিতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়।

হিজড়া কি মানুষ নয় ?

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা হলো- দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার, ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, কাজের অধিকার, মানসম্মত জীবন-যাপনের অধিকার, আইনের আশ্রয় ও নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার এবং বিবাহ ও পরিবার গঠনের অধিকার। এইসব অধিকার পরিপন্থি কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধের জন্য আরো বহু চুক্তি ও সনদও রয়েছে। কিন্তু এসব অধিকারের ছিটেফোটা প্রভাবও হিজড়াদের জীবনে কখনো পড়তে দেখা যায় না। মানবাধিকার বঞ্চিত এই হিজড়ারা তাহলে কি মানুষ নয় ?
মানুষের জন্মদোষ কখনোই নিজের হয না। আর হিজড়ারা নিজেরা বংশবৃদ্ধিও করতে পারে না। এ অপরাধ তাদের নয়। স্বাভাবিক পরিবারের মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তাদের জন্ম। তবু প্রকৃতির প্রহেলিকায় কেবল অস্বাভাবিক লিঙ্গ বৈকল্যের কারণেই একটা অভিশপ্ত জীবনের অপরাধ সম্পূর্ণ বিনাদোষে তাদের ঘাড়ে চেপে যায়। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে একটা মেয়ে যদি ছেলে হয়ে যায়, কিংবা একটা ছেলে ঘটনাক্রমে মেয়ে হয়ে গেলেও এরকম পরিণতি কখনোই নামে না তাদের জীবনে, যা একজন হিজড়ার জীবনে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়। খুব অমানবিকভাবে যৌনতার অধিকার, পরিবারে সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকার, চাকরির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার ইত্যাদি মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যায় এরা। কিন্তু এসব অধিকার রক্ষা ও বলবৎ করার দায়িত্ব ছিলো রাষ্ট্রের। কেননা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযাযী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে- ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আওতাধীন কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার’ প্রতিষ্ঠা করা। আদৌ কি কখনো হয়েছে তা ? অথচ পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হিজড়ারা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার অভাবে পৈতৃক সম্পত্তির বা উত্তরাধিকারীর দাবি প্রতিষ্ঠা থেকেও বঞ্চিত থেকে যায়। এমন বঞ্চনার ইতিহাস আর কোন জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের হয়েছে কিনা জানা নেই।
প্রকৃতির নির্দয় রসিকতার কারণে হিজড়াদের গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন পদ্ধতির অনিবার্য যৌনতাকেও ইসলাম প্রধান দেশ হিসেবে সহজে মেনে নেওয়া হয় না। এমনকি ব্রিটিশ আমলেও এদেশে হিজড়াদের বিতাড়িত করা হয়েছে বলে জানা যায়। যৌনতার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় আইনে হিজড়াদের যৌনতাকে ‘সডোমি’ অর্থাৎ অস্বাভাবিক ও অনৈতিক হিসেবে চিহ্ণিত করে পেনাল কোড (১৮৬০) এর ৩৭৭ ধারায় এটাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের মানবাধিকার রক্ষাকল্পে রাষ্ট্রীয় কোন উদ্যোগ কখনো হাতে নেয়া হয়েছে বলে শোনা যায় নি।
তাই বিবেকবান নাগরিক হিসেবে এ প্রশ্নটাই আজ জোরালোভাবে উঠে আসে, হিজড়ারা কি তাহলে রাষ্ট্রের স্বীকৃত নাগরিক নয় ? রাষ্ট্রের সংবিধান কি হিজড়াদের জন্য কোন অধিকারই সংরক্ষণ করে না ?
তবে খুব সম্প্রতি গত ০২ জুলাই ২০০৯ ভারতে দিল্লী হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ যুগান্তকারী এক রায়ের মাধ্যমে ‘প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে সমকামী সম্পর্ক’ ফৌজদারী অপরাধের তালিকাভুক্ত হবে না বলে ঘোষণা করেছে। ভারতের নাজ ফাউন্ডেশনের দায়ের করা এই জনস্বার্থমূলক মামলাটির রায়ে আদালত সমকামীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির অপপ্রয়োগকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি, গণতন্ত্রের পরিপন্থি এবং অসাংবিধানিক বলে অভিমত দিয়েছে। আদালতের মতে এই প্রয়োগ ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত কয়েকটি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি, যেগুলো হলো- আইনের দৃষ্টিতে সমতা (অনুচ্ছেদ ১৪), বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ১৫), জীবনধারণ ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)। রায়টির অব্যবহিত পরেই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রায়টিকে স্থগিত করার জন্য সুপ্রীম কোর্টের কাছে আবেদন করা হয় যা মঞ্জুর হয়নি (সূত্রঃ )। এই রায় ভারতের হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য এক বিরাট আইনি সহায়তার পাশাপাশি আমাদেরর দেশের জন্যেও একটা উল্লেখযোগ্য নমুনা হিসেবে উদাহরণ হবে। কেননা সেই ব্রিটিশ ভারতীয় এই আইনটিই আমাদের জন্যেও মৌলিক অধিকার পরিপন্থি হয়ে এখনো কার্যকর রয়েছে।
তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি নয় কেন ?

যুগ যুগ ধরে ফালতু হিসেবে অবজ্ঞা অবহেলা ঘৃণা টিটকারী টিপ্পনি খেয়েও বেঁচে থাকা ছোট্ট একটা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী এই হিজড়াদের জন্য রাষ্ট্রের কোন বাজেট বা কোন পুনর্বাসন কার্যক্রম আদৌ হাতে নেয়া হয় কিনা জানা নেই আমাদের। আমরা শুধু এটুকুই জানি, পরিবার ও সমাজের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হিজড়ারা বেঁচে থাকার তাগিদেই দলবদ্ধভাবে বসবাস করে বা করতে বাধ্য হয়। মানুষ হিসেবে তাদেরও যে অধিকার রয়েছে, তা সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে হিজড়াদের উন্নয়নে হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠন খুব ছোট্ট পরিসরে হলেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। বন্ধু সোস্যাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি সংগঠনের নাম কম-বেশি শোনা যায়। এদের কার্যক্রম ততোটা জোড়ালো না হলেও এইডস প্রতিরোধসহ কিছু উন্নয়ন কার্যক্রমে এরা যুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়। সেখানে রাষ্ট্রের কোন অনুদান নেই। তাই রাষ্ট্রের কাছে হিজড়াদের প্রধান দাবি আজ, তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি। কেননা এই লিঙ্গস্বীকৃতি না পেলে কোন মানবাধিকার অর্জনের সুযোগই তারা পাবে না বলে অনেকে মনে করেন।
তবে আশার কথা যে, এবারের ভোটার তালিকায় এই প্রথম হিজড়াদেরকে অন্তর্ভূক্ত করার প্রশংসনীয় একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ বিবেকবান মানুষের সমর্থনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থারও প্রশংসা কুড়িয়েছে। আমরাও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবু প্রায় এক লাখ হিজড়াকে এবারের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তির ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা এখনো রয়ে গেছে বলে জানা যায়। কেননা তাদেরকে তাদের নিজের পরিচয় হিজড়া হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি বা করা যায়নি। হয়েছে ছেলে বা মেয়ের লিঙ্গ পরিচয়ে, যেখানে যা সুবিধাজনক মনে হয়েছে সেভাবেই। ফলে এতেও হিজড়া হিসেবে সবকিছু থেকে বঞ্চিত এই সম্প্রদায়ের আদতে কোন স্বীকৃতিই মেলেনি। ফলে হিজড়াদের প্রাপ্য অধিকার ও মানুষ হিসেবে পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ আইনের দরকার হয়ে পড়েছে আজ, যেখানে যৌক্তিক কারণেই তাদের হোমোসেক্স বা সমকামিতার অধিকার প্রতিষ্ঠাও জরুরি বৈ কি। আর এজন্যেই আজ অনিবার্য হয়ে উঠেছে হিজড়াদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মানবিক দাবিটাও।
প্রিয় পাঠক, আপনার স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততার ফাঁকে হঠাৎ করেই কোন হিজড়ার সাথে দেখা হয়ে গেলে হয়তোবা স্বতঃকৌতুহলি হয়ে ওঠবেন আপনি। এই কৌতুহলের মধ্যে অজান্তেও কোন কৌতুক মেশাবার আগেই একটিবার অন্তত ভেবে দেখবেন কি, এই না-পুরুষ না-স্ত্রী সত্তাটি আপনার আমার মতোই সবক’টি নির্দোষ দৈহিক উপাদান নিয়েই কোন না কোন পারিবারিক আবহে জন্মেছিলো একদিন। মানবিক বোধেও কোন কমতি ছিলো না। কিন্তু প্রকৃতি তাকে দিয়েছে ভয়াবহ বঞ্চনা, যা আপনার আমার যে কারো ক্ষেত্রেই হতে পারতো ! অসহায় পরিবার ত্যাগ করেছে তাকে, অবিবেচক সমাজ করেছে প্রতারণা। নিয়তি করেছে অভিশপ্ত, আর রাষ্ট্র তাকে দেয়নি কোন সম্মান পাবার অধিকার। কোন অপরাধ না করেও ভাগ্য-বিড়ম্বিত সে কি আপনার আমার একটু সহানুভূতি থেকেও বঞ্চিত হবে ?
তথ্য-কৃতজ্ঞতা: হিজড়া সম্প্রদায় তৃতীয় লিঙ্গ নয় কেন/ঝর্ণা রায়/সাপ্তাহিক ২০০০,বর্ষ১১ সংখ্যা২৭, ১৪ নভেম্বর ২০০৮

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.