খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

যুবকশূন্য সেই গাঁয়ের কথা December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka),People — rezowan @ 11:46 pm

লিখেছেন আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয়

গ্রামটির নাম থানাপাড়া। দেশের আর দশটা গ্রামের মতো রাজশাহীর এই গ্রামটিও গাছগাছালি আর পাখির ডাকে একটা ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে বয়ে গেছে পদ্মা। পদ্মায় মাছ ধরে, জমিতে ধান চাষ করে, রাতে গানের আসর বসিয়ে দিব্যি কাটছিল গায়ের লোকজনের জীবন।

সেই জীবনটাই একদিন এলোমেলো হয়ে গেল। এক দিন ঠিক দুপুরবেলায় বুটের মচমচ আওয়াজ তুলে, মুখে অচেনা বুলি বলে এই গ্রামে ঢুকে পড়ল পাকিস্তানি সেনারা। কাতারে কাতারে মানুষ নিয়ে দাঁড় করানো হলো নদীর ধারে। সব লোক জড়ো হওয়ার পর আলাদা করে ফেলা হলো পুরুষ আর মহিলাদের।
তারপর এই দুনিয়ায় নাত্সী হত্যাকাণ্ডের চেয়েও জঘন্য আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো! একসঙ্গে মেরে ফেলা হলো গ্রামের তিন শতাধিক যুবককে! ইচ্ছেমতো লুট করা হলো বাড়িগুলো, নির্যাতন চলল বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর ওপর।
এর পরও কি এই গ্রামটির টিকে থাকার কথা? অন্য কোনো দেশ হলে কী হতো, কে জানে! কিন্তু এ গ্রামের বেঁচে যাওয়া মানুষেরা যে বাঙালি। এরা মরতে জানে না, লড়তে জানে। সেই লড়াইটাই শুরু করলেন ‘বিধবাদের গ্রামের’ বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো।
ইতিহাসের কী অপূর্ব খেলা! পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে যে গ্রামটিকে যুবকশূন্য করে ফেলেছিল, সেই গ্রামটি এখন দুনিয়ার হাজারো মানুষের জন্য এক বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বন্ধুদের হাত ধরে সেই গ্রামটি এখন হস্তশিল্পের জন্য ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে খ্যাতি পেয়ে গেছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের গ্রামটির এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এক সুইডিশ দম্পতির। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে রয় জোহানসন ও অনিতা এন্ডারসন দম্পতি বেড়াতে আসেন গ্রামটিতে। এঁরা ছিলেন সুইডেনের সোয়ালোজ নামের একটি সংস্থার ভারতীয় শাখার কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গ্রামটির অবস্থা দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল তাঁদের। অবস্থা দেখে শিউরে উঠলেন রয় ও অনিতা। আশার আলোও খুঁজে পেলেন। গ্রামটির মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চায়। সেই চাওয়া পূরণ করতে এখানে শুরু হলো ‘সোয়ালোজ আন্দোলন’।
সোয়ালোজ একটি পাখির নাম। সুইডেনে বসন্ত আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এই পাখি। থানাপাড়া গ্রামেও দুর্যোগের পর বসন্ত নিয়ে আসবে সোয়ালোজ—এমন স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করলেন রয়-অনিতারা। সঙ্গে শত শত বিধবা নারী। ১৯৭৪ সালের গোড়ার দিকে এই গ্রামে শুরু হয় তাঁতের কাপড় দিয়ে পোশাক, পাট দিয়ে শিকা, কার্পেট ও মেট, নকশিকাঁথা ইত্যাদি তৈরি। কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রামের মানুষ। আর এই উত্পাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে লাগল সোয়ালোজের লোকজন।
সোয়ালোজের এই বিদেশিরা এখানে থাকতে আসেনি। বাংলার লড়াইয়ে বাঙালিরাই জিততে পারে, বুঝতে পেরে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া শুরু করে তারা। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় লোকদের হাতেই সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যায় সুইডিশরা।
এখনো দারুণভাবে চলছে হস্তশিল্পের কাজ। এখন আর এই গ্রাম দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একদিন ধ্বংস হতে বসেছিল। এখানকার উত্পাদিত পণ্য এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সন্তানদের রাখার জন্য একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।
এই কেন্দ্রে ৪৫ জন শিশু থাকে। বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি স্কুল। আছেন পাঁচজন শিক্ষক। চারঘাটে সোয়ালোজ হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে এখন ২২০ জন নারী কাজ করেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ পরিবারের প্রায় দেড় শ নারী। সরাসরি পাঁচ শহীদের স্ত্রীও রয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ওয়াজান বেওয়া। তিনি এখন সোয়ালোজের তাঁতের সুতা তৈরির কাজ করেন। ওয়াজান বেওয়া এখনো দেখতে পান ১৯৭১-এর সেই দিনটা, ‘গ্রামে মিলিটারি ঢোকার কথা শুনে সবাই পদ্মা নদীর ধারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বেলা আড়াই-তিনটার দিকে মিলিটারি ঘিরে ফেলল আমাদের। কেউ পালাতে পারল না। কিছুক্ষণ পর বাচ্চাদের নিয়ে মেয়েদের চলে যেতে বলা হলো। ভাবছিলাম, পেছন থেকে আমাদের গুলি করে মারবে। আমরা বেঁচে গেলাম ঠিকই। কিন্তু ওখান থেকে আমরা চলে আসার খানিক পরই সব পুরুষ মানুষকে মেরে ফেলল ওরা। স্বামীর লাশটাও দাফন করতে পারিনি।’
এমন গল্প এই গ্রামের অনেকের। এই স্মৃতির কষ্টটা আছে। সেই সঙ্গে আছে জীবন-যুদ্ধ জয়ের গর্বও। গর্ব এখন ওয়াজান বেওয়ারা করতেই পারেন। তাঁদের যুদ্ধজয় দেখতে এখন দেশ-বিদেশ থেকে লোক আসে।
ভারত, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন থেকে যুবকেরা আসে গ্রামটির উন্নয়নের গল্প শুনতে। এখানকার নারীদের সংগ্রামের কথা শুনতে। এই তো গত ৯ নভেম্বর থেকে উরুগুয়ে, চিলি, বুরুন্ডি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া ফিনল্যান্ড ও ভারত ‘এমাউস ইন্টারন্যাশনালের’ ১৯ জন সদস্য এসেছিলেন।
তাঁরা সবাই মুগ্ধ গ্রামটির নারীদের সংগ্রামের গল্প শুনে। এই মুগ্ধ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ফিনল্যান্ডের মেয়ে ক্যারিনা। গ্রামটির গল্প শুনে বললেন, ‘১৯৭১ সালে এখানে একটি যুবকশূন্য গ্রাম তৈরি করতে চেয়েছিল কিছু লোক। অথচ আজ দেখুন, দুনিয়ার হাজারো যুবকের গ্রামে পরিণত হয়েছে জায়গাটি। এভাবেই তো আপনারা জিতলেন।’
হ্যাঁ, এ-ও আমাদের আরেক যুদ্ধ জয়!

 

গায়েবি মসজিদ December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:58 pm

খন্দকার মাহমুদুল হাসান ৎ প্রথম আলো

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেল। তাড়াতাড়ি খুঁজতে লেগে গেলাম গায়েবি মসজিদ। অবশ্য খুব একটা দেরিও হলো না। কারণ, সঙ্গে ছিলেন বন্ধু আহমদ মমতাজ।
দেখলাম, মসজিটি পুরোনো হলেও মসজিদ আর রাস্তাকে আড়াল করার মতো বিস্তর দালানকোঠা বানানো হয়েছে। এত পুরোনো একটি মসজিদ, অথচ রাস্তা থেকে দেখাই যায় না প্রায়। শুধু সাদা গম্বুজের চূড়া দেখে বুঝতে হয়, এখানে একটি মসজিদ আছে। গায়েবি মসজিদ ছাড়াও এর অন্য একটা নাম আছে। তা হলো মাহমুদ খান জামে মসজিদ। পাহাড়তলীর জোলারপাড় এলাকায় এর অবস্থান।
মূল মসজিদের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে এভাবে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, আসল মসজিদকে প্রায় চেনাই যায় না। মূল মসজিদটি মেপে দেখা গেল, উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমের দেয়াল প্রায় চার দশমিক পাঁচ ফুট অর্থাত্ এক দশমিক ৩৭ মিটার চওড়া। তবে পূর্ব দিকের দেয়াল দরজার কাছে ছয় দশমিক ৭৫ ফুট অর্থাত্ প্রায় ২০৩ মিটার চওড়া। পূর্ব দেয়ালে তিনটি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে।
যদিও পশ্চিম পাশের দেয়ালে একটি মেহরাব দেখা গেল এবং ভেতরটা পুরোপুরি আধুনিক টাইলসে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেল। কিন্তু লোকমুখে জানা গেল, আদতে পশ্চিম দেয়ালে মেহরাব ছিল তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রবেশপথ দুটোর আকৃতি আগে অনেক ছোট ছিল।
ভেতরের দিক থেকে মসজিদের দৈর্ঘ্য ২৫ ফুট অর্থাত্ প্রায় সাত দশমিক ৬২ মিটার ও প্রস্থ ১৪ ফুট অর্থাত্ প্রায় চার দশমিক ২৭ মিটার।
জনশ্রুতি আছে, মসজিদটি ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে জন্মগ্রহণকারী সুবেদার মাহমুদ খান নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের গম্বুজের কাছাকাছি উচ্চতায় দেয়ালের গায়ে বসানো শিলার লেখায় এসব কথার বিবরণ আছে বলেও শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গেই সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম ওপরে। দেখলাম, একটা পাথরের খণ্ডে এক লাইন লেখা থাকলেও এমনভাবে এর ওপর রং লেপ্টে দেওয়া হয়েছে, সেটির পাঠোদ্ধার দুষ্কর। এতে কোনো সালের উল্লেখ আছে কি না, তা ভালোভাবে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনো সাল বা তারিখের বর্ণনা পেলাম না। তাই চেষ্টা করলাম বৈশিষ্ট্য সন্ধান করে এর সময়কাল সম্পর্কে ধারণা লাভের।
মসজিদের ভেতর থেকে একটি বড় গম্বুজের অবস্থান খুব ভালোভাবে লক্ষ করা যায়। খিলানের সাহায্যে যে এটি নির্মিত হয়েছিল, তা-ও বোঝা যায়। ভেতরের দিক থেকে গম্বুজের শীর্ষভাগে প্রস্ফুটিত ফুলের নকশা দেখা যায়। বড় গম্বুজের নিম্নভাগে দুই পাশের দুটি ছোট গম্বুজের সূচনা স্থানেও যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে প্রায় একই রকমের ফুলের পাপড়ির নকশা আছে, তবে তা সম্পূর্ণ ফুলের নয়, বরং অংশবিশেষের।
ছাদে উঠে মসজিদের বহিরায়বের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলাম। মসজিদের ছাদের মাঝখানে একটি ও এর প্রতি পাশে একটি করে দুটি অর্থাত্ মোট তিনটি গম্বুজ আছে। মসজিদের চার কোনায় চারটি আট কোণাকার মিনার আছে। এ ছাড়া পশ্চিম পাশে দুটি ও পূর্ব পাশে একটি ছোট মিনার আছে। প্রতিটি মিনারের শীর্ষভাগ শেষ হয়েছে কারুকার্যময় ছোট ছোট গম্বুজে। এ ধরনের মসজিদের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ও উত্তরাঞ্চলের একটি মুঘল যুগের মসজিদের বেশ সাদৃশ্য লক্ষ করলাম। এ দুটির একটি হলো, কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া মসজিদ, অন্যটি গাইবান্ধার ফুলহারের মসজিদ।
মসজিদের বাইরে চার কোনায় চারটি বেলেপাথরের স্তম্ভ দেখলাম। এগুলোর ওপর এখন চুনের পুরু প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। তবুও স্তম্ভগুলোর সঙ্গে মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁ মসজিদের সামনের স্তম্ভের বেশ মিল দেখলাম। এ স্তম্ভগুলোর উচ্চতা প্রায় তিন ফুট। স্তম্ভগুলোকে মসজিদের অনুচ্চ সীমানাপ্রাচীরের প্রান্তভাগ নির্দেশক বলে মনে হলো। মসজিদের পশ্চিম ও উত্তর দিকে টিকে থাকা সেই সীমানাপ্রাচীর পর্যবেক্ষণেরও সুযোগ হলো। অনুচ্চ এই প্রাচীরের বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে গেছে। এর গায়ে চুনের পুরু প্রলেপ দেওয়া হলেও পুরোনো ইট কোথাও কোথাও বেশ দেখা গেল। সে ইট সুস্পষ্টভাবে মুঘল বৈশিষ্ট্যের এবং ছোট ছোট। প্রাচীরের শীর্ষভাগ অনেকটা দোচালা আকারের। ঠিক একই রকমের, দোচালা ধারার প্রাচীর দেখেছি ঢাকার ধামরাইয়ের মুঘল যুগের একটি মাজারের পাশে।
মসজিদকে ঘিরে নানা কাহিনীর কথা শোনালেন জোলাপাড়ার (অন্য নাম নোয়াপাড়া) মরহুম শেখ আরবের রহমানের ছেলে শেখ ফরিদুর রহমান। তিনি জানালেন, এই মসজিদের পাশেই রয়েছে নোয়াপাড়া, ফকির তালুক, পাঠানপাড়া, ফৌজদারপাড়া, কুলালপাড়া, শহীদনগর ও কাজীপাড়াসহ আটটি মহল্লার কবরস্থান। তাঁর কাছেই জানা গেল, এ মসজিদের পূর্ব দিকের প্রায় মজে যাওয়া একটি পুকুরের ভেতর পুরোনো পাথরখণ্ড আছে। পুকুরের পাড়ে গেলাম। কিন্তু পাথরের দেখা মিলল না। তিনি জানালেন, এ মসজিদের উত্তর পাশের রুমে মোয়াজ্জিন একা থাকতে পারেন না। রাতে শুতে পারেন না। কেউ তাঁকে টেনে তোলে। আগে এখানে জিন নামাজ পড়ত।
মসজিদের মোয়াজ্জিনের নাম মো. নূরুল হক। তাঁর বয়স ২৮ বছর। বাবার নাম মরহুম আবদুস ছত্তর। বাড়ি আনোয়ারা উপজেলায়। তিনিও মাথা নেড়ে এ কথায় সায় দিলেন। তবে এ বিষয়ে আর বিশেষ কথা হলো না।
সবকিছু বিবেচনায় মসজিদটিকে মুঘল যুগের বলে স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি। তবে তারও আগে এখানে মসজিদের কাঠামো নির্মিত হওয়া অসম্ভব নয়।
২০০৯ সালের ২৮ মে এখানে আসার আগে এ মসজিদের কথা কোথাও পড়িনি এবং তেমন একটা জানাও ছিল না এ সম্পর্কে। তাই মসজিদটি দেখে বেশ তৃপ্তিই পেলাম, যদিও এটি যথাযথ যত্নের সঙ্গে পুরোনো দিনের কীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত হয়নি।

 

বাংলাদেশকে রুখতে চীন-মার্কিন আঁতাত December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:47 pm

১১ তারিখ বিকেল চারটায় মুক্তিবাহিনীনিয়ন্ত্রিত টাঙ্গাইলের পুংলি এলাকায় ভারতীয় ছত্রীসেনাদল অবতরণ করে। পুরো এক প্যারা ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যখন নেমে আসছিলেন আকাশ থেকে, সেটা হয়েছিল দেখার মতো দৃশ্য। এক মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন যে একটার পর একটা উড়োজাহাজ থেকে প্যারাসুটে শত শত ছত্রীসেনা নামছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশটা প্যারাসুটে ভরে গেল, যেন সেগুলো পাখির মতো ভাসছে। এরপর আরও অবাক হওয়ার পালা। দেখা গেল, প্যারাসুটে ঝুলে কয়েকটা গাড়ি নামছে, আর নামছে বড় বড় কামান।
তবে যত না ছত্রীসেনা নেমেছিল, কাজ হয়েছিল তার চেয়ে বেশি। কেননা, ছত্রীসেনার সংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্ফীত হয়ে এবং পাকিস্তানিদের মনোবল ভাঙতে তা সহায়ক হয়েছিল। সানডে টাইমস-এর অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘৫০টি ফ্লাইং বক্সকার পরিবহন বিমানে করে ৫০০০ ছত্রীসেনা ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবতরণ করেছে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসছে ভারতীয় বাহিনী।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত্ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একাংশ তখন পৌঁছে গিয়েছিল নরসিংদী। অন্যদিকে মেজর জেনারেল কৃষ্ণা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন আট মাউন্টেন ডিভিশন উপনীত হয়েছিল ফেঞ্চুগঞ্জে। মিত্রবাহিনীর পদাতিক সৈন্যরা ঢাকার কাছে পৌঁছে গেলেও মূল বাহিনী রয়ে গিয়েছিল অনেকটা পেছনে। যুদ্ধের ভারী সব উপকরণ বয়ে এনে ঢাকা অভিযান পরিচালনায় দরকার ছিল কিছুটা সময়। আগের দিন বেতার ঘোষণায় জানা গিয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছে। যুদ্ধ যে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের কেন্দ্রে এবং জাতিসংঘে চলছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরেক খেলা। দুবার সোভিয়েত ভেটো দ্বারা প্রতিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য পুনরায় উত্থাপিত হয়েছিল। প্রত্যাশিতভাবে ১০৪ বনাম ১১ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেহেতু সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এর আশু রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না; কিন্তু বিষয়টি পুনরায় ফিরে আসে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। এ যাত্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভেটো প্রদান ছিল কঠিন, তাই চেষ্টা চলছিল আলোচনা দীর্ঘায়িত করার। অন্যদিকে পর্দার অন্তরালে চলছিল চীন-মার্কিন আঁতাতের রাজনীতি, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর জন্য উভয়ের মধ্যে নানা পাঁয়তারা।
সম্প্রতি বর্তমান লেখকের হাতে এসেছে বেশ কিছু অবমুক্ত মার্কিন দলিল, যা পর্দার আড়ালের কূটনীতির পরিচয় মেলে ধরে। এমনি এক গোপন দলিলে জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ নিউইয়র্কে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়ার সঙ্গে গোপন সভার বিবরণ দিয়েছেন। জর্জ বুশ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বৈঠকের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন এই রিপোর্টে। তাঁকে হোয়াইট হাউস ফোনে জানায় যে নিউইয়র্কের ৭৪তম স্ট্রিটের একটি অ্যাপার্টমেন্টে চীনাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং হেনরি কিসিঞ্জার ও আলেকজান্ডার হেগ এতে যোগ দেবেন। জর্জ বুশ লিখেছেন, “উইনস্টন লর্ড দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে কিসিঞ্জার ও হেগের উদয় হলো, এর পরপরই হুয়াং হুয়া ও তাঁর সহকারী দুই অনুবাদকসহ এসে হাজির। হেনরি ভারত-পাকিস্তান বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক নীতি মেলে ধরে বললেন, এই নীতি চীনাদের মতো একই। কিসিঞ্জার আরও জানান, ‘মাঝদরিয়ায় কয়েকটি জাহাজের গতি আমরা পরিবর্তন করেছি। জর্দান, তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে কিছু যুদ্ধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছি।’ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পতন ঠেকাতে প্রদত্ত সাহায্যের কথাও তিনি বলেন। আমাদের অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানকে অটুট ও সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবতে হবে। ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানকে পালিশ করার কাজ শেষ করে তারা কাশ্মীরের কতক অঞ্চলে প্রবেশ করবে। জবাবে হুয়াং হুয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। বললেন, প্রয়োজনে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করতে হবে।”
এরপর বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটি ঘটনার কথা জানা যায়। জর্জ বুশ লিখেছেন, ‘হুয়াং হুয়া জানতে চান, বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে বুশ সত্যিই দেখা করেছিলেন কি না। বাংলাদেশ শব্দটা চীনাদের কাছে একটি নোংরা শব্দ। আমি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি যে বিচারপতি (আবু সাঈদ) চৌধুরীকে নিয়ে এমন একটা রটনা সম্প্রতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তিনি থার্ড কমিটির সদস্য সেজে ভিন্ন রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের মিশনত্যাগী এক কর্মকর্তাও ছিলেন। এটা আমাদের জন্য ছিল বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং নিউইয়র্ক টাইমস যেমন লিখেছে, দুই দিন আগে তা নয়, দু-তিন সপ্তাহ আগে এটা ঘটেছে।’
জর্জ বুশ আরও এক কৌতুকপ্রদ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক ডেকে সংকটের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ প্রশ্ন ও ভারতের বিরুদ্ধে কিসিঞ্জারের যে কোনো বৈরিতা নেই, তেমন ধারণা তিনি দিতে চেয়েছিলেন। হুয়াং হুয়ার কাছে এই সাংবাদিক বৈঠকের রিপোর্ট দেন কিসিঞ্জার এবং জর্জ বুশ তাঁর নোটে লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে বলেছেন যে তিনি পটভূমি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। এ কথা শুনে আমি অ্যাল হেগের দিকে ঝুঁকে তাঁকে মনে করিয়ে দেই যে ওই পটভূমির কার্যপত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গও রয়েছে, সেটা জানলে হুয়াং হুয়ার চুল খাড়া হয়ে যাবে।’
এমনি নানা খোলামেলা ভাষ্য মেলে এই নোটে, চীন ও আমেরিকা যে পরস্পরকে বুঝে নিতে চাইছিল, অপরকে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল, সেটা বেশ পরিষ্কার। আর এ ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার ছিলেন পরম উত্সাহী। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও আচারের ধার ধারেননি। কিসিঞ্জারের কথাবার্তার ধরনেও জর্জ বুশ বেশ বিরক্ত বোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘হেনরি তাঁকে (হুয়াং হুয়া) বলেন যে জাতিসংঘে তাঁরা তাঁদের ইচ্ছেমতো প্রস্তাব আনতে পারেন, আমেরিকা সেটা সমর্থন করবে। এটা আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছিল। কেননা, চীনারা (জাতিসংঘে) কঠোর নিন্দামূলক ভাষায় কথা বলছিল। সোভিয়েতের মোকাবিলায় সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও যোগাযোগ রক্ষার পদ্ধতি বিষয়ে কথা বলতেও হেনরি আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানান যে ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে এবং তিনি ভুট্টোকে বলবেন কেবল তাঁর ও হেগের কথা শুনতে, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারও নয়।’ শোষোক্ত এই বক্তব্য থেকে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং কিসিঞ্জারের ঔদ্ধত্য ও শক্ত অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায়।
কূটনীতিক মহলের ভেতরের এসব বিবরণ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা বড়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পতন ঠেকানোর, চীনাদেরও প্ররোচিত করেছে সামরিকভাবে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর লক্ষ্যে বিশ্বজনীন আয়োজন এইভাবে ঘনীভূত হয়ে আসছিল এবং এর পরিচয় পাওয়া যায় আরেক গোপন মার্কিন দলিলে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ৮ ডিসেম্বরের টপ সিক্রেট-সেনসিটিভ ডকুমেন্টে। সেখানে সুপারিশকৃত পদক্ষেপের মধ্যে ছিল মার্কিন নৌশক্তিকে অবিলম্বে ভারত মহাসাগরে পাঠানো, চীনকে জানানো যে পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে চীন সামরিক ব্যবস্থা নিলে মার্কিন সরকার তা অনুকূল মনোভাব নিয়ে বিচার করবে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সিয়াটো/সেন্টোর জরুরি সভা আহ্বান ইত্যাদি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দ্বাদশ বা শেষ সুপারিশ, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘অবিলম্বে সিনক্ল্যানটের আওতায় সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতবহ সামরিক পরিকল্পনা সূচিত ও সক্রিয় করা।’
যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা-জনতা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে নিশ্চিত করে চলছিলেন বিজয়, আর রক্তপায়ী বর্বর পাকিস্তানি-সামরিক চক্রকে বাঁচাতে ক্রমেই মরিয়া হয়ে উঠছিল আমেরিকা ও চীন। মুক্তিযুদ্ধ উপনীত হয়েছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একেবারে মুখোমুখি। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে সামরিক-কূটনৈতিক অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিল নিক্সন প্রশাসন, ঝুঁকি নিতেও পরোয়া ছিল না তাদের। আর বাস্তবে চীন কী করবে, সেটা খোদ আমেরিকানরাও বুঝে উঠতে পারছিল না। আগামী দিনগুলো তাই ছিল অশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
 মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।
ই-মেইল: mofidul_hoque@yahoo.com ১১ তারিখ বিকেল চারটায় মুক্তিবাহিনীনিয়ন্ত্রিত টাঙ্গাইলের পুংলি এলাকায় ভারতীয় ছত্রীসেনাদল অবতরণ করে। পুরো এক প্যারা ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যখন নেমে আসছিলেন আকাশ থেকে, সেটা হয়েছিল দেখার মতো দৃশ্য। এক মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন যে একটার পর একটা উড়োজাহাজ থেকে প্যারাসুটে শত শত ছত্রীসেনা নামছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশটা প্যারাসুটে ভরে গেল, যেন সেগুলো পাখির মতো ভাসছে। এরপর আরও অবাক হওয়ার পালা। দেখা গেল, প্যারাসুটে ঝুলে কয়েকটা গাড়ি নামছে, আর নামছে বড় বড় কামান।
তবে যত না ছত্রীসেনা নেমেছিল, কাজ হয়েছিল তার চেয়ে বেশি। কেননা, ছত্রীসেনার সংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্ফীত হয়ে এবং পাকিস্তানিদের মনোবল ভাঙতে তা সহায়ক হয়েছিল। সানডে টাইমস-এর অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘৫০টি ফ্লাইং বক্সকার পরিবহন বিমানে করে ৫০০০ ছত্রীসেনা ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবতরণ করেছে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসছে ভারতীয় বাহিনী।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত্ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একাংশ তখন পৌঁছে গিয়েছিল নরসিংদী। অন্যদিকে মেজর জেনারেল কৃষ্ণা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন আট মাউন্টেন ডিভিশন উপনীত হয়েছিল ফেঞ্চুগঞ্জে। মিত্রবাহিনীর পদাতিক সৈন্যরা ঢাকার কাছে পৌঁছে গেলেও মূল বাহিনী রয়ে গিয়েছিল অনেকটা পেছনে। যুদ্ধের ভারী সব উপকরণ বয়ে এনে ঢাকা অভিযান পরিচালনায় দরকার ছিল কিছুটা সময়। আগের দিন বেতার ঘোষণায় জানা গিয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছে। যুদ্ধ যে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের কেন্দ্রে এবং জাতিসংঘে চলছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরেক খেলা। দুবার সোভিয়েত ভেটো দ্বারা প্রতিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য পুনরায় উত্থাপিত হয়েছিল। প্রত্যাশিতভাবে ১০৪ বনাম ১১ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেহেতু সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এর আশু রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না; কিন্তু বিষয়টি পুনরায় ফিরে আসে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। এ যাত্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভেটো প্রদান ছিল কঠিন, তাই চেষ্টা চলছিল আলোচনা দীর্ঘায়িত করার। অন্যদিকে পর্দার অন্তরালে চলছিল চীন-মার্কিন আঁতাতের রাজনীতি, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর জন্য উভয়ের মধ্যে নানা পাঁয়তারা।
সম্প্রতি বর্তমান লেখকের হাতে এসেছে বেশ কিছু অবমুক্ত মার্কিন দলিল, যা পর্দার আড়ালের কূটনীতির পরিচয় মেলে ধরে। এমনি এক গোপন দলিলে জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ নিউইয়র্কে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়ার সঙ্গে গোপন সভার বিবরণ দিয়েছেন। জর্জ বুশ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বৈঠকের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন এই রিপোর্টে। তাঁকে হোয়াইট হাউস ফোনে জানায় যে নিউইয়র্কের ৭৪তম স্ট্রিটের একটি অ্যাপার্টমেন্টে চীনাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং হেনরি কিসিঞ্জার ও আলেকজান্ডার হেগ এতে যোগ দেবেন। জর্জ বুশ লিখেছেন, “উইনস্টন লর্ড দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে কিসিঞ্জার ও হেগের উদয় হলো, এর পরপরই হুয়াং হুয়া ও তাঁর সহকারী দুই অনুবাদকসহ এসে হাজির। হেনরি ভারত-পাকিস্তান বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক নীতি মেলে ধরে বললেন, এই নীতি চীনাদের মতো একই। কিসিঞ্জার আরও জানান, ‘মাঝদরিয়ায় কয়েকটি জাহাজের গতি আমরা পরিবর্তন করেছি। জর্দান, তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে কিছু যুদ্ধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছি।’ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পতন ঠেকাতে প্রদত্ত সাহায্যের কথাও তিনি বলেন। আমাদের অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানকে অটুট ও সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবতে হবে। ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানকে পালিশ করার কাজ শেষ করে তারা কাশ্মীরের কতক অঞ্চলে প্রবেশ করবে। জবাবে হুয়াং হুয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। বললেন, প্রয়োজনে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করতে হবে।”
এরপর বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটি ঘটনার কথা জানা যায়। জর্জ বুশ লিখেছেন, ‘হুয়াং হুয়া জানতে চান, বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে বুশ সত্যিই দেখা করেছিলেন কি না। বাংলাদেশ শব্দটা চীনাদের কাছে একটি নোংরা শব্দ। আমি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি যে বিচারপতি (আবু সাঈদ) চৌধুরীকে নিয়ে এমন একটা রটনা সম্প্রতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তিনি থার্ড কমিটির সদস্য সেজে ভিন্ন রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের মিশনত্যাগী এক কর্মকর্তাও ছিলেন। এটা আমাদের জন্য ছিল বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং নিউইয়র্ক টাইমস যেমন লিখেছে, দুই দিন আগে তা নয়, দু-তিন সপ্তাহ আগে এটা ঘটেছে।’
জর্জ বুশ আরও এক কৌতুকপ্রদ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক ডেকে সংকটের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ প্রশ্ন ও ভারতের বিরুদ্ধে কিসিঞ্জারের যে কোনো বৈরিতা নেই, তেমন ধারণা তিনি দিতে চেয়েছিলেন। হুয়াং হুয়ার কাছে এই সাংবাদিক বৈঠকের রিপোর্ট দেন কিসিঞ্জার এবং জর্জ বুশ তাঁর নোটে লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে বলেছেন যে তিনি পটভূমি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। এ কথা শুনে আমি অ্যাল হেগের দিকে ঝুঁকে তাঁকে মনে করিয়ে দেই যে ওই পটভূমির কার্যপত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গও রয়েছে, সেটা জানলে হুয়াং হুয়ার চুল খাড়া হয়ে যাবে।’
এমনি নানা খোলামেলা ভাষ্য মেলে এই নোটে, চীন ও আমেরিকা যে পরস্পরকে বুঝে নিতে চাইছিল, অপরকে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল, সেটা বেশ পরিষ্কার। আর এ ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার ছিলেন পরম উত্সাহী। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও আচারের ধার ধারেননি। কিসিঞ্জারের কথাবার্তার ধরনেও জর্জ বুশ বেশ বিরক্ত বোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘হেনরি তাঁকে (হুয়াং হুয়া) বলেন যে জাতিসংঘে তাঁরা তাঁদের ইচ্ছেমতো প্রস্তাব আনতে পারেন, আমেরিকা সেটা সমর্থন করবে। এটা আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছিল। কেননা, চীনারা (জাতিসংঘে) কঠোর নিন্দামূলক ভাষায় কথা বলছিল। সোভিয়েতের মোকাবিলায় সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও যোগাযোগ রক্ষার পদ্ধতি বিষয়ে কথা বলতেও হেনরি আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানান যে ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে এবং তিনি ভুট্টোকে বলবেন কেবল তাঁর ও হেগের কথা শুনতে, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারও নয়।’ শোষোক্ত এই বক্তব্য থেকে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং কিসিঞ্জারের ঔদ্ধত্য ও শক্ত অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায়।
কূটনীতিক মহলের ভেতরের এসব বিবরণ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা বড়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পতন ঠেকানোর, চীনাদেরও প্ররোচিত করেছে সামরিকভাবে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর লক্ষ্যে বিশ্বজনীন আয়োজন এইভাবে ঘনীভূত হয়ে আসছিল এবং এর পরিচয় পাওয়া যায় আরেক গোপন মার্কিন দলিলে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ৮ ডিসেম্বরের টপ সিক্রেট-সেনসিটিভ ডকুমেন্টে। সেখানে সুপারিশকৃত পদক্ষেপের মধ্যে ছিল মার্কিন নৌশক্তিকে অবিলম্বে ভারত মহাসাগরে পাঠানো, চীনকে জানানো যে পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে চীন সামরিক ব্যবস্থা নিলে মার্কিন সরকার তা অনুকূল মনোভাব নিয়ে বিচার করবে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সিয়াটো/সেন্টোর জরুরি সভা আহ্বান ইত্যাদি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দ্বাদশ বা শেষ সুপারিশ, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘অবিলম্বে সিনক্ল্যানটের আওতায় সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতবহ সামরিক পরিকল্পনা সূচিত ও সক্রিয় করা।’
যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা-জনতা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে নিশ্চিত করে চলছিলেন বিজয়, আর রক্তপায়ী বর্বর পাকিস্তানি-সামরিক চক্রকে বাঁচাতে ক্রমেই মরিয়া হয়ে উঠছিল আমেরিকা ও চীন। মুক্তিযুদ্ধ উপনীত হয়েছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একেবারে মুখোমুখি। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে সামরিক-কূটনৈতিক অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিল নিক্সন প্রশাসন, ঝুঁকি নিতেও পরোয়া ছিল না তাদের। আর বাস্তবে চীন কী করবে, সেটা খোদ আমেরিকানরাও বুঝে উঠতে পারছিল না। আগামী দিনগুলো তাই ছিল অশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য় ৎ লিখেছেন মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

 

দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই থাইল্যান্ডের মরণ রেলপথ December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস) — rezowan @ 10:42 pm
প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য় ৎ লিখেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন
কাওয়াই নদীর ওপর এই সেতুতে স্বপক্ষের বন্দীদের দেখেও সেতু ধ্বংসের দায়িত্ব বিস্মৃত হয় না মিত্র বাহিনীর পাইলট

ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই ছবিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁদের সঙ্গে এই নামটির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যাঁরা দেখেননি, তাঁদের জন্য জানাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা ফরাসি কথাসাহিত্যিক পিয়েরে বোলের (১৯১২—১৯৯৪) উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি তৈরি করেছিলেন পরিচালক ডেভিড লিন। এলেক গিনেস, উইলিয়াম হোল্ডেন আর জ্যাক হকিন্স অভিনীত ছবিটি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (এলেক গিনেস), শ্রেষ্ঠ পরিচালনা আর সেরা ছবিসহ ১৯৫৭ সালের মোট সাতটি অস্কার পুরস্কার জিতে নিয়েছিল। ছবিটি দেখতে দেখতে অনেক দর্শক একসময় নিজের অজান্তে ভাবতে শুরু করেন যে ছবিটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। এ রকম ভাবার কারণ বোধকরি পিয়ের বোলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত উপন্যাসটি। উল্লেখ্য, তিনি নিজেও ছিলেন একদা যুদ্ধবন্দী। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তিনি প্যারিসে ফিরে গিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। সে সময় যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেন ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই (১৯৫২)। বইটি বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার হিসেবে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। চিত্রায়িত হওয়ার পর এটি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের জন্যও একাডেমি পুরস্কার পায়, যদিও চিত্রনাট্য তিনি লেখেননি; লেখার প্রশ্নও ওঠে না, কারণ তিনি ইংরেজি জানেন না। অস্কারের ইতিহাসে নাকি সংক্ষিপ্ততম ধন্যবাদজ্ঞাপক ভাষণটি ছিল তাঁর, ‘মার্সি’ অর্থাত্ ধন্যবাদ। তবে ছবিটির ইংরেজি চিত্রনাট্যকার দুজন—কার্ল ফোরম্যান ও মাইকেল উইলসনকে কমিউনিস্ট সমর্থক হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা হলেও আমেরিকার মোশন পিকচার একাডেমি ১৯৮৪ সালে এ দুজনের নাম মূল ছবির পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহর থেকে ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্বে কাঞ্চনাবুরি শহরে কাওয়াই নদীর ওপরের যে সেতু দিয়ে থাইল্যান্ড-বার্মা রেল সড়কটি চলে গেছে, সেটিই ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই। মজার ব্যাপার, ভিয়েতনামের ওপর বহু ছবির শুটিং থাইল্যান্ডে হলেও থাইল্যান্ডের নদীর ওপর রেলসেতুর নামে অস্কারজয়ী ছবিটি কিন্তু থাইল্যান্ডে চিত্রায়িত হয়নি, এটির শুটিং হয়েছিল শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডে।
আমাদের গাইড মেয়েটি গজদাঁত বের করে হাসা ছাড়া আর কিছু জানে বলে মনে হলো না। তবে সার্কাসের বাঘ গলে যেতে পারে এমন বিশাল কানের রিং নেড়ে নিজের নামটি সে বলতে পেরেছিল—লেক। রমণীয় উপস্থিতিসহ ভ্রমণসঙ্গিনী হওয়াই ছিল ওর একমাত্র ভূমিকা। ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে চলতে চলতে বিনা নোটিশে একপাশে গাড়ি রেখে ড্রাইভার এবং মেয়েটি যখন নামার তোড়জোড় করে, তখনো আমরা বুঝতে পারি না যে কাঞ্চনাবুরি সমর সমাধি দেখানোর জন্য আমাদের ওখানে থামানো হয়েছে। অবশ্য এ রকম ওয়ার সেমেট্রি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লায়ও রয়েছে।
জাপানি সেনা, যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ সরবরাহের জন্য থাইল্যান্ড-বার্মা রেলপথ নির্মাণের সময় মারা যাওয়া প্রায় ১৬ হাজার কমনওয়েলথ, ওলন্দাজ এবং আমেরিকান যুদ্ধবন্দীকে রেলপথের আশপাশেই কবর দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে এদের কবরগুলো চিহ্নিত করে মোট তিনটি সমাধিতে স্থানান্তর করা হয়, থাইল্যান্ডের চুংকাই এবং কাঞ্চনাবুরি, আর বার্মার থানবুজায়াত সমর সমাধিতে। এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড় কাঞ্চনাবুরির সমাধি।
১৯৪৩ সালের মে-জুন মাসে কলেরায় মারা যাওয়া শ তিনেক সৈন্যের দাহকৃত দেহভস্মও এই সমাধির দুটি কবরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কাঞ্চনাবুরি সমর সমাধিতে আছে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের মোট পাঁচ হাজার ৮৪ জন এবং পর্তুগালের এক হাজার ৮৯৬ জন সৈনিকের কবর।
সমাধিতে ঢোকার মুখে ছোট গেটহাউসে তিনটি আর্চওয়ে, তার ভেতরের দেয়ালে উত্কীর্ণ রয়েছে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মারা যাওয়া ১১ জন ভারতীয় মুসলিম সৈনিকের নাম—যাঁদের থাইল্যান্ডের বিভিন্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়েছিল; তবে সেসব আর আলাদা করে সংরক্ষণ করা যায়নি। এই ১১ জনের নাম হচ্ছে: ল্যান্স নায়েক করম খান, সেপার (সমর প্রকৌশলী) কাদির খান, ল্যান্স নায়েক নিয়ানামুথি, সিপাহি আবদুল খালিক, মনজুর ইলাহি, ফতেহ খান, আমির, সুরুজদিন, ল্যান্স দফাদার শাহ মুহাম্মাদ,আমির আহমাদ ও শাব্বির।
সমাধিক্ষেত্রটি আমাদের দেশের দুটোর মতোই, তবে আয়তনে অনেক বড়। মাঝখানে উঁচু ক্রসচিহ্নের ভাস্কর্য, তার চারপাশে নাম লেখা সারি সারি সমাধিপাথরের সারি তৈরি করেছে জ্যামিতিক প্যাটার্ন। সবুজ ঘাসে পানি ছিটাচ্ছে কয়েকটা স্প্রিঙ্কলার। কাওয়াই রেল সেতুর নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে এই সমাধিক্ষেত্রের একটা সরাসরি যোগসূত্র আছে বলেই এখানে নামা। আমরা বাইরে বেরিয়ে এলে লেক গজদাঁত দেখিয়ে হাসলে আকিক পাথরের মতো ওর সফেদ গজদাঁতে দুপুরের রোদ ঝিকিয়ে ওঠে। ওর বিনম্র বুকের ওপর নেমে আসা কালো রং করা সরল রেশমের মতো চুল মৃদু বাতাসে দোল খায়, সংক্ষিপ্ত স্কার্টের ঝুল বরাবর উঠে আসা ঊরু কামড়ে ধরা কালো স্টকিংয়ের ভেতর থেকে বিচ্ছুরিত হয় প্রচ্ছন্ন উজ্জ্বলতা।
১৯৪২ সালে সিঙ্গাপুরে মিত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর জাপানি বাহিনী ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্মা দখল করে নেয়। সেখানে সৈন্য ও রসদ পাঠানোর জন্য জাপানিদের সমুদ্রপথে মালাক্কা প্রণালী ও আন্দামান সাগর হয়ে আসতে হতো। দূরত্ব ছাড়াও মিত্র বাহিনীর সাবমেরিন ছিল জাপানিদের জন্য সমুদ্রপথের এক বড় বিপদ। ফলে বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড থেকে রেলপথের কথা ভাবা হয়। অবশ্য এই রেলপথটির জন্য বহু আগেই বার্মায় ব্রিটিশ সরকার একবার জরিপ করিয়েছিল, কিন্তু দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল আর বহু নদীর কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি। জাপানি বাহিনী শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বার্মার থানবুজায়াত থেকে থাইল্যান্ডের নং প্লাদুক পর্যন্ত ৪১৫ কিলোমিটার বিপজ্জনক দীর্ঘ পথটিতে রেললাইন বসানোর দুঃসাহসিক প্রকল্পটি গ্রহণ করে। পরিবহন-সুবিধা ছাড়াও বার্মা থেকে ব্রিটিশ শাসিত ভারতে হানা দেওয়াও ছিল জাপানিদের আরেক উদ্দেশ্য। এই কাজে যুদ্ধবন্দীদের অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তাতে প্রায় ১৬ হাজার যুদ্ধবন্দী মারা যায়। সে কারণে রেল লাইনটির নাম হয়ে যায় ‘মরণ রেলপথ’ (ডেথ রেলওয়ে)। হিসেব করলে দেখা যায়, প্রতি কিলোমিটার রাস্তার জন্য প্রাণ দিয়েছে ৩৮ জন যুদ্ধবন্দী অথবা প্রতিটি রেলওয়ে স্লিপারের বদলে একটা করে লাশ। এদের মৃত্যু হয়েছে অপুষ্টি, অসুস্থতা ও অত্যধিক পরিশ্রমের কারণে। বন্দীদের খাবার ছিল দিনে দুই বেলা—ভাত আর লবণসেদ্ধ সবজি। সামান্য অপরাধ বা গাফিলতির জন্য ছিল মারাত্মক শাস্তি। ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই ছবিতে কেবল রেলসেতু নির্মাণের সময়কে ধরা হলেও নিপীড়নের কিছু কিছু বিষয় সিনেমাটিতে উঠে আসে।
জেনেভা কনভেনশনের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধবন্দীদের ওপর অনৈতিক দুর্ব্যবহার ও নিপীড়নের একটা বিশ্বাসযোগ্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে বের করা হয় যে মিত্র বাহিনীর সহজ আত্মসমর্পণ জাপানিদের কাছে কাপুরোষোচিত মনে হয়েছিল। এ রকম অসহায় আত্মসমর্পণের চেয়ে আত্মহত্যা (হারিকিরি বা সেপুকু) বরং শ্রেয়তর ছিল—এটাই ছিল জাপানিদের মনোভাব।
প্রথম জরিপের সময় ধারণা করা হয়েছিল, রেললাইন বসানোর কাজে সময় নেবে বছর পাঁচেক। কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের অতিরিক্ত খাটিয়ে মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে লাইনটি চালু করা হয়। ন্যূনতম সময়ে কাজটি শেষ করার জন্য জাপানিরা এতই মরিয়া ছিল যে যুদ্ধবন্দীদের ভালোমন্দ দেখার বিন্দুমাত্র প্রয়াস তাদের ছিল না। কাজ শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে অতিরিক্ত শ্রম এবং রোগ ও মহামারির কারণে যুদ্ধবন্দীদের কর্মক্ষমতা এতই কমে যায় যে সময়মতো কাজ শেষ করার জন্য জাপানিদের প্রায় দুই লাখ এশীয় শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। এদের মধ্যে ছিল চীনা, মালয়েশীয়, তামিল ও বর্মী। এদের দুরবস্থা ছিল যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও খারাপ। এ কারণে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক মারা যায়। ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা দেড় লাখের কম হবে না। কারণ এসব শ্রমিকের কোনো রেকর্ড রাখা হতো না।
মরণ রেলপথটির কাজ শুরু হয় ১৯৪২ সালের জুন মাসে বার্মা ও থাইল্যান্ডের উভয় প্রান্ত থেকে। ১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের কায়েং খোইথাতে এসে উভয় প্রান্তের লাইন মিলিত হয়। তবে রেললাইনটির পুরো নির্মাণকাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাওয়াই নদীর ওপর রেল সেতুটি। আমরা নদীটির নাম কাওয়াই জানলেও স্থানীয় উচ্চারণে এটির নাম কোয়ে।
সমর সমাধি থেকে কাওয়াই ব্রিজের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ব্রিজের কাছে এসে একটা পার্কিং লটে গাড়ি রেখে লেক আর ড্রাইভার আমাদের নিয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাদুঘরে। এটির অন্য নাম জিথ মিউজিয়াম। মরণ রেলপথ তৈরির সময় মূলত যেসব দেশের যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছিল, সে দেশগুলোর নামের আদ্যক্ষর দিয়ে (জাপানের জে, ইংল্যান্ডের ই, অস্ট্রেলিয়ার এ, থাইল্যান্ডের টি ও হল্যান্ডের এইচ) জাদুঘরটির নামকরণ। জাদুঘরে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে আজদাহার মতো আস্ত এক রেল ইঞ্জিন। আমরা যেগুলোকে কয়লা-ইঞ্জিন বলে চিনি, সেরকম ইঞ্জিনটির পুরোটাই জং ধরা, পাশ থেকে ক্ষয়ে গেছে শরীরের কিছু অংশ। ইঞ্জিনের গায়ে বড় একটা জাপানি পতাকা টানানো, সামনে-পেছনে ইতালি, জর্ডান, বেলজিয়াম, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, কানাডা, কলাম্বিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মিশরসহ আরও অনেক দেশের ছোট ছোট পতাকা দড়িতে ঝোলান থাকায় বেশ উত্সব-উত্সব ভাব। তবে রেলের ইঞ্জিনটির দুরবস্থার জন্য সবকিছু যেন মার খেয়ে গেছে। ইঞ্জিনের গায়ে সাদা রং দিয়ে থাই ও ইংরেজিতে লেখা—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা যুদ্ধকে বার্মা এবং ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে গোলাবারুদ আনা-নেওয়ার জন্য এই ট্রেনটি ব্যবহার করত। ট্রেনের ওপর দাঁড়িয়ে যে বিনা পয়সায় ছবি তোলা যায়, সেই ঘোষণাও সাঁটানো আছে ওটার গায়ে। বিশ্বযুদ্ধের এ রকম একটা স্মারকের হতশ্রী অবস্থা বিস্ময়কর বৈকি। কোনো সংস্কার কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে মরচে ধরে ট্রেনটির পুরোটাই হয়তো একসময় ক্ষয়ে যাবে।
আমরা যখন ট্রেনটি ঘুরেফিরে দেখি, তখন লেক আর ড্রাইভারটি সামনের একটি বেঞ্চ দখল করে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে। টিকিট কেটে জাদুঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বেলা চড়ে যায়। বিশ্বযুদ্ধের স্মারকগুলো সযত্ন সংরক্ষণের প্রয়াস ভেতরেও অনুপস্থিত দেখা গেল। দোতলার খোলা ছাদের ওপর থেকে সাদামাটা কাওয়াই ব্রিজটির সম্পূর্ণ দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখতে সাদামাটা হলেও অসাধারণ ফিল্মটির কল্যাণে এটি আর সাধারণ কোনো রেলসেতু নেই; এটার নাম ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই হলেও ঠিক এ ব্রিজটা কিন্তু যুদ্ধবন্দীরা তৈরি করেনি। ব্রিজের ইস্পাতের কাঠামো ইন্দোনেশিয়ার জাভা থেকে তুলে এনে কাওয়াই নদীর ওপর বসানো হয়। তবে সিনেমায় কাঠের যে ব্রিজ তৈরি এবং শেষে গেরিলা অ্যামবুশে ধ্বংস করা দেখানো হয়, সেটিও ছিল বর্তমান ব্রিজটির পাশে, অর্থাত্ পাশাপাশি দুটি ব্রিজই প্রায় একই সময় ছিল। কাঠেরটি ১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসে মিত্র বাহিনীর বোমা হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর মাত্র দুই মাস পর আরেক হামলায় এখন চালু সেতুটিরও তিনটি স্প্যান ভেঙে পড়ে। মজার ব্যাপার, দুটি ব্রিজের নির্মাণকাজও শেষ হয়েছিল ঠিক দুই মাসের ব্যবধানে। সেদিন মিত্র বাহিনীর বোমারু বিমান গর্জন তুলে কাঞ্চনাবুরির আকাশে যখন শিকারি বাজের মতো চক্কর দিচ্ছিল, তখন জাপানিরা যুদ্ধবন্দীদের গাদা করে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে বিমানের উদ্দেশে হাত নাড়ানোর নির্দেশ দেয়, যাতে মিত্র বাহিনীর বিমান ব্রিজের ওপর বোমা ফেলার আগে দুবার চিন্তা করে। প্লেনগুলো নিচু হয়ে ব্রিজের ওপর উড়ে আসার পরই নিরস্ত্র বন্দীরা বুঝতে পারেন, মৃত্যুর কতখানি মুখোমুখি তাঁরা। স্বপক্ষের এতজন বন্দীকে দেখেও ব্রিজ ধ্বংসের দায়িত্ব বিস্মৃত হয় না মিত্র বাহিনীর পাইলট। প্লেনের পেট উজাড় করে নির্ভুল নিশানায় বোমাগুলো ছেড়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে সেতুর তিনটি স্প্যান, এর সঙ্গে নদীর পানিতে হারিয়ে যায় শত শত বন্দীর মৃতদেহ। তাঁদের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল কাওয়াই, আর গলিত মৃতদেহের কারণে পরের কয়েক দিনের জন্য সম্পূর্ণ অপেয় হয়ে গিয়েছিল তার জল। যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্ত স্প্যান তিনটি মেরামত করা হয়েছিল।
জাদুঘরের ভেতর রয়েছে যুদ্ধের সময় জাপানিদের ব্যবহূত জিপ গাড়ি, এর ভেতর জাপানি সেনা অফিসারের মূর্তি, ঘোড়ায় টানা গাড়ি, মোটরসাইকেল, বোমার খোল, পত্রিকার খবরের কাটিং—এসব। অস্ত্রধারী জাপানি সেনাদের প্রহরায় রেললাইনে কর্মরত হাড়জিরজিরে শরীরের প্রায়-উলঙ্গ যুদ্ধবন্দীদের ভাস্কর্যমূর্তি দেখে তাদের দুরবস্থার কথা কিছুটা আঁচ করা যায়। জাদুঘর ভবনের মাঝখানে খোলা জায়গায় আমাদের মালগাড়ির মতো একটা রেলের বগি, সেটার দরজায় গরাদ লাগানো, ভেতরে কৌপীন পরা এক যুদ্ধবন্দীর মূর্তি। জাদুঘরে জাপানি দখলদারি, অবস্থান ও তাদের অত্যাচার-নিপীড়নের নানা স্মারকচিহ্ন ও নিদর্শন সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। লম্বা বাঁশের ব্যারাকে যুদ্ধবন্দীদের যে মানবেতরভাবে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল; সাজানো আছে তার অনেক মর্মস্পর্শী আলোকচিত্র। একটি দেয়ালের গায়ে সারি সারি সাজানো রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমর-নেতাদের মূর্তি। এক জায়গায় কাচের ঘেরার ভেতর রয়েছে গণকবর থেকে উদ্ধার করা এশীয় শ্রমিকদের মাথার খুলি ও হাড়গোড়। দোতলার প্রায় পুরো একটা উইং জুড়ে রয়েছে জাপানি সৈন্যদের ব্যবহার করা হাজারো জিনিসপত্র। এগুলোর মধ্যে অস্ত্র-গোলাবারুদ থেকে শুরু করে মাউথ অর্গান, টাইপরাইটার ও মশারি পর্যন্ত। জাদুঘরটি রকমারি স্মারকে প্রায় ঠাসা, তবে সংরক্ষণব্যবস্থা খুব সুবিধার নয়। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ না করলে কালের আবর্তে বহু জিনিস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাধারণত জাদুঘরে স্মারক ও নিদর্শনগুলো যেভাবে যত্ন ও সংরক্ষণের মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়, এখানে সে রকম যত্নের বালাই নেই বলে মনে হলো।
আমরা যখন জাদুঘর থেকে বের হয়ে আসি, তখনো সেই বেঞ্চের ওপর ঠাঁয় বসে আছে লেক আর ড্রাইভারটি। এদের পায়ে কী খিলও ধরে না! আমরা ভাবি। লেক আমাদের দেখে উঠে এসে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করে, লাঞ্চ? আমাদের সায় পেয়ে দুজন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। আমাদের পথ দেখিয়ে যেতে যেতে রেললাইন পেরিয়ে নিয়ে যায় একদম নদীর ওপর ভাসমান রেস্তোরাঁয়। সেখান থেকে সামান্য উজানে কাওয়াই ব্রিজের বিশাল কাঠামো জ্যামিতিক নকশায় নীল আকাশের পটভূমিতে আঁকা। পাশাপাশি তিনটি রেস্তোরাঁ ভাসছে কাওয়াই নদীর শান্ত বহমান স্রোতের ওপর—এর মধ্যে ঠাসা ট্যুরিস্ট। আমাদের রেস্তোরাঁয় পৌঁছে দিয়ে ওরা দুজন মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যায়। আমাদের সঙ্গে ওদের লাঞ্চ করতে বলব, কিন্তু ওদের আর টিকিটিও দেখা যায় না। থাই খাবার অচেনা নয় বলে খেতে আমাদের তেমন বেগ পেতে হয় না। স্যুপ, থাই ওমলেট, শাক, রাইস—প্রায় সবকিছু মিশিয়ে বাঙালি খাবারের মতো খেতে শুরু করলে পরিবেশনকারী মেয়েগুলো অন্য টেবিলের তদারকি ভুলে গিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমাদের খাওয়া দেখে। দেশ থেকে ক্রমাগত কয়েক দিন বাইরে থাকলে দেশি খাবারের মতো কিছু খেতে ইচ্ছে করে বলে আমরা ওদের কৌতূহলী দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে আমাদের মতো করে খেতে থাকি।
খাওয়া শেষ হলে আমরা যখন রেস্তোরাঁর নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলের স্রোত থেকে চোখ তুলে দূরের সবুজ বনানীর দৃশ্য দেখে পর্যটকসুলভ উচ্ছ্বাসে মগ্ন হই, তখন লেক আর ড্রাইভারটি কোথা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়। আমাদের বাচ্চা ছেলের মতো ট্রেনে চড়ার লোভ দেখিয়ে ওখান থেকে বের করে আনে ওরা। খোলা স্টেশনের প্লাটফরমের পাশে টিকিট কাটার গুমটি দেখিয়ে জানায়, ওখান থেকে ট্রেনে চড়ে কাওয়াই ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ওপার থেকে ঘুরে আসতে পারি। টিকিট কাটতে কাটতে চারপাশ খোলা ট্যুরিস্ট ট্রেন প্লাটফরমে এসে যায়। বিকেলের তীর্যক রোদ টয় ট্রেনের ভেতর তেরচা বর্শার মতো ঢুকে পড়লে গুড়গুড় করে চলতে শুরু করে ট্রেন। শিশুপার্কের টয় ট্রেনের মতো রেলগাড়িটা যখন কাওয়াই ব্রিজের ওপর উঠে পড়ে, ট্রেনভর্তি যাত্রীদের সহর্ষ হুল্লোড় কাওয়াই নদীর শান্তজলে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন। ট্রেন চলার সময় পদচারীদের আশ্রয় নেওয়ার জন্য ব্রিজের ওপর কিছুদূর পরপর ঝুল-বারান্দার মতো রেলিং ঘেরা জায়গা, সেখানে দাঁড়িয়ে এক বেহালাবাদক ছড় বোলাতে বোলাতে প্রায় ঝুঁকে পড়ে। ট্রেনের শব্দে তার বেহালার সুরের মূর্ছনা ঢেকে যায়। ব্রিজ পেরিয়ে ট্রেনটি ঢালু রেল সড়কের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে যেতে একটা পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে থামে, তারপর আবার ফিরতি পথে চলতে শুরু করে।
যুদ্ধবন্দী মিত্র বাহিনীর রক্ত আর ঘামে নির্মিত রেল সড়কের ওপর দিয়ে ফিরে আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে যায়। নিস্তরঙ্গ কাওয়াই নদীর পানির আয়নায় পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ব্রিজের কাছাকাছি স্টেশনে নেমে পড়ার পর সেতুটার দিকে ফিরে তাকাই, ট্যুরিস্টদের এলোমেলো পদচারণে আর মৃদু কোলাহল ছাপিয়ে কানে বাজতে থাকে ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই ছবিতে যুদ্ধবন্দী সৈনিকদের কুচকাওয়াজের তালে তালে শিস দিয়ে বাজানো সুর।

 

১৯৭১ ঝটিকা আক্রমণ December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:36 pm

প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য়

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নীলক্ষেতে ধ্বংসস্তূপ ও লাশের মাঝখানে বিমূঢ় শিশু ও মা
ছবি: আনোয়ার হোসেন

অনেক তথ্য ঘেঁটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটা নিরপেক্ষ নির্দলীয় ইতিহাস লেখার চেষ্টা করেছেন গোলাম মুরশিদ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিতব্য এই গ্রন্থের নাম: মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর। এই গ্রন্থ থেকে একটি নির্বাচিত অংশ এখানে ছাপা হলো।

১৯৭১ সালের মার্চের ২৫ তারিখ রাত একটার অল্প পরেই শেখ মুজিবর রহমানকে সেনারা গ্রেপ্তার করে তাঁর বাড়ি থেকে। গ্রেপ্তারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লে. ক. জহির আলম খানকে। তিনি তাঁর অধীনস্থ মেজর বিল্লালকে নিয়ে যান ৩২ নম্বরে। জহির আলম তাঁর গ্রন্থ দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ (১৯৯৮) গ্রন্থে লিখেছেন যে গ্রেপ্তারের আগে তাঁর সেনাদের ওপর পিস্তলের একটা গুলি ছোড়া হয়েছিল। তার জবাবে তার সেনারা মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি ছোড়ে এবং একটা গ্রেনেড ফাটায়। শেখ মুজিব তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির তাঁকে প্রচণ্ড একটা থাপ্পড় দেয়। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকে আদমজী স্কুলে। তিন দিন পরে পশ্চিম পাকিস্তানে। (গ্রেপ্তারের আগে পিস্তল থেকে একটা গুলি ছুড়ে সেনাদের প্ররোচিত করা হয়েছিল—ধারণা করি, এ কথা একেবারে বানোয়াট। পিস্তল দিয়ে এক প্লাটুন সৈন্যকে আটকে রাখা যায় না—এটা মুজিবের মতো বিচক্ষণ নেতা কেন, একটি অপরিণত বালকও বুঝতে পারে।) সিদ্দিক সালিকের লেখাতেও কোনো পিস্তল থেকে কোনো গুলির কথা নেই। প্রবেশপথে পাহারাদারদের খতম করে দেয়াল টপকে বাড়ির চত্বরে ঢুকেছিল মেজর বিল্লালের পঞ্চাশ জন সৈন্য। তারপরই তারা গুলি করেছিল স্টেনগান দিয়ে—নানা দিক থেকে। দোতলায় উঠে মুজিবের শোবার ঘরের দরজায় গুলি করে দরজা খুলে সেই কক্ষে ঢুকেছিল তারা। মুজিব তৈরি ছিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। (সালিক, ১৯৭৮)
আহমদ সালিমও লিখেছেন যে গ্রেপ্তারের আগে মুজিবের বাসভবনের ওপর নানা দিক থেকে অসংখ্য গুলি ছোড়া হয়েছিল। (সালিম, ১৯৯৭) তাঁকে মেগাফোনে বলা হয়েছিল নিচে নেমে আসার কথা। তিনি তখন কাপড়-চোপড়ের ছোট্টো একটি ব্যাগ হাতে করে আর মুখে পাইপ দিয়ে নিচে নেমে এসেছিলেন। জিপে ওঠার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁর ওপর যে শারীরিক নির্যাতন শুরু করে, তার কথা তিনি নিজেই বলেছিলেন, ডেভিড ফ্রস্টকে। তিনি বলেন,
‘তারা আমাকে ধরে নিয়ে টানাটানি করে। আমার মাথার পেছন দিকে বৃষ্টির মতো ঘুসি মারতে আরম্ভ করে। আমাকে আঘাত করে রাইফেলের বাঁট দিয়ে। তা ছাড়া, তারা আমাকে এদিকে-ওদিকে ধাক্কা দিতে থাকে।’ (উদ্ধৃত, সালিম, ১৯৯৭)
নিজে ধরা দিলেও মুজিব আগে থেকে অন্য নেতাদের গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে তাজউদ্দীনকে তিনি শহরতলিতে পালিয়ে থাকার কথা বলেছিলেন। (আমীরউল ইসলাম, ১৯৮৮) শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খানকেও তিনি পালিয়ে গিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্যদেরও সম্ভবত বলে থাকবেন। কিন্তু অন্যরা পালালেও তাঁর নিজের পালানোর কোনো উপায় ছিল না। তাঁর মতো একজন নেতাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা যায় না। তার চেয়েও বড় কথা, পালানোর মতো মনোবৃত্তিই তাঁর ছিল না।
বদরুদ্দীন উমরের মতো কোনো কোনো সমালোচক বলেছেন, এভাবে ধরা দেওয়া তাঁর ঠিক হয়নি। এর ফলে তিনি বিপ্লবের নেতৃত্বে দিতে ব্যর্থ হন। (উমর, ২০০৬) কিন্তু এই সমালোচনাকে যথার্থ বলে মানা যায় না। কারণ, মুজিব চিরদিন সাংবিধানিক রাজনীতি করেছেন, বিপ্লবী রাজনীতি করেননি। তা ছাড়া তিনি সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে পাকিস্তানিরা অমন বর্বরোচিত হামলা করে লাখ লাখ লোককে হত্যা করতে পারে। আর ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন সত্যিকার নির্ভীক এবং আপসহীন। এর আগে বহুবার গ্রেপ্তার বরণ করেছেন তিনি। কারা বাস করেছেন বহু বছর। কিন্তু গ্রেপ্তারের ভয়ে কোনো দিন তিনি আত্মগোপন করেননি। অথবা তাঁর দল নিয়ে তিনি কোনো দিন কমিউনিস্টদের মতো গোপন আন্দোলনও করেননি।
নিয়াজি ও রাও ফরমান আলী লিখেছেন, তাঁরা মনে করেছিলেন রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার করেই স্বাধীনতা আন্দোলন বন্ধ করা যাবে। কিন্তু ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তা মনে করেননি। তাই তাঁরা চেয়েছিলেন এর ফৌজি সমাধান। ইয়াহিয়া আগে থেকে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দু-একবার প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছিলেন। যেমন—২২ ফেব্রুয়ারি জেনারেলদের সভায় তিনি নাকি বলেছিলেন, দরকার হলে ৩০ লাখ লোককে খতম করে দেওয়া হবে। বাকিরা তখন অনুগত ভৃত্যের মতো আচরণ করবে। (রুডলফ রামেল, ১৯৯৬)
এ জন্যই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসেন টিক্কা খানকে। এর আগে টিক্কা খান কঠোর হাতে বেলুচিস্তানের জনগণকে দমন করেছিলেন। সে ‘খ্যাতি’র কারণেই তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল বাঙালিদের দমন ও নিধন করতে। অন্য জেনারেলদের নিয়ে টিক্কা খান ১৮ মার্চ পরিকল্পনা করেছিলেন, মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশকে তিনি ‘বিদ্রোহী’মুক্ত করবেন। ২০ মার্চ এই পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। (সালিক, ১৯৮৮)
ব্যাপক গণহত্যার মধ্য দিয়ে জনতাকে হতভম্ব ও চুপ করিয়ে দেওয়াই ছিল এই ঝটিকা আক্রমণের উদ্দেশ্য।
তার জন্য অবশ্য সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করাই যথেষ্ট ছিল না। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর (বিডিআর) ও পুলিশকেও দমন করারও দরকার ছিল। মার্চ মাসের গোড়া থেকেই তাই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তাদের জায়গায় বসানো হয়েছিল পশ্চিমাদের। বেশির ভাগ বাঙালি কম্যান্ডিং অফিসারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল দায়িত্ব থেকে। যেমন—চট্টগ্রামের সবচেয়ে সিনিয়র বাঙালি অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ২৪ তারিখে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আনা হয় ঢাকায়। যেমন—খালেদ মোশাররফকে ২২ মার্চ ঢাকার ব্রিগেড মেজরের পদ থেকে সরিয়ে কুমিল্লায় বদলি করা হয়। যেমন—জয়দেবপুরে শফিউল্লাহর বাহিনীর কম্যান্ডিং অফিসার করে এক পশ্চিমা ব্যাটালিয়ন কম্যান্ডারকে পাঠানো হয় ২৫ মার্চের দু-তিন দিন আগে। যেমন—শাফায়েত জামিলকে কল্পিত ভারতীয় শত্রু দমন করার জন্য কমিল্লা থেকে পাঠানো হয় সিলেটের পথে। (জামিল, ২০০৯)
তা ছাড়া বাঙালি সৈন্য ও সেনাপতিদের রাখা হয়েছিল চোখে চোখে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিরস্ত্র করা হয় বহু বাঙালি সেনা-কর্মকর্তাকে। এমনকি অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহতও হন অনেকে।
২৫ মার্চ রাতে সৈন্য বাহিনী ঢাকায় যে হামলা চালায়, তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। এ হামলা যেমন অতর্কিত ছিল, তেমনি ছিল বিদ্যুত্ গতির। রাস্তায় বেরিয়ে সৈন্যরা মধ্যরাতের পর থেকেই নির্বিচারে হাজার হাজার লোককে মারতে আরম্ভ করেছিল।
স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্ররা বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। সে জন্য বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ওপর হামলা চালায় সৈন্যরা। তখনকার ইকবাল হল (সার্জেন্ট জহিরুল হক হল) ছিল ছাত্রলীগের ঘাঁটি—সেখানে সে রাতে অন্তত দু শ ছাত্র নিহত হন। ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং দুই দিন পরে এই হলে গিয়ে তখনো পোড়া কক্ষগুলোয় আধা-পচা লাশ দেখতে পান। দেখতে পান এখানে সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ। (ড্রিং, ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০. ৩. ১৯৭১) হিন্দু ছাত্রদের ওপর সৈন্যদের আক্রোশ ছিল আরও বেশি। তাদের ধারণা ছিল, জগন্নাথ হল কার্যত অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে। (সালিক, ১৯৭৬)
রাও ফরমান আলী লিখেছেন, সামরিক অভিযান শুরু হলে এই হল থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল। (ফরমান আলী তাঁর গ্রন্থে সত্য কথা কমই লিখেছেন। সুতরাং তাঁর কথাকে সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়ার কারণ নেই। তিনি এও লিখেছেন, ২৫ মার্চ রাতে কোনো ট্যাংক ব্যবহার করা হয়নি।) কিন্তু সে যা-ই হোক, এই হলে সৈন্যরা যাকে পায়, তাকেই হত্যা করে। কালীরঞ্জন শীলের মতো সেখান থেকে দু-চারজন ছাত্রই অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন। (কালীরঞ্জন শীল, [রশীদ হায়দার, ১৯৯৬])
ছাত্র ও কর্মচারীদের মৃতদেহগুলো হলের সামনের মাঠে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। সেই গণকরব খোঁড়ায় কালীরঞ্জনও অংশ নিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে সে শুয়ে পড়ায় সৈন্যরা তাঁকে মৃত বলে মনে করেছিল। এই হলে যে আগুন জ্বালানো হয় তা দুই দিন পরেও নিভে যায়নি বলে লিখেছেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। (বাসন্তী, ১৯৯১)
জগন্নাথ হলের প্রোভেস্ট ছিলেন জি সি দেব (গোবিন্দচন্দ্র দেব)। চিরকুমার, আপন-ভোলা মানুষ। দর্শনের অধ্যাপক। সৈন্যরা তাঁকেও হত্যা করে। জগন্নাথ হলের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ নম্বর বাড়িতে থাকতেন অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান আর জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। মুনিরুজ্জামানের বাড়িতে ঢুকে সৈন্যরা তাঁকে এবং অন্য তিনজনকে টেনে এনে সিঁড়ির ওপর গুলি করে হত্যা করে। নিচতলায় বাড়ি থেকে বের করে ঘাড়ের ওপর দুটি গুলি করে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার। তিনি হাসপাতালে মারা যান ৩০ মার্চ। গুলি করার আগে তাঁর কাছে নাম ও ধর্ম কী—তা জিজ্ঞেস করেছিল সৈন্যরা। এমনিতে তাঁকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথা বলে দয়া হয়েছিল কি না, জানা যায় না। কিন্তু হিন্দু শুনে আর দয়া করতে পারেনি। (বাসন্তী, ১৯৯১)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট-নয়জন অধ্যাপক নিহত হন এই রাতে। এই অধ্যাপকদের মধ্যে তিনজন ছিলেন হিন্দু।
আসলে হিন্দুরা পাকিস্তানের শত্রু এবং ভারতের দালাল বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। ফলে কেবল এই রাতে নয়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই হিন্দুদের ওপর নির্মমভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছিল। (ম্যাসকারেনহ্যাস, ১৯৭১)
নির্মম নির্যাতন করতে পাকিস্তানি সেনারা অকুণ্ঠ ছিল। কিন্তু হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করে হত্যা করা, শিশু-বৃদ্ধসহ হিন্দু পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করা এবং তাঁদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের দোসর রাজাকারেরা একটু বেশি বিশেষ উত্সাহী ছিল। (সরকার, ২০০৬)
বিদেশি সাংবাদিকদের বিবরণ থেকে জানা যায়, হিন্দু-নিধনের কাজ চালানো হয়েছিল পদ্ধতিগতভাবে এবং নীতি হিসেবে। (ডেইলি টেলিগ্রাফে লোশাকের রিপোর্ট, সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইমস, ভারজিন আয়ল্যান্ডস ডেইলি নিউজ, সানডে টাইমস [১৩ জুন], টাইমস [৫ জুন], সানডে টাইমস [১৩ জুন] এবং নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিভিন্ন সংখ্যা, অ্যান্টনি ম্যাকারেনহ্যাসের দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ [১৯৭১] গ্রন্থ ইত্যাদি দ্রষ্টব্য) আসলে, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে দেশছাড়া করতে। যাতে পূর্ব পাকিস্তান পুরোপুরি মুসলমানদের দেশে পরিণত হয়।
২৫ মার্চ রাতে, কেবল সাধারণ মানুষদের ওপর নয়, প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মীদের ওপরও। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর ও পুলিশকে খতম করা ছিল পশ্চিমাদের একটা বড় লক্ষ্য। তাই তারা একযোগে আক্রমণ করে পিলখানার ইপিআর ছাউনি এবং রাজারবাগের পুলিশ লাইনের ওপর। রাত ১২টায় এ দুই জায়গায়ই সেনারা পৌঁছে যায়।
পিলখানায় বাঙালি জওয়ানেরা প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন, কিন্তু বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। আগে থেকেই পশ্চিমা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের নিয়ে এসে সেখানে বাঙালিদের দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। জওয়ানেরা অনেকেই বুড়িগঙ্গার ওপারে গিয়ে নিজেদের সংগঠিত করতে চেষ্টা করেন। নিহত হয়েছিলেন অনেকেই। রাজারবাগের পুলিশেরা অতি তুচ্ছ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবল যুদ্ধ করেন, কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাধা দিতে পারেননি। এখানে এগারো শ পুলিশ ছিল। তার মধ্যে খুব কমই রক্ষা পেয়েছিলেন। বাকি সবাই নিহত হন। পুলিশ লাইনের একজন মহিলা সুইপার পরে সাক্ষী দিয়েছেন, পরের দিন থেকেই রাজারবাগ পরিণত হয় ধর্ষণকেন্দ্রে। বিভিন্ন বয়সের বাঙালি নারীদের—এমনকি বালিকাদের এনে এখানে ধর্ষণ করে তারপর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। এই মহিলাকেও উপর্যুপরি ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল। (তালুকদার, ১৯৯১)
প্রসঙ্গত বলা দরকার, ধর্ষণের ব্যাপারে পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশেষ উত্সাহী ছিল। তাদের বোঝানো হয়েছিল যে, এ হচ্ছে কাফের নিধনের জন্য ধর্মযুদ্ধ অর্থাত্ জেহাদ। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী জেহাদের মালামাল এবং নারীরা তাদের জন্য ‘হালাল’। কাজেই নয় মাস ধরে লাখ লাখ বাঙালি বালিকা, কিশোরী, যুবতী এবং মধ্যবয়সী নারীদের উপর্যুপরি ধর্ষণ করতে তারা বিবেকের কোনো দংশন অনুভব করেনি। জেনারেলরাও বাদ যাননি। নিয়াজি যেমন—সালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে জেনারেল খাদিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কখন তুমি তোমার রক্ষিতাদের আমার হাতে দিচ্ছ?’ সালিক এও স্বীকার করেছেন, ধর্ষণের বহু ঘটনা ঘটেছিল এবং এ জন্য নয়জন জওয়ানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। (সালিক, ১৯৮৮)
ঢাকায় কী ভয়ানক হামলা হয়েছিল তার বর্ণনা দেশি-বিদেশি অনেকেইে দিয়েছেন। এই হামলার ফলে কী ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল, তারও। সরকারি হিসাবে বলা হয়েছিল ৪০ জন নিহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর অফিসারদের মতে, এক শ। (সালিক, ১৯৭৬) সায়মন ড্রিং ব্যাংকক থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলেন, ঢাকায় সাত হাজার, দেশের অন্যান্য জায়গায় ১৫ হাজার। (ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ) ২৭ মার্চের ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড-এর মতে ১০ হাজার। ২৮ মার্চের নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতে ১০ হাজার; এ দিনের ডেইলি এক্সপ্রেস-এর মতে ৪০ হাজার। ২৯ তারিখের সিডনি হেরাল্ড-এ লেখা হয়, ১০ হাজার থেকে এক লাখ। নিউইয়র্ক টাইস-এর ১ এপ্রিলের সংখ্যা প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর সময়ে নিহতদের সংখ্যা ৩৫ হাজার। বাঙালিরা লিখেছেন, হাজার হাজার। কিন্তু সত্যিকারভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি। তবে সব মিলে ঢাকায় যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার সবচেয়ে ভালো বর্ণনা দিয়েছেন লে. জে. নিয়াজি। তিনি লিখেছেন:
“২৫ মার্চের সেই সামরিক অভিযানের নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়।…মেজর জেনারেল রাও ফরমান তাঁর টেবিল ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল মাটি লাল করে দেওয়া হবে।’ বাঙালির রক্ত দিয়ে মাটি লাল করে দেওয়া হয়েছিল।” (নিয়াজি, ২০০৮)
সেনাদের এই ঝটিকা আক্রমণ ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা দেশের বড় শহরগুলোতে একই সঙ্গে তারা আক্রমণ শুরু করে। বিশেষ করে প্রবল যুদ্ধ শুরু হয় চট্টগ্রামে। কারণ, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রসদ আসার এটাই ছিল একমাত্র পথ। সে পথ খোলা রাখাটা ছিল তাদের অগ্রাধিকার। অন্যান্য শহরে সেনাদের বিশেষ লক্ষ্য ছিলেন ছাত্র-শিক্ষক এবং হিন্দুরা।
বাঙালিরা পঁচিশের রাতে অতর্কিত হামলার কোনো জবাব দিতে না পারলেও পরের দিন থেকে পাকিস্তানি সেনারা কিছু বাধার মুখোমুখি হয়। বাঙালি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় এই হত্যাযজ্ঞে বাধা দেন। তাঁদের বেশি অস্ত্রশস্ত্র ছিল না; লড়াই করার জন্যে তাঁদের কেউ আদেশও দেননি; কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁরা যুদ্ধ শুরু করেন, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে যাঁরা ছিলেন—জেলা শহরগুলোতে ও সীমান্তে। ‘যার যা কিছু ছিল’ তা নিয়ে ইপিআরের জওয়ান, পুলিশ, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষেরা বাধা দিতে থাকেন পাকিস্তানি বাহিনীকে।

 

ভিয়েতনামে ভ্রমণ: সম্রাটের সমাধি – মঈনুস সুলতান December 4, 2009

Filed under: History(ইতিহাস) — rezowan @ 3:48 pm

মঁশিয়ো বনোঁয়া চাকাওয়ালা ছোট্ট স্যুটকেসটি টেনে নিয়ে যান। আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি, কিন্তু তিনি এখন কোন দিকে তাকাচ্ছেন না। অতঃপর বনোঁয়া সমাধি-চত্বরের নির্জনতম কোণে এসে- কি একটা কৌশলে তার স্যুটকেসটিকে ট্যান্ডে রূপান্তরিত করেন। মনে হয় ট্যান্ডের উপর দূর দর্শনের জন্য ল্যান্স ফ্যান্স কিছু লাগিয়ে তিনি এখন সমাধি-সৌধের দিকে ফোকাস্ করছেন। হয়তো বনোঁয়া বেশ কয়েক শতাব্দীর পুরানো সৌধটির ঈশান কোণাভিমুখে হেলে পড়াটুকু সার্ভে করে নিচ্ছেন। এতদূর থেকে সঠিক করে কিছু বলা যায় না। মঁশিয়ো বনোঁয়ার সাথে মাত্র গেল সন্ধ্যায় আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পুরাতাত্ত্বিক স্মৃতিময় শহর হোয়ের মাঝারি মানের সরাইখানায় আমরা তার প্রতিবেশী হিসাবে আছি। মঁশিয়ো মনুমেন্ট ওয়াচ্ নামক একটি আন্তর্জাতিক এন,জি,ও’র ভ্রাম্যমাণ কর্মচারী রূপে ভিয়েতনাম এসেছেন। যেহেতু আমি ও হলেন আন্তর্জাতিক এইড্ এজেন্সিতে কাজ করে থাকি তাই বনোঁয়ার সাথে খোশ্ আড্ডায় লিপ্ত হতে আমাদের বিলম্ব হয় না। বনোঁয়া চুটিয়ে গল্প করতে ভালোবাসেন। প্রশিক্ষণে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার এ প্রায় বৃদ্ধ ফ্রেঞ্চ ইন্দোচায়নার কলোনী গোটানোর বছর সর্ব প্রথম ভিয়েতনামে আসেন আর্কিওলজি বিভাগে কাজ নিয়ে। সে থেকে অদ্যাবধি তিনি ভিয়েতনামে এসেছেন প্রায় বার বিশেক। ভিয়েতনামের ইতিহাসটিও বনোঁয়া পাঠ করেছেন রীতিমত আগ্রহ নিয়ে। আমরা সম্রাটের সমাধি সৌধে এসে এ বিষয়ে বিশেষ কিছু না জেনে বুদ্ধিভিত্তিক বিভ্রান্তির মাঝে আছি। ইচ্ছা হয় বনোয়াঁর সাথে এ নিয়ে কিঞ্চিৎ কথাবার্তা বলে প্রেক্ষাপটটি জেনে নেই। কিন্তু মঁশিয়ো তার কাজে রীতিমত মগ্ন হয়ে আছেন।

হলেনের উদ্যোগ নেয়ার স্বভাব আছে, উপরন্তু বিদেশ বিভুঁই-এ দরকার পড়লে তার চেচাঁমেচিতেও আপত্তি কিছু নেই। সে দ্রুত পায়ে পর্যবেক্ষণরত বনোঁয়ার দিকে এগিয়ে যায়। তার শ্রবণ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে বলে, ‘মঁশিয়ো, উই আর হিয়ার, ইফ্ ইউ উড্ লাইক টু কাম্ এন্ড জয়েন আস্।’ বনোঁয়া সার্ভে-কর্ম থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে হাত নেড়ে সমতি জানান। হলেন ফিরে এলে পর আমরা কৃত্তিম হ্রদের উপর বিস্তৃত সেঁতুর দিকে হাঁটি। পুলটির দিকে তাকালে মনে হয় পানির উপর ভাস্ছে তিনটি বন্ধনী। আমরা এসে এর নীচু তবে প্রশস্ত রেলিং-এ বসি। অল্প দূরের রাঁধাচূড়া গাছে সূর্যালোক হলুদ কুসুমে সোনালি হয়ে প্রতিফলিত হয়। গাছটি তার ঝরা ফুল ও দুপুর বেলার তীব্র উজ্জ্বলতা নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাজরি তার ম্যাগনেফায়িং গ্লাস নিয়ে ওখানে চলে যায়। আমাদের ছোট্ট মেয়েটি আতশি কাঁচ দিয়ে ঝরা ফুলের পাপড়িতে খুঁজে চলমান পিঁপড়া। হ্রদের উপর বসে থেকে থেকে আমাদের ভেতর যেন জলের প্রতিচ্ছায়া ভাসে। বন্ধনী ব্রীজের দু’ধারে প্রসারিত কৃতিম জলাশয়কে কিংবদন্তীর কোন এক মরালের উড্ডীন ডানা বলে ভ্রম হয়। জলের বর্ণ এখানে কালচে গভীর, তার উপর ভাসে হালকা পীতাভ্ সর। আমরা তন্ময় হয়ে পদে“র সবুজ পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। কাজরি গাছের তল থেকে ফিরে এসে আতশি কাঁচ রেখে তার শিশুতোষ বাইনোকুলার নিয়ে ভিন্ন দিকে হাঁটে। ওদিকে টি-বোশের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু ঝোপঝাড়। সে এখন একটি ঝোপের আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে দিগন্তের দিকে। আমরা খেয়াল করে দেখি-রাশি রাশি মেঘের ছত্রছায়ায় মেদুর হয়ে ফুটে আছে নীল পাহাড়ের রেখা। মনে মনে ভাবি-ভিয়েতনামের রাজাধিরাজ অন্তিম শয়ানের জন্য জায়গাটি নির্বাচন করেছেন তোফা। মঁশিয়ো বনোঁয়াকে স্যুটকেসসহ এদিকে আসতে দেখা যায়।

সার্ভে করে মনে হলো মঁশিয়ো সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এসেই অনুযোগ করে বলেন, ‘এ মনুমেন্টটি এন্ডেনজারড্ হয়ে গেলো। মনে হয় না সৌধটি আরো বছর পঁচিশেক টিকবে বলে।’ হলেন আগ্রহ নিয়ে বলে, ‘বনোঁয়া ভিয়েতনামের সম্রাট সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন?’ মঁশিয়ো স্যুটকেসের উপর কনুই রেখে গল্প বলার জন্য তৈরী হন। তিনি জানান, ‘সম্রাট মধ্য জামানার স্ট্যান্ডার্ডে শাসক হিসাবে খারাপ ছিলেন না। তবে তার প্রকৃতি ছিল বিচিত্র রকমের বিলাসী। ভোরবেলা শিশিরের জমানো জলে পদ“ফুলের নির্যাস মেশানো চা খেতে ভালোবাসতেন। তার মহিষী ও উপপতœীতের সংখ্যা ছিল অগণিত। কিন্তু নারীদের সকলেই ব্যর্থ হন সন্তানের জন্ম দানে। রাজধানীতে রাজনৈতিক ডামাডোল তীব্র হলে প্রায়ই সম্রাট এখানে এসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে লেকের জলে নাও বেয়ে সময় কাটাতেন। জীবনে রচনা করেছেন সহস্রাধিক কবিতা ও একটি চমৎকার ডায়েরী। মৃত্যুর প্রায় তিরিশ বছর আগে এ স্থানটি নির্বাচন করেন অন্তিম শয্যার জন্য।’ হলেন আরো জানতে চায়, ‘মঁশিয়ো সম্রাটের কবিতাগুলো পড়েছেন কি?’ বনোঁয়া ঈষৎ হেসে বলেন, ‘ডায়েরীর কিয়দংশ ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। রচনাটি রীতিমত ইন্টারেস্টিং। রাজত্বের শেষ দিকে তার হেরেমের নারীকুলের উপর তিনি রীতিমত ত্যক্তবিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন রাজ্য শাসনের চেয়েও অনেক জটিল কাজ এ মেয়েগুলোর কোন্দল মেটানো।’ এ পর্যন্ত বলে বনোঁয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘চল তোমাদের সম্রাটের লেখা কবিতার কিছু ক্যালিওগ্রাফ্ দেখাই।’ কাজরি পাতায় বোনা মাথাইল হাতে ছুটে এসে আমাদের বলে, ‘লুক্, দিস ওমেন গিভ মি দিস হ্যাট। ক্যান আই হ্যাভ ইট?’ মাথাইলের উপর রেশমের সুতা দিয়ে ফুল পাতার নকশা আঁকা। বনোঁয়া তার হাত থেকে মাথাইলটি নিয়ে আমাদের পরখ করার জন্য সূর্যালোকে তুলে ধরেন। ফুল পাতার মোটিফের আড়ালে ভিয়েতনামিজ্ লেখনীর বিচিত্র সব কারেক্টার ফুটে ওঠে। বনোঁয়া আমাদের জানান, ‘এ সম্রাটের রাজত্বে শিল্পকলার প্রভূত উন্নতি হয়। কুটির শিল্পীরা পাতার মাথাইলে কবিতার ছত্র সুঁই দিয়ে আঁকে। প্রথাটি আজকের দিন পর্যন্ত চালু আছে।’ বিষয়টি আমাদের কাছে অভিনব লাগে। হলেন কাজরির সাথে চলে যায় রাঁধাচূড়া গাছের নীচে দাঁড়ানো- কাঁধে দড়ি দিয়ে ঝুলানো এক গাদা পদ্য লেখা মাথাইলসহ তরুণীর কাছে। নতমুখি নারীটি কিছুতেই কাজরিকে দেয়া মাথাইলের জন্য দাম নেবে না। অবশেষে হলেন তার কাছ থেকে আরো দু’টি বড় মাপের মাথাইল কিনে আনে। আমি মনে মনে ভাবি ভিয়েতনামিজ্ ভাষা জানেন এমন কাউকে খুঁজে পেলে কবিতাগুলো তর্জমা করে শোনা যেত।

যে পাহাড়টির উপর সম্রাটের স“ৃতিমন্দির তার আকার তিমি মাছের দেহের মতো। এখানে ভবন একাধিক। মঁশিয়ো বনোঁয়ার ভাষ্যানুযায়ী- একটি গৃহে বসে সম্রাট বছরের পর বছর ধরে তার কবরস্থানের নকশা করেন। অন্য ঘরটি নির্দিষ্ট ছিল মানসিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য। এখানে রাজাধিরাজ পদ্য লিখতেন, তুলি দিয়ে আঁকতেন হস্তলিপি, পর্যবেক্ষণ করতেন আসমানী মানচিত্রে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ। এ পর্যন্ত শুনে হলেন মন্তব্য করে-,‘তা সম্রাট রাজ্য শাসনের সময় পেতেন কখন?’ বনোঁয়া সরাসরি তার মন্তব্যের জবাব না দিয়ে বলেন,‘ এসব ছাড়াও সম্রাটকে সঙ্গ দিতে হতো শতাধিক নারীর।’ আমরা মূল সৌধ ভবনের কাছে চলে আসি। বনোঁয়া ভবনটি দেখিয়ে বলেন, ‘এখানে এক সময় সম্রাট স্বয়ং বাস করতেন। মৃত্যুর পর অট্টালিকাটিকে স“ৃতিমন্দিরে রূপান্তরিত করা হয়। এখানকার দেওয়ালে এখনো ঝুলছে তার হাতের ক্যালিওগ্রাফ করা কবিতার পংক্তি।’ এ পর্যন্ত বলে মঁশিয়ো হাতের ইশারায় ইমারতের প্রবেশপথ দেখিয়ে ‘এক্সুজ আমওয়া’ বলে চলে যান দালানের দেয়াল পরীক্ষা করতে। আমি, হলেন ও কাজরি স“ৃতি মন্দিরে প্রবেশের সময় দেখি বনোঁয়া একটি কাঠি হাতে ভবনের দেওয়ালে ঠক্ ঠক্ আওয়াজ করে ভেতরে বোধকরি কতটুকু ফাঁপা হয়েছে তার জরিপ করে নিচ্ছেন।

সৌধের মস্ত হল কক্ষে কালো কাঠের সারি সারি পিলার। ছাদ থেকে ঝুল্ছে সিল্কের ট্যাসেল দুলানো কারুকাজ করা ভিয়েতনামী লণ্ঠন। বাতিগুলোর জড়োয়া শেডের নীচে একটি করে টাংগানো ম্লান হয়ে আসা সোনালি ফ্রেম। ফ্রেমগুলোর ভেতরে কবিতার ক্যালিওগ্রাফ। পদ্য গুলো পড়া যায় না বটে তবে প্রতিটি কবিতার পাশে পাশে আঁকা ইলাবরেট্ চিত্র। আমরা ঘুরে ঘুরে চিত্রগুলোর ডিটেল লক্ষ্য করি। মনে হয় স্বর্গ ও নরকের বর্ণনা সিল্কের জমিনে রঙ-তুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে। কোথাও কিংবদন্তীর বিকট দর্শন দৈত্য, খিল খিল হাসছে ক্ষীণকটি পরী। কোন কোন চিত্রের রেখায় প্রাসাদ, তরবারী হাতে যোদ্ধা, অশ¡ ও দূরাগত পর্বতের পানে উড়ে চলা মরালের ঝাঁক আমাদের বিসি“ত করে। আমরা কবিতার রস বা ছবির বিষয়বস্তুর সাথে কমিউনিকেট করতে পারি না, কিন্তু দৃশ্যগুলো থেকে সহসা চোখ ফেরানো কঠিন হয়। নরম কাদায় মাছের সন্তরণ ছাপের মতো বাঁধানো ফ্রেমগুলোর ভিজুয়্যাল ইমপ্যাক্ট আমাদের মনে গাঢ় হয়ে বসে যেতে থাকে। সিল্কের লণ্ঠন ঝুলা কক্ষটির আলো আঁধারি থেকে আমরা সহসা বেরিয়ে আসতে পারি না।

এত যুগ পরেও সম্রাট কিন্তু তার স“ৃতি মন্দিরে তেমন একটা অবহেলিত না। তার কীর্তি দেখতে এখানে সমবেত হয় পঞ্চজন পর্যটকের। নীল সিরামিকের বিশাল সব ফুলদানীতে থোকা থোকা রজনী গন্ধা ও পদ“ ফুল সৌরভ ছড়ায়। পিতলে তৈরী সারসাকৃতির বিরাট সব বাতিদানে রাশি রাশি মোম রহস্যময় আলো ছড়ায়। এ আলো আঁধারিতে ধুসর সাফারি স্যুট পরা রূপালি চুলের এক বুড়ো লোক হুইল চেয়ারে চড়ে একটি স্তম্ভ থেকে চলে যান অন্য স্তম্ভের কাছে। মিনিস্কার্ট পরা অতি অল্প বয়সী যুবতী তার হুইল চেয়ারটি ঠেলে নিয়ে যায়। বৃদ্ধ মনে হয় কপাল কুঁচকিয়ে মনযোগ দিয়ে একটি ফ্রেমের কবিতা পড়েন। যুবতীটি নতমুখে তার বেগুনী বর্ণের দীর্ঘ নখ নিয়ে খেলা করে। বৃদ্ধ তার কাছে কিছু একটা চাইলে সে বের করে দেয় অপেরা গ্লাস। তাতেও বোধ করি বুড়োর কবিতা পাঠে বিশেষ যুৎ হয় না। মেয়েটি এবার নীচু হয়ে ব্যাগ থেকে বের করে আনে চার্জার লাইট। সে লাইটটি জ্বেলে ফ্রেমের কাছে ধরে। ফ্রেমে প্রতিফলিত হয়ে আলোর কণিকা মেয়েটির বেগুনী বর্ণের ঠোঁটে খেলা করে। বুড়ো বিড় বিড় করে কবিতার পাঠোদ্ধার করেন। যুবতী চার্জার লাইট নামিয়ে আনলে হঠাৎ আলোয় তার অনাচ্ছাদিত স্তনরেখা দীপ্যমান হয়ে ওঠে। বুড়ো ছোট্ট নোটবুকে খস্ খস্ করে কিছু লিখে চলেন। আমি মনে মনে আন্দাজ করতে চেষ্টা করি বুড়োর সাথে তরুণীটির সম্পর্ক। ভাবি সাফারি স্যুট পরা মানুষটি কোন বিখ্যাত লেখক অথবা অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ কিনা? নাকি নগুয়েন রাজ বংশের অধস্তন কোন উত্তর পুরুষ চুপিসারে চলে এসেছেন পূর্ব পুরুষের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে? আমার এলোমেলো ভাবনা স্রোতে ছেদ পড়ে। দেখি মাথাইল বিক্রেতা মেয়েটি এসে স“ৃতিমন্দিরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে।

তার হাতে রাইস ক্রেকার ও একটি বেলুন। তাকে দেখা মাত্রই কাজরি পলকের সান্নিধ্যে ছুটে যাওয়া কুকুর ছানার মতো ধাবিত হয়। তাদের ভাষাহীন বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে মনে হয় আমাদের মেয়েটি এতক্ষণ রাইস ক্রেকার খাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল। কাজরি ফেরিওয়ালা নারীর সাথে বেলুন উড়িয়ে হাঁটছে দেখে আমাদের স“ৃতিমন্দির দর্শনের এখানেই ইতি পড়ে।

পাহাড় তলে বৃত্তাকার হ্রদ। ফেরিওয়ালা মেয়েটি আধশুকনো পাতায় নৌকা বানায়। কাজরি নাও এর গলুইতে ঝরা চম্পা ফুল রেখে তা লেকে ভাসাচ্ছে। পানিতে মৃদু হাওয়ায় পদ“ ফুলের বৃহৎ পাতাগুলো দোলে। একটি পাতা ঈষৎ ডুবে গিয়ে ভেসে উঠলে ভেতরে রূপালি জল অশ্রুর মতো টলমল করে উঠে। হ্রদের মধ্যখানে কৃত্রিম দ্বীপাণু। জলে ভরা এ ভাসমান ক্ষুদ্র স্থলখন্ডে বহু যুগের পুরানো রক্ ফর্মেশন। আমি হলেনকে ক্যামেরা হাতে পানির দিকে দিশা ধরে তাকিয়ে থাকতে দেখি। পানির সারফেসে সাবলিল গতিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে ছোট্ট মাকড়শার মতো দেখতে অগুণতি জলপোকা। হলেন তার মনযোগ গাঢ় করে পোকাগুলোর একটিতে ফোকাস্ করতে চেষ্টা করে। আমি অল্প হেঁটে বৃত্তময় হ্রদের অন্য পাড়ে এসে পড়ি। দ্বীপাণুর জলভাগের কাছাকাছি গর্ত থেকে উঁকি দেয় মাছরাঙার উৎসুক চোখ।

আমি কাঠে তৈরী বোটহাউসের কাছে এসে দাঁড়াই। অনেক কালের পুরানো এ কুটিরের খোলা ডেক্ চলে গেছে ঠিক জলের উপর। কাঠের বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ির সর্বনিম্ন স্তরে বসে দু’টি কিশোরী। মেয়ে দু’টি পানিতে পা ডুবিয়ে শরীর দুলিয়ে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে বিড় বিড় করে কিছু বলে- অজানা কোন কৈশোরতোষ খেলা খেলে যায়। খেলাটির এক পর্যায়ে তারা ভেজা পায়ে পানি ছিটিয়ে পরস্পরের হাতে হাতে তালি বাজিয়ে খিল্ খিল্ করে হেসে ওঠে। হ্রদের জলে মাছের ঘাই এর মতো হাসির গমকে তাদের বুকে অর্ধস্ফুট স্তনরেখা দোলে। আমি হাঁটতে হাঁটতে তাদের পেছনভাগে চলে আসি। তাদের পদ-তাড়নে খানিক দূরে একটি পদ“ পাতা জলে মুখ মোছে। দ্বীপাণুর আড়াল থেকে কাজরির ভাসানো নাওখানা চাঁপা ফুলের সওদা নিয়ে এগিয়ে আসে। খানিক পরেই- কাজরি, হলেন ও ফেরিওয়ালা নারীকে এদিক পানে আসতে দেখা যায়। আমি আবার ক্ষণিকের জন্য ঘাটে বসা বালিকা দু’টির দিকে তাকাই। তীব্র সূর্যালোকে তাদের কাঁধে ঝুলানো মাথাইলে আঁকা কবিতার রঙীন পংক্তিগুলো রেডিয়ামের মতো সবুজাভ্ দ্যুতি ছড়ায়। আমরা আবার পারিবারিক ভাবে মিলিত হয়ে সম্রাটের কবরস্থলের দিকে যেতে যেতে ডাঙ্গায় ভেসে ওঠা মৎস্য কন্যা যুগলের মতো কিশোরী দু’টিকে পায়ে আলোড়ন তোলে জল ছিটাতে দেখি। ঢেউ এর বৃত্তাকার রেখা হ্রদের জলে বিস্তৃত হয়। চাঁপা ফুল ভরা পাতার নাওখানা তীব্র হয়ে দোলে। তার আশেপাশে চলমান জল পোকাগুলো তাদের অদৃশ্য পদ সঞ্চালনে যেন পরমাণুর রেখাচিত্র এঁকে চলে।

আমরা এবার আঁকাবাঁকা হ্রদের পাড় ধরে বৃহৎ সব গাছের ছায়ায় হাঁটি। কোথাও কোথাও জলভাগ পদ“ পাতায় একদম সবুজ হয়ে আছে। আমরা আধবোঁজা গোলাপি সব পদ“ ফুলের আশে পাশে বেশ ক’টি বককে ঝিম্ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমাদের পথরেখা পাথুরে সিঁড়িতে রূপান্তরিত হয়। আমরা পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে দেখি খানিক সামনে ঈষৎ তফাতে সাফারি স্যুট্ পরা বৃদ্ধটিও চলেছেন রাজ সমাধি পানে। তার হুইল চেয়ারখানা বয়ে নিয়ে চলেছে দু’টি জোওয়ান মর্দ। বুড়োটি চাকাওয়ালা চেয়ারে বসে মেঘের দিকে তাকিয়ে ফুঁকে চলেছেন মস্ত এক সিগার। তার পিছন পিছন হাই হীল পরে চড়াই উৎরাই ভাঙ্গছে মিনিস্কার্ট পরা যুবতী। তার হাঁটার ভঙ্গিতে ফুটছে তীব্র রকমের লীলায়িত লাস্য। মনে হচ্ছে তার দুদোল্যমান নিতম্ব যেন গোলাকার জোড়া ড্রাম হয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে সংবেদনের তুমুল বাদ্য। আমি ও হলেন এবার খোলাখুলি বৃদ্ধের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করি। আমরা অনুমান করি- মেয়েটি হয়তো বৃদ্ধের কনভেন্টে পড়া নাতনি ফাতনি হলেও হতে পারে। কাজরি শিশুতোষ ক্যামেরায় হুইল চেয়ারের ছবি তুলতে চাইলে হলেন তাকে নিষেধ করে।

আমরা ‘অনার কোর্ট ইয়ার্ড’ বলে খ্যাত বাঁধানো চত্বরে আসি। এখানে বৃক্ষ ছায়ায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাথরে গড়া পাত্রমিত্র বা ম্যান্ডারিনের সারিবদ্ধ মূর্তি। মূর্তিগুলোর চোখে মুখের এক্সপ্রেশন দেখে মনে হয় তারা যেন রাজাধিরাজের আগমন প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের পাশাপাশি রাজসিক বাহন হিসাবে প্রস্তুত প্রস্তরের ক্ষয়িষ্ণু হস্তি ও অশ¡। মঁশিয়ো বনোঁয়াকে দেখা যায় জ্যামিতির ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে- হাতি, ঘোড়া ও ওমরাহরা কয়েক শতাব্দীতে ঠিক কত ডিগ্রি হেলে পড়েছে তার মাপজোক নিতে। মঁশিয়ো তার ‘মনুমেন্ট ওয়াচ্’ নিয়ে ব্যস্থ হয়ে আছেন বটে- তবে তার কাছ থেকে ওমরাহদের মূর্তিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানতে ইচ্ছা হয়। বাসনাটি হলেনকে বলি। সে এগিয়ে গিয়ে সমীক্ষারত বনোঁয়াকে সম্বোধন করে বলে, ‘মঁশিয়ো, কুড্ ইউ টেল্ আস্ এ্য লিটল মোর এবাউট দিজ্ ট্যাচুস্?’ বনোঁয়া বোধ করি- এ ধরনের সওয়ালের প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি মাপজোক থেকে চোখ তুলে বলেন, ‘মূর্তিগুলো সব সম্রাটের পারিষদবর্গের অনুকৃতি বিশেষ। তবে যেহেতু জাঁহাপনা খাটো ছিলেন তাই ওমরাহের মূর্তিগুলো সে অনুপাতে খর্বাকৃতি করে গড়া হয়েছে।’ মঁশিয়ো আবার এন্ডেন্জারড্ মনুমেন্টের মূল্যায়নে লিপ্ত হলে- খোশ্গল্প জমার কোন সম্ভাবনা নেই দেখে আমরা ধীর লয়ে ‘অনার কোর্ট ইয়ার্ডটি’ অতিক্রম করে যাই।

কবরস্থলের প্রবেশ মুখে আরেকটি আংগিনা। এখানে অর্ধচন্দ্রাকৃতির মিনিয়েচার লেকের পাড়ে সিরামিকে গোড়া বাঁধানো দু’টি প্রাচীন বকুলের গাছ। স্থানটির নির্জন মায়া মুহূর্তের জন্য আমাদের আনমনা করে দেয়। আমরা সিঁড়ি ভেঙ্গে চলে আসি ঈষৎ উপরের স্তরে। এখানে পেল্লায় একটি কচ্ছপের পিঠে দাঁড় করানো প্রকান্ড পাথরের ফলক বা ট্যাবলেট। সাফারী স্যুট পরা বুড়োকেও দেখা যায় অপেরা গ্লাস দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফলকে লেখা অনুশাসনটি পড়ছেন। যেহেতু প্রস্তরলিপির ভাষান্তর আমাদের সাধ্যাতীত- তাই আমরা মনে মনে বনোঁয়ার আগমনের প্রত্যাশা করি। আন্দাজ করি হয়তো ফলকে সম্রাটের কীর্তি কলাপের বর্ণনা আছে। বুড়ো নোট্ নেয়া শেষ করে তার সাথের যুবতীর দিকে তাকান। মেয়েটি তার ব্লাউজের ভেতর থেকে লাইটার বের করে বুড়োর আধ পোড়া সিগার ধরিয়ে দেয়। শিলালিপি পরিবাহি কচ্ছপের আংগিনা ভরে ওঠে বিরল তামাকের মুখরোচক গন্ধে। অবশেষে আমরা সম্রাটের কবরে এসে ঢুকি। স্থানটি বৃত্তাকারে ল্যান্ডস্কেপ্ করা বলে অর্ধচন্দ্রাকৃতির হ্রদের প্রেক্ষাপটে উদিত সূর্যের গোলাকার আকৃতি ফুটে। বেশ ক’টি চাঁপা ফুলের গাছের আলোছায়ায় তুলনামূলকভাবে সাদামাটা কবরটি। চাকাওয়ালা স্যুটকেস টেনে টেনে বনোঁয়া এসে আমাদের সাথে যোগ দেন। তিনি তার চোখমুখ রহস্যময় করে নীচু গলায় হলেনকে বলেন, ‘এ কবরে লাশফাস কিছু নেই। সম্রাটের উইলানুযায়ী তাকে গোপন স্থানে সমাধিস্থ করা হয়। তার গোর যাতে ভবিষ্যতে ধনরতেœর জন্য লুণ্ঠিত না হয় এ জন্য কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। যে একশত দশজন রাজভৃত্য তার লাশ সমাহিত করে- তাদের কাছ থেকে যাতে কথা বের হয়ে না পড়ে- এর জন্য এদেরকে তৎক্ষণাৎ শিরèেদ করা হয়। এখানে আমরা যা দেখছি তা হচ্ছে সম্রাটের সমাধির রেপ্লিকা। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তেস্টিক্রিয়া হয়, কবরে নামানো হয় ডালাবদ্ধ কফিন। আসল লাশটি কোথায় সমাধিস্থ তা এখনো কোন পুরাতাত্ত্বিক বা ধনরতœ সন্ধানী খুঁজে বের করতে পারেনি।’ মঁশিয়োর মুখে কাহিনীটি শুনে আমরা সহসা নির্বাক হয়ে পড়ি। মনে মনে ভাবি গল্পটি কী ইতিহাস নির্ভর নাকি নিছক কল্পনাপ্রসূত কিংবদন্তী বিশেষ? কাজরি জানতে চায়, ‘হোয়াই দ্যা রাজা কিল্ড হিস সারভেন্টস্?’ তীব্র রোদে আপাতঃ নকল সমাধির উপর ঝরে একটি দু’টি চাঁপা ফুল। আমরা ছোট্ট মেয়েটির কাছে নগুয়েন বংশের নাম না জানা এক সম্রাটের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিমশিম খাই। মনে হয় সারাদিন কাদামাটি ছেনে, চমৎকার মূর্তিটি গড়ার পর বনোঁয়ার গল্প যেন দৈত্য হয়ে এসে মট্ করে ভাস্কর্যটির ঘাড় মটকে দিল।

 

কলম্বাস December 4, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),People — rezowan @ 3:45 pm

ভারতবর্ষ আবিস্কার করতে গিয়ে পশ্চিমে যাত্রা করে ক্রিটোফার কলম্বাস নতুন বিশ্ব অর্থাৎ আমেরিকা আবিস্কার করে ফেলেন এ কথা কম বেশী সবার জানা। ১৪৯২ সালে স্পেনের রানী ইসাবেলার কাছ থেকে পিনটা, নিনা ও সান্তা সারিয়া নামের তিনটি জাহাজ নিয়ে সাগর অভিযান শুরু করেন কলম্বাস। কলম্বাস তার তরী ভাসিয়েছিলেন সিপাঙ্গু বা তখনকার জাপান দেশটিতে পৌছাতে। তখন এই এলাকার নাম ছিল ইন্ডিজ নামে। একজন দক্ষ নাবিক হিসেবে কলম্বাসের খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। তিনিই প্রথম নৌ অধিপতি ছিলেন, ইতিহাসবিদ বার্তোলোমো ডি লা কাসাস কলম্বাস সর্ম্পকে মন্তব্য করেছেন তাঁর সমুদ্র অভিযানের অর্ধ শতাব্দী পরে। তিনিই প্রথম আবিস্কারের নেশার আলোক বর্তিকা জ্বেলে দেন যা পরবর্তীতে আবিস্কারদের জন্য ছিল পাথেয় স্বরূপ।

কিন্তু, ষোড়শ শতাব্দীর অনেক ইতিহাস গ্রন্থে কলম্বাসের নাম প্রায় উল্লেখ্য করাই হয়নি। ওই সময় অভিযানকারী এবং আবিস্কারক আমেরিগো ভেসপুচি, ভাস্কো ডা গামা ও ম্যাগেলানের জয় জয়কার। তবে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কলম্বাস যেন তাঁর ছায়া থেকে আবার কায়া হয়ে ওঠেন। পূর্ণজন্ম ঘটে তার। তবে মানুষ এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে পেটরানিক চরিত্র হিসেবেই যেন তাকে বেশি অংকন করা হয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে নিয়ে বির্তকের কোন শেষ নেই। নাবিক হিসেবে তার দক্ষতা নিয়ে কোন সন্দেহ না থাকলেও অনেকেই তাকে সাম্রাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেন। ইতিহাস ঘেঁটে যতদূর জানা যায় কলম্বাসের জন্ম ১৪৫১ খ্রীষ্টাব্দে জোনায়াতে এক উল তাঁতির ঘরে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। কলম্বাসের পরিবার ছিল খীষ্টান সম্প্রদায়ের। তিনি যখন জন্মেছিলেন তখন অনেক মানুষই ভ্যাগান্বেষনে সমুদ্র পথে পূর্বে পাড়ি জমাত। কলম্বাসেরও অন্য সবার মতো আকস্মিক ভাবেই তার পর্তুগাল যাবার সুযোগ ঘটে যায়। তরুন বয়সের ওই সমুদ্র যাত্রা তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর একটি অভিজ্ঞতা। পুর্তগীজ রমনী ফেলিপা পেরেস্ত্রেলো ইমোনিজকে বিয়ে করার সুবাদে কলম্বাস স্যাডিয়ারা দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে আসেন। ওই সময় তিনি আটলান্টিক মহাসাগরের উপর প্রচুর পড়াশোনা করেন। তখন পশ্চিমে যাত্রার জন্য মানুষ ছিল উদগ্রীব। বিভিন্ন জনের কাছে পশ্চিমের উপর প্রচুর জনশুনে তিনি ওদিকে যাত্রার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। পশ্চিমে অভিযানের জন্য তিনি একটা পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু, পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জন তাঁর সেই পরিকল্পনা অগ্রাহ্য করেন।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশুপুত্র ডিয়েগোকে নিয়ে কলম্বাস ১৪৮৪ খ্রীষ্টাব্দে কলম্বাস স্পেনে চলে আসেন। কিন্তু, আট বছর চেষ্টা করেও স্পেনের রাজাকে সমুদ্র যাত্রায় সহায়তা করার জন্য রাজী করাতে পারেননি।

এর কিছুদিন পর কলম্বাস উত্তর উপকূলের পা ইজাবেলার কলোনি স্থাপন করেন। কলম্বাস অত্যন্ত জেদী স্বভাবের ছিলেন। তার কথা অমান্য করার সাহস কারও ছিল না। একবার তিনি তার মাঝি মাল্লোদের দিয়ে স্বীকার করতে বাধ্য করান যে, কিউবা এশিয়ার একটা দেশ। কলম্বাস খুব খোলা মনের মানুষ ছিলেন না। ১৫০৬ সালে তিনি মারা যান। তবে কলম্বাস মানুষ হিসেবে যতই বির্তকিত হন না কেন, আমেরিকার মানুষ তাদের দেশের আবিস্কারক হিসেবে এই ব্যক্তিকে কোন দিনই বিস্মৃত হতে দেবে না

 

জাপানের সম্রাট আকিহিতো ও সম্রাজ্ঞী মিচিকো December 4, 2009

Filed under: History(ইতিহাস) — rezowan @ 1:28 pm
সম্রাট আকিহিতো ও সম্রাজ্ঞী মিচিকো
জাপানের রাজভবন দেখে মনে হয় বহুতল ভবন আর কংক্রিট-আসফাল্টের যত্রতত্র উপস্থিতির মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মরূদ্যান। রাজধানী টোকিওর প্রাণকেন্দ্র মারুনোউচির লাগোয়া এই রাজপ্রাসাদ। এর বিস্তৃত এলাকা নগরে কেবল মনোরম প্রকৃতিকেই ফিরিয়ে আনেনি, দেশের সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাসকেও তা নানাভাবে ধরে রেখেছে।

আড়াই হাজার বছরের নিরবচ্ছিন্ন বংশানুক্রমিক ধারা অনুসরণ করে সিংহাসনাধীন জাপানের বর্তমান সম্রাট আকিহিতো হচ্ছেন ইতিহাসের জীবন্ত এক সাক্ষী।
সেই ইতিহাসকে ধরে রাখার সযত্ন প্রয়াস হিসেবে টোকিওর রাজপ্রাসাদের আকার এবং গঠনের মধ্যেও ফুটে উঠেছে জাপানের সমৃদ্ধ অতীতের ধারা। রাজপ্রাসাদের বিশাল চত্বরের অধিকাংশ ভবনই জাপানি রীতি অনুসরণ করে তৈরি। এ কারণে এসব ভবন রাজধানীর আকাশচুম্বী দালানকোঠার তুলনায় আকারে খুবই ছোট। তা সত্ত্বেও রাজকীয় গাম্ভীর্য আর চমত্কার সৌন্দর্যের কোনো রকম ঘাটতি এসব ভবনের কোনোটিতেই নেই।
আর এ রকম সব ভবনকে ঘিরে তৈরি করা অসম্ভব সুন্দর নানা রকম বাগান ও যত্নের মধ্যে বেড়ে ওঠা গাছপালা সেই সৌন্দর্যে নিয়ে এসেছে সত্যিকার অর্থে রাজকীয় মহিমা। রাতের বেলায় নেই সেখানে আলোর কোনো রকম বাড়াবাড়ি। মারুনোউচি এলাকার উঁচু যেকোনো ভবন থেকে রাতের রাজপ্রাসাদের দিকে তাকালে রাজধানীর নিয়ন ঝলমলে আলোর বন্যার মাঝখানে দাঁড়ানো অন্ধকারে ডুবে থাকা এই বিশাল এলাকা দেখে অবাক হতে হয়।
জাপানের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সযত্নে ধরে রাখা এই রাজপ্রাসাদের অধিবাসীদের নিয়ে জনগণের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও তাতে কোনো রকম বাড়াবাড়ি নেই। এ কারণেই যেন জাপানের সম্রাট ও রাজপরিবারের সদস্যরা সার্বিকভাবে হয়ে উঠেছেন শ্রদ্ধার পাত্র—দূর থেকে যাঁদের সাক্ষাত্ পাওয়াকেই অনেকে খুব ভাগ্যবান মনে করে থাকেন।
শ্রদ্ধাভাজন সেই সম্রাট ও রাজপরিবারের অন্য সব সদস্যের সাক্ষাত্ লাভের এক দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল ১৩ নভেম্বর। সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাজপ্রাসাদে আয়োজিত বিশেষ এক স্মারক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ লাভ করেছিলাম।
নির্বাচিত অতিথিদের মধ্যে মন্ত্রিসভার সদস্য, সাংসদ, ব্যবসা-শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য-ক্রীড়াসহ নানা ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিরা ছিলেন। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের নেতাদেরও সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রথম আলোর প্রতিনিধি হিসেবে জাপানে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সভাপতি আমি। সেই সুবাদে আমন্ত্রিতদের দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ হলো আমারও।
ফলে দূর থেকেই কেবল সম্রাটের দেখা পাওয়া নয়, সম্রাটের সঙ্গে হাত মেলানো ও তাঁর সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কথা বলার সুযোগের দুয়ারও সেদিন খুলে গিয়েছিল।
ভাঙা জাপানি ভাষার জ্ঞান নিয়ে নিজের দুটি পরিচয়—প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব—তুলে ধরতেই পরম স্নেহে আমার হাত ধরে সম্রাট বললেন অতীতে দুবার তাঁর আমাদের দেশ ভ্রমণের কথা।
আমাকে যেটা অবাক করে দিয়েছিল তা হলো, বয়স সত্তরের ঘরের শেষ দিকে পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও তার প্রখর স্মৃতিশক্তি। যে শক্তি দিয়ে তাত্ক্ষণিক আমাদের ইতিহাসসংক্রান্ত কিছু কথা বললেন সম্রাট। বললেন, তাঁর প্রথম সফরের সময় আমাদের দেশটি পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল।
আমার অবাক হওয়ার পালা তখনো অবশ্য শেষ হয়নি।
এর পরই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের নেতা মুজিবুর রহমানকে আমার এখনো মনে আছে।’ জাপানের সম্রাট প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নেতা ও নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত্ করছেন। ফলে তাঁর স্মৃতিতে হাজার হাজার নাম নিশ্চয় স্তরের পর স্তর জুড়ে জমা হয়ে আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কর্ণধারদের প্রায় সবাই অন্ততপক্ষে একবার হলেও জাপানের সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে গেছেন। এত নামের মধ্যে থেকে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তেই শেখ মুজিবুর রহমানের নাম জাপান সম্রাটের মুখ থেকে শোনা আমার জন্য যেন ছিল এক অসাধারণ পাওয়া।
বাংলাদেশকে এতটা সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখার জন্য সম্রাটকে আমি তখন ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘আমাদের দেশের লোকজন আরও একবার তাঁর সাক্ষাতের সুযোগ পেলে যথার্থই আনন্দিত হবে।’
এখানে বলে নেওয়া দরকার যে সম্রাটের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মতো তৃতীয় কোনো ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। যেহেতু এটা রাজপ্রাসাদের আমন্ত্রণে যোগ দেওয়ার অনুষ্ঠান, তাই সম্রাট ও রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা নিজেরাই আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে সেখানে কথা বলেন।
সম্রাটের সঙ্গে কথা বলার পর বিশাল সেই রাজকীয় হলঘরের আরেক দিকে সম্রাজ্ঞীর সঙ্গেও আমার দেখা হয়ে যায়। সম্রাজ্ঞী মিচিকোও হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন এবং খুবই স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন তাঁর বাংলাদেশ ভ্রমণের কথা।
সম্রাটের পরিবারের আরও যাঁরা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন—যুবরাজ নোরিহিতো, যুবরাজ্ঞী মাসাকো, রাজপুত্র আকিশিনো ও তাঁর স্ত্রী প্রিন্সেস কিকো, সম্রাটের কাকা প্রিন্স মিকাসা ও পরিবারের আরও কয়েকজন নিকটাত্মীয়।
তাঁদের মধ্য যুবরাজ্ঞী মাসাকো নানা কারণে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়ে আসছেন। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম তাঁকে লেডি ডায়ানার প্রাচ্য-সংস্করণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে সেই তুলনা অনেকটাই অতিরঞ্জিত—পশ্চিমের রঙিন চশমা চোখে চাপিয়ে নিয়ে প্রাচ্যের দিকে আলোকপাত করার মতো। ফলে যুবরাজ্ঞী মাসাকো ব্যক্তি হিসেবে কেমন, তা জানার উত্সাহ সব সময়ই আমার মধ্যে ছিল। সেই চমত্কার সুযোগও সেদিন আমার মিলে যায়।
বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণে যে প্রশ্ন শুরুতে আমাকে তিনি করেছিলেন তা হলো, জাপান আমার কেমন লাগছে? আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘যে দেশের সম্রাজ্ঞী তিনি হতে যাচ্ছেন সে দেশটিকে আমার ভালো লাগারই কথা।’ সেই সঙ্গে তাঁকে বলতে ভুলিনি যে, বাংলাদেশের লোকজনের কাছে তাঁর নামটি খুবই পরিচিত এবং দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ তিনি করে নিতে পারলে আমরা তাতে আনন্দিত হব।
তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে সে চেষ্টা তিনি অবশ্যই করবেন। যুবরাজ্ঞীর সেই হাসিভরা মুখ কাছ থেকে দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগল, আমরা যা শুনছি তার মধ্যে কতটা বাস্তব, আর কতটাই বা অতিরঞ্জন?
আমন্ত্রিত অতিথিদের দলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়ুকিও হাতোইয়ামাসহ অন্তত আরও পাঁচজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদের নেতারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁদের সবার সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছিল। বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাবের সভাপতি হিসেবে ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রসঙ্গেও কারও কারও সঙ্গে আমি সেদিন কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী হাতোইয়ামা একদিন তাঁর সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রার উল্লেখ করে বলেছিলেন, সেই একই সফরে এশিয়ার পাঁচটি দেশে তিনি যাবেন। সময় ও সুযোগমতো বাংলাদেশ সফরের বিষয়টিও যে তাঁর ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত আছে, সেটা তিনি জানালেন।
অন্যদিকে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো বলেছিলেন, ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোয় জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় লিগের সভাপতি হিসেবে তেমন কার্যকর অবদান রাখা তাঁর পক্ষে এখন আর হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে।
ইদানীং দ্বিতীয় যে জাপানি রমণীকে নিয়ে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম কিছুটা বাড়াবাড়ি রকমের খবরাখবর প্রচার করে আসছে, তিনি হলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী মিইয়ুকি হাতোইয়ামা। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে সেই অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, প্রেসক্লাবের বিশেষ কোনো আয়োজনে উপস্থিত হয়ে সংবাদমাধ্যমের কৌতূহল নিরসনে তিনি যেন এগিয়ে আসেন। তিনি কথা দিয়েছেন, সময়মতো একদিন তিনি ক্লাবে অবশ্যই যাবেন। আমরা সেই অপেক্ষায় থাকব।
মনজুরুল হক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক।
টোকিও, ১৪ নভেম্বর ২০০৯
প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো‘য়

 

যেভাবে শুরু হলো যুদ্ধ December 3, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 7:45 pm

লিখেছেন মফিদুল হক ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য়

ভারতীয় বিমানবাহিনী বোমা ফেলছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে। ঘরের চাল থেকে তা দেখছে ঢাকাবাসী
ছবি: আনোয়ার হোসেন, ঢাকা ১৯৭১

৩ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের পশ্চিম সীমান্তের কতক শহরে হামলা চালিয়ে ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর নাজেহাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কেন ভারত আক্রমণ করে যুদ্ধের সূচনা ঘটাল, সেটা অনেকের কাছে বড় জিজ্ঞাসা হয়ে রয়েছে। এর আগে ভারত মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে সীমান্ত অতিক্রম করলেও তা ছিল সীমিত সংখ্যায় ও সীমিত আকারে। ভারত যুদ্ধ শুরুর দায় নিজের কাঁধে নিতে চাইছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন প্রদানের নীতি গ্রহণের পরও এ ক্ষেত্রে ভারতের দ্বিধার মূল কারণ ছিল, বিশ্বের সামনে নিজেকে আক্রমণের সূচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হতে না দেওয়া। তা হলে পাকিস্তান কেন স্ব-উদ্যোগে যুদ্ধের সূচনা করল? এর উত্তর আসলে খুঁজতে হবে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ও এলিট চক্রের মানসের মধ্যে। দীর্ঘকাল রাষ্ট্রক্ষমতা যথেচ্ছভাবে ভোগের ফলে বিপুল সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র এক চক্র, যারা নিজেদের বুদ্ধি অথবা বুদ্ধিহীনতার আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে বিপুল মানুষের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয় দেয় চরম অবিমৃশ্যকারিতার। এ কারণেই তাদের হাতে প্রণীত হয়েছিল অপারেশন সার্চলাইটের মতো নিষ্ঠুর গণহত্যা-পরিকল্পনা, যা অচিরে পরিগণিত হয় জাতিহত্যা বা জেনোসাইডে। বিশ শতকের ইতিহাসে হিটলারের নািস বাহিনীর মতো আরেক ঘৃণিত বাহিনীর রূপ নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী, যদিও যেই কুিসত চেহারা আড়াল করার জন্য প্রসাধনী জোগানো হয়েছে অনেক দিক থেকে, বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাধরেরা দিয়েছে এক প্রলেপ, ইসলামের নাম ভাঙিয়ে লাগানো হয়েছে আরেক প্রলেপ।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল উভয় দেশ। সীমান্তজুড়ে অবস্থান নিয়েছিল সেনাবাহিনী; লজিস্টিক ও সরবরাহের ব্যবস্থাদি ছিল প্রস্তুত। কেননা, জানা ছিল না কখন কীভাবে শুরু হবে যুদ্ধ। ৩ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটায় রেডিও পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত এক বিশেষ সংবাদ প্রচার করে। এতে বলা হয়, ‘ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে আক্রমণ শুরু করেছে। বিস্তারিত খবর এখনো আসছে।’ ঠিক তখনই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো ভারতীয় লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশে উড়তে শুরু করে। পাঁচটা ৯ মিনিটে পেশোয়ার বিমানবন্দর থেকে হাজার পাউন্ডের বোমা নিয়ে ১২টি স্যাবর উড়ে যায় কাশ্মীরের শ্রীনগর ও অনন্তপুরের দিকে। এক মিনিট পর সারগোদা বিমানঘাঁটি থেকে আটটি মিরেজ উড়ে যায় অমৃতসর ও পাঠানকোটের দিকে। দুটি যুদ্ধবিমান বিশেষভাবে প্রেরিত হয় ভারত ভূখণ্ডের গভীরে আগ্রায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে। মোট ৩২টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এই আকস্মিক আক্রমনে।
সেই বিকেলে রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসের বিবরণ পাওয়া যায় ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকীর ইস্ট পাকিস্তান: দি এন্ড গেম বইয়ে। প্রেসিডেন্টের প্রেস উপদেষ্টা হিসেবে তাঁকে জরুরি তলব করে আনা হয়েছিল যুদ্ধ শুরুর প্রেস রিলিজ তৈরি করার জন্য। জেনারেল গুল হাসানের পরামর্শে একটি মুসাবিদা তৈরি করে তিনি অপেক্ষা করছিলেন প্রেসিডেন্টকে একবার তা দেখিয়ে নিতে। তিনি লিখেছেন, “মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড তখন ভেতরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও জেনারেল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। চীনা রাষ্ট্রদূত চ্যাং টাং দেখা করে চলে গেছেন। আমরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বের হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, তার পরে ভেতরে যেতে পারব। ইতিমধ্যে বেয়ারা পানীয় নিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর বিমানবাহিনীর প্রধান রহিম খান আমার দিকে ফিরে কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে জানতে চাইলেন আমি এখানে কী কাজে এসেছি। বললাম, ‘সাংবাদিকদের জানানোর আগে আমি প্রেসিডেন্টকে প্রেস রিলিজের ভাষ্য দেখিয়ে নিতে চাই’।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বিমানবাহিনীর প্রধান বললেন, ‘কিসের প্রেস রিলিজ? কেন এর প্রয়োজন?’ আমি বিহ্বল হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য শব্দ হাতড়ে ফিরছিলাম। ইতিমধ্যে জেনারেল গুল হাসান বললেন, ‘আপনি তো জানেন স্যার, রাজ্যের সাংবাদিক অপেক্ষা করছে কোন পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটল, তা জানার জন্য। আমাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেখাতে হবে।’
বিমানবাহিনীর প্রধান এবার গর্জে উঠলেন, ‘যুক্তি আবার কিসের? সাফল্যের চেয়ে বড় যুক্তি আর কি হতে পারে। এইক্ষণে আগ্রার আকাশে, আমার পাখিরা (মাই বার্ডস) শত্রুর জান কয়লা করে দিচ্ছে। আমি কেবল সুখবর শোনার অপেক্ষায় আছি।’
এভাবেই পাকিস্তান শুরু করেছিল যুদ্ধ এবং সুখবর আর রহিম খানের শোনা হয়নি। পরের কথা পরে, এমনকি সেই আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়েও ভারতের ক্ষতি করা গিয়েছিল যত্সামান্যই। ভারতীয় বিমানবাহিনীকে আকস্মিক আঘাতে ভঙ্গুর করে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান, বরং পরে দেখা গেল ভারতীয় প্রত্যাঘাতে তাদেরই হয়েছে বেহাল দশা।
অপরদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকলেও তা যে ৩ ডিসেম্বর এভাবে শুরু হবে, সেটা ভারতের কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কেননা, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তাঁকে জানানো হয় বিমান হামলার খবর। তিনি সমবেত জনতাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে যথারীতি বক্তৃতা শেষ করে দ্রুত চলে যান রাজভবনে। ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল অরোরা তাঁকে গোটা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং বিমানবাহিনীর প্রহরায় তিনি ফিরে আসেন দিল্লি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম ছিলেন বিহারে নিজ নির্বাচনী এলাকায়, অর্থমন্ত্রী চ্যবন বোম্বেতে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সভা শেষে গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বেতার ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে বলেন, ‘বাংলাদেশের যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে।’ তাঁর এই বক্তৃতা যখন চলছিল, তখন পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনজুড়ে গর্জে ওঠে কামান, ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলাও চলে যুগপত্। সেই রাতেই ঢাকা এবং আশপাশের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর শুরু হয় বিমান হামলা। বোমা বিস্ফোরণের প্রবল শব্দে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে অবরুদ্ধ ঢাকার মানুষজন। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী এবার সমুচিত শিক্ষা পেতে শুরু করেছে, এই অনুভূতি তাদের নির্ঘুম করে তোলে। পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া ট্রেসারে যখন চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন প্রায় নয় মাসের কৃষ্ণ দিনের অবসানের আলোকচ্ছটা যেন সবাই দেখতে পায়।
ইতিহাসে এ এক বিরল মুহূর্ত, যখন সর্বস্তরের মানুষ অভিনন্দন জানায় যুদ্ধকে। কেননা, এই যুদ্ধ যে মুক্তির জন্য যুদ্ধ।
মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

 

মহাভারতের বাস্তবানুগ পাঠ December 3, 2009

Filed under: Culture,History(ইতিহাস) — rezowan @ 7:28 pm

মহাভারতের মহারণ্যে
লেখক: প্রতিভা বসু
প্রকাশক: বিকল্প প্রকাশনী, কলকাতা
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ১৯৯৮
প্রচ্ছদের ছবি: নন্দলাল বসুর স্কেচ ‘দুর্যোধন’
মূল্য: ৬০ টাকা
পৃষ্ঠা: ২১৪

महाभारत

ভারতবর্ষে এমন কিছু নেই যা মহাভারত-এ অনুপস্থিত—এ রকম এক প্রবচন জানার পর এ মহাগ্রন্থের প্রতি আকৃষ্ট হই। তত দিনে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রত্বে উন্নীত হয়েছি। রাজশেখর বসুর সারানুবাদ দিয়ে শুরু। তারপর অনার্সে পা দিয়ে কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ। প্রায় বছরখানেক কাটে তাঁর লাইনে লাইনে হাঁটাহাঁটিতে।
গ্রন্থটি আয়তনে এত বিশাল, এত সুদূরে এর বিস্তার যে একবার পাঠে তা আয়ত্তে আনা দুরূহ। আর হূদয়ঙ্গমের জন্য চাই আরও গভীরে ডুব, শতপাঠ। জীবিকার তাগিদ সে সৌভাগ্য থেকেও বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই যতটুকু সম্ভব আয়ত্তে আনার জন্য প্রাসঙ্গিক বইয়ের দ্বারস্থ হই। হাতের কাছে যা পাই, সাধ্যে যা কুলোয়, তা সংগ্রহ করি। এর কোনোটা সঙ্গে সঙ্গে পাঠ হয়ে যায়, আবার কোনোটা আলমারিতে বসে বয়স বাড়ায়, যেমন প্রতিভা বসুর মহাভারতের মহারণ্যে।
মহাভারত-এর মতো মহাগ্রন্থ পাঠে যে-কারও মনে অনেক প্রশ্ন জাগে, হাজারো বৈপরীত্যের জোড় মেলে না। সাধারণ পাঠক হিসেবে আমাকেও সে ঘূর্ণিবায়ুতে পড়তে হয়েছে। তা থেকে বের হওয়ার দরজা খুঁজছিলাম। হাতড়াচ্ছিলাম প্রাসঙ্গিক বই। প্রতিভা বসু যেন সে দরজা দেখিয়ে দিলেন। অনেক প্রশ্নের উত্তর, শত বৈপরীত্যের জোড় মিলে গেল।
প্রতিভা বসু তাঁর বইয়ে কোনো কল্পকাহিনীকে প্রশ্রয় দেননি। মহাভারতজুড়ে অ্যাখ্যান-উপাখ্যান, রূপকথা-উপকথার যে বিশাল মেলা রয়েছে, তা ছেঁটে ফেলে মূল কাহিনী নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার অলৌকিক ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা খুঁজেছি।’
এ বাস্তবধর্মী ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে গিয়ে তাঁকে তৈরি করতে হয়েছে অনেক নতুন পথ। আর তাঁর ইট-পাথরের যুক্তি একে করেছে সুদৃঢ়। যেমন আমরা জানি, মহাভারত হচ্ছে ‘ভরতবংশ’র ইতিহাস। এর চূড়ান্ত মুহূর্ত কুরুক্ষেত্রে ভাইয়ে ভাইয়ে, কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষের মধ্যে মহাযুদ্ধ। কিন্তু প্রতিভা বসু তা মনে করেন না। তাঁর মতে, ‘মহাভারত নামত ভরতবংশের ইতিহাস হলেও, প্রকৃতপক্ষে সত্যবতী-দ্বৈপায়নের বংশের ইতিহাস। হয়তো সে জন্যই দ্বৈপায়ন লোকগাথায় বেঁধে সেই মূল আখ্যানটিকে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, সত্যবতীর পুত্র হচ্ছে মহাভারতের রচয়িতা দ্বৈপায়ন, তাঁর পুত্র বিদুর এবং তাঁর পুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁকে হস্তিনাপুরের তথা ভারতবর্ষের অধিপতি করার জন্য শুরু থেকে নানা উদ্যোগ-আয়োজন চালায় মাতা-পিতা ও পিতামহ। আর সে পথে একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায় কৌরব পক্ষের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর জন্মের পর থেকেই চলে হাজারো অপপ্রচার। জন্মের পরপরই তাঁর গায়ে লাগানো হয় ‘পাপাত্মা’র তকমা। সহস্র সহস্র বছর ধরে তাই সবাই তাঁকে মহাভারত-এর ভিলেন হিসেবে বিশ্বাস করে এসেছে। আর যিনি ‘ধর্মাত্মা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, তিনি নিজে অক্ষম হয়েও অপরের পারঙ্গমতার সাহায্যে তাঁর নিজের লোভ চরিতার্থের জন্য যেকোনো পাপকর্মে অন্যদের লিপ্ত হতে দিতে মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করেননি’, সেই যুধিষ্ঠির গিয়ে দাঁড়িয়েছেন নায়কের কাতারে।
মহাভারত-এর আরেক নায়ক অর্জুন, তৃতীয় পাণ্ডব। তাঁর বীরত্বের কাহিনী ভুবনজোড়া। তবে প্রতিভা বসুর বাস্তবানুগ কাহিনীর আয়নায় তাঁর যে ভূমিকা ফুটে উঠেছে, তা হচ্ছে, ‘সারা মহাভারতে কোটি কোটি অক্ষরের প্রকাশে যাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই অর্জুন কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রকৃতপক্ষে কোনো বড় যোদ্ধার সঙ্গেই শঠতা ব্যতীত বীরত্বের প্রমাণ দেননি।’ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুরুক্ষেত্রে কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ। কর্ণ যেহেতু অঙ্গীকার করেছিলেন, পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে অর্জুন ছাড়া আর কাউকে বিনাশ করবেন না, তাই অন্যদের বাগে পেয়েও ছেড়ে দেন। কিন্তু যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে তাঁর রথের একটি চাকা মাটিতে দেবে যায়। এ সময় তাঁকে আঘাত করা যুদ্ধরীতি ও ক্ষত্রীয় ধর্মবিরোধী। কিন্তু অর্জুন তা মানেননি, বরং কর্ণ যখন অস্ত্রহীন হয়ে রথের চাকাটা তোলার চেষ্টা করছিলেন, তখন কৃষ্ণের প্ররোচনায় কাপুরুষের মতো তাঁর মস্তক ছেদন করেন।
মহাভারত-এর সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র কৃষ্ণ। তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার যেমন শেষ নেই, তেমনি তাঁকে অবতার ভেবে পুজোপাদ্য দেওয়ারও ক্ষান্তি নেই। তবে প্রতিভা বসুর মনে হয়েছে, ‘কৃষ্ণ অনৃতবাক্য উচ্চারণে যেমন বিমুখ নন, তেমনি যেকোনো হীনকর্ম করতেও দ্বিধাহীন।’
আর দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের ঘটনার সঙ্গে রয়েছে অলৌকিকত্বের ছোঁয়া। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মুড়ে তাকে বাস্তবানুগ করার কোনো চেষ্টাই করেননি প্রতিভা বসু। তবে তাঁর মতে, রাজসভায় দ্রৌপদীকে অপমানের ঘটনা ছিল পাণ্ডবদের হিংসার বদলে কৌরবদের প্রতিহিংসা মাত্র। আর পঞ্চস্বামী গ্রহণ, একেক বছরের জন্য একেকজনের শয্যায় যাওয়াকে মনে হয়েছে, ‘নারী দেহ তো নয়, যেন খেলার বল।’
তবে প্রতিভা বসুর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার দুর্যোধন। তাঁর মতে, তাঁর আসল নাম ‘সূর্যধন’। রচনায় দ্বৈপায়ন এবং রাজসভায় বিদুর একজোট হয়ে অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে দুর্যোধন করেছেন। কেননা কোনো পিতাই তাঁর সন্তানের এ নাম রাখতে পারেন না, সে যে যুগের দোহাই পাড়া হোক না কেন।
আর মহাভারতজুড়ে তাঁর ঘাড়ে এত সহস্র অপকর্মের দোষ চাপানো হয়েছে যে এর নিচে চাপা পড়ে গেছে তাঁর যত সুকীর্তি ও সুকর্ম। অথচ তিনি ছিলেন সুশাসক, প্রজাবত্সল এবং বিশাল বীর। প্রতিভা বসুর তাই আক্ষেপ—‘যদি বলি দুর্যোধন স্বভাবতই কিছুটা সংযত ও সহিষ্ণু চরিত্রের মানুষ, তাহলে শতকরা ১০০ জনই হয়তো অট্টহাস্য করে উঠবেন। কেননা, কেবল শুনে শুনে, প্রচারের মহিমায়, তার উল্টো কথাই সবাই বিশ্বাস করে এসেছেন সহস্র সহস্র বছর যাবত্।’
সুতরাং যারা মেদহীন বাস্তবানুগ মহাভারত পড়তে আগ্রহী, তাদের জন্য মহাভারতের মহারণ্যে অবশ্যপাঠ্য।
লিখেছেন জিয়া হাশান

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.