খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা ‘বড় মসজিদ’ December 14, 2009

Filed under: Culture,History(Dhaka) — rezowan @ 3:36 am

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা ‘বড় মসজিদ’ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। সুষ্ঠু তদারকির অভাবে বৃহত্তর সুনামগঞ্জের এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার গৌরব হারাতে বসেছে। ১৯৩১ সালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলা রায়পুরের মহাজন ইয়াসীন মির্জা এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। টানা ১০ বছর মসজিদের নির্মাণকাজ চলে। মসজিদের প্রধান মিস্ত্রি আনা হয় অবিভক্ত ভারতের কলকাতা থেকে। প্রধান মিস্ত্রিসহ জোগালিরা ছিলেন ভারতের। পাশাপাশি মসজিদ নির্মাণে এলাকার লোকজনও সহায়তা করেন। এলাকার লোকজন এ মসজিদকে রায়পুর ‘বড় মসজিদ’ হিসেবে জানে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর দ্বিতল এ মসজিদে রয়েছে তিনটি আকর্ষণীয় গম্বুজ।
শামস শামীম ও আলমগীর হোসেন

 

এসকর্ট December 14, 2009

Filed under: History(Dhaka),People — rezowan @ 2:50 am

খবর:The weekly sheershakhabar

বিশেষ প্রতিবেদন

কলগার্লরা পতিতালয় নির্ভর নয়। তারা চলমান এবং অদৃশ্য। দেখা যায়, কিন্তু জানা যায় না। ঢাকার কলগার্ল বিজনেস খুবই সুসংগঠিত। এ পেশাটি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের নেটওয়ার্কও শক্তিশালী। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এরা ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। অথচ প্রশাসন এদের বিরম্নদ্ধে কোন ব্যবস’া নেয় না। ঢাকার কলগার্লদের এই নেটওয়ার্কের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকার এসকর্ট এজেন্সিগুলো(scort service)। আর বাকী অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন কলগার্ল এজেন্টদের মাধ্যমে।
এজেন্ট আর ক্লায়েন্টের সম্পর্কটা এখানে ত্রিভুজের মতো। ক্লায়েন্ট-কলগার্ল এবং এজেন্ট একটা সুক্ষ্ম সম্পর্কে আবদ্ধ। সমসত্ম লেনদেন হয় এজেন্টের মাধ্যমে। এজেন্ট তার নিজের কলগার্লদের এবং ক্লায়েন্টের ডিমান্ড সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকে। এজেন্ট টারমনোলজিতে ডিমান্ডের অর্থ হল কলগার্লটির ‘ভ্যালুয়েশন।’ অর্থাৎ কলগার্লের সৌন্দর্য, স্বাস’্য এবং গস্নামার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সংযোগের মোট মূল্য (শহুরে, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, শিড়্গিত এবং সমাজের উঁচুতলার মানুষের সঙ্গে পরিচিত)। ‘এজেন্ট’ই অধিকাংশ সময় প্রোগ্রাম তৈরি করেন। ক্লায়েন্টের চাহিদা এবং টাকা খরচ করার ড়্গমতার উপর নির্ধারিত হয় প্রোগ্রাম কেমন হবে। একটা প্রোগ্রাম আয়োজনের ‘সময়’ এবং ‘স’ান’ সি’র হয় ক্লায়েন্ট এবং কলগার্ল উভয়ের সুবিধা মত। ঢাকার এক একজন এজেন্টের অধিনে শতাধিক কলগার্ল রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। আবার এই পেশায় অনেক দিন আছেন এমন কলগার্লরা নিজেই এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন- এমন উদাহরণও বিরল নয়। ঢাকার ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, বনানলী, সেগুনবাগিচা এলাকায় ফ্যাট বাসা নিয়ে চলছে কলগার্ল বিজনেস। মডেল প্রোভাইডার হিসেবে পরিচিত অনেক প্রযোজক, পরিচালক এবং এক সময়ের নামি অভিনেত্রীরা এই কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। সচারচর কোন কলগার্লের বয়স বেশি হয়ে গেলে বা চাহিদা কমে আসলে তারা তখন এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরম্ন করেন। কথা হয় ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন এমন একজন কলগার্লের সাথে। মনিকা নামের এই কলগার্ল নিজেই এখন এজেন্ট। নিজের ফ্ল্যাটেই অফিস খুলে বসেছেন। তার আন্ডারেই রয়েছে ২০ জনেরও বেশি কলগার্ল। ঢাকার বেশ কয়েকটি নামি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মেয়েও যে তার সাথে কাজ করনে -এ কথা জানান তিনি। মনিকা জানান, এরা কখনোই নিজে কোন ক্লায়েন্টের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে প্রোগ্রামে অংশ নেয় না। কারণ হিসেবে নিজেদের গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এমনটি বলে জানান তিনি। এ প্রতিবেদক ইডেন এবং তিতুমীর কলেজে পড়ে এমন দু’জন কলগার্লের সাথে ফোনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ করেন। তবে দু’জনই তাদের এই গোপন অভিসারের কথা অস্বীকার করেন। এদের একজনের সেলফোন নম্বর আবার ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটে সংরড়্গিত আছে। ওয়েব পেজে তার পরিচিতিতে কলগার্ল কথাটির সাথে আবেদনময় আহ্বান রয়েছে। ওয়েব সাইটটিতে তার ছবিও আপলোড করা। ওয়েবে থাকা স্টিল ফটোগ্রাফটি নিজের বলে স্বীকার করলেও তিনি যে কলগার্ল ধরনের কিছু নন, তা বারবার বোঝাতে চেষ্টা করেন। এই প্রতিবেদক তাকে বাংলায় প্রশ্ন করলেও চটপটে ইংরেজিতে উত্তর দেন মেয়েটি। কলগার্ল না হলে সেলফোন বন্ধ করে দিচ্ছেন না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সনেত্মাষজনক কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এখানে এজেন্ট কলগার্ল সম্পর্কটা চমকে দেয়ার মতো। এজেন্টরা নিজেদের কলগার্লদের ব্যাপারে অনেক যত্নশীল। ঢাকায় এই কলগার্লরা কখনও কখনও বাইরে গিয়েও প্রোগ্রাম করেন। ডিমান্ডেবল কলগার্লদের আনত্মর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। ওয়েব সাইট ঘেঁটে দেখা যায়, এসকর্ট এজেন্সিগুলো সারা বিশ্বে একটা নেটওয়ার্ক হয়ে কাজ করে। ফলে অনেক সময় কলগার্লদের দেশের বাইরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
যেভাবে কলগার্ল ঃ
উচ্চাকাঙড়্গা পূরণ করার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হলো কলগার্ল বনে যাওয়া! টেলিভিশন ও সিনেমার পরিচালক-প্রযোজকের লোভনীয় অভিনয়ের সুযোগ বাসত্মবায়ন করতে, মডেল হওয়ার খায়েশ পূরণ করতে, সখের বসে এমনকি উচ্চবিত্ত গৃহবধূ একাকিত্ব দূর করতে তার বন্ধুর মাধ্যমে জড়িয়ে পড়ে এই ধরনের পেশায়। তবে শুধু টাকার অভাবে এই পেশায় নাম লিখিয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। কলগার্ল সুমা (ছদ্ম নাম) জানান, তার স্বামীর অন্য সম্পর্ক ছিল। সে অনেক চেষ্টা করেও তাকে না ফেরাতে পেরে জিদের বসে নিজে এমন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। কলগার্লরা নেটওয়ার্কে ঢোকেন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সিনেমা-টেলিভিশন পরিচালক-প্রযোজক, বিউটি পার্লার, ড্যান্স স্কুল এবং অন্যান্য লোকজনের মাধ্যমে। বাড়তি রোজগারের লোভে, ভাল ক্যারিয়ারের আশায়, কারোর কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে কিংবা স্বামীর অবহেলায় কানত্ম হয়ে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, নামকরা মডেল বা অভিনেত্রী হওয়ার আশায় এই শহরে গোপনে গোপনে ‘কলগার্ল’ হয়েছেন অনেকেই। এই পেশায় সিনেমা-টেলিভিশনের অভিনেত্রী থেকে শুরম্ন করে উঠতি গায়িকা, উচ্চাকাঙড়্গী মডেল ছাড়াও আছেন মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়েরা। এদের অনেকেই আবার সমাজে পরিচিত। অর্থাৎ তারকা হিসেবে তাদের ফেসভ্যালু রয়েছে। এসব তারকাদের যে কোন প্রোগ্রাম আয়োজনে থাকে কঠোর গোপনীয়তা। আর এড়্গেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে এজেন্ট কর্তৃপড়্গ। আর ক্লায়েন্টের তালিকায় আছেন মূলতঃ ব্যবসায়ীরা। বিদেশী ক্লায়েন্টদেরও মনোরঞ্জন করে থাকেন ঢাকার কলগার্লরা। যাদের কাঁচা টাকা ওড়াতে কোন বাধা নেই, কেবল তারাই কলগার্লদের নিয়ে মেতে ওঠেন কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার এই জমকালো আয়োজনে। তবে সাধারণ মানুষও যে নেই, তাও নয়। তবে সে সংখ্যা একেবারেই হাতে গোণা।
কলগার্ল হওয়ার পাশাপাশি এদের অন্য একটা পরিচিতিও রয়েছে। সেই পরিচিতিই এদেরকে সমাজে আড়াল করে রাখে। কেউ স্টুডেন্ট, কেউ বিউটিশিয়ান, কেউ ম্যাসিউজ, কেউ প্রাইভেট টিউটর, কেউ বুটিক চালান, কেউ অভিনেত্রী। আছেন গৃহবধূরাও। এরা যেন চেনামুখের আড়ালে অচেনাজন।
যারা ঢাকার কলগার্ল ঃ
দ্ব এরা কোনও নির্দিষ্ট পতিতালয় নির্ভর নন।
দ্ব এরা চলমান মহিলা যৌনকর্মী। একা বা কোন এজেন্ট দ্বারা নিজেদের পরিচালিত করেন।
দ্ব প্রত্যেকটি প্রোগ্রাম (যৌনকর্ম) আয়োজনে থাকে গভীর গোপনীয়তা। সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই কিংবা তিনটি প্রোগ্রামে অংশ নেন একজন কলগার্ল।
দ্ব প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ হোটেল, রিসর্ট, প্রাইভেট ফ্ল্যাট ও ম্যাসেজ পার্লারে।
দ্ব এরা সকলেই শিড়্গিত এবং বাংলা-ইংরেজিতে পারদর্শী। এছাড়াও কেউ কেউ হিন্দিতেও অনর্গল কথা বলতে পারেন।
দ্ব এদের বেশিরভাগ উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। উচ্চাভিলাসী মধ্যবিত্তের সংখ্যাও কম নয়। বাইরের থেকে দেখে কোনভাবেই বোঝা যাবে না এরা কলগার্ল।
দ্ব বেশিরভাগই এ পেশার বাইরেও অন্য কাজ করে থাকেন, যেখান থেকে আয়-রোজগারও যথেষ্ট।
কাদের ডিমান্ড এখানে ঃ
জানা যায়, ক্লায়েন্টদের কাছে কম বয়সী স্কুল এবং কলেজের মেয়েদের চাহিদা বেশি। ফলে এই সব এসকর্ট এজেন্সিগুলোর নজর থাকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের সাথে সাথে স্বনাম ধন্য ঢাকার স্কুল কলেজগুলোর দিকে। এসকর্ট এজেন্টগুলো বিভিন্নভাবে ফাঁদ পেতে স্কুল-কলেজের মেয়েদের কৌশলে কলগার্লের খাতায় নাম লেখিয়ে নিচ্ছে। অর্থের লোভ দেখিয়ে নতুন নতুন মেয়েদের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে পারঙ্গম এরা। তবে এরা পতিতালয়ের তথাকথিত ‘পিম্প’ বা দালালদের মতো নয়।
এসকর্ট এজেন্সি এবং কলগার্ল ঃ
ঢাকার এসকর্ট এবং কলগার্ল এখন একে অপরের পরিপূরক শব্দ। বৈধতার সনদ দেখিয়ে এরা প্রকাশ্যে কলগার্ল বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছে। ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করতে কলগার্ল বিষয়ে যাবতীয় তথ্য, ছবি এবং কলগার্লের রেট দিয়ে ওয়েব সাইটের মাধ্যমে যাবতীয় তথ্য অনলাইনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কলগার্ল বুকিং দেয়া যায়। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে- এসব ওয়েব সাইটে তরম্নণীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলে নতুন নতুন কলগার্ল হওয়ার জন্য আহ্বান রয়েছে। সেই সাথে ক্লায়েন্ট এবং কলগার্লদের জন্য যাবতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার কথা ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ঢাকার এসকর্ট এজেন্সিগুলোর প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব কলগার্ল ডেটাবেজ। ছবিসহ এসব ডেটাবেজে গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়। আবার সব কলগার্লের ছবি ওয়েবে থাকে না। কারণ স্টার কিংবা সেলিব্রেটি কলগার্লরা ওতটা প্রকাশ্যে প্রচার হতে রাজী হয় না। চাহিদা মতো এসকর্টের কলগার্ল পেতে কায়েন্টকে বেশ কিছু শর্ত পালন করতে হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে- এসকর্ট এজেন্সিকে ক্লায়েন্টের পাসপোর্ট অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর প্রদান, যোগাযোগের জন্য একটা কন্ট্যাক্ট নম্বর (মোবাইল/টেলিফোন), কোন হোটেলে এসকর্ট আয়োজন করতে চাইলে তা কমপড়্গে থ্রিস্টার হোটেল হতে হয় এবং ফ্যাটের ড়্গেত্রেও হতে হয় মানসম্মত। ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ঢাকা এসকর্ট এজেন্সি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা ভিত্তিক এইভাবে উন্মুক্ত কলগার্ল ব্যবসাকে বৈধ বলে দাবি করেন এসকর্ট কর্তৃপড়্গ। ঢাকা এসকর্টের আজাদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কলগার্লের এই বিজনেস প্রফেশনালি বৈধভাবে করে থাকেন তারা। আর এ প্রতিবেদক নিজেকে একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে পরিচয় দিলে তাদের বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস সম্পর্কে বিসত্মারিত জানিয়ে মেইল করেন। আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কলগার্লদের রেট যৎসামান্য কমতে পারে বলেও তিনি জানান। ঢাকা এসকর্টের ওয়েব সাইটে দেখা যায়, ফেডারেল লেবেয়িং এন্ড রেকর্ড কিপিং ল’ (১৮ ইউএসসি ২২৫৭) অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম বৈধ এবং কর্তৃপড়্গ অনুমোদিত। কিন’ একাধিক আইনজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই আইনের দোহাই দিয়ে যৌন ব্যবসা বৈধ করার কোন সুযোগ নেই। এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসকর্ট এজেন্সি খুলে কলগার্ল ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ গুলশান জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনভাবেই যৌন ব্যবসা বৈধ হতে পারে না। উলেস্নখিত আইনের কথাও এর আগে শোনেননি বলে জানান তিনি। আর ওয়েব সাইটের মাধ্যমে একেবারে প্রকাশ্যে এই ধরনের যৌনব্যবসা চলছে শুনে তিনি বিস্মিত হন।
কলগার্ল হতে ইচ্ছুক ঃ
এসকর্ট এজেন্সিগুলো কলগার্ল হতে ইচ্ছুকদের ওয়েব সাইটের মাধ্যমে আহ্বান জানায়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়-য়া সুন্দরী মেয়ে, গৃহিনী এবং কম বয়সী তরম্নণীদের লোভনীয় প্রসত্মাবের মাধ্যমে আকৃষ্ট করার প্রবণতা লড়্গ্য করা যায়। গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ এবং কম বয়সে লাখপতি হওয়ার সুযোগ। এ রকম নানা প্রলোভনে কলগার্ল হওয়ার প্রসত্মাব দিয়ে থাকে এসব এসকর্ট এজেন্সিগুলো। তবে অধিকাংশ ড়্গেত্রে সরাসরি এজেন্টরা নতুন কলগার্ল নিতে ডিল করে না। মাধ্যম হিসেবে তৃতীয় একটি পড়্গকে ব্যবহার করে থাকে। ফলে কেউ কলগার্লের খাতায় নাম লেখালে সেড়্গেত্রে এজেন্সিকে দায়ী করা যায় না।
রেট ঃ
সাধারণতঃ ৪ ক্যাটাগরির কলগার্ল পাওয়া যায়। বয়স, ফিগার এবং ইন্টেলেকচুয়াল-এর ওপর ভিত্তি করে ক্যাটাগরি নির্ধরণ করা হয়। এলিট ‘এ’, এলিট ‘বি’, প্রিমিয়াম ‘এ’ এবং প্রিমিয়াম ‘বি’। ক্যাটাগরি অনুযায়ী কলগার্লদের পেতে টাকা খরচের অঙ্কেও পরিবর্তন আসে। এলিট ক্যাটাগরির কলগার্লদের স্বল্প সময়ের জন্য বুকিং দেয়া যায় না। প্রিমিয়ার ক্যাটাগরির কলগার্লদের আধা ঘণ্টার জন্য বুকিং দিলে কমপড়্গে ৪০ ডলার গুনতে হয়। আর এলিট শ্রেণীর সর্বনিম্ন রেট ২০০ ডলার (প্রতিঘণ্টা)। তবে সময় বাড়লে রেটে কিছুটা তারতম্য হয়। পুরো রাতের জন্য এ লেবেলের এলিট কলগার্লদের রেট ৮০০ থেকে ১০০০ ডলার। প্রতি তিন সপ্তাহ অনত্মর কলগার্লদের ডাক্তারী পরীড়্গা করা হয়। ফলে কলগার্লদের সংস্পর্শে ক্লায়েন্টদের কোন প্রকার যৌনবাহিত রোগ হবে না বলেও নিশ্চয়তা দেয় এজেন্টরা। পছন্দের কলগার্লকে নিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। হিল ট্রাক্টস্‌, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এমনকি দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আর সেড়্গেত্রে দরকার শুধু টাকা। এলিট কলগার্লদের প্রায় সকলেরই পাসপোর্ট রয়েছে। পছন্দসই এসকর্ট অর্ডার দেয়ার পর ঢাকা হলে এসকর্ট আয়োজনে সময় লাগবে সর্বোচ্চ একঘণ্টা। সিলেট, চট্টগ্রাম ১২ ঘণ্টা এবং দেশের বাইরে তিনদিন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের নতুন, পুরানো অনেক মডেল, টেলিভিশন ও সিনেমার বেশ কয়েকজন অভিনেত্রী এমনকি প্রাইভেট চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকাও কলগার্লের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তবে এদের রেট প্রচলিত রেটের চেয়ে অনেক বেশি। এদের সাথে প্রোগ্রাম কিংবা এসকর্টে অংশ নিতে হলে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরম্ন করে ২ লাখ টাকা পর্যনত্ম খরচ করতে হয়। অগ্রিম টাকা নেয়া হয় না। সে ড়্গেত্রে নতুন ক্লায়েন্ট হলেও প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকে না বললেই চলে। কলগার্ল অর্ডার দেয়ার পর তাকে দেখে পছন্দ না হলে অর্ডার বাতিল করা যায়। বিভিন্ন দেশের প্রচলিত মুদ্রায় বিল পরিশোধ করা যায়। তবে এ ড়্গেত্রে টাকার সাথে সাথে ডলার, পাউন্ড এবং ইউরোকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রাইভেসির জন্য শুধুমাত্র নগদ ক্যাশে বিল দিতে হয়। চেক কিংবা ডেবিট, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিশেষে ঃ
কলগার্ল হচ্ছে মুখোশের আড়ালে চালিয়ে যাওয়া একটি পেশা। দেশে ঠিক কতজন কলগার্ল আছে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। আর এটা এমন একটা পেশা যেখানে পেশাজীবী থাকেন আড়ালে, গোপনে। এখানে যেমন যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি জানাজানি হলে পারিবারিক ও সামাজিক অশানিত্মও অপেড়্গা করছে। ফলে সবার অলড়্গে প্রতিদিন কতজন মেয়ে এই পেশায় নাম লেখাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন’ যারা কলগার্ল নিয়ে ব্যবসা করে তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ সংখ্যাটি একেবারেই কম নয়। আর যদি সত্যি সত্যিই তেমনটি হয়ে থাকে, তবে তা যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ। কেননা, তাহলে যে মুখশের আড়ালে হারিয়ে যাবে বিবেকের এবং চিরচেনা বাংলার সবুজ নারী।

আরো একটা খবর পদ্মা পাড়ের মানুষ হতে
শাহজাহান আকন্দ শুভ ও হাসান জাকির:
ওয়েবসাইটে কলগার্ল ব্যবসা৷ তাও গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই৷ রাজধানীর বনানীতে ‘এসকর্ট এজেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ব্যবসা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ এ ব্যাপারে তারা ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে কলগার্লদের যৌন আবেদনময়ী ছবি এবং সেলফোন নাম্বার দেয়া হয়েছে৷ এছাড়াও আছে কলগার্লদের শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা এবং তাদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার নিয়ম-কানুন৷ এছাড়াও দেহ ব্যবসা করে রাতারাতি লাখপতি হওয়ার লোভনীয় সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে এসকর্টের ওয়েবসাইটে৷

জানা গেছে, আজাদ রহমান নামে এক ব্যবসায়ী এসকর্টের কলগার্ল ব্যবসা পরিচালনা করেন৷ গতকাল ফোনে তিনি জানান, ‘নিছক দুষ্টুমি করার জন্যই ওয়েবসাইটটি খোলা হয়েছে৷ মেয়েদের ছবি এবং সেলফোন নাম্বার দিয়ে কেন এই দুষ্টুমি করছেন_ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো অপরাধ নয়৷’
এসকর্টের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, কলগার্লদের নিয়ে তাদের রয়েছে বিশাল ডাটাবেজ৷ গ্রাহক হওয়ার পরই কেবল এসব ডাটাবেজে প্রবেশ করা যায়৷ ডাটাবেজে কলগার্লদের ছবিসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে৷ অভিযোগে প্রকাশ, ৪ ক্যাটাগরির কলগার্ল নিয়ে ব্যবসা করছে এসকর্ট৷ এলিট-এ, এলিট-বি, প্রিমিয়াম-এ এবং প্রিমিয়াম-বি৷ বয়স, ফিগার এবং বুদ্ধিমত্তার ওপর ভিত্তি করে তারা ক্যাটাগরি নিধর্ারণ করেছে৷ এলিট ক্যাটাগরির কলগার্লদের স্বল্প সময়ের জন্য বুকিং দেয়া যায় না৷ প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির কলগার্লদের আধ ঘণ্টার জন্য বুকিং দিলে কমপৰে ৪০ ডলার গুণতে হয়৷ আর এলিট শ্রেণীর সর্বনিম্ন রেট হচ্ছে প্রতি ঘণ্টা ২০০ ডলার৷ পুরো রাতের জন্য এলিট কলগার্লদের রেট ৮০০ থেকে ১০০০০ ডলার৷ প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর কলগার্লদের ডাক্তারি পরীৰা করা হয় এবং কলগার্লদের সংস্পর্শে এলে ক্লায়েন্টদের কোনো যৌনবাহিত রোগ হবে না বলেও ওয়েবসাইটে প্রচারণা চালাচ্ছে এসকর্ট৷
রাজধানী ঢাকার নামিদামি হোটেল, ফ্ল্যাট এবং ম্যাসেজ পারলারে এসকর্ট ক্লায়েন্ট-কলগার্ল প্রোগ্রাম সম্পন্ন করে৷ তবে টাকা হলে পছন্দের কলগার্লকে ঢাকার বাইরে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এমনকি দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে৷
ওয়েবসাইটে পরিচিতি, ছবি এবং সেলফোন নাম্বার থাকা ঢাকার দু’জন কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তারা গোপন অভিসারের কথা অস্বীকার করেন৷ এদের একজন ওয়েবে থাকা স্টিল ফটোগ্রাফটি নিজের বলে স্বীকার করলেও তিনি যে কলগার্ল ধরনের কিছু নন, তা বারবার বোঝাতে চেষ্টা করেন৷ এসকর্ট যে বৈধভাবে এই ব্যবসা করছে তার সপৰে তারা ওয়েবসাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল লেবেলিং অ্যান্ড রেকর্ড কিপিং ল’ (১৮ ইউ.এস.সি. ২২৫৭)-এর একটি রেফারেন্স তুলে ধরেছে৷ কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের ব্যবসা কোনোক্রমেই বৈধ হতে পারে না৷ শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, সরকারের অনুমোদিত যৌনপলস্নী ছাড়া আর সব জায়গাতেই দেহ ব্যবসা অবৈধ৷

 

যুবকশূন্য সেই গাঁয়ের কথা December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka),People — rezowan @ 11:46 pm

লিখেছেন আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয়

গ্রামটির নাম থানাপাড়া। দেশের আর দশটা গ্রামের মতো রাজশাহীর এই গ্রামটিও গাছগাছালি আর পাখির ডাকে একটা ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে বয়ে গেছে পদ্মা। পদ্মায় মাছ ধরে, জমিতে ধান চাষ করে, রাতে গানের আসর বসিয়ে দিব্যি কাটছিল গায়ের লোকজনের জীবন।

সেই জীবনটাই একদিন এলোমেলো হয়ে গেল। এক দিন ঠিক দুপুরবেলায় বুটের মচমচ আওয়াজ তুলে, মুখে অচেনা বুলি বলে এই গ্রামে ঢুকে পড়ল পাকিস্তানি সেনারা। কাতারে কাতারে মানুষ নিয়ে দাঁড় করানো হলো নদীর ধারে। সব লোক জড়ো হওয়ার পর আলাদা করে ফেলা হলো পুরুষ আর মহিলাদের।
তারপর এই দুনিয়ায় নাত্সী হত্যাকাণ্ডের চেয়েও জঘন্য আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো! একসঙ্গে মেরে ফেলা হলো গ্রামের তিন শতাধিক যুবককে! ইচ্ছেমতো লুট করা হলো বাড়িগুলো, নির্যাতন চলল বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর ওপর।
এর পরও কি এই গ্রামটির টিকে থাকার কথা? অন্য কোনো দেশ হলে কী হতো, কে জানে! কিন্তু এ গ্রামের বেঁচে যাওয়া মানুষেরা যে বাঙালি। এরা মরতে জানে না, লড়তে জানে। সেই লড়াইটাই শুরু করলেন ‘বিধবাদের গ্রামের’ বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো।
ইতিহাসের কী অপূর্ব খেলা! পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে যে গ্রামটিকে যুবকশূন্য করে ফেলেছিল, সেই গ্রামটি এখন দুনিয়ার হাজারো মানুষের জন্য এক বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বন্ধুদের হাত ধরে সেই গ্রামটি এখন হস্তশিল্পের জন্য ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে খ্যাতি পেয়ে গেছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের গ্রামটির এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এক সুইডিশ দম্পতির। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে রয় জোহানসন ও অনিতা এন্ডারসন দম্পতি বেড়াতে আসেন গ্রামটিতে। এঁরা ছিলেন সুইডেনের সোয়ালোজ নামের একটি সংস্থার ভারতীয় শাখার কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গ্রামটির অবস্থা দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল তাঁদের। অবস্থা দেখে শিউরে উঠলেন রয় ও অনিতা। আশার আলোও খুঁজে পেলেন। গ্রামটির মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চায়। সেই চাওয়া পূরণ করতে এখানে শুরু হলো ‘সোয়ালোজ আন্দোলন’।
সোয়ালোজ একটি পাখির নাম। সুইডেনে বসন্ত আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এই পাখি। থানাপাড়া গ্রামেও দুর্যোগের পর বসন্ত নিয়ে আসবে সোয়ালোজ—এমন স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করলেন রয়-অনিতারা। সঙ্গে শত শত বিধবা নারী। ১৯৭৪ সালের গোড়ার দিকে এই গ্রামে শুরু হয় তাঁতের কাপড় দিয়ে পোশাক, পাট দিয়ে শিকা, কার্পেট ও মেট, নকশিকাঁথা ইত্যাদি তৈরি। কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রামের মানুষ। আর এই উত্পাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে লাগল সোয়ালোজের লোকজন।
সোয়ালোজের এই বিদেশিরা এখানে থাকতে আসেনি। বাংলার লড়াইয়ে বাঙালিরাই জিততে পারে, বুঝতে পেরে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া শুরু করে তারা। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় লোকদের হাতেই সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যায় সুইডিশরা।
এখনো দারুণভাবে চলছে হস্তশিল্পের কাজ। এখন আর এই গ্রাম দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একদিন ধ্বংস হতে বসেছিল। এখানকার উত্পাদিত পণ্য এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সন্তানদের রাখার জন্য একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।
এই কেন্দ্রে ৪৫ জন শিশু থাকে। বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি স্কুল। আছেন পাঁচজন শিক্ষক। চারঘাটে সোয়ালোজ হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে এখন ২২০ জন নারী কাজ করেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ পরিবারের প্রায় দেড় শ নারী। সরাসরি পাঁচ শহীদের স্ত্রীও রয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ওয়াজান বেওয়া। তিনি এখন সোয়ালোজের তাঁতের সুতা তৈরির কাজ করেন। ওয়াজান বেওয়া এখনো দেখতে পান ১৯৭১-এর সেই দিনটা, ‘গ্রামে মিলিটারি ঢোকার কথা শুনে সবাই পদ্মা নদীর ধারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বেলা আড়াই-তিনটার দিকে মিলিটারি ঘিরে ফেলল আমাদের। কেউ পালাতে পারল না। কিছুক্ষণ পর বাচ্চাদের নিয়ে মেয়েদের চলে যেতে বলা হলো। ভাবছিলাম, পেছন থেকে আমাদের গুলি করে মারবে। আমরা বেঁচে গেলাম ঠিকই। কিন্তু ওখান থেকে আমরা চলে আসার খানিক পরই সব পুরুষ মানুষকে মেরে ফেলল ওরা। স্বামীর লাশটাও দাফন করতে পারিনি।’
এমন গল্প এই গ্রামের অনেকের। এই স্মৃতির কষ্টটা আছে। সেই সঙ্গে আছে জীবন-যুদ্ধ জয়ের গর্বও। গর্ব এখন ওয়াজান বেওয়ারা করতেই পারেন। তাঁদের যুদ্ধজয় দেখতে এখন দেশ-বিদেশ থেকে লোক আসে।
ভারত, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন থেকে যুবকেরা আসে গ্রামটির উন্নয়নের গল্প শুনতে। এখানকার নারীদের সংগ্রামের কথা শুনতে। এই তো গত ৯ নভেম্বর থেকে উরুগুয়ে, চিলি, বুরুন্ডি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া ফিনল্যান্ড ও ভারত ‘এমাউস ইন্টারন্যাশনালের’ ১৯ জন সদস্য এসেছিলেন।
তাঁরা সবাই মুগ্ধ গ্রামটির নারীদের সংগ্রামের গল্প শুনে। এই মুগ্ধ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ফিনল্যান্ডের মেয়ে ক্যারিনা। গ্রামটির গল্প শুনে বললেন, ‘১৯৭১ সালে এখানে একটি যুবকশূন্য গ্রাম তৈরি করতে চেয়েছিল কিছু লোক। অথচ আজ দেখুন, দুনিয়ার হাজারো যুবকের গ্রামে পরিণত হয়েছে জায়গাটি। এভাবেই তো আপনারা জিতলেন।’
হ্যাঁ, এ-ও আমাদের আরেক যুদ্ধ জয়!

 

গায়েবি মসজিদ December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:58 pm

খন্দকার মাহমুদুল হাসান ৎ প্রথম আলো

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেল। তাড়াতাড়ি খুঁজতে লেগে গেলাম গায়েবি মসজিদ। অবশ্য খুব একটা দেরিও হলো না। কারণ, সঙ্গে ছিলেন বন্ধু আহমদ মমতাজ।
দেখলাম, মসজিটি পুরোনো হলেও মসজিদ আর রাস্তাকে আড়াল করার মতো বিস্তর দালানকোঠা বানানো হয়েছে। এত পুরোনো একটি মসজিদ, অথচ রাস্তা থেকে দেখাই যায় না প্রায়। শুধু সাদা গম্বুজের চূড়া দেখে বুঝতে হয়, এখানে একটি মসজিদ আছে। গায়েবি মসজিদ ছাড়াও এর অন্য একটা নাম আছে। তা হলো মাহমুদ খান জামে মসজিদ। পাহাড়তলীর জোলারপাড় এলাকায় এর অবস্থান।
মূল মসজিদের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে এভাবে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, আসল মসজিদকে প্রায় চেনাই যায় না। মূল মসজিদটি মেপে দেখা গেল, উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমের দেয়াল প্রায় চার দশমিক পাঁচ ফুট অর্থাত্ এক দশমিক ৩৭ মিটার চওড়া। তবে পূর্ব দিকের দেয়াল দরজার কাছে ছয় দশমিক ৭৫ ফুট অর্থাত্ প্রায় ২০৩ মিটার চওড়া। পূর্ব দেয়ালে তিনটি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে।
যদিও পশ্চিম পাশের দেয়ালে একটি মেহরাব দেখা গেল এবং ভেতরটা পুরোপুরি আধুনিক টাইলসে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেল। কিন্তু লোকমুখে জানা গেল, আদতে পশ্চিম দেয়ালে মেহরাব ছিল তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রবেশপথ দুটোর আকৃতি আগে অনেক ছোট ছিল।
ভেতরের দিক থেকে মসজিদের দৈর্ঘ্য ২৫ ফুট অর্থাত্ প্রায় সাত দশমিক ৬২ মিটার ও প্রস্থ ১৪ ফুট অর্থাত্ প্রায় চার দশমিক ২৭ মিটার।
জনশ্রুতি আছে, মসজিদটি ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে জন্মগ্রহণকারী সুবেদার মাহমুদ খান নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের গম্বুজের কাছাকাছি উচ্চতায় দেয়ালের গায়ে বসানো শিলার লেখায় এসব কথার বিবরণ আছে বলেও শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গেই সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম ওপরে। দেখলাম, একটা পাথরের খণ্ডে এক লাইন লেখা থাকলেও এমনভাবে এর ওপর রং লেপ্টে দেওয়া হয়েছে, সেটির পাঠোদ্ধার দুষ্কর। এতে কোনো সালের উল্লেখ আছে কি না, তা ভালোভাবে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনো সাল বা তারিখের বর্ণনা পেলাম না। তাই চেষ্টা করলাম বৈশিষ্ট্য সন্ধান করে এর সময়কাল সম্পর্কে ধারণা লাভের।
মসজিদের ভেতর থেকে একটি বড় গম্বুজের অবস্থান খুব ভালোভাবে লক্ষ করা যায়। খিলানের সাহায্যে যে এটি নির্মিত হয়েছিল, তা-ও বোঝা যায়। ভেতরের দিক থেকে গম্বুজের শীর্ষভাগে প্রস্ফুটিত ফুলের নকশা দেখা যায়। বড় গম্বুজের নিম্নভাগে দুই পাশের দুটি ছোট গম্বুজের সূচনা স্থানেও যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে প্রায় একই রকমের ফুলের পাপড়ির নকশা আছে, তবে তা সম্পূর্ণ ফুলের নয়, বরং অংশবিশেষের।
ছাদে উঠে মসজিদের বহিরায়বের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলাম। মসজিদের ছাদের মাঝখানে একটি ও এর প্রতি পাশে একটি করে দুটি অর্থাত্ মোট তিনটি গম্বুজ আছে। মসজিদের চার কোনায় চারটি আট কোণাকার মিনার আছে। এ ছাড়া পশ্চিম পাশে দুটি ও পূর্ব পাশে একটি ছোট মিনার আছে। প্রতিটি মিনারের শীর্ষভাগ শেষ হয়েছে কারুকার্যময় ছোট ছোট গম্বুজে। এ ধরনের মসজিদের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ও উত্তরাঞ্চলের একটি মুঘল যুগের মসজিদের বেশ সাদৃশ্য লক্ষ করলাম। এ দুটির একটি হলো, কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া মসজিদ, অন্যটি গাইবান্ধার ফুলহারের মসজিদ।
মসজিদের বাইরে চার কোনায় চারটি বেলেপাথরের স্তম্ভ দেখলাম। এগুলোর ওপর এখন চুনের পুরু প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। তবুও স্তম্ভগুলোর সঙ্গে মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁ মসজিদের সামনের স্তম্ভের বেশ মিল দেখলাম। এ স্তম্ভগুলোর উচ্চতা প্রায় তিন ফুট। স্তম্ভগুলোকে মসজিদের অনুচ্চ সীমানাপ্রাচীরের প্রান্তভাগ নির্দেশক বলে মনে হলো। মসজিদের পশ্চিম ও উত্তর দিকে টিকে থাকা সেই সীমানাপ্রাচীর পর্যবেক্ষণেরও সুযোগ হলো। অনুচ্চ এই প্রাচীরের বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে গেছে। এর গায়ে চুনের পুরু প্রলেপ দেওয়া হলেও পুরোনো ইট কোথাও কোথাও বেশ দেখা গেল। সে ইট সুস্পষ্টভাবে মুঘল বৈশিষ্ট্যের এবং ছোট ছোট। প্রাচীরের শীর্ষভাগ অনেকটা দোচালা আকারের। ঠিক একই রকমের, দোচালা ধারার প্রাচীর দেখেছি ঢাকার ধামরাইয়ের মুঘল যুগের একটি মাজারের পাশে।
মসজিদকে ঘিরে নানা কাহিনীর কথা শোনালেন জোলাপাড়ার (অন্য নাম নোয়াপাড়া) মরহুম শেখ আরবের রহমানের ছেলে শেখ ফরিদুর রহমান। তিনি জানালেন, এই মসজিদের পাশেই রয়েছে নোয়াপাড়া, ফকির তালুক, পাঠানপাড়া, ফৌজদারপাড়া, কুলালপাড়া, শহীদনগর ও কাজীপাড়াসহ আটটি মহল্লার কবরস্থান। তাঁর কাছেই জানা গেল, এ মসজিদের পূর্ব দিকের প্রায় মজে যাওয়া একটি পুকুরের ভেতর পুরোনো পাথরখণ্ড আছে। পুকুরের পাড়ে গেলাম। কিন্তু পাথরের দেখা মিলল না। তিনি জানালেন, এ মসজিদের উত্তর পাশের রুমে মোয়াজ্জিন একা থাকতে পারেন না। রাতে শুতে পারেন না। কেউ তাঁকে টেনে তোলে। আগে এখানে জিন নামাজ পড়ত।
মসজিদের মোয়াজ্জিনের নাম মো. নূরুল হক। তাঁর বয়স ২৮ বছর। বাবার নাম মরহুম আবদুস ছত্তর। বাড়ি আনোয়ারা উপজেলায়। তিনিও মাথা নেড়ে এ কথায় সায় দিলেন। তবে এ বিষয়ে আর বিশেষ কথা হলো না।
সবকিছু বিবেচনায় মসজিদটিকে মুঘল যুগের বলে স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি। তবে তারও আগে এখানে মসজিদের কাঠামো নির্মিত হওয়া অসম্ভব নয়।
২০০৯ সালের ২৮ মে এখানে আসার আগে এ মসজিদের কথা কোথাও পড়িনি এবং তেমন একটা জানাও ছিল না এ সম্পর্কে। তাই মসজিদটি দেখে বেশ তৃপ্তিই পেলাম, যদিও এটি যথাযথ যত্নের সঙ্গে পুরোনো দিনের কীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত হয়নি।

 

বাংলাদেশকে রুখতে চীন-মার্কিন আঁতাত December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:47 pm

১১ তারিখ বিকেল চারটায় মুক্তিবাহিনীনিয়ন্ত্রিত টাঙ্গাইলের পুংলি এলাকায় ভারতীয় ছত্রীসেনাদল অবতরণ করে। পুরো এক প্যারা ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যখন নেমে আসছিলেন আকাশ থেকে, সেটা হয়েছিল দেখার মতো দৃশ্য। এক মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন যে একটার পর একটা উড়োজাহাজ থেকে প্যারাসুটে শত শত ছত্রীসেনা নামছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশটা প্যারাসুটে ভরে গেল, যেন সেগুলো পাখির মতো ভাসছে। এরপর আরও অবাক হওয়ার পালা। দেখা গেল, প্যারাসুটে ঝুলে কয়েকটা গাড়ি নামছে, আর নামছে বড় বড় কামান।
তবে যত না ছত্রীসেনা নেমেছিল, কাজ হয়েছিল তার চেয়ে বেশি। কেননা, ছত্রীসেনার সংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্ফীত হয়ে এবং পাকিস্তানিদের মনোবল ভাঙতে তা সহায়ক হয়েছিল। সানডে টাইমস-এর অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘৫০টি ফ্লাইং বক্সকার পরিবহন বিমানে করে ৫০০০ ছত্রীসেনা ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবতরণ করেছে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসছে ভারতীয় বাহিনী।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত্ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একাংশ তখন পৌঁছে গিয়েছিল নরসিংদী। অন্যদিকে মেজর জেনারেল কৃষ্ণা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন আট মাউন্টেন ডিভিশন উপনীত হয়েছিল ফেঞ্চুগঞ্জে। মিত্রবাহিনীর পদাতিক সৈন্যরা ঢাকার কাছে পৌঁছে গেলেও মূল বাহিনী রয়ে গিয়েছিল অনেকটা পেছনে। যুদ্ধের ভারী সব উপকরণ বয়ে এনে ঢাকা অভিযান পরিচালনায় দরকার ছিল কিছুটা সময়। আগের দিন বেতার ঘোষণায় জানা গিয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছে। যুদ্ধ যে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের কেন্দ্রে এবং জাতিসংঘে চলছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরেক খেলা। দুবার সোভিয়েত ভেটো দ্বারা প্রতিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য পুনরায় উত্থাপিত হয়েছিল। প্রত্যাশিতভাবে ১০৪ বনাম ১১ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেহেতু সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এর আশু রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না; কিন্তু বিষয়টি পুনরায় ফিরে আসে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। এ যাত্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভেটো প্রদান ছিল কঠিন, তাই চেষ্টা চলছিল আলোচনা দীর্ঘায়িত করার। অন্যদিকে পর্দার অন্তরালে চলছিল চীন-মার্কিন আঁতাতের রাজনীতি, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর জন্য উভয়ের মধ্যে নানা পাঁয়তারা।
সম্প্রতি বর্তমান লেখকের হাতে এসেছে বেশ কিছু অবমুক্ত মার্কিন দলিল, যা পর্দার আড়ালের কূটনীতির পরিচয় মেলে ধরে। এমনি এক গোপন দলিলে জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ নিউইয়র্কে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়ার সঙ্গে গোপন সভার বিবরণ দিয়েছেন। জর্জ বুশ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বৈঠকের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন এই রিপোর্টে। তাঁকে হোয়াইট হাউস ফোনে জানায় যে নিউইয়র্কের ৭৪তম স্ট্রিটের একটি অ্যাপার্টমেন্টে চীনাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং হেনরি কিসিঞ্জার ও আলেকজান্ডার হেগ এতে যোগ দেবেন। জর্জ বুশ লিখেছেন, “উইনস্টন লর্ড দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে কিসিঞ্জার ও হেগের উদয় হলো, এর পরপরই হুয়াং হুয়া ও তাঁর সহকারী দুই অনুবাদকসহ এসে হাজির। হেনরি ভারত-পাকিস্তান বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক নীতি মেলে ধরে বললেন, এই নীতি চীনাদের মতো একই। কিসিঞ্জার আরও জানান, ‘মাঝদরিয়ায় কয়েকটি জাহাজের গতি আমরা পরিবর্তন করেছি। জর্দান, তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে কিছু যুদ্ধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছি।’ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পতন ঠেকাতে প্রদত্ত সাহায্যের কথাও তিনি বলেন। আমাদের অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানকে অটুট ও সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবতে হবে। ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানকে পালিশ করার কাজ শেষ করে তারা কাশ্মীরের কতক অঞ্চলে প্রবেশ করবে। জবাবে হুয়াং হুয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। বললেন, প্রয়োজনে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করতে হবে।”
এরপর বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটি ঘটনার কথা জানা যায়। জর্জ বুশ লিখেছেন, ‘হুয়াং হুয়া জানতে চান, বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে বুশ সত্যিই দেখা করেছিলেন কি না। বাংলাদেশ শব্দটা চীনাদের কাছে একটি নোংরা শব্দ। আমি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি যে বিচারপতি (আবু সাঈদ) চৌধুরীকে নিয়ে এমন একটা রটনা সম্প্রতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তিনি থার্ড কমিটির সদস্য সেজে ভিন্ন রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের মিশনত্যাগী এক কর্মকর্তাও ছিলেন। এটা আমাদের জন্য ছিল বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং নিউইয়র্ক টাইমস যেমন লিখেছে, দুই দিন আগে তা নয়, দু-তিন সপ্তাহ আগে এটা ঘটেছে।’
জর্জ বুশ আরও এক কৌতুকপ্রদ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক ডেকে সংকটের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ প্রশ্ন ও ভারতের বিরুদ্ধে কিসিঞ্জারের যে কোনো বৈরিতা নেই, তেমন ধারণা তিনি দিতে চেয়েছিলেন। হুয়াং হুয়ার কাছে এই সাংবাদিক বৈঠকের রিপোর্ট দেন কিসিঞ্জার এবং জর্জ বুশ তাঁর নোটে লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে বলেছেন যে তিনি পটভূমি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। এ কথা শুনে আমি অ্যাল হেগের দিকে ঝুঁকে তাঁকে মনে করিয়ে দেই যে ওই পটভূমির কার্যপত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গও রয়েছে, সেটা জানলে হুয়াং হুয়ার চুল খাড়া হয়ে যাবে।’
এমনি নানা খোলামেলা ভাষ্য মেলে এই নোটে, চীন ও আমেরিকা যে পরস্পরকে বুঝে নিতে চাইছিল, অপরকে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল, সেটা বেশ পরিষ্কার। আর এ ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার ছিলেন পরম উত্সাহী। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও আচারের ধার ধারেননি। কিসিঞ্জারের কথাবার্তার ধরনেও জর্জ বুশ বেশ বিরক্ত বোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘হেনরি তাঁকে (হুয়াং হুয়া) বলেন যে জাতিসংঘে তাঁরা তাঁদের ইচ্ছেমতো প্রস্তাব আনতে পারেন, আমেরিকা সেটা সমর্থন করবে। এটা আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছিল। কেননা, চীনারা (জাতিসংঘে) কঠোর নিন্দামূলক ভাষায় কথা বলছিল। সোভিয়েতের মোকাবিলায় সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও যোগাযোগ রক্ষার পদ্ধতি বিষয়ে কথা বলতেও হেনরি আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানান যে ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে এবং তিনি ভুট্টোকে বলবেন কেবল তাঁর ও হেগের কথা শুনতে, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারও নয়।’ শোষোক্ত এই বক্তব্য থেকে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং কিসিঞ্জারের ঔদ্ধত্য ও শক্ত অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায়।
কূটনীতিক মহলের ভেতরের এসব বিবরণ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা বড়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পতন ঠেকানোর, চীনাদেরও প্ররোচিত করেছে সামরিকভাবে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর লক্ষ্যে বিশ্বজনীন আয়োজন এইভাবে ঘনীভূত হয়ে আসছিল এবং এর পরিচয় পাওয়া যায় আরেক গোপন মার্কিন দলিলে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ৮ ডিসেম্বরের টপ সিক্রেট-সেনসিটিভ ডকুমেন্টে। সেখানে সুপারিশকৃত পদক্ষেপের মধ্যে ছিল মার্কিন নৌশক্তিকে অবিলম্বে ভারত মহাসাগরে পাঠানো, চীনকে জানানো যে পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে চীন সামরিক ব্যবস্থা নিলে মার্কিন সরকার তা অনুকূল মনোভাব নিয়ে বিচার করবে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সিয়াটো/সেন্টোর জরুরি সভা আহ্বান ইত্যাদি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দ্বাদশ বা শেষ সুপারিশ, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘অবিলম্বে সিনক্ল্যানটের আওতায় সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতবহ সামরিক পরিকল্পনা সূচিত ও সক্রিয় করা।’
যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা-জনতা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে নিশ্চিত করে চলছিলেন বিজয়, আর রক্তপায়ী বর্বর পাকিস্তানি-সামরিক চক্রকে বাঁচাতে ক্রমেই মরিয়া হয়ে উঠছিল আমেরিকা ও চীন। মুক্তিযুদ্ধ উপনীত হয়েছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একেবারে মুখোমুখি। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে সামরিক-কূটনৈতিক অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিল নিক্সন প্রশাসন, ঝুঁকি নিতেও পরোয়া ছিল না তাদের। আর বাস্তবে চীন কী করবে, সেটা খোদ আমেরিকানরাও বুঝে উঠতে পারছিল না। আগামী দিনগুলো তাই ছিল অশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
 মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।
ই-মেইল: mofidul_hoque@yahoo.com ১১ তারিখ বিকেল চারটায় মুক্তিবাহিনীনিয়ন্ত্রিত টাঙ্গাইলের পুংলি এলাকায় ভারতীয় ছত্রীসেনাদল অবতরণ করে। পুরো এক প্যারা ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যখন নেমে আসছিলেন আকাশ থেকে, সেটা হয়েছিল দেখার মতো দৃশ্য। এক মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন যে একটার পর একটা উড়োজাহাজ থেকে প্যারাসুটে শত শত ছত্রীসেনা নামছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আকাশটা প্যারাসুটে ভরে গেল, যেন সেগুলো পাখির মতো ভাসছে। এরপর আরও অবাক হওয়ার পালা। দেখা গেল, প্যারাসুটে ঝুলে কয়েকটা গাড়ি নামছে, আর নামছে বড় বড় কামান।
তবে যত না ছত্রীসেনা নেমেছিল, কাজ হয়েছিল তার চেয়ে বেশি। কেননা, ছত্রীসেনার সংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্ফীত হয়ে এবং পাকিস্তানিদের মনোবল ভাঙতে তা সহায়ক হয়েছিল। সানডে টাইমস-এর অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘৫০টি ফ্লাইং বক্সকার পরিবহন বিমানে করে ৫০০০ ছত্রীসেনা ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবতরণ করেছে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসছে ভারতীয় বাহিনী।’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত্ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একাংশ তখন পৌঁছে গিয়েছিল নরসিংদী। অন্যদিকে মেজর জেনারেল কৃষ্ণা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন আট মাউন্টেন ডিভিশন উপনীত হয়েছিল ফেঞ্চুগঞ্জে। মিত্রবাহিনীর পদাতিক সৈন্যরা ঢাকার কাছে পৌঁছে গেলেও মূল বাহিনী রয়ে গিয়েছিল অনেকটা পেছনে। যুদ্ধের ভারী সব উপকরণ বয়ে এনে ঢাকা অভিযান পরিচালনায় দরকার ছিল কিছুটা সময়। আগের দিন বেতার ঘোষণায় জানা গিয়েছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছে। যুদ্ধ যে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের কেন্দ্রে এবং জাতিসংঘে চলছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরেক খেলা। দুবার সোভিয়েত ভেটো দ্বারা প্রতিহত হওয়ার পর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য পুনরায় উত্থাপিত হয়েছিল। প্রত্যাশিতভাবে ১০৪ বনাম ১১ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেহেতু সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এর আশু রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না; কিন্তু বিষয়টি পুনরায় ফিরে আসে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। এ যাত্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভেটো প্রদান ছিল কঠিন, তাই চেষ্টা চলছিল আলোচনা দীর্ঘায়িত করার। অন্যদিকে পর্দার অন্তরালে চলছিল চীন-মার্কিন আঁতাতের রাজনীতি, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর জন্য উভয়ের মধ্যে নানা পাঁয়তারা।
সম্প্রতি বর্তমান লেখকের হাতে এসেছে বেশ কিছু অবমুক্ত মার্কিন দলিল, যা পর্দার আড়ালের কূটনীতির পরিচয় মেলে ধরে। এমনি এক গোপন দলিলে জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ নিউইয়র্কে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুয়ার সঙ্গে গোপন সভার বিবরণ দিয়েছেন। জর্জ বুশ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বৈঠকের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন এই রিপোর্টে। তাঁকে হোয়াইট হাউস ফোনে জানায় যে নিউইয়র্কের ৭৪তম স্ট্রিটের একটি অ্যাপার্টমেন্টে চীনাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং হেনরি কিসিঞ্জার ও আলেকজান্ডার হেগ এতে যোগ দেবেন। জর্জ বুশ লিখেছেন, “উইনস্টন লর্ড দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে কিসিঞ্জার ও হেগের উদয় হলো, এর পরপরই হুয়াং হুয়া ও তাঁর সহকারী দুই অনুবাদকসহ এসে হাজির। হেনরি ভারত-পাকিস্তান বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক নীতি মেলে ধরে বললেন, এই নীতি চীনাদের মতো একই। কিসিঞ্জার আরও জানান, ‘মাঝদরিয়ায় কয়েকটি জাহাজের গতি আমরা পরিবর্তন করেছি। জর্দান, তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে কিছু যুদ্ধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছি।’ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পতন ঠেকাতে প্রদত্ত সাহায্যের কথাও তিনি বলেন। আমাদের অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানকে অটুট ও সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবতে হবে। ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানকে পালিশ করার কাজ শেষ করে তারা কাশ্মীরের কতক অঞ্চলে প্রবেশ করবে। জবাবে হুয়াং হুয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। বললেন, প্রয়োজনে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করতে হবে।”
এরপর বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটি ঘটনার কথা জানা যায়। জর্জ বুশ লিখেছেন, ‘হুয়াং হুয়া জানতে চান, বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে বুশ সত্যিই দেখা করেছিলেন কি না। বাংলাদেশ শব্দটা চীনাদের কাছে একটি নোংরা শব্দ। আমি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি যে বিচারপতি (আবু সাঈদ) চৌধুরীকে নিয়ে এমন একটা রটনা সম্প্রতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তিনি থার্ড কমিটির সদস্য সেজে ভিন্ন রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের মিশনত্যাগী এক কর্মকর্তাও ছিলেন। এটা আমাদের জন্য ছিল বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং নিউইয়র্ক টাইমস যেমন লিখেছে, দুই দিন আগে তা নয়, দু-তিন সপ্তাহ আগে এটা ঘটেছে।’
জর্জ বুশ আরও এক কৌতুকপ্রদ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক ডেকে সংকটের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ প্রশ্ন ও ভারতের বিরুদ্ধে কিসিঞ্জারের যে কোনো বৈরিতা নেই, তেমন ধারণা তিনি দিতে চেয়েছিলেন। হুয়াং হুয়ার কাছে এই সাংবাদিক বৈঠকের রিপোর্ট দেন কিসিঞ্জার এবং জর্জ বুশ তাঁর নোটে লিখেছেন, ‘কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে বলেছেন যে তিনি পটভূমি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। এ কথা শুনে আমি অ্যাল হেগের দিকে ঝুঁকে তাঁকে মনে করিয়ে দেই যে ওই পটভূমির কার্যপত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গও রয়েছে, সেটা জানলে হুয়াং হুয়ার চুল খাড়া হয়ে যাবে।’
এমনি নানা খোলামেলা ভাষ্য মেলে এই নোটে, চীন ও আমেরিকা যে পরস্পরকে বুঝে নিতে চাইছিল, অপরকে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট ছিল, সেটা বেশ পরিষ্কার। আর এ ক্ষেত্রে কিসিঞ্জার ছিলেন পরম উত্সাহী। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও আচারের ধার ধারেননি। কিসিঞ্জারের কথাবার্তার ধরনেও জর্জ বুশ বেশ বিরক্ত বোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘হেনরি তাঁকে (হুয়াং হুয়া) বলেন যে জাতিসংঘে তাঁরা তাঁদের ইচ্ছেমতো প্রস্তাব আনতে পারেন, আমেরিকা সেটা সমর্থন করবে। এটা আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছিল। কেননা, চীনারা (জাতিসংঘে) কঠোর নিন্দামূলক ভাষায় কথা বলছিল। সোভিয়েতের মোকাবিলায় সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও যোগাযোগ রক্ষার পদ্ধতি বিষয়ে কথা বলতেও হেনরি আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানান যে ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে এবং তিনি ভুট্টোকে বলবেন কেবল তাঁর ও হেগের কথা শুনতে, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারও নয়।’ শোষোক্ত এই বক্তব্য থেকে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং কিসিঞ্জারের ঔদ্ধত্য ও শক্ত অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায়।
কূটনীতিক মহলের ভেতরের এসব বিবরণ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা বড়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পতন ঠেকানোর, চীনাদেরও প্ররোচিত করেছে সামরিকভাবে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর লক্ষ্যে বিশ্বজনীন আয়োজন এইভাবে ঘনীভূত হয়ে আসছিল এবং এর পরিচয় পাওয়া যায় আরেক গোপন মার্কিন দলিলে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ৮ ডিসেম্বরের টপ সিক্রেট-সেনসিটিভ ডকুমেন্টে। সেখানে সুপারিশকৃত পদক্ষেপের মধ্যে ছিল মার্কিন নৌশক্তিকে অবিলম্বে ভারত মহাসাগরে পাঠানো, চীনকে জানানো যে পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে চীন সামরিক ব্যবস্থা নিলে মার্কিন সরকার তা অনুকূল মনোভাব নিয়ে বিচার করবে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সিয়াটো/সেন্টোর জরুরি সভা আহ্বান ইত্যাদি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দ্বাদশ বা শেষ সুপারিশ, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘অবিলম্বে সিনক্ল্যানটের আওতায় সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতবহ সামরিক পরিকল্পনা সূচিত ও সক্রিয় করা।’
যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা-জনতা এবং ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে নিশ্চিত করে চলছিলেন বিজয়, আর রক্তপায়ী বর্বর পাকিস্তানি-সামরিক চক্রকে বাঁচাতে ক্রমেই মরিয়া হয়ে উঠছিল আমেরিকা ও চীন। মুক্তিযুদ্ধ উপনীত হয়েছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একেবারে মুখোমুখি। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে সামরিক-কূটনৈতিক অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিল নিক্সন প্রশাসন, ঝুঁকি নিতেও পরোয়া ছিল না তাদের। আর বাস্তবে চীন কী করবে, সেটা খোদ আমেরিকানরাও বুঝে উঠতে পারছিল না। আগামী দিনগুলো তাই ছিল অশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য় ৎ লিখেছেন মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

 

১৯৭১ ঝটিকা আক্রমণ December 11, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 10:36 pm

প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য়

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নীলক্ষেতে ধ্বংসস্তূপ ও লাশের মাঝখানে বিমূঢ় শিশু ও মা
ছবি: আনোয়ার হোসেন

অনেক তথ্য ঘেঁটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটা নিরপেক্ষ নির্দলীয় ইতিহাস লেখার চেষ্টা করেছেন গোলাম মুরশিদ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিতব্য এই গ্রন্থের নাম: মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর। এই গ্রন্থ থেকে একটি নির্বাচিত অংশ এখানে ছাপা হলো।

১৯৭১ সালের মার্চের ২৫ তারিখ রাত একটার অল্প পরেই শেখ মুজিবর রহমানকে সেনারা গ্রেপ্তার করে তাঁর বাড়ি থেকে। গ্রেপ্তারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লে. ক. জহির আলম খানকে। তিনি তাঁর অধীনস্থ মেজর বিল্লালকে নিয়ে যান ৩২ নম্বরে। জহির আলম তাঁর গ্রন্থ দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ (১৯৯৮) গ্রন্থে লিখেছেন যে গ্রেপ্তারের আগে তাঁর সেনাদের ওপর পিস্তলের একটা গুলি ছোড়া হয়েছিল। তার জবাবে তার সেনারা মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি ছোড়ে এবং একটা গ্রেনেড ফাটায়। শেখ মুজিব তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির তাঁকে প্রচণ্ড একটা থাপ্পড় দেয়। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকে আদমজী স্কুলে। তিন দিন পরে পশ্চিম পাকিস্তানে। (গ্রেপ্তারের আগে পিস্তল থেকে একটা গুলি ছুড়ে সেনাদের প্ররোচিত করা হয়েছিল—ধারণা করি, এ কথা একেবারে বানোয়াট। পিস্তল দিয়ে এক প্লাটুন সৈন্যকে আটকে রাখা যায় না—এটা মুজিবের মতো বিচক্ষণ নেতা কেন, একটি অপরিণত বালকও বুঝতে পারে।) সিদ্দিক সালিকের লেখাতেও কোনো পিস্তল থেকে কোনো গুলির কথা নেই। প্রবেশপথে পাহারাদারদের খতম করে দেয়াল টপকে বাড়ির চত্বরে ঢুকেছিল মেজর বিল্লালের পঞ্চাশ জন সৈন্য। তারপরই তারা গুলি করেছিল স্টেনগান দিয়ে—নানা দিক থেকে। দোতলায় উঠে মুজিবের শোবার ঘরের দরজায় গুলি করে দরজা খুলে সেই কক্ষে ঢুকেছিল তারা। মুজিব তৈরি ছিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। (সালিক, ১৯৭৮)
আহমদ সালিমও লিখেছেন যে গ্রেপ্তারের আগে মুজিবের বাসভবনের ওপর নানা দিক থেকে অসংখ্য গুলি ছোড়া হয়েছিল। (সালিম, ১৯৯৭) তাঁকে মেগাফোনে বলা হয়েছিল নিচে নেমে আসার কথা। তিনি তখন কাপড়-চোপড়ের ছোট্টো একটি ব্যাগ হাতে করে আর মুখে পাইপ দিয়ে নিচে নেমে এসেছিলেন। জিপে ওঠার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁর ওপর যে শারীরিক নির্যাতন শুরু করে, তার কথা তিনি নিজেই বলেছিলেন, ডেভিড ফ্রস্টকে। তিনি বলেন,
‘তারা আমাকে ধরে নিয়ে টানাটানি করে। আমার মাথার পেছন দিকে বৃষ্টির মতো ঘুসি মারতে আরম্ভ করে। আমাকে আঘাত করে রাইফেলের বাঁট দিয়ে। তা ছাড়া, তারা আমাকে এদিকে-ওদিকে ধাক্কা দিতে থাকে।’ (উদ্ধৃত, সালিম, ১৯৯৭)
নিজে ধরা দিলেও মুজিব আগে থেকে অন্য নেতাদের গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে তাজউদ্দীনকে তিনি শহরতলিতে পালিয়ে থাকার কথা বলেছিলেন। (আমীরউল ইসলাম, ১৯৮৮) শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খানকেও তিনি পালিয়ে গিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্যদেরও সম্ভবত বলে থাকবেন। কিন্তু অন্যরা পালালেও তাঁর নিজের পালানোর কোনো উপায় ছিল না। তাঁর মতো একজন নেতাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা যায় না। তার চেয়েও বড় কথা, পালানোর মতো মনোবৃত্তিই তাঁর ছিল না।
বদরুদ্দীন উমরের মতো কোনো কোনো সমালোচক বলেছেন, এভাবে ধরা দেওয়া তাঁর ঠিক হয়নি। এর ফলে তিনি বিপ্লবের নেতৃত্বে দিতে ব্যর্থ হন। (উমর, ২০০৬) কিন্তু এই সমালোচনাকে যথার্থ বলে মানা যায় না। কারণ, মুজিব চিরদিন সাংবিধানিক রাজনীতি করেছেন, বিপ্লবী রাজনীতি করেননি। তা ছাড়া তিনি সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে পাকিস্তানিরা অমন বর্বরোচিত হামলা করে লাখ লাখ লোককে হত্যা করতে পারে। আর ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন সত্যিকার নির্ভীক এবং আপসহীন। এর আগে বহুবার গ্রেপ্তার বরণ করেছেন তিনি। কারা বাস করেছেন বহু বছর। কিন্তু গ্রেপ্তারের ভয়ে কোনো দিন তিনি আত্মগোপন করেননি। অথবা তাঁর দল নিয়ে তিনি কোনো দিন কমিউনিস্টদের মতো গোপন আন্দোলনও করেননি।
নিয়াজি ও রাও ফরমান আলী লিখেছেন, তাঁরা মনে করেছিলেন রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার করেই স্বাধীনতা আন্দোলন বন্ধ করা যাবে। কিন্তু ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তা মনে করেননি। তাই তাঁরা চেয়েছিলেন এর ফৌজি সমাধান। ইয়াহিয়া আগে থেকে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দু-একবার প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছিলেন। যেমন—২২ ফেব্রুয়ারি জেনারেলদের সভায় তিনি নাকি বলেছিলেন, দরকার হলে ৩০ লাখ লোককে খতম করে দেওয়া হবে। বাকিরা তখন অনুগত ভৃত্যের মতো আচরণ করবে। (রুডলফ রামেল, ১৯৯৬)
এ জন্যই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসেন টিক্কা খানকে। এর আগে টিক্কা খান কঠোর হাতে বেলুচিস্তানের জনগণকে দমন করেছিলেন। সে ‘খ্যাতি’র কারণেই তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল বাঙালিদের দমন ও নিধন করতে। অন্য জেনারেলদের নিয়ে টিক্কা খান ১৮ মার্চ পরিকল্পনা করেছিলেন, মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশকে তিনি ‘বিদ্রোহী’মুক্ত করবেন। ২০ মার্চ এই পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। (সালিক, ১৯৮৮)
ব্যাপক গণহত্যার মধ্য দিয়ে জনতাকে হতভম্ব ও চুপ করিয়ে দেওয়াই ছিল এই ঝটিকা আক্রমণের উদ্দেশ্য।
তার জন্য অবশ্য সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করাই যথেষ্ট ছিল না। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর (বিডিআর) ও পুলিশকেও দমন করারও দরকার ছিল। মার্চ মাসের গোড়া থেকেই তাই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তাদের জায়গায় বসানো হয়েছিল পশ্চিমাদের। বেশির ভাগ বাঙালি কম্যান্ডিং অফিসারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল দায়িত্ব থেকে। যেমন—চট্টগ্রামের সবচেয়ে সিনিয়র বাঙালি অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ২৪ তারিখে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আনা হয় ঢাকায়। যেমন—খালেদ মোশাররফকে ২২ মার্চ ঢাকার ব্রিগেড মেজরের পদ থেকে সরিয়ে কুমিল্লায় বদলি করা হয়। যেমন—জয়দেবপুরে শফিউল্লাহর বাহিনীর কম্যান্ডিং অফিসার করে এক পশ্চিমা ব্যাটালিয়ন কম্যান্ডারকে পাঠানো হয় ২৫ মার্চের দু-তিন দিন আগে। যেমন—শাফায়েত জামিলকে কল্পিত ভারতীয় শত্রু দমন করার জন্য কমিল্লা থেকে পাঠানো হয় সিলেটের পথে। (জামিল, ২০০৯)
তা ছাড়া বাঙালি সৈন্য ও সেনাপতিদের রাখা হয়েছিল চোখে চোখে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিরস্ত্র করা হয় বহু বাঙালি সেনা-কর্মকর্তাকে। এমনকি অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহতও হন অনেকে।
২৫ মার্চ রাতে সৈন্য বাহিনী ঢাকায় যে হামলা চালায়, তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। এ হামলা যেমন অতর্কিত ছিল, তেমনি ছিল বিদ্যুত্ গতির। রাস্তায় বেরিয়ে সৈন্যরা মধ্যরাতের পর থেকেই নির্বিচারে হাজার হাজার লোককে মারতে আরম্ভ করেছিল।
স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্ররা বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। সে জন্য বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ওপর হামলা চালায় সৈন্যরা। তখনকার ইকবাল হল (সার্জেন্ট জহিরুল হক হল) ছিল ছাত্রলীগের ঘাঁটি—সেখানে সে রাতে অন্তত দু শ ছাত্র নিহত হন। ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং দুই দিন পরে এই হলে গিয়ে তখনো পোড়া কক্ষগুলোয় আধা-পচা লাশ দেখতে পান। দেখতে পান এখানে সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ। (ড্রিং, ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০. ৩. ১৯৭১) হিন্দু ছাত্রদের ওপর সৈন্যদের আক্রোশ ছিল আরও বেশি। তাদের ধারণা ছিল, জগন্নাথ হল কার্যত অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে। (সালিক, ১৯৭৬)
রাও ফরমান আলী লিখেছেন, সামরিক অভিযান শুরু হলে এই হল থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল। (ফরমান আলী তাঁর গ্রন্থে সত্য কথা কমই লিখেছেন। সুতরাং তাঁর কথাকে সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়ার কারণ নেই। তিনি এও লিখেছেন, ২৫ মার্চ রাতে কোনো ট্যাংক ব্যবহার করা হয়নি।) কিন্তু সে যা-ই হোক, এই হলে সৈন্যরা যাকে পায়, তাকেই হত্যা করে। কালীরঞ্জন শীলের মতো সেখান থেকে দু-চারজন ছাত্রই অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন। (কালীরঞ্জন শীল, [রশীদ হায়দার, ১৯৯৬])
ছাত্র ও কর্মচারীদের মৃতদেহগুলো হলের সামনের মাঠে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। সেই গণকরব খোঁড়ায় কালীরঞ্জনও অংশ নিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে সে শুয়ে পড়ায় সৈন্যরা তাঁকে মৃত বলে মনে করেছিল। এই হলে যে আগুন জ্বালানো হয় তা দুই দিন পরেও নিভে যায়নি বলে লিখেছেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। (বাসন্তী, ১৯৯১)
জগন্নাথ হলের প্রোভেস্ট ছিলেন জি সি দেব (গোবিন্দচন্দ্র দেব)। চিরকুমার, আপন-ভোলা মানুষ। দর্শনের অধ্যাপক। সৈন্যরা তাঁকেও হত্যা করে। জগন্নাথ হলের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ নম্বর বাড়িতে থাকতেন অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান আর জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। মুনিরুজ্জামানের বাড়িতে ঢুকে সৈন্যরা তাঁকে এবং অন্য তিনজনকে টেনে এনে সিঁড়ির ওপর গুলি করে হত্যা করে। নিচতলায় বাড়ি থেকে বের করে ঘাড়ের ওপর দুটি গুলি করে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার। তিনি হাসপাতালে মারা যান ৩০ মার্চ। গুলি করার আগে তাঁর কাছে নাম ও ধর্ম কী—তা জিজ্ঞেস করেছিল সৈন্যরা। এমনিতে তাঁকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথা বলে দয়া হয়েছিল কি না, জানা যায় না। কিন্তু হিন্দু শুনে আর দয়া করতে পারেনি। (বাসন্তী, ১৯৯১)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট-নয়জন অধ্যাপক নিহত হন এই রাতে। এই অধ্যাপকদের মধ্যে তিনজন ছিলেন হিন্দু।
আসলে হিন্দুরা পাকিস্তানের শত্রু এবং ভারতের দালাল বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। ফলে কেবল এই রাতে নয়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই হিন্দুদের ওপর নির্মমভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছিল। (ম্যাসকারেনহ্যাস, ১৯৭১)
নির্মম নির্যাতন করতে পাকিস্তানি সেনারা অকুণ্ঠ ছিল। কিন্তু হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করে হত্যা করা, শিশু-বৃদ্ধসহ হিন্দু পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করা এবং তাঁদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের দোসর রাজাকারেরা একটু বেশি বিশেষ উত্সাহী ছিল। (সরকার, ২০০৬)
বিদেশি সাংবাদিকদের বিবরণ থেকে জানা যায়, হিন্দু-নিধনের কাজ চালানো হয়েছিল পদ্ধতিগতভাবে এবং নীতি হিসেবে। (ডেইলি টেলিগ্রাফে লোশাকের রিপোর্ট, সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইমস, ভারজিন আয়ল্যান্ডস ডেইলি নিউজ, সানডে টাইমস [১৩ জুন], টাইমস [৫ জুন], সানডে টাইমস [১৩ জুন] এবং নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিভিন্ন সংখ্যা, অ্যান্টনি ম্যাকারেনহ্যাসের দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ [১৯৭১] গ্রন্থ ইত্যাদি দ্রষ্টব্য) আসলে, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে দেশছাড়া করতে। যাতে পূর্ব পাকিস্তান পুরোপুরি মুসলমানদের দেশে পরিণত হয়।
২৫ মার্চ রাতে, কেবল সাধারণ মানুষদের ওপর নয়, প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মীদের ওপরও। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর ও পুলিশকে খতম করা ছিল পশ্চিমাদের একটা বড় লক্ষ্য। তাই তারা একযোগে আক্রমণ করে পিলখানার ইপিআর ছাউনি এবং রাজারবাগের পুলিশ লাইনের ওপর। রাত ১২টায় এ দুই জায়গায়ই সেনারা পৌঁছে যায়।
পিলখানায় বাঙালি জওয়ানেরা প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন, কিন্তু বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। আগে থেকেই পশ্চিমা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের নিয়ে এসে সেখানে বাঙালিদের দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। জওয়ানেরা অনেকেই বুড়িগঙ্গার ওপারে গিয়ে নিজেদের সংগঠিত করতে চেষ্টা করেন। নিহত হয়েছিলেন অনেকেই। রাজারবাগের পুলিশেরা অতি তুচ্ছ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবল যুদ্ধ করেন, কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাধা দিতে পারেননি। এখানে এগারো শ পুলিশ ছিল। তার মধ্যে খুব কমই রক্ষা পেয়েছিলেন। বাকি সবাই নিহত হন। পুলিশ লাইনের একজন মহিলা সুইপার পরে সাক্ষী দিয়েছেন, পরের দিন থেকেই রাজারবাগ পরিণত হয় ধর্ষণকেন্দ্রে। বিভিন্ন বয়সের বাঙালি নারীদের—এমনকি বালিকাদের এনে এখানে ধর্ষণ করে তারপর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। এই মহিলাকেও উপর্যুপরি ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল। (তালুকদার, ১৯৯১)
প্রসঙ্গত বলা দরকার, ধর্ষণের ব্যাপারে পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশেষ উত্সাহী ছিল। তাদের বোঝানো হয়েছিল যে, এ হচ্ছে কাফের নিধনের জন্য ধর্মযুদ্ধ অর্থাত্ জেহাদ। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী জেহাদের মালামাল এবং নারীরা তাদের জন্য ‘হালাল’। কাজেই নয় মাস ধরে লাখ লাখ বাঙালি বালিকা, কিশোরী, যুবতী এবং মধ্যবয়সী নারীদের উপর্যুপরি ধর্ষণ করতে তারা বিবেকের কোনো দংশন অনুভব করেনি। জেনারেলরাও বাদ যাননি। নিয়াজি যেমন—সালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে জেনারেল খাদিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কখন তুমি তোমার রক্ষিতাদের আমার হাতে দিচ্ছ?’ সালিক এও স্বীকার করেছেন, ধর্ষণের বহু ঘটনা ঘটেছিল এবং এ জন্য নয়জন জওয়ানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। (সালিক, ১৯৮৮)
ঢাকায় কী ভয়ানক হামলা হয়েছিল তার বর্ণনা দেশি-বিদেশি অনেকেইে দিয়েছেন। এই হামলার ফলে কী ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল, তারও। সরকারি হিসাবে বলা হয়েছিল ৪০ জন নিহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর অফিসারদের মতে, এক শ। (সালিক, ১৯৭৬) সায়মন ড্রিং ব্যাংকক থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলেন, ঢাকায় সাত হাজার, দেশের অন্যান্য জায়গায় ১৫ হাজার। (ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ) ২৭ মার্চের ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড-এর মতে ১০ হাজার। ২৮ মার্চের নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতে ১০ হাজার; এ দিনের ডেইলি এক্সপ্রেস-এর মতে ৪০ হাজার। ২৯ তারিখের সিডনি হেরাল্ড-এ লেখা হয়, ১০ হাজার থেকে এক লাখ। নিউইয়র্ক টাইস-এর ১ এপ্রিলের সংখ্যা প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর সময়ে নিহতদের সংখ্যা ৩৫ হাজার। বাঙালিরা লিখেছেন, হাজার হাজার। কিন্তু সত্যিকারভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি। তবে সব মিলে ঢাকায় যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার সবচেয়ে ভালো বর্ণনা দিয়েছেন লে. জে. নিয়াজি। তিনি লিখেছেন:
“২৫ মার্চের সেই সামরিক অভিযানের নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়।…মেজর জেনারেল রাও ফরমান তাঁর টেবিল ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল মাটি লাল করে দেওয়া হবে।’ বাঙালির রক্ত দিয়ে মাটি লাল করে দেওয়া হয়েছিল।” (নিয়াজি, ২০০৮)
সেনাদের এই ঝটিকা আক্রমণ ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা দেশের বড় শহরগুলোতে একই সঙ্গে তারা আক্রমণ শুরু করে। বিশেষ করে প্রবল যুদ্ধ শুরু হয় চট্টগ্রামে। কারণ, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রসদ আসার এটাই ছিল একমাত্র পথ। সে পথ খোলা রাখাটা ছিল তাদের অগ্রাধিকার। অন্যান্য শহরে সেনাদের বিশেষ লক্ষ্য ছিলেন ছাত্র-শিক্ষক এবং হিন্দুরা।
বাঙালিরা পঁচিশের রাতে অতর্কিত হামলার কোনো জবাব দিতে না পারলেও পরের দিন থেকে পাকিস্তানি সেনারা কিছু বাধার মুখোমুখি হয়। বাঙালি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় এই হত্যাযজ্ঞে বাধা দেন। তাঁদের বেশি অস্ত্রশস্ত্র ছিল না; লড়াই করার জন্যে তাঁদের কেউ আদেশও দেননি; কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁরা যুদ্ধ শুরু করেন, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে যাঁরা ছিলেন—জেলা শহরগুলোতে ও সীমান্তে। ‘যার যা কিছু ছিল’ তা নিয়ে ইপিআরের জওয়ান, পুলিশ, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষেরা বাধা দিতে থাকেন পাকিস্তানি বাহিনীকে।

 

বাংলাদেশে হেমন্তের উত্সব December 4, 2009

Filed under: Culture,History(Dhaka) — rezowan @ 1:46 pm

লিখেছেন সাইমন জাকারিয়া ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো‘য়

নবান্ন

সারা অঙ্গে তার শীতল ভাব, অথচ কিছুতেই সে শীত নয়। ঘাসে, গাছের পাতায়, ঘরের চালে শিশির ঝরিয়ে শীতের সূচনা করে হেমন্ত। বাংলার ফসলের এই ঋতুকে কেন্দ্র করে কয়েকটি উত্সবের বর্ণনা দিয়েছেন সাইমন জাকারিয়া

নবান্ন

একসময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উত্পাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে তাতে পাক ধরে। কার্তিকের শেষ দিকে তাই গ্রামের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণে সেই কাটা ধান মাড়াই করা হয়।
এরপর শুরু হয় নবান্নের আয়োজন। এই আয়োজনে চাঁদ-সূর্য কিংবা গ্রহ-নক্ষত্রের তিথিকে অনুসরণ করা হয় না। নবান্নের আয়োজনের পুরোটাই নির্ভর করে ফসল ঘরে ওঠার ওপর। তাই একেক গ্রামে একেক সময় নবান্ন উত্সব হয়। সাধারণত কার্তিকে কাটা ধান অগ্রহায়ণে মাড়াই করে ধান থেকে আতপ চাল তৈরি করা হয়। ওই চাল থেকে তৈরি গুঁড়া দিয়ে শুরু হয় নবান্নের উত্সব।
রান্না করা হয় ক্ষীর-পায়েস। চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি করা হয় চিতই, পাটিসাপটা, পুলি, কুলসি হরেক রকমের পিঠা। আগের চেয়ে নবান্নের উত্সব বাংলাদেশে এখন কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। তবে এখনো অনেক জেলাতেই সাড়ম্বরে নবান্ন উত্সব করা হয়। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলায় নবান্ন উপলক্ষে বিবাহিতা মেয়েরা সন্তান-স্বামীসহ বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।
নবান্ন উত্সব এখন একটি সাংস্কৃতিক উত্সব হিসেবে ঢাকা মহানগরেও আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক বছর ধরে ঢাকায় নবান্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রা বের হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় দিনব্যাপী নবান্ন উত্সবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়। এসব শহুরে সংযোজনের পাশাপাশি গ্রামের পিঠা-পুলি উত্সবের একটি শহুরে রূপও এখানে দেখা যায়।
লালন স্মরণোত্সব
১৮৯০ সালে কার্তিকের, তথা হেমন্তের প্রথম দিনটিতেই কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে নিজের আখড়াবাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন লালন সাঁই। বাংলার এই অসামান্য বাউলসাধকের তিরোধান উপলক্ষে পয়লা কার্তিককে কেন্দ্র করে ছেঁউড়িয়ায় লালন সমাধি চত্বরে তিন দিনব্যাপী লালন উত্সব পালিত হয়।

লালন স্মরণোৎসব

লালন স্মরণোত্সবের নিজস্ব কিছু চরিত্র আছে, যা অন্যদের থেকে একে আলাদা করে ফেলে। এটা মূলত লালনপন্থী সাধুদের সম্মিলন উত্সব। মেলার এক প্রান্ত জুড়ে থাকে বাউলদের বাদ্যযন্ত্র বিক্রির দোকান। এসব দোকানে একতারা, দোতারা, ডুগি, প্রেমজুড়ি বা কাঠজুড়ি, মন্দিরার মতো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয়। লালন স্মরণোত্সবে লালনপন্থী সাধুদেরই তাঁতে তৈরি গামছা-লুঙ্গিও দিব্যি বিক্রি হয়। বিক্রি হয় সাঁইজির গানের ক্যাসেট ও গানের বই।
অন্যদিকে প্লাস্টিকের সামগ্রী, কারু দারু পণ্য থেকে আসবাবসামগ্রী, পাটি, মাটির পুতুল, মাটির হাঁড়ি, গয়না এসবও বেশ বেচাকেনা চলে মেলায়। মেলায় জমিয়ে বিক্রি হয় কুষ্টিয়ার তিলের খাজা। খাজার প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে লালনের গান, ‘হায় রে মজার তিলের খাজা/খেয়ে দেখলি নে মন কেমন মজা’!
ছেঁউড়িয়ার লালন স্মরণোত্সব ও দোলপূর্ণিমায় লালন সাধুসঙ্গের অনুষ্ঠান বর্তমানে যে চেহারা পেয়েছে তা খুব বেশি দিন আগের নয়। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত লালন উত্সব ছিল অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। সে উত্সব ছিল সাধু-ভক্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তখন দোলপূর্ণিমা কিংবা লালন স্মরণোত্সব ছিল মূলত সাধুসেবার অনুষ্ঠান—বাউল-ফকির সম্মিলন, সেবা ও সংগীত এবং দীক্ষানুষ্ঠান। সে সময় এখানকার অনুষ্ঠানের একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল।
কিন্তু ষাটের দশকে লালন আখড়ার অনুষ্ঠান দুটি প্রশাসনিক সহায়তায় আস্তে আস্তে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে পড়ে। তবুও কোনো কোনো বছর এই মেলার মধ্যেই চলে সাধুদের ‘দীক্ষা’ বা ‘ভেক খিলাফতের’ অনুষ্ঠান।
এই অনুষ্ঠানে লালন সাঁইয়ের মাজারকে সামনে রেখে খেলাফতের সাদা কাপড় পরিয়ে দেওয়া হয় লালন অনুসারীকে। এরপর সমাধিকে সাতবার প্রদক্ষিণের ভেতর দিয়ে দীক্ষা বা খেলাফতের অনুষ্ঠান পালিত হয়। খেলাফতের অনুষ্ঠানের মধ্যে ভিক্ষাপর্বে গান গেয়ে সাধুভক্তদের কাছ থেকে নতুন খেলাফতধারীরা ভিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
দুবলার মেলা
বাগেরহাট জেলার এই রাস উত্সবটি আলোচ্য তার অবস্থানের কারণে। সুন্দরবনের দক্ষিণে পশুর নদীর মোহনায় দুবলার চর নামে এক চরে প্রতিবছর রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে এক বিরাট মেলা বসে। ১৯২৩ সালে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত হরিভজন (১৮২৯—১৯২৩) এই মেলার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিবছর অসংখ্য পুণ্যার্থী রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে এখানে সমুদ্রস্নান করতে আসেন।
দুবলার চরে সূর্যোদয় দেখে সমুদ্রের জলে ফল, মূল ভাসিয়ে দেন ভক্তরা। সমুদ্র ও সূর্যের দিকে তাকিয়ে জীবনের শান্তি ও স্বস্তি ভিক্ষা করেন তাঁরা। কেউ কেউ আবার হারমোনিয়াম-মৃদঙ্গ-করতাল বাজিয়ে ভজন-কীর্তন গেয়ে নীরব দুবলার চরকে মুখর করে তোলেন। দুবলার চরের রাসমেলায় শুধু গ্রামীণ ও বনবাসী ভক্তকুল সমবেত হন না, দূর-দূরান্তের শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুবলার চরের মেলায় অংশ নিয়ে থাকেন।

দুবলার মেলা

দুবলার চর ছাড়াও বাংলাদেশে রাসমেলার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো—বাগেরহাটের খানপুর রাসপূর্ণিমার মেলা, ফরিদপুর ওড়াকান্দির রাসমেলা, দিনাজপুর কান্তনগর রাসমেলা, বরিশালের গোশিঙ্গা রাস উত্সবের মেলা, সিলেটের লামাবাজার রাস উত্সব মেলা।
রাসলীলা
অনেকে হেমন্ত ঋতুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন মনে করেন মণিপুরি জনগোষ্ঠীর রাস উত্সবকে। হেমন্ত ঋতুতে অনুষ্ঠিত মহারাস বাংলাদেশের মণিপুরি জনগোষ্ঠীর প্রধান উত্সব।
রাসপূর্ণিমার দিন রাত ১২টার দিকে মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠী আদমপুর ও মাধবপুর গ্রামের কিছু মণ্ডপে মহারাস পালন করে। মূলত মণিপুরি কিশোরীরাই মহারাসে অংশ নেয়। উত্সবের শুরুতেই বাদ্যকর ও গায়েন-দোহারদের সম্মিলিত ঐকতান। তারপর থাকে সম্মিলিত কণ্ঠে একটি রাগাশ্রিত ভক্তিমূলক গান। এরপর আসে আগমনী।
আগমনীতে একটি কিশোরী নাচের পোশাকে শ্রীরাধার সখী বৃন্দা সেজে এসে মণ্ডপে নৃত্য শুরু করে। বৃন্দার আগমনী নৃত্যগীতি শেষ হলে প্রদীপ আরতি শুরু হয়। তারপর বাঁ হাতে একটি কাচের স্বচ্ছ গ্লাস তুলে নেয়। গ্লাসের মধ্যে গোলাপি রঙের পানিতে সুগন্ধি মেশানো থাকে। হাতে একটি পাতাবাহারের পাতাসমেত ডাল নিয়ে মাঝেমধ্যে সুগন্ধি ছিটাতে থাকে।
এরপর সে ফুলের থালা হাতে নাচতে নাচতে ফুল সংগ্রহে বের হয় এবং মণ্ডপে রাখা ফুলগাছ থেকে কয়েকটি কাগজের ফুল সংগ্রহ করে মালা গাঁথে। এর পর মঞ্চে একটি আসন পেতে দিয়ে বিদায় নেয় বৃন্দা।
এরপর মণ্ডপে আবির্ভাব হয় কৃষ্ণরূপী এক বালকের। প্রথমেই দেখা যায়, কৃষ্ণ ঘুমিয়ে আছে। তার এক হাতের মুঠোর মধ্যে জরি দিয়ে সাজানো একটি বাঁশি। একসময় ঘুম থেকে উঠে নাচ শুরু করে কৃষ্ণ। সঙ্গে সঙ্গে গায়েনদের কণ্ঠের গানও বদলে যায়। কৃষ্ণ নাচ শেষ করে বৃন্দার রেখে যাওয়া আসনে বসে পড়ে। এভাবে কৃষ্ণর আসনে বসার ভেতর দিয়ে শেষ হয় রাসের দ্বিতীয় অঙ্ক। রাসের তৃতীয় অঙ্ক থাকে রাধা ও তার সখীদের দখলে।

রাসলীলা

কৃষ্ণ আসনে বসার পর সখীরা দলবেঁধে রাধাকে নিয়ে গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে মণ্ডপে প্রবেশ করে, ‘যাত্রা কইরো বামস্বরে বামপদ তুলি/যাত্রা কইরো বিনোদিনী।/মুখে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি/বামস্বরে বামপদ তুলি\’ বলা হয়ে থাকে এটি হচ্ছে ‘রাধা ও তার সখীদের আগমন গীত।’
একপর্যায়ে রাধা যখন কৃষ্ণের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন কৃষ্ণ প্রশ্ন করে, ‘কোন কারণে আইছো বৃন্দাবনে, গভীর-নিঘোর রাতে?’ উত্তরে রাধারানী লজ্জা পেয়ে যায়। আর সখীরা রাধার হয়ে কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে। কৃষ্ণ তাদের ক্ষমা করে দিয়ে প্রসন্ন বদনে এবার রাধার দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা যুগল মূর্তিতে প্রকাশ পায়।
গোষ্ঠলীলা
সাধারণত কার্তিক মাসেই রাসপূর্ণিমার চাঁদ ওঠে। এই পূর্ণিমার দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মৌলভীবাজার জেলার আদমপুর ও মাধবপুরে চলে গোষ্ঠলীলার উত্সব। মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সারা দিন এলাকা মাতিয়ে রাখে উত্সবে।
গোষ্ঠলীলা করা হয় পৌরাণিক চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠভূমিতে গোচারণকে স্মরণ করে। এদিন খুব সকাল থেকেই আদমপুর-মাধবপুরের বাড়ি বাড়ি তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। অনেক বাড়ির ‘মাংকোলে’ বা ঘরের বারান্দায় কৃষ্ণ অথবা রাখাল সাজানো হয়। তার মাথায় তুলে দেওয়া হয় ময়ূরের বহুবর্ণ চূড়া, নিচে লাল রঙের লেট্রেং, কপনাম। আর মাথার চূড়া থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় জোড়াফুল, জুড়া বা চুল। গলায় ফুলদান বা মালা পরিয়ে পাঙপঙ বেঁধে দেওয়া হয় দুই বাহুতে। এরপর থাবেরেত, থবল, ঘুঙুর, খাড়ু, আঙটি আর পিছনদারীতে রাজকীয় ভঙ্গিমায় সাজানো হয় কৃষ্ণ বা রাখালকে।

গোষ্ঠলীলা

সাজসজ্জা শেষ হতেই কৃষ্ণ বা রাখাল গোষ্ঠলীলার অনুষ্ঠানে রওনা দেয়। জোড়মণ্ডপে পৌঁছে তার জন্য নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসে। এ সময়ই প্রথম বোঝা যায়, কে কৃষ্ণ আর কে রাখাল। কারণ, কৃষ্ণ থাকে একদিকে একা। আর রাখালেরা থাকে দলবেঁধে। কৃষ্ণের পাশে মৃদঙ্গ-করতাল বাদক এবং মা যশোদারূপী দুজন নারী বসে থাকেন।
বাদ্যকর-গাহকেরা এবার বন্দনায় কৃষ্ণকে ডেকে চলে—‘এসো হে কানাই এসো/বলি বারে বারে\’ এমন বন্দনাগীত শুনে কেউ কেউ আবেগে আসরে ছুটে এসে শিশু কৃষ্ণের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েন। তখন অন্য কেউ এসে তাঁকে উঠিয়ে ভক্তদের মধ্যে নিয়ে যায়।
বন্দনাগীত শেষে বাঁশি হাতে দুই-দুইজন করে মোট চারজন সখা এসে কৃষ্ণ ও যশোদার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শিশুদের মতো ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বাদ্যের সঙ্গে বলতে থাকে—চলো গোষ্ঠে/চলো গো কানাই…।’ কৃষ্ণ বাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়—‘আর যাব না গোষ্ঠে/মাতার কথার বোল বলে/পিতার কথার বোল বলে/বলি আমি গোষ্ঠে আর যাব না।’ কৃষ্ণের কথা শেষ হতেই সখাদের উদ্দেশে এবারে মা যশোদা গেয়ে ওঠেন—‘তোমরা যাও হে/আর গোপাল দিব না গোষ্ঠে।’
সখারা পাল্টা গেয়ে ওঠে—‘শোনো বলি এবার/কানাই সঙ্গে নিতে চাই/গোষ্ঠে কানাই বাঁশি বাজায়/আমরা সবাই ধেনু চরাই/কানাই বিনে গোষ্ঠ কেমনে হয়…!’ এরপর কৃষ্ণ বলে ওঠে—‘মাগো মা তোর চরণ ধরি/গোষ্ঠে যাইতে বিদায় দে মা জননী/এই মিনতি করি।’
শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের কথায় এবং তার সখাদের দাবিতে কৃষ্ণকে গোষ্ঠে যাওয়ার অনুমতি দেন যশোদা। জোড়মণ্ডপ থেকে কৃষ্ণ ও তার রাখালসখারা এবার কদমতলার গোষ্ঠে চলে যায়। এবার গোষ্ঠের মূল আয়োজন শুরু হয়। এ আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ অসংখ্য রাখালের সম্মিলিত নাচ। নিরবচ্ছিন্নভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নাচ চলে। গোষ্ঠলীলার রাখালনৃত্যে কৃষ্ণের অসুর নিধন, সন্ন্যাসী ও দই বিক্রেতার সঙ্গে নাট্যাংশ অভিনীত হয়। সন্ধ্যায় মা যশোদার আরতিতে গোষ্ঠলীলায় রাখালনৃত্য শেষ হয়।

 

যেভাবে শুরু হলো যুদ্ধ December 3, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 7:45 pm

লিখেছেন মফিদুল হক ৎ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো’য়

ভারতীয় বিমানবাহিনী বোমা ফেলছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে। ঘরের চাল থেকে তা দেখছে ঢাকাবাসী
ছবি: আনোয়ার হোসেন, ঢাকা ১৯৭১

৩ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের পশ্চিম সীমান্তের কতক শহরে হামলা চালিয়ে ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর নাজেহাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কেন ভারত আক্রমণ করে যুদ্ধের সূচনা ঘটাল, সেটা অনেকের কাছে বড় জিজ্ঞাসা হয়ে রয়েছে। এর আগে ভারত মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে সীমান্ত অতিক্রম করলেও তা ছিল সীমিত সংখ্যায় ও সীমিত আকারে। ভারত যুদ্ধ শুরুর দায় নিজের কাঁধে নিতে চাইছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন প্রদানের নীতি গ্রহণের পরও এ ক্ষেত্রে ভারতের দ্বিধার মূল কারণ ছিল, বিশ্বের সামনে নিজেকে আক্রমণের সূচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হতে না দেওয়া। তা হলে পাকিস্তান কেন স্ব-উদ্যোগে যুদ্ধের সূচনা করল? এর উত্তর আসলে খুঁজতে হবে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ও এলিট চক্রের মানসের মধ্যে। দীর্ঘকাল রাষ্ট্রক্ষমতা যথেচ্ছভাবে ভোগের ফলে বিপুল সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র এক চক্র, যারা নিজেদের বুদ্ধি অথবা বুদ্ধিহীনতার আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে বিপুল মানুষের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয় দেয় চরম অবিমৃশ্যকারিতার। এ কারণেই তাদের হাতে প্রণীত হয়েছিল অপারেশন সার্চলাইটের মতো নিষ্ঠুর গণহত্যা-পরিকল্পনা, যা অচিরে পরিগণিত হয় জাতিহত্যা বা জেনোসাইডে। বিশ শতকের ইতিহাসে হিটলারের নািস বাহিনীর মতো আরেক ঘৃণিত বাহিনীর রূপ নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী, যদিও যেই কুিসত চেহারা আড়াল করার জন্য প্রসাধনী জোগানো হয়েছে অনেক দিক থেকে, বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাধরেরা দিয়েছে এক প্রলেপ, ইসলামের নাম ভাঙিয়ে লাগানো হয়েছে আরেক প্রলেপ।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল উভয় দেশ। সীমান্তজুড়ে অবস্থান নিয়েছিল সেনাবাহিনী; লজিস্টিক ও সরবরাহের ব্যবস্থাদি ছিল প্রস্তুত। কেননা, জানা ছিল না কখন কীভাবে শুরু হবে যুদ্ধ। ৩ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটায় রেডিও পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত এক বিশেষ সংবাদ প্রচার করে। এতে বলা হয়, ‘ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে আক্রমণ শুরু করেছে। বিস্তারিত খবর এখনো আসছে।’ ঠিক তখনই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো ভারতীয় লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশে উড়তে শুরু করে। পাঁচটা ৯ মিনিটে পেশোয়ার বিমানবন্দর থেকে হাজার পাউন্ডের বোমা নিয়ে ১২টি স্যাবর উড়ে যায় কাশ্মীরের শ্রীনগর ও অনন্তপুরের দিকে। এক মিনিট পর সারগোদা বিমানঘাঁটি থেকে আটটি মিরেজ উড়ে যায় অমৃতসর ও পাঠানকোটের দিকে। দুটি যুদ্ধবিমান বিশেষভাবে প্রেরিত হয় ভারত ভূখণ্ডের গভীরে আগ্রায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে। মোট ৩২টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এই আকস্মিক আক্রমনে।
সেই বিকেলে রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসের বিবরণ পাওয়া যায় ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকীর ইস্ট পাকিস্তান: দি এন্ড গেম বইয়ে। প্রেসিডেন্টের প্রেস উপদেষ্টা হিসেবে তাঁকে জরুরি তলব করে আনা হয়েছিল যুদ্ধ শুরুর প্রেস রিলিজ তৈরি করার জন্য। জেনারেল গুল হাসানের পরামর্শে একটি মুসাবিদা তৈরি করে তিনি অপেক্ষা করছিলেন প্রেসিডেন্টকে একবার তা দেখিয়ে নিতে। তিনি লিখেছেন, “মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড তখন ভেতরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও জেনারেল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। চীনা রাষ্ট্রদূত চ্যাং টাং দেখা করে চলে গেছেন। আমরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বের হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, তার পরে ভেতরে যেতে পারব। ইতিমধ্যে বেয়ারা পানীয় নিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর বিমানবাহিনীর প্রধান রহিম খান আমার দিকে ফিরে কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে জানতে চাইলেন আমি এখানে কী কাজে এসেছি। বললাম, ‘সাংবাদিকদের জানানোর আগে আমি প্রেসিডেন্টকে প্রেস রিলিজের ভাষ্য দেখিয়ে নিতে চাই’।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বিমানবাহিনীর প্রধান বললেন, ‘কিসের প্রেস রিলিজ? কেন এর প্রয়োজন?’ আমি বিহ্বল হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য শব্দ হাতড়ে ফিরছিলাম। ইতিমধ্যে জেনারেল গুল হাসান বললেন, ‘আপনি তো জানেন স্যার, রাজ্যের সাংবাদিক অপেক্ষা করছে কোন পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটল, তা জানার জন্য। আমাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেখাতে হবে।’
বিমানবাহিনীর প্রধান এবার গর্জে উঠলেন, ‘যুক্তি আবার কিসের? সাফল্যের চেয়ে বড় যুক্তি আর কি হতে পারে। এইক্ষণে আগ্রার আকাশে, আমার পাখিরা (মাই বার্ডস) শত্রুর জান কয়লা করে দিচ্ছে। আমি কেবল সুখবর শোনার অপেক্ষায় আছি।’
এভাবেই পাকিস্তান শুরু করেছিল যুদ্ধ এবং সুখবর আর রহিম খানের শোনা হয়নি। পরের কথা পরে, এমনকি সেই আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়েও ভারতের ক্ষতি করা গিয়েছিল যত্সামান্যই। ভারতীয় বিমানবাহিনীকে আকস্মিক আঘাতে ভঙ্গুর করে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান, বরং পরে দেখা গেল ভারতীয় প্রত্যাঘাতে তাদেরই হয়েছে বেহাল দশা।
অপরদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকলেও তা যে ৩ ডিসেম্বর এভাবে শুরু হবে, সেটা ভারতের কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কেননা, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তাঁকে জানানো হয় বিমান হামলার খবর। তিনি সমবেত জনতাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে যথারীতি বক্তৃতা শেষ করে দ্রুত চলে যান রাজভবনে। ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল অরোরা তাঁকে গোটা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং বিমানবাহিনীর প্রহরায় তিনি ফিরে আসেন দিল্লি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম ছিলেন বিহারে নিজ নির্বাচনী এলাকায়, অর্থমন্ত্রী চ্যবন বোম্বেতে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সভা শেষে গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বেতার ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে বলেন, ‘বাংলাদেশের যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে।’ তাঁর এই বক্তৃতা যখন চলছিল, তখন পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনজুড়ে গর্জে ওঠে কামান, ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলাও চলে যুগপত্। সেই রাতেই ঢাকা এবং আশপাশের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর শুরু হয় বিমান হামলা। বোমা বিস্ফোরণের প্রবল শব্দে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে অবরুদ্ধ ঢাকার মানুষজন। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী এবার সমুচিত শিক্ষা পেতে শুরু করেছে, এই অনুভূতি তাদের নির্ঘুম করে তোলে। পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া ট্রেসারে যখন চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন প্রায় নয় মাসের কৃষ্ণ দিনের অবসানের আলোকচ্ছটা যেন সবাই দেখতে পায়।
ইতিহাসে এ এক বিরল মুহূর্ত, যখন সর্বস্তরের মানুষ অভিনন্দন জানায় যুদ্ধকে। কেননা, এই যুদ্ধ যে মুক্তির জন্য যুদ্ধ।
মফিদুল হক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

 

ঢাকা এক চক্কর November 4, 2009

Filed under: History(ইতিহাস),History(Dhaka) — rezowan @ 1:49 am
ঢাকা শহরে থেকেও ঢাকাকে দেখেননি অনেকেই। এ শহরের চারধারে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস-অনেক ঐতিহ্য। একটু সময় করে ঘুরে আসুন ঢাকার ওলি-গলি। ঢাকায় এক চক্কর নিয়ে এই সপ্তাহে কড়চা’র বিশেষ বেড়ানো।

ঢাকা শহর ভ্রমণ নিয়ে বিনোদনের এ আয়োজনের প্রথম কিসত্দি ছাপা হলো এ সংখ্যায়। বাকী আরো দু’টি কিসত্দি পর্যায়ক্রমে অন্যকোন সময় ছাপা হবে বেড়ানো বিভাগে।
আমাদের ঢাকা ভ্রমণের শুরম্ন মোহম্মদপুরের সাতগম্বুজ মসজিদ থেকে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা পশ্চিমেই রয়েছে মুঘল আমলের একটি মসজিদ। নাম তার সাতগম্বুজ। ১৭শ শতকের শেষ দিকে নির্মিত এ মসজিদে শায়েসত্দা খাঁর আমলের স্থাপত্যিক নিদর্শন সুস্পষ্ট। মসজিদের চারকোনে চারটি এবং মাঝখানের তিনটি গম্বুজসহ এ মসজিদে মোট সাতটি গম্বুজ রয়েছে। কারম্নকার্য মণ্ডিত তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে মসজিদটিতে। মাঝখানের প্রবশপথটি দুইপাশের প্রবেশপথ থেকে কিছুটা বড়। এ মসজিদের নামে ধানমন্ডির সর্ববহৎ প্রধান সড়ক সাত মসজিদ সড়কের নামকরণ হয়েছে।
সাতমসজিদ দেখে এবার সাতমসজিদ সড়ক ধরে রিক্সায় চলুন আরেক মুঘল স্থাপনার খোঁজে। পুরনো ১৫ এবং নতুন ৮/এ ধানমন্ডিতে প্রাচীর বেস্টিত একটি ঈদগাহ্ চোখে পড়বে। ঈদগাহের কেন্দ্রীয় মিহরাবের শিলা লিপি থেকে জানা যায় শাহজাদা শাহ সুজার আমলে তাঁর দেওয়ান মীর আবুল কাশেম ১৬৪০ সালে ঈদগাহ্টি নির্মাণ করেন। এর আয়তন ২৪৫*১৩৭ ফুট। চারদিকে চুন সুরকির তৈরি উঁচু পুরম্ন দেয়াল বেস্টিত। দীর্ঘকাল ভগ্নদশা অবস্থায় থাকার পরে ১৯৮১ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর সংস্কার করে।
মুঘল আমলের এ স্থাপনাটি দেখে এবার চলুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অনেক দর্শনীয় স্থানের একটি হল কলা ভবনের সামনে গুরম্নদুয়ারা নানকশাহী। কথিত আছে শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরম্ন নানক ১৫০৪ সালে এখানে এসেছিলেন। অনেকটা এক গম্বুজ মসজিদ আকৃতিতে তৈরি এটি।
কেন্দ্রীয় গম্বুজ সম্বলিত কৰ ঘিরে কয়েকটি অলিন্দ ও কুঠুরী রয়েছে এর ভেতর। খিলানযুক্ত প্রবেশপথ দিয়ে এগুলো একটি অপরের সাথে যুক্ত। মাঝখানের কৰে রয়েছে শিখ ধর্মের ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থ সাহেব রাখার পবিত্র বেদী। প্রতি শুক্রবার প্রার্থনা উপলৰে এখানে অনেক শিখ ধর্মানুসারীর আগমণ ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশেই রয়েছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলামের সমাধি। কবির জীবনের তীব্র মর্মকামনা পূরণ করতেই তাকে এ মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। কবি নজরম্নলের সমাধির পাশেই রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পটুয়া কামরম্নল হাসান প্রমুখের সমাধিও।
এখান থেকে চলুন বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে। এককালের ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউজই এখনকার বাংলা একাডেমীর মূল ভবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আরেকটি প্রত্নতাত্তি্বক স্থাপনা হাজী খাজা শাহবাজের মসজিদ। শিশু একাডেমীর লাগোয়া উত্তর কোনে রয়েছে এ মসজিদটি। ৬৮*২৬ফুট আয়তনের এ মসজিদের চারকোণে চারটি আটকোণা বাতির মিনার বা টারেট আছে। এগুলো কার্নিশের অনেক উপরে উঠে নিরেট ছোট গম্বুজে শেষ হয়েছে। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশ পথ। মসজিদের প্রায় ৫০ ফুট উত্তর পূর্বে একখন্ড উঁচু জায়গায় রয়েছে হাজী খাজা শাহবাজের সমাধি। হাজী শাহবাজ তার মৃতু্যর আগেই এ মাজার নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। মসজিদের পশ্চিম পাশেই রয়েছে আমাদের তিন নেতার মাজার এবং তার সামনেই দেখা যাবে প্রাচীন ঢাকা গেট। ঢাকা শহরকে মগ দসু্যদের হাত থেকে রৰা করার জন্যই মীর জুমলা এ গেট নির্মাণ করেছিলেন।
ঢাকা গেট ধরে কিছুটা সামনেই রয়েছে কার্জন হল। ১৯০৪ সালের ১৪ ফেব্রম্নয়ারী ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড কার্জন এ ভবনটির ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন হয়। কার্জন হলেন স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট খুবই আকর্ষণীয়। ঘুরে দেখতে পারেন পুরো এলাকাটি।
এবার চলুন কার্জন হলের পেছনে আরেকটি স্থাপনা দেখতে। এটি হল মুসা খানের মসজিদ। মুসা খান ছিলেন ঈসা খান মসনদই আলার পুত্র। মসজিদটি পিতার নামে তাঁর পুত্র মূনাওয়ার খান নির্মাণ করেন। দ্বিতল বিশিষ্ট এ মসজিদের তিনটি গম্বুজ রয়েছে। মাঝের গম্বুজটি অন্য দু’টির চেয়ে অপেৰাকৃত বড়।
এখান থেকে অল্প দূরত্বে বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটির পেছনে এবং অমর একুশে হলের পশ্চিম পাশেই রয়েছে নিমতলী প্রাসাদ। মূল প্রসাদটি ধ্বংস হয়ে গেলেও এর আকর্ষণীয় ফটকটি এখনও ধ্বংসের প্রহর গুণছে। ধারণা করা হয় ব্রিটিশ আমল লে. সুইনটিন ১৭৬৬ খ্রীস্টাব্দে নায়েব নাজিম জসরত খানের বাসস্থান হিসেবে নিমতলী প্রাসাদও ফটক নির্মাণ করেন। ঢাকায় নায়েব নাজিমগণ ১৮৪৩ সাল পর্যনত্দ এখানে বসবাস করেন।
নিমতলী প্রাসাদ থেকে ৫ টাকা রিক্সা ভাড়ার দূরত্বে রয়েছে ঢাকার আরেক প্রাচীন স্থাপনা হোসনী দালান। শিয়া সম্প্রদায়ের ইমাম বাড়ি খ্যাত হোসনী দালান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পেছনে হোসনী দালান রোডে এটি অবস্থিত। ধারণা করা হয় শিয়া সম্প্রদায়ের নবাব নসরত জঙ্গ আঠারো শতকে এটি নির্মাণ করেন। পরে ১৮২৩ সালের তাঁর মৃতু্য হলে এখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে হোসনী দালানের বিশাল ৰতি হয়। পরে নওয়াব স্যার আহসানুলস্নাহ নিরানব্বই হাজার টাকা ব্যায়ে এটি পুননির্মাণ করেন। প্রতিদিন শত শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের আগমণ ঘটে এখানে। মহররম মাসে ঢাকার সবচেয়ে বড় তাজিয়া মিছিলটি বের হয় হোসনী দালান থেকেই।
ঢাকা বেড়ানোর প্রথম পর্বের শেষ এখানেই। রিকশা, টেক্সিক্যাব কিংবা নিজস্ব কোন বাহনে একদিনেই ঘুরে ফেলতে পারেন এ জায়গাগুলো।
লেখা ও ছবি মুসত্দাফিজ মামুন

 

অস্কারে বাংলাদেশের ছবি October 22, 2009

Filed under: Culture,History(Dhaka),People — rezowan @ 4:23 pm


২০০২ মাটির ময়না
পরিচালক : তারেক মাসুদ

২০০৫ শ্যামল ছায়া
পরিচালক : হুমায়ূন আহমেদ

২০০৬ নিরন্তর
পরিচালক : আবু সাইয়ীদ

২০০৭ স্বপ্ন ডানায়
পরিচালক : গোলাম রাব্বানী বিপ্লব

২০০৮ আহা!
পরিচালক : এনামুল করিম নির্ঝর

২০০৯ বৃত্তের বাইরে
পরিচালক : গোলাম রব্বানী বিপ্লব

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.