খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

নোয়াখালীতে গান্ধী October 16, 2009

ছবি: গান্ধী আশ্রমের সৌজন্যে যা ২ অক্টোবর ২০০৯এ দৈনিক প্রথম আলোয়

ভঙ্গুর সাকো পেরিয়ে পথ চলছেন
নোয়াখালীতে গান্ধী
 

মহাত্মা গান্ধী: সত্য ও অহিংসার অবতার October 16, 2009

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ  যা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়।

উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে কয়েকজন বড় নেতা ওই সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংগঠনিক অবস্থানের বাইরে থেকেও বহু বড় ব্যক্তিত্ব অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা জওহরলাল নেহরুর মতো বিরাট রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের রাজনীতিতে এমন এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, যাঁকে নেতা না বলে এক বিস্ময়কর ঘটনা বা প্রপঞ্চ বলাই ভালো। যেকোনো সমস্যা বা সংঘাত—রাজনৈতিক হোক, সামাজিক বা ধর্মীয় হোক—তা অহিংস উপায়ে সমাধানের শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। যে সত্যাগ্রহ নীতি তিনি তাঁর জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন, অবাস্তব মনে হলেও, তাঁর উদ্ভাবিত সেই সত্যাগ্রহ হলো যুদ্ধের বিকল্প।
গান্ধীজির জীবনের মূলমন্ত্র সত্য ও অহিংসা। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘পৃথিবীকে আমার নতুন কিছু শিক্ষা দেওয়ার নেই। সত্য ও অহিংসা পর্বতের মতো অতি পুরোনো জিনিস।’অতি পুরোনো অর্থাত্ শাশ্বত জিনিসকে তিনি জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন মানুষের সমাজে তার মূল্য কত বেশি।

১৮৯৩ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত গান্ধীর কর্মজীবন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তখন সেখানে বাস করত দেড় লাখ ভারতীয় শ্রমিক ও নাগরিক। ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ শাসকদের দ্বারা তারা ছিল নিপীড়িত। তাদের সামান্য উপার্জনের ওপর আরোপ করা হতো নানা রকম কর, রাস্তাঘাটে তারা হতো অপমানিত, বিচিত্র কালাকানুনে তাদের করা হতো নাজেহাল, মানবাধিকার বলে তাদের কিছু ছিল না। একটি মামলার ওকালতি করতে তিনি গিয়েছিলেন প্রেটোরিয়ায়। সেখানে তিনি ভারতীয় শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে তাদের পাশে দাঁড়ান। তাতে নিজেও নিপীড়িত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর যে মানবাধিকার আন্দোলন, এর তুলনা পৃথিবীতে বিরল।

আগেই বলেছি, প্রথাগত রাজনৈতিক নেতা তিনি ছিলেন না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফ্রিকা থেকে এসে তিনি কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে যোগ দেন। কোনো কংগ্রেস সম্মেলনে সেটিই তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা। তিনি লক্ষ করলেন, সব বড় বড় নেতা দামি পোশাক পরে গরম বক্তৃতা দিতে প্রতিযোগিতা করছেন। তিনি দায়িত্ব নেন স্থায়ী ও অস্থায়ী পায়খানাগুলো পরিষ্কার করার। ঝাড়ু ও বালতিতে পানি নিয়ে তিনি পায়খানা সাফ করতেন।

ভারতবাসীর মুক্তির সংগ্রামে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন গান্ধী। ১৯১৪ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি সারা ভারত ঘুরে মানুষের অবস্থা দেখেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী বছর দুই তিনি বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯২০ সালে বালগঙ্গাধর তিলকের মৃত্যুর পর কংগ্রেস অনেকটা নেতৃত্বে দুর্বল হয়ে পড়ে। গান্ধী এগিয়ে এলেন। এবারও তাঁর হাতিয়ার অহিংসা। ১৯২০ সালে তিনি শুরু করেন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। সে এক অভূতপূর্ব রাজনীতি। এমন এক অসহযোগ আন্দোলন, যার তুলনা উপমহাদেশের দুই হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা যায় না।

গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহ হলো অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিদ্রোহ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের স্বভাবে শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য সহজাত উপাদান রয়েছে। সেগুলোর সদ্ব্যবহারে বিশ্বে শান্তি স্থাপন ও মানুষের মুক্তি অর্জন সম্ভব।

অসহযোগ আন্দোলনের পরে তাঁর নেতৃত্বে আরেক বড় আন্দোলন ১৯৩০ সালের ‘লবণ সত্যাগ্রহ’। এরপর ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। এসব গণ-আন্দোলন ব্রিটিশ রাজত্বের ভিত্তি টলিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

১৯৩৩ সালের পর গান্ধীজি কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেন না। কিন্তু তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের পিতৃপ্রতিম শীর্ষনেতা। তবে জীবনের শেষ চার-পাঁচ বছর তিনি তাঁর সহকর্মীদের ক্ষমতার রাজনীতির মোহ লক্ষ করে হতাশ হন। ফলে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ। তখন তাঁর ভূমিকা হয়ে পড়ে মানবতাবাদী দার্শনিকের।

মহাত্মা গান্ধীর জীবনের শেষ বড় কর্মযজ্ঞ নোয়াখালী শান্তি মিশন। নোয়াখালীর দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় তিনি ১৯৪৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৭-এর মার্চ পর্যন্ত চার মাসের বেশি একনাগাড়ে অবস্থান করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭-এর পরও যে কয়েক মাস তিনি জীবিত ছিলেন, সমাজে ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

রাজনীতিবিদ হিসেবে গান্ধী হয়তো ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু মানুষ গান্ধী, মানবতাবাদী গান্ধী, শান্তিবাদী গান্ধী ও সত্যসন্ধানী গান্ধীর কোনো তুলনা উপমহাদেশে নেই। যে সত্য নিজের বিরুদ্ধে যায়, তাও তিনি অসংকোচে প্রকাশ করেছেন। তাঁর ছিল বিজ্ঞের মতো বৈষয়িক বুদ্ধি, কিন্তু শিশুর মতো সরল মন। তিনি ছিলেন অতি বিনয়ী। প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলতেন বন্ধুর আন্তরিকতা নিয়ে। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি এই মহান রাজনৈতিক সাধকের জীবনাবসান ঘটে আততায়ীর হাতে।
 

‘বাপু’ আসবেন বলে October 16, 2009

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন তৈমুর রেজা যা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়।

ক্যাসাব্লাংকার গল্প মনে আছে? ঝড়ের মুখে ডুবতে বসা জাহাজে বাবা তাকে হুকুম দিয়েছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ না আসি, তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।’ সবাই জাহাজ ছেড়ে গেল, বাবাও গেলেন। কিন্তু ক্যাসাব্লাংকা নড়ল না। বাবা বলে গেছেন, তাই অপেক্ষা করতেই হবে।

আজকের দিনে ক্যাসাব্লাংকা বা আমাদের বায়েজিদ বোস্তামীর গল্প অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু নোয়াখালীর জয়াগ গ্রামে গিয়ে আবিষ্কার করা গেল একে একে নয়জন ক্যাসাব্লাংকার গল্প। বাবার জন্য নয়, তাদের অপেক্ষা ছিল ‘বাপু’র জন্য। বাপু, মানে মহাত্মা গান্ধীর অপেক্ষায় তাঁরা কাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা জীবন। আর এই যুগের ক্যাসাব্লাংকাদের এই অপেক্ষার ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’।
সেই ক্যাসাব্লাংকারা হলেন গান্ধীর সঙ্গে শান্তির কাজে বাংলাদেশে আসা তাঁর নয়জন শিষ্য। গল্পের শুরু সেই ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি। মহাত্মা গান্ধী এলেন জয়াগের জমিদারবাড়িতে। প্রায় তিন মাস হলো নোয়াখালীতে এসে পৌঁছেছেন তিনি।
দাঙ্গার খবর পেয়ে তিনি গ্রাম পরিক্রমা করছেন। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন গান্ধী-অন্তঃপ্রাণ লোকেরা। তাঁরা গান্ধীর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন—ধর্মের, অহিংসার, শান্তির। যত দিন প্রাণ তত দিন তাঁদের যাত্রা।
গান্ধীজির গ্রাম পরিক্রমার ধারাটা অদ্ভুত। গাড়ি-ঘোড়া নেই। তিনি চলেন পদব্রজে। যেখানে রাত সেখানেই ঘুম। ভোরবেলা আবার যাত্রা। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এসে পড়েছেন জয়াগে। লোকলস্কর নিয়ে আশ্রয় নিলেন হেমন্তকুমার ঘোষের বাড়িতে।
হেমন্ত বাবু এ গাঁয়ের জমিদার। ভদ্রলোকের কপাল মন্দ। যেদিন গান্ধী পদধূলি দিলেন সেদিন তিনি বাড়িতে নেই। পরদিন সকালেই গান্ধী অন্যত্র চললেন। হেমন্ত বাবু গান্ধীর নাগাল পেলেন না। কিন্তু বাড়িতে গান্ধীর পদধূলি পড়ায় অভিভূত হয়ে গেলেন। আবেগ উথলানো হূদয়ে তিনি গান্ধীকে চিঠি লিখতে বসলেন। গান্ধীর শান্তিমিশনের কাজে তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করবেন, সব সম্পত্তি লিখে দেবেন গান্ধীকে। কিন্তু সম্পত্তি দিয়ে গান্ধী কী করবেন! স্মিত হেসে হেমন্ত বাবুর পত্রের উত্তরে বললেন, ‘আমার সম্পত্তির প্রয়োজন নেই। পারলে ওই সম্পত্তি শান্তিরক্ষার কাজে ব্যবহার করুন।’ হেমন্ত বাবু হুকুম শিরোধার্য করলেন। স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দিয়ে তৈরি করলেন ‘অম্বিকা-কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট’। আর সেই ট্রাস্টেই এসে কাজ শুরু করলেন গান্ধীর শিষ্যরা। কারণ, গান্ধীর আদেশ!
বিহারেও দাঙ্গা শুরু হওয়ার খবর পেয়ে নোয়াখালী ছেড়ে রওনা দিলেন মহাত্মা গান্ধী। ইচ্ছে ছিল আবার নোয়াখালীতে ফিরে গ্রামোন্নয়নে কাজ করার। রেলস্টেশনে এগিয়ে দিতে আসা জনাবিশেক শিষ্যকে তাই হুকুম করলেন, ‘নোয়াখালী ফিরে যাও। শান্তি আশ্রমে কাজ করতে থাকো। আমি শিগগিরই ফিরে আসব।’
গান্ধী চলে গেলেন। আর গান্ধীর আদেশ সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালীতে ফিরলেন গান্ধীর অনুসারীরা। বিপুল উদ্যমে তাঁরা শান্তি আশ্রমের কাজে ঝাঁপ দিলেন। কাজের তো আর অভাব নেই। একটা গ্রাম্য সমাজে যত রকম অসুবিধা হতে পারে, তার সব দিকে তাঁরা হাত লাগালেন। গান্ধী ফিরে আসবেন।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধী খুন হলেন। জয়াগ গ্রাম ত্যাগের ঠিক এক বছরের মাথায়। এই মৃত্যুর খবর সারা পৃথিবীতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল। নোয়াখালীর শান্তি মিশনেও পৌঁছাল এই খবর। গান্ধীর মৃত্যু এবং দেশভাগের প্রতিক্রিয়ায় আশ্রম ছেড়ে ভারতে পাড়িও জমালেন অনেক শিষ্য। কিন্তু এসব কিছুই বিন্দুমাত্র বিচলিত করল না নয়জন শিষ্যকে।
তাঁরা বিশ্বাসই করলেন না গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ! সত্যসাধক গান্ধী নিজের মুখে বলেছেন, তিনি ফিরে আসবেন। তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। সেই ফেরার পথ চেয়েই কাজ করে চললেন চারু চৌধুরী, রেড্ডি পল্লী সত্যনারায়ণেরা। কাজ করেন গ্রামের উন্নয়নে। কেউ বাচ্চাদের পড়ান, কেউ অহিংসার ব্রত শেখান। আর সত্যনারায়ণের মতো কেউ কেউ অক্লান্ত কাজ করে যান মানুষের জন্য। আজও সত্যনারায়ণের কাজের গল্প ঘুরে মানুষের মুখে। রামগঞ্জের এক বৃদ্ধ আবদুর রাজ্জাক মনে করলেন, “প্রতি রাতে এলাকার সব সাঁকোর দুই পাশে একটা করে হারিকেন ঝুলিয়ে দিতেন সত্যনারায়ণজি। কেউ যেন সাঁকো থেকে পড়ে না যায়। আমরা বলতাম, ‘এসব করে কী হবে?’ উনি হেসে বলতেন, ‘বাপু আবার আসবেন, তখন দেখবেন এসব’।” এই ‘বাপু’র পথ চেয়ে কাজ করে যাওয়ার পথটা সোজা ছিল না। পাকিস্তান সরকার তাঁদের শান্তি দিল না। ‘ভারতের এজেন্ট’ তকমা দিয়ে নানা রকম হেনস্তা শুরু হলো। এসব গান্ধীবাদী জেল খাটলেন বছরের পর বছর। তাঁরা জেলে পচে মরতে রাজি, কিন্তু গান্ধীর নির্দেশ আলগা করতে নারাজ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এঁদের মধ্যে চারজনের প্রতীক্ষা শেষ হয়ে গেল। গান্ধীর চারজন অহিংস অনুসারীকে তারা হত্যা করল। মদনমোহন চট্টোপাধ্যায় আর দেবেন্দ্রনারায়ণ সরকার ধ্যান করছিলেন। ধ্যানস্থ অবস্থায় গুলি করে মারা হলো তাঁদের।
সবচেয়ে আঁধার রাতও শেষ হয়, ভোর আসে। অবশেষে আসে স্বাধীনতা। আলো জ্বলে ওঠে। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি এক বিশেষ অধ্যাদেশবলে পুরোনো ট্রাস্ট পুনর্গঠন করে ‘গান্ধী আশ্রম বোর্ড অব ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করলেন। গান্ধীর অনুসারীরা যথারীতি আপন কাজ করতে থাকলেন। সেবাব্রত আর গান্ধীর জন্য প্রতীক্ষা। তিনি কথা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন।
গান্ধী ফিরবেন কি না, আমরা জানি না। তবে সেই মশালবাহকেরা জেনে খুশি হবেন, মশাল আজও জ্বলছে। এখনো গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট শান্তির জন্য, অহিংসার জন্য কাজ করে চলেছে। এখনো তাঁরা মানুষকে ডেকে বলেন, ‘অহিংসাই পরম ধর্ম’। এটা কি গান্ধীর প্রত্যাবর্তন নয়!
সেই নয় গান্ধীবাদী
১. রেড্ডি পল্লী সত্যনারায়ণ
২. চারু চৌধুরী
৩. দেবেন্দ্রনারায়ণ সরকার
৪. মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়
৫. সাধনেন্দ্রনাথ মিত্র
৬. বিশ্বরঞ্জন সেন
৭. রঞ্জনকুমার দত্ত
৮. অজিত কুমার দে
৯. জীবনকৃষ্ণ সাহা

 

কয়েকজন গান্ধী-দ্রষ্টার গল্প October 16, 2009

খাঁ খাঁ রোদ্দুরে পুড়ে যাচ্ছে চরাচর। আগুনের হলকা এসে লাগছে গাছতলায় বসে থাকা বৃদ্ধের শরীরে। কিন্তু উত্তাপ যেন স্পর্শ করে না নব্বইয়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে।

থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে দেন, অদৃশ্য একটা রাস্তা দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, ‘উই যে রাস্তা দেখা যায়। ওই রাস্তা দিয়ে বাপু হেঁটে যেতেন। হাতে লাঠি, এত্তোটুক একটা ধুতি পরা, চোখে গোল চশমা। আমরা অবাক হয়ে দেখতাম…’।
বিশ্বাস হতে চায় না যেন বর্ণনাটা। একটু সন্দেহের দৃষ্টিতে ফিরে তাকাতেই জ্বলে ওঠে বৃদ্ধের চোখ। আহত গলায় বলে ওঠেন, ‘আমি গান্ধীজিরে নিয়ে কি মিথ্যে কথা বলব! গান্ধীজি নিজে আমাগো রামধুন শিখিয়েছেন। শুনবেন?’
উত্তরের অপেক্ষা না করে ভাঙা, বেসুরো গলায় গেয়ে ওঠেন মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় ভজন—
‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম।
পতিত পাবন সীতারাম \’
মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর স্পর্শ পেয়েছেন আবদুস সাত্তার, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমরাও যেন দেখতে পাই, ‘এত্তোটুক একটা ধুতি পরা, চোখে গোল চশমা’, গান্ধীজি হেঁটে যাচ্ছেন।
আবদুস সাত্তারের বাড়ি নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলায়। সেই রামগঞ্জ, ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত ভারতবর্ষের আরও অনেক গ্রামের মতো একটি লোকালয়। এখনো দাঙ্গার সাক্ষী মেলে এখানে-ওখানে খুঁজলে। কিন্তু আমরা হানাহানির সাক্ষী খুঁজি না, শান্তির প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান করি। তাঁর সন্ধান দেন আবদুস সাত্তার, রাখাল রাজদত্ত ও আবদুর রাজ্জাক পাটোয়ারীর মতো গান্ধীদর্শীরা। যাঁরা সেই সময়ে কাছ থেকে দেখেছেন সেই মানুষটিকে।

 
 
 
 
 
 

 
মানুষটি এখানে এসেছিলেন ১৯৪৬ সালে। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি এবং ভারতের দ্বিখণ্ডিত হওয়া তখন অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সময়ে জ্বলে উঠল ভারতীয় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন। আগুনের সূত্রপাত কলকাতায়। অনেক জায়গার মতো সে আগুন ছড়িয়ে পড়ল এই নোয়াখালীতেও।

দাঙ্গার ভয়াবহতায় সেদিন কেঁপে উঠেছিল ভারতবর্ষ। নোয়াখালীর সেই দাঙ্গা থামাতে এক বুক বিশ্বাস নিয়ে ছুটে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তখন তাঁর বয়স ৭৭। গান্ধী আসবেন—এই একটা কথাই বদলে দিল পরিস্থিতি। আজও সেই সময়টা দিব্যি মনে করতে পারেন সাত্তার সাহেব, ‘কী ভয়ের একটা সময় ছিল! হিন্দুরা মুসলমানদের, মুসলমানেরা হিন্দুদের একটুও বিশ্বাস করতে পারত না। আমরা তো তখন ছোট ছোট ছিলাম। এর পরও বুঝতাম, কী একটা ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে। এখানে-ওখানে মানুষের ঘরে আগুন জ্বলছে, মানুষ খুন হচ্ছে। হঠাত্ একদিন শুনি, গান্ধী আসবেন। গান্ধী আসলে নাকি সব ঠিক হয়ে যাবে। গান্ধী কে! কিছুই বুঝি না, গান্ধীর নামও শুনি নাই। কিন্তু দেখলাম, গান্ধী আসবেন শুনেই কেমন যেন বদলে যেতে থাকল সবকিছু।’
গান্ধী এলেন। ট্রেনে করে নোয়াখালী এলেন। এসেই ঢুকে পড়লেন নোয়াখালীর গ্রামগঞ্জে। শ্রীরামপুর, চণ্ডীপুর, ফতেপুর—একের পর এক গ্রাম ঘুরে চলেছেন। এই করতে করতে একদিন গান্ধীর পদচিহ্ন পড়ল রামগঞ্জে। আবদুস সাত্তার, আবদুর রাজ্জাক—এরা তখন ছোট, দেখলেন গান্ধীর আগমন, তাঁর হেঁটে চলা।
আবদুর রাজ্জাক পাটোয়ারী বর্ণনা করে চলেন গান্ধীর সেই অভিযাত্রা, ‘অনেক দিন ছিলেন রামগঞ্জে। রোজ সকালে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আমাদের হাইস্কুলের মাঠে আসতেন। পথে সাঁকো ছিল। কোনো দিন একা একা পার হতেন। শরীর খারাপ থাকলে আবার কেউ হাত ধরত। একদিন ঝোলায় করেও পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। স্কুলমাঠে এসে প্রথমেই প্রার্থনা করতেন সবাইকে নিয়ে।’
সেই প্রার্থনার সময় খুব কাছ থেকে গান্ধীকে দেখার সুযোগ হয়েছে রাজ্জাক সাহেবের। চোখ দুটি শূন্যে ভাসিয়ে গান্ধীর মুখের বর্ণনা দেন, ‘মনে হতো উনি যেন ধ্যান করছেন। কাছ থেকে চশমার দিকে তাকালে মনে হতো ভেতরে বড় বড় দুটি চোখ। প্রার্থনা শেষ করে সবাইকে বারবার বোঝাতেন, মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি হিংসা করা অন্যায়।’
এতটুকু বিশ্রাম ছিল না তখন গান্ধীর। এই নোয়াখালীতে বসেই খবর পেয়েছিলেন, ভারত ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে গর্জে উঠেছিলেন, ‘আগে আমার শরীর দু টুকরো করো, তারপর ভারত ভাগ করো।’ শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন ব্যাপারটা। মেনে নিয়েছেন নিজের নিয়তি, মানুষের জন্য কাজ করা। কী সেই কাজ?
কাজের খানিকটা বর্ণনা করলেন রাখাল রাজদত্ত, ‘বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখতেন, কার কী অবস্থা। এলাকার পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন, কাজ করেছেন স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিয়েও। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন শান্তি নিয়ে।’
ওই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুবকদের বলতেন লাঠি খেলা, দৌড়-ঝাঁপে মন দিতে। সমাজের সেবা করতে। কীভাবে সেগুলো শেখাতেন, বললেন সাত্তার সাহেব, “অনেকগুলো লাঠি নিয়ে একটা করে সবার হাতে দিয়ে তা ভাঙতে বলতেন। পরে আবার অনেকগুলো লাঠি একসঙ্গে বেঁধে বলতেন ভাঙার জন্য। সেটা কেউ পারত না। তখন বলতেন, ‘ধর্মই আমাদের শিখিয়েছে এমন এক হয়ে থাকতে। হিন্দু-মুসলমান সবাই এক হয়ে থাকলে কেউ ভাঙতে পারবে না’।’’
এই শিক্ষা চলত গ্রামে, গ্রামান্তরে। স্বপ্ন ছিল বদলে দেওয়ার। গান্ধীর সেই বদলে দেওয়ার স্বপ্নের কথা বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে যান বৃদ্ধ রাখাল, ‘‘আমি তখন এখানে থাকতাম না। একদিন গ্রামে ফিরেছি। দেখলাম, স্কুলমাঠে সবার উদ্দেশে কথা বলছেন গান্ধীজি। বলছেন, ‘লাঠি নয়, তরবারি নয়, বন্দুক নয়; একটু হাসি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায়।’ এখনো আমার কানে বাজে গান্ধীজির সেই কণ্ঠ—ঈশ্বর আল্লাহ তেরে নাম।
সব কো সুমতি দে ভগবান \’’
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর নোয়াখালী প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমান

 

কেন অহিংস হবে না মানুষ October 16, 2009

Writer:রেজিনা বেগম

‘I have nothing new

to teach the world
Truth and non-violence are

as old as the hills’
Mahatma Gandhi
 

২ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস। ২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘ কর্তৃক দিনটি অহিংসা দিবস হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্তরালে যে মানুষটি তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং ২ অক্টোবর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্মদিন। যাঁরা ইতিহাসের ছাত্র নন তাঁরাও অবগত রয়েছেন যে ব্রিটিশ শাসকদের হাত থেকে মুক্ত হতে ভারতবর্ষ যখন সংগ্রাম করছে, তখন এই সংগ্রামে এক নতুন ধারার জন্ম হয়, যা অহিংস অসহযোগ আন্দোলন হিসেবে পরিচিত এবং এই আন্দোলনের প্রবর্তক মহাত্মা গান্ধীজি। ব্যক্তি মোহনদাস এবং মহাত্মা গান্ধীজি কি পৃথক সত্তা? একজন ব্যক্তি মোহনদাস এবং মহাত্মা গান্ধীজির ব্যবধান কতটুকু? সূক্ষ্ম চিন্তা করলে দেখা যাবে ব্যবধান শুধু মহাত্মা ও গান্ধীজি শব্দ দুটি। এই শব্দ দুটি যদি পরিহার করা যায় তাহলে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এসে পড়েন আমজনতার কাতারে। বহুল প্রচলিত একটি প্রবচন আছে যে ভারতবর্ষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে দক্ষিণ আফ্রিকাতে পাঠিয়েছিল আর ফেরত পেয়েছিল মহাত্মাকে। তাহলে বলা যাচ্ছে যে মহাত্মা > মোহন। মহাত্মা শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে মহত্ যে আত্মা। আধ্যাত্মিকতার প্রশ্ন না তুলেও বলা যেতে পারে যে মানুষ মাত্রই জন্মগ্রহণ করে একটি বিশুদ্ধ এবং নির্মল আত্মা নিয়ে, তাহলে মানুষ মাত্রই কেন মহাত্মা নয়? ব্যক্তিকে মহাত্মা হতে হলে অবশ্যই তাকে দেশ-কালের ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলের বাইরে বের হয়ে এসে সর্বকালের সার্বজনীনতার পর্যায়ে উন্নীত হতে হয়। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সর্বকালের সর্বজনীন হওয়ার যে প্রক্রিয়া তা তিনি নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এখানে যে বিষয় লক্ষণীয়, তিনি তাঁর আত্মজীবনীকে অভিহিত করেছেন ‘দি স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’ নামে। সত্য কি তাহলে এমন কোনো বস্তু যা কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়? বিষয়টি সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না যে ব্যক্তির জীবনে সত্যের অবস্থান তাকে সাধারণত্বের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। যারাই গান্ধীজির ‘আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ’ গ্রন্থটি উপলব্ধি করে অধ্যয়ন করেছেন তাদের মনে অন্তত সত্যের প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা জন্মেছে। কেবল সত্যকে আঁকড়ে ধরে মানবজীবনের সব সমস্যা সমাধান যে সম্ভব তার প্রামাণ্য দলিল বলা যেতে পারে এই আত্মজীবনী। মোহনদাসের মহাত্মা হওয়ার প্রক্রিয়ায় লক্ষ করা যায় সত্যের প্রাধান্য। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা হচ্ছে, যা সত্য তা যতই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকুক না কেন তা চিরন্তন সত্য হিসেবেই বিরাজমান, অপরপক্ষে একটি ভুল (কিংবা যদি বলা যায় মিথ্যা) যতই বিস্তার ঘটুক না কেন তা সত্যে পরিণত হবে না। তাঁর পুরো জীবনকে যদি এক কথায় বর্ণনা করা যায় তবে বলতে হয় এটি ছিল একটি সরলরেখার মতো, তিনি নিজে যাকে তুলনা করেছেন তরবারির ধারালো দিকের সঙ্গে, যা একই সঙ্গে সরু ও সোজা। এই তীক্ষ সরল পথে হাঁটতে তিনি আনন্দিত হয়েছেন, বেদনার্ত হয়েছেন যখনই তিনি এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, বিশ্বাস করেছেন সৃষ্টিকর্তার সেই আশ্বাস, যে সংগ্রাম করে সে কখনোই বিজিত হয় না। তিনি পা পা করে এগিয়েছেন সত্যের পথ ধরে, একত্র করেছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সত্যেকে এবং জীবনে যখনই উপস্থিত হয়েছে কোনো মহাসংকট তখনই তিনি আশ্রয় নিয়েছেন সত্যের, মুখোমুখি হয়েছেন বাস্তবতার, যে লক্ষ্যটি স্থির করতেন সেখানে পৌঁছার জন্য যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন, যখনই কোনো ভুল করেছেন তার শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছেন। প্রতিটি বিষয়ে পরীক্ষা করা ছিল তাঁর স্বভাবজাত, সেই প্রক্রিয়ায় তিনি পরীক্ষা চালিয়েছেন খাদ্য নিয়ে, স্বাস্থ্য নিয়ে, পরিচ্ছদ নিয়ে, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কার, নীতি, আধ্যাত্মিকতাসহ যা কিছু জীবনের একান্ত অংশ, তার কোনোটিই তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে রাখেননি। তাঁর আত্মজীবনী এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের দলিলমাত্র। এখানে একটি বড় প্রশ্ন মনে আসে, সত্যকে নিয়ে তিনি কীভাবে পরীক্ষা করেছেন? একটি বিষয় আমাদের কাছে প্রতীয়মান যে সত্যের স্বরূপ সন্ধানে গান্ধীজির পথটি কোনো নির্দিষ্ট সূত্রমতে এগোয়নি, যেমন দক্ষিণ আফ্রিকাতে যখন তিনি শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদ ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন তখনই উপলব্ধি করেছেন অহিংসা নামক সত্যকে, অর্থাত্ সত্যকে তিনি আবিষ্কার করেছেন নিজস্ব উপলব্ধির জায়গা থেকে। আবার এই নিজস্ব উপলব্ধি তিনি শুধু ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রাখেননি। যখনই তিনি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তখন সেই সমস্যাকে তিনি এককেন্দ্রিক না রেখে দেখেছেন সার্বজনীন ব্যাপ্তিতে এবং সেই প্রেক্ষাপটে সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। এই সমাধান খোঁজার প্রক্রিয়াটি হচ্ছে সত্যের পরীক্ষা। সত্যকে উপলব্ধি করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন ‘সত্যময় হওয়ার যাত্রাপথে অহিংসা একটি অবলম্বন।’ এখানে এসে তাহলে বলা যায় অহিংসার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে সত্য অর্জন কিংবা সত্য হচ্ছে অহিংসার মূলমন্ত্র।

তাহলে বিশ্ব অহিংসা দিবসের অর্থ কি একদিন শান্তি পদযাত্রা? নাকি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লড়াই করার নামে যারা সন্ত্রাস চালাচ্ছে সেই আমেরিকার সৈন্য, ন্যাটো ফোর্স বা ইসরায়েলি সৈন্যদের একদিন অস্ত্রবিরতি? বোধকরি খুব বেশি প্রয়োজন আমাদের আত্ম-অনুসন্ধান অথবা সত্যের অনুসন্ধান, কারণ বর্তমানে আমরা সত্যের থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছি আর তাই আমাদের জীবনটা চলছে ভুল পথে। আমরা মহাত্মাকে সযতনে তুলে রাখছি বইয়ের র্যাকে অথবা দেয়ালে ফ্রেমবন্দী করে আর নিজেরা ক্রমেই হয়ে যাচ্ছি নথুরাম গডসে। সম্মানিত পাঠক, অনুগ্রহ করে আজ অহিংসা দিবসে সত্যকে একটু খুঁজবেন কি? আমরা একজন মহাত্মাকে খুঁজছি, হয়তো তিনি নিজেই জানেন না, সত্য খুঁজতে খুঁজতে আমরা ঠিকই তাঁকে পেয়ে যাব কোনো একদিন।

 

এখনো বিক্রির শীর্ষে থাকে মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী October 16, 2009

ভারতে অহিংস আন্দোলনের নেতা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী মারা গেছেন আজ থেকে ছয় দশক আগে। কিন্তু আজও এই মহান রাজনীতিক সবার হূদয়ে দাপটের সঙ্গেই বিচরণ করছেন। সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ এখনো মহাত্মা গান্ধীর জীবনী থেকে প্রেরণা খোঁজে। তাঁর আত্মজীবনী দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ এখনো সর্বাধিক বিক্রি হওয়া বই। এই আধুনিক যুগেও ওই বই বছরে দুই লাখ কপি করে বিক্রি হয়। গুজরাটের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নবজীবন ট্রাস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।

গান্ধী পিস ফাউন্ডেশনের পরিচালক অনুপম মিশরা বলেন, ‘গান্ধীজি অবিরাম লিখতেন। লিখতে লিখতে যখন তাঁর ডান হাত ধরে আসত, তখন তিনি বাঁ হাত দিয়ে লিখতেন। এখনো তাঁর অনেক কাজ আছে যেগুলো প্রকাশ পায়নি। প্রায় ৩০ হাজার পৃষ্ঠার সমপরিমাণ গান্ধীজির চিঠি ও লেখা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে।’

এই বিপুল পরিমাণ অপ্রকাশিত লেখা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের পণ্ডিতেরা বলেছেন, গান্ধীজির এসব ছড়ানো-ছিটানো লেখা একত্র করে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা উচিত। এ পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীর যত লেখা পাওয়া গেছে তা ১০০টি খণ্ডে সংকলন করা হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার পৃষ্ঠায় লেখা ওই খণ্ডগুলোকেই গান্ধীজির পুরো আত্মজীবনী বলে ধরে নেওয়া হয়।
১৯২৯ সালে মহাত্মা গান্ধী নবজীবন ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানটিকে তাঁর সব কাজকর্ম প্রকাশের অধিকার দেন। ভারতে ১৯৫৭ সালের গ্রন্থস্বত্ব আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ৬০ বছর পর তাঁর কাজকর্ম অন্য কেউ জনসম্মুখে প্রকাশ করার অধিকার পাবে। এই আইন অনুযায়ী নবজীবন ট্রাস্ট এ বছরের ১ জানুয়ারি গ্রন্থস্বত্ব হারায়। তবে তারা গান্ধীর আত্মজীবনী প্রকাশনা এখনো বন্ধ করেনি। বর্তমানে নবজীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গতকাল শুক্রবার ছিল মহাত্মা গান্ধীর ১৪০তম জন্মবার্ষিকী। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা সংগঠন দিনটি পালন করেছে। এএফপি।

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.