খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

নোবেল পুরস্কার October 17, 2009

Filed under: Nobel Prize(নোবেল পুরস্কার) — rezowan @ 11:40 pm

 এ পর্যন্ত ৮০৬ জন ও ২৩টি সংস্থা নোবেল পুরস্কার লাভ করেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বা কোনো কোনো সংস্থা একাধিকবার পুরস্কারটি পেয়েছে।

 ফ্রান্সের জ্যাঁ পল সার্ত্রে ১৯৬৪ সালে সাহিত্যে আর ভিয়েতনামের লি দাক থো ১৯৭৩ সালে শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। সার্ত্রে বরাবরই প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন, আর লি ‘পুরস্কার গ্রহণের অবস্থায় নেই’ এই যুক্তিতে পুরস্কার নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

 এ পর্যন্ত ১২ জন নারী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রথম নারী অস্ট্রেলীয় লেখিকা ও শান্তিবাদী বার্থা স্টাটনার।

 সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন উইলিয়াম লরেনস ব্রাগ। ১৯১৫ সালে বাবা উইলিয়াম হেনরি ব্রাগের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে এ পুরস্কার পান তিনি।

 সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল জিতেছেন অধ্যাপক লিওনিদ হারউইজ। ২০০৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল ৯০।

 এ পর্যন্ত বেঁচে থাকা সবচেয়ে বয়সী নোবেল বিজয়ী রিটা লেভি মনটালচিনি। ১৯৮৬ সালে চিকিত্সাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রিটা এ বছরের ২২ এপ্রিল তাঁর ১০০তম জন্মদিন পালন করেছেন।

 স্বামী-স্ত্রী নোবেল জিতেছেন মেরি-পিয়েরে কুরি, আইরিন-ফ্রেডরিক জুলিয়ট, গার্টি-কার্ল কোরি, আলভা-গানার মিরডাল। আইরিন মেরি-পিয়েরে কুরির মেয়ে।

ওয়েবসাইট অবলম্বনে

 

সাহিত্যে নোবেল পেলেন জার্মানির হেরটা মুয়েলার October 9, 2009

Filed under: Nobel Prize(নোবেল পুরস্কার) — rezowan @ 9:31 pm

রুমানীয় বংশোদ্ভূত জার্মান লেখক হেরটা মুয়েলার সাহিত্যে ২০০৯ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সুইডিশ একাডেমি তঁার এ পুরস্কার পাওয়ার কথা ঘোষণা করে। সাহিত্যিক হিসেবে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তঁার সম্পর্কে বিচারকেরা বলেন, Èহেরটা মুয়েলার তঁার কবিতায় গভীর মনোনিবেশ ও গদ্যে অকপটতার মাধ্যমে বঞ্চিতদের চিত্র তুলে ধরেছেন।’

১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু করার পর থেকে ১২তম নারী হিসেবে হেরটা মুয়েলার এ পুরস্কার পেলেন। এর আগে ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ডোরিস লেসিং সাহিত্যে নোবেল জয় করেন।
হেরটা মুয়েলার ১৯৫৩ সালের ১৭ আগস্ট রুমানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রুমানিয়ার সংখ্যালঘু জার্মান পরিবারের সন্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তঁার মাকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি Èশ্রমশিবিরে’ পাঠানো হয়। রুমানিয়ায় হেরটার শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্য কেটেছে। সত্তরের দশকে তিনি রুমানিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কুর গোপন পুলিশ বাহিনীকে সহযোগিতা না করার অভিযোগে শিক্ষকের চাকরি খোয়ান। ১৯৮৭ সালে অভিবাসী হিসেবে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর আগ পর্যন্ত তিনি সরকারের হুমকির মুখে ছিলেন।

১৯৮২ সালে জার্মান ভাষায় লেখা হেরটা মুয়েলারের গল্পসংকলন নাডিরস প্রকাশিত হয়। এটিই তঁার প্রথম বই। বইটি চোরাই পথে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব দেশের জার্মানভাষী পাঠকদের কাছে বইটি দারুণভাবে সমাদৃত হয়। গল্পগুলোতে চসেস্কুর শাসনামলে রুমানিয়ার জার্মানভাষীদের গ্রামে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এ জন্য তত্কালীন রুমানীয় সরকার হেরটার গল্পগুলো কাটছঁাট করে। ১৯৮৪ সালে অপ্রেসিভ ট্যাংগো (ইংরেজি নাম) নামে তঁার আরেকটি গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটির কাহিনীতেও রুমানিয়ায় জার্মান ভাষাভাষীদের ওপর নিপীড়নের চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস দ্য পাসপোর্ট। এরপর গল্প, উপন্যাস ও কবিতার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে তঁার। মূলত একনায়ক চসেস্কুর আমলে রুমানিয়ায় বেড়ে ওঠা নিপীড়িত মানুষের জীবনচিত্রই উঠে এসেছে তঁার লেখনীতে।
রুমানীয় বংশোদ্ভূত অপর শীর্ষস্থানীয় লেখক রিচার্ড ওয়াগনার হলেন হেরটা মুয়েলারের স্বামী। সূত্র: এএফপি, এপি, বিবিসি, গার্ডিয়ান অনলাইন।
————————————————————————————————————-
*********************************************************************************
কেন হেরটা মুয়েলার
২০০৯-এ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী হেরটা মুয়েলারকে নিয়ে লিখেছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
এ বছর বেশ কানাঘুষা ছিল, ইসরায়েলি ঔপন্যাসিক অ্যামস ঔজ্ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েস ক্যারল ওটস্ অথবা ফিলিপ রথেরই ভাগ্যে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের শিকেটি ছিঁড়বে। অনেকেরই প্রতীতি ছিল, কোনো না কোনো মার্কিনকে এবার পুরস্কারটি দেওয়া হবে। এসব কানাঘুষা সাধারণত বাস্তবে রূপ নেয় না; নোবেল পুরস্কার মনোনয়নের ব্যাপারে সুইডিশ কমিটি যথেষ্ট গোপনীয়তা রক্ষা করে থাকে। নির্ধারিত সময়ে কমিটির স্থায়ী সচিবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগ পর্যন্ত জানা সম্ভব হয় না, কাকে পুরস্কার দেওয়া হলো। কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার সময় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করে থাকেন; যেমন ২০০৫-এ হ্যারল্ড পিন্টারকে অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে ‘হ্যারি পটার’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। সুইডিশ কমিটির সদস্যরা শর্ট লিস্টেড প্রার্থীদের বই পড়ার সময় অন্য বইয়ের জ্যাকেট লাগিয়ে নেন, যাতে বোঝা না যায় তাঁরা কী পড়ছেন।

তার পরও কিছু কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়ে যায়। যাঁরা নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে থাকেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের মনোনীত সাহিত্যিকের নাম একসময় আর গোপন রাখেন না। সারা বিশ্ব থেকে শত শত সাহিত্যিকের নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য পাঠানো হয়। তা থেকে প্রথমে ২৫ জনের, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৫ জনের তালিকা করা হয়। বছরের মে মাসের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের একটি শর্ট লিস্ট চূড়ান্ত করা হয়। জুন থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিশ্বের সাহিত্যামোদী মহলে জল্পনাকল্পনা চলে, এ শর্ট লিস্টকে কেন্দ্র করে বাজি ধরা হয় সম্ভাব্য সাহিত্যিকদের ওপর।
এটা ঠিক যে এ বছরের সম্ভাব্য সাহিত্যিকদের তালিকায় হেরটা মুয়েলারের নামটি ছিল এবং অ্যামস ঔজ্, জয়েস ক্যারল ওটস্ ও ফিলিপ রথের সঙ্গে এককাতারেই তা কখনো কখনো, বিশেষ করে যতই পুরস্কার ঘোষণার দিন-ক্ষণ এগিয়ে এসেছে, উচ্চারিত হয়েছে। তবু তাঁকেই নোবেলের জন্য মনোনীত করায় আপত্তি উঠেছে। নোবেল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে এ বছর একটি ভোট গ্রহণ প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ১২ অক্টোবর ২০০৯ পর্যন্ত ১১ হাজার ২৯২ জন ভোটদাতার মধ্যে ৯৩ শতাংশ ব্যক্তি তাঁর কোনো লেখাই পড়েননি। আরেকটি বিষয়ে ভোট নেওয়া সম্ভব ছিল: নোবেল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কতজন এ লেখকের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এতে হিসাবের খুব একটা তারতম্য হতো বলে মনে হয় না। অগ্রগণ্য মার্কিন সাহিত্যিক হ্যারল্ড ব্লুম অকপটে জানিয়েছেন, পড়া দূরের কথা, তিনি এ পর্যন্ত মুয়েলারের নামই শোনেননি। ব্লুমকে সম্ভবত পড়ার চেয়ে লেখা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়; তিনি যত বই লিখেছেন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জীবনে ততগুলো বই পড়ে উঠতে পারে না।
প্রধানত তুলনামূলকভাবে অপরিচিত হওয়ায় মুয়েলারের নোবেল প্রাপ্তিতে বেশ খানিকটা শোরগোল উঠেছে। খোদ বার্লিনের সাধারণ পাঠকমহলে মুয়েলার খুব প্রিয় কোনো নাম নয়। তবে এটা তো ঐতিহাসিক সত্য যে পাঠকের আনুকূল্য এবং নোবেল পুরস্কার সর্বদা একসঙ্গে যায় না। ১৯১৬ সালে নোবেলজয়ী সুইডিশ সাহিত্যিক ভেনে ভন হাইডেনস্টামের (Verner von Heidenstam) নাম আজ অনেকটাই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে।
জার্মান কথাসাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের পর জার্মানির লেখক হিসেবে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে হেরটা মুয়েলারের মূল্যায়ন হবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। তবে তা হয়তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাঁর মাত্র চারটি উপন্যাস এবং একটি ছোটগল্প সংকলন আজ পর্যন্ত ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। পুনর্মুদ্রণের আগে সেগুলোও বিশ্বব্যাপী সাধারণ পাঠকের হাতে পৌঁছাবে না। ২০০১-এর পর তাঁর কোনো বই ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়নি।

২.
হেরটা মুয়েলারের প্রথম পরিচয়—তিনি রুমানিয়ায় জন্ম নেওয়া একজন জার্মান। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ আগস্ট তাঁর জন্ম। পরিণত বয়সে, ১৯৮৭ সালে রুমানিয়া ছেড়ে চিরকালের জন্য জার্মানিতে এসে নতুন ঠিকানা করেছেন তিনি। তিন যুগেরও বেশি সময় এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। তবু রুমানিয়ার জীবন তাঁর সাহিত্যিক চিন্তা-চেতনার প্রধান উপজীব্য। শৈশব-যৌবনের ৩০টি বছর কেটেছে একপতি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি চিন্তা ও প্রকাশের স্বাধীনতার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। গোপন নিরাপত্তা (এসএস) পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অসম্মত হওয়ায় তাঁকে চাকরি হারাতে হয়েছে। লেখালেখির মধ্যে তিনি একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবীর অন্বেষণ করেছেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ছিল ১৫টি গল্পের একটি সংকলন, যা ইংরেজি অনুবাদে নাডিরস প্রচ্ছদ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর তিনি অনবরত লিখেছেন। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ অনূদিত হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার কিছুক্ষণ পর টেলিফোনে নেওয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘আমি গল্প খুঁজি না, গল্পই আমাকে খুঁজে নেয়।’ আবার বলেছেন, ‘আমি মুখ্যত নিজের জন্যই লিখি। লেখার মধ্য দিয়েই বাস্তবতার প্রকৃত রূপটি সঠিকভাবে উপলব্ধ হয়।’ ফলত তাঁর রচনার আখ্যানভাগ আত্মজৈবনিক। কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, নিজ গোত্রের কাছেও তিনি বৈরিতা পেয়েছেন। ফলে তাঁর রচনায় প্রত্যক্ষ হয় আত্মোপলব্ধির নিরঞ্জন প্রতিফলন। পাঠকের মুখাপেক্ষিতা তাঁকে প্রভাবান্বিত করেনি কখনো।
মুয়েলারের ভাষাভঙ্গি সম্পর্কে ‘কবিতার একাগ্রতা’ এবং ‘কথাসাহিত্যের নিরাবরণতা’—এ দুটি কথা ব্যবহার করা হয়েছে ৫৯ সেকেন্ডের নোবেল ঘোষণায়। আর তৃতীয় বিষয়টি তাঁর লেখার উপজীব্য নিয়ে: উদ্বাস্তু মানুষের পরিপ্রেক্ষিত। কেবল এটুকু দিয়ে একজন লেখকের নোবেলযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না; কিংবা তাঁর সাহিত্যপ্রতিভা সম্পর্কেও নতুন কারও মনে প্রতীতি উত্পাদন করা যায় না। সমনোযোগ পাঠের মাধ্যমেই পাঠককে পরিচিত হতে হবে মুয়েলারের সঙ্গে। তাঁর কোন বইটি প্রথমে পড়বেন? মুয়েলার বলেছেন, সর্বশেষ বইটি নিতে যার প্রচ্ছদ নাম রাখা হয়েছে Die Atemschaukel; সর্বশেষ এ বইটি এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়। ডোনাল ম্যাকলাফলিনের ইংরেজি অনুবাদের প্রচ্ছদ নাম দেওয়া হবে Everything I Possess I Carry With Me (বাংলায়: আমার যা কিছু আছে তা নিয়েই আমি পথ চলি)। এ উপন্যাসের প্রথম অনুচ্ছেদ থেকে মুয়েলারের রচনাশৈলী সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া কি সম্ভব?
‘১৯৪৫-এর জানুয়ারি, কিন্তু যুদ্ধ তখনো চলছিল। এ গভীর শীতের মধ্যে রুশরা আমাকে কে জানে কোথায় নিয়ে যাবে শুনে সবাই আমার জন্য কিছু না কিছু একটা নিয়ে এসেছে; সেগুলো হয়তো কোনো কাজেই লাগবে না। আসলেও আর কিছুতেই কিছু যাবে-আসবে না আমার। কপালের ফের অপরিবর্তনীয়: রুশদের তালিকায় আমার নাম উঠে গেছে, অতএব সবাই কিছু না কিছু নিয়ে এসেছে, আর যার যা মনে এসেছে কোনো একটা পরিণতি ভেবে নিয়েছে। সবই আমি গ্রহণ করেছি। আর সেই ১৭ বছর বয়সেই ভেবেছি, বিদায় হওয়ার জন্য সময়টা আদৌ মন্দ নয়। রুশদের তালিকায় নাম না উঠলেও হয়তো আমি কেটে পড়তাম, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ মোড় নিয়েছিল যে সেটাই যথোচিত হতো। এ শহরটার ঘেরাটোপ থেকে আমি নিষ্কৃতি চেয়েছিলাম। এটা এমন একটা শহর, যার পাথরগুলোও নজরদারি করে। ভেতরে ভেতরে আমি যতটা অধীর হয়ে উঠেছিলাম ভয় ততটা দানা বাঁধেনি। আর আমার নীতিবোধের বালাই যতটুকু ছিল, তাতে ওই রুশদের তালিকায় নাম ওঠা নিয়ে আত্মীয়স্বজনের মনঃকষ্ট আমাকে তেমন বিচলিত করেনি। তাদের আশঙ্কা, ভিনদেশে আমার পোড়া কপালে না জানি কী ঘটবে! আর আমি চেয়েছিলাম, এমন কোথাও যেতে, যেখানে আমাকে চিনে ফেলার মতো কেউ নেই।’
একটি অংশে আমরা পাঠ করি, ‘সুগভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে আমি নিজেকে অন্তরীণ করেছি এবং তা এত দীর্ঘকাল ধরে যে ভাষায় আর নিজেকে অবমুক্ত করতে পারি না। আমার মুখ খোলা মানে নিজেকে নতুন কোনো মোড়কে আবৃত করা।’ তাঁর মাতৃভাষা জার্মান। কিন্তু তাঁর রচনাশৈলীতে রুমানীয় ভাষার প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাঁর ভাষার যে কাব্যিক সৌন্দর্য সুইডিশ কমিটি প্রত্যক্ষ করেছে, তা সম্ভবত রুমানীয় ভাষার অবদান। উদ্ধৃতিতে এ কাব্যিকতা আভাসিত। মুয়েলার নিজেও বলেছেন, রুমানীয় বাক্প্রতিমার সমৃদ্ধি উপেক্ষণীয় নয়।
ইংরেজিতে অনূদিত উপন্যাস দি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আলোচনাক্রমে নিউইয়র্ক টাইমস-এর গ্রন্থালোচক পিটার ফিলকিনস লিখেছিলেন, মুয়েলারের উপন্যাসপাঠ সহ্যশক্তির পরীক্ষা বটে, সেটা আদৌ সুখকর কোনো অভিজ্ঞতা নয়। উপর্যুক্ত ক্ষুদ্র উদ্ধৃতির ভিত্তিতে কোনো ঔপন্যাসিকের মূল্যায়নের প্রচেষ্টা কেবল অন্যায্য নয়, তা আস্পর্ধাও বটে। তবে এটুকু প্রতীয়মান হয় যে মুয়েলার মূলত গল্পকার নন। কথকতা তাঁর বৈশিষ্ট্য এবং শ্রোতার মুখাপেক্ষিতা তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করে না। কী এ লক্ষ্য? তাঁর লক্ষ্য নিজ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা। অতএব তাঁর বিষয়বস্তুর বৈশিষ্ট্য আত্মজৈবনিকতা। তিনি বলেছেন, সাহিত্য সর্বদাই এমন ঘটনা থেকে উত্সারিত, যা কাউকে সরাসরি রক্তাক্ত করেছে এবং একশ্রেণীর সাহিত্যে বিষয়বস্তু নির্বাচনে লেখকের ভূমিকা থাকে না; বরং তিনি সে বিষয়ই উপজীব্য করেন যা তাঁর ওপর নিক্ষেপিত হয়েছে।
এটা ঠিক যে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, একপতি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকৃতাচার, পরিপার্শ্বের অন্যায় বৈরিতা বা কয়েদখানার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস রচিত হয়েছে; কিন্তু মুয়েলারের সঙ্গে একমত হওয়া দুরূহ যে লেখকের ব্যক্তিগত রক্তক্ষরণই সাহিত্যের প্রধান উত্স-সরোবর। কেননা মানুষের জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। সাহিত্য কেবল অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নয়, এতে কল্পনার একটি তাত্পর্যপূর্ণ অবদান আবশ্যক। অনস্বীকার্য যে ভাষার কুশলতা এবং প্রকাশভঙ্গির স্বকীয়তা একজন লেখককে বিশিষ্ট করে তোলে। বলা যায়, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির কারণেই একজন গল্পকার পরিণত হয় কথাসাহিত্যিকে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে গল্পই পাঠকের প্রধান অভীষ্ট। এ লক্ষ্য এড়িয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছানো ঔপন্যাসিকের জন্য দুরূহ। হয়তো হতভাগ্য রুমানিয়ার একপতি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নে ধর্ষিত সমাজ-মানসের প্রতিরূপ সাহিত্যে হেরটা মুয়েলারের মতো নিখুঁতভাবে ধারণ করা আর কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু এটাই একজন লেখকের মূল দায়িত্ব কি না, সে প্রশ্ন চিরকালই তর্কাধীন হয়ে থাকবে। মহত্ লেখক আত্মসত্তা কিংবা সমাজ—সম্ভবত কারও কাছেই দায়বদ্ধ থাকেন না; দায়বদ্ধতার ঋণ পরিশোধ করা ঔপন্যাসিকের কাজ নয়।

 

চিকিত্সাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী October 7, 2009

Filed under: Nobel Prize(নোবেল পুরস্কার) — rezowan @ 2:37 pm

যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিজ্ঞানী ২০০৯ সালের চিকিত্সাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তারা হলেন-অষ্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন, ব্রিটেনে জন্মগ্রহণকারী জ্যাক সোজস্ট্যাক ও ক্যারল গ্রেইডার। পুরস্কারের অর্থ ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রাউন তারা ভাগাভাগি করে নেবেন। আজ সোমবার সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট একথা জানিয়েছে।

ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট বলেছে,এই তিনজন জীববিজ্ঞানের একটি বড় সমস্যার সমাধান করেছেন।”

 

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন তিন আলোকবিজ্ঞানী October 7, 2009

Filed under: Nobel Prize(নোবেল পুরস্কার) — rezowan @ 1:34 pm
চার্লস কাউ, উইলার্ড বয়েল ও জর্জ স্মিথকে পদার্থবিজ্ঞানে ২০০৯ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। সুইডেনের ‘দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি’ মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেয়। ফাইবার অপটিক ক্যাবল এবং কাচের হালকা তার উন্নয়নে যুগানত্দকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চার্লস কাউকে এ পুরস্কার দেয়া হয়। হালকা ও সূক্ষ্ম এ তারের মধ্য দিয়েই ফোন ও নেটডাটা আলোকমাধ্যমে পরিবাহিত হয়। অন্য দুই বিজ্ঞানী বয়েল ও স্মিথকে তাদের উদ্ভাবিত চার্জড কাপলড ডিভাইস বা সিসিডির জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এ সিসিডি বা আলোক নির্দেশকই সব ধরনের ডিজিটাল ক্যামেরার বৈদু্যতিক চোখ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খবর বিবিসি, এএফপি ও এপির।


দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি জানায়, দুটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের জন্য এবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। উদ্ভাবিত এ দুটি উপকরণ বর্তমান পৃথিবীর নেটওয়ার্কভিত্তিক সমাজ গড়ায় গুরম্নত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। উপকরণ দুটির উদ্ভাবক তিন বিজ্ঞানীকে ‘মাস্টার অফ লাইট’ আখ্যায়িত করে নোবেল কমিটির জুরি বলেন, আজকের পৃথিবীতে তথ্য-প্রযুক্তিতে যে বিপস্নব সাধিত হয়েছে কাউ, বয়েল ও স্মিথ সেই বিপস্নবের সারথী।
একাডেমির ঘোষণায় বলা হয়, পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ চার্লস কাউকে দেয়া হবে। চীনের সাংহাইয়ে জন্মগ্রহণকারী কাউ একই সঙ্গে বৃটিশ ও মার্কিন নাগরিক। তবে মূলত হংকংয়েই বসবাস করেন তিনি। পুরস্কারের বাকি অর্ধেক অর্থ অন্য দুই বিজয়ী উইলার্ড বয়েল ও জর্জ স্মিথকে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হবে। তারা দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের মারে হিলের বেল ল্যাবরেটরিতে গবেষণারত। বয়েল একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিক।
একাডেমির ঘোষণায় আরো বলা হয়, ১৯৬০-এর দশকে বৃটেনে গবেষণার সময় কাউয়ের যুগানত্দকারী উদ্ভাবনই বিজ্ঞানীদের সামনে ফাইবার অপটিককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। তার গবেষণালব্ধ ফাইবার অপটিকের মাধ্যমেই আলোকে এক ভগ্নাংশ সেকেন্ডের মধ্যে অনেক দূরে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এ ফাইবার অপটিকের কল্যাণে গড়ে ওঠা যোগাযোগ প্রযুক্তিই আজকের পৃথিবীর অনিবার্য অনুষঙ্গ। চুলের মতো সূক্ষ্ম এ ক্যাবল অত্যনত্দ দ্রম্নতগতিতে বিশ্বজুড়ে তথ্য বহন করছে। এ প্রযুক্তির ওপরই গড়ে উঠেছে টেলিফোন নেটওয়ার্ক। কাউয়ের এ উদ্ভাবন ব্যতীত তীব্র গতিসম্পন্ন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রযুক্তিও সম্ভব হতো না।
দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমির জুরি জানান, উইলার্ড বয়েল ও জর্জ স্মিথের গবেষক দলই সর্বপ্রথম ডিজিটাল সেন্সর- সিসিডি উদ্ভাবন করে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ফটোইলেকট্রিক ইফেক্টের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৯ সালে বয়েল ও স্মিথ এ আলোক নির্দেশক যন্ত্রটি তৈরি করেন। ডিজিটাল ক্যামেরা ছাড়াও মানবদেহের রোগ নির্ণয় ও মাইক্রোসার্জারির মতো গুরম্নত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজে এ সিসিডি ব্যবহার করা হয়।
নোবেল পুরস্কারের অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। বিজয়ীরা এ অর্থ ছাড়াও একটি করে ডিপেস্নামা সনদ ও মেডেল পাবেন।
প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক যায়যায়দিন” পত্রিকায়।
*********************************************************************************
দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ এখন সবার এগিয়ে যাওয়ার অনিবার্য অনুষঙ্গ। আর দ্রুতগতি সত্যিই দিতে পারে অপটিক্যাল ফাইবার বা আলো প্রবাহী তন্তুর তার।এখন হাতে হাতে দেখা যায় ডিজিটাল ক্যামেরা। এ ক্যামেরার মূল উপাদান চার্জড কাপলড ডিভাইস (সিসিডি)। এই দুই উদ্ভাবন গোটাদুনিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি)। তার স্বীকৃতি মিলল ২০০৯ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারে। ৬ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় পদার্থবিজ্ঞানে এ বছরের নোবেলপুরস্কার। যুগান্তকারী এই দুই উদ্ভাবনের জন্য নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী চার্লস কে কাও, উইলার্ড এস বয়েল ও জর্জ ই স্মিথ। আমরা ও আমাদের চারপাশের যা কিছু আছে, সবকিছুকে জানার যে অবিরাম চেষ্টা ও ছোট-বড় বিশাল বিশাল সব আয়োজন—এসব নিয়েই বিজ্ঞান। তাই এখন মানুষ ও সভ্যতা মানেই বিজ্ঞান। মানুষ ও সভ্যতার শুরু থেকেই শুরু হয়েছে বিজ্ঞানের পথচলা। তবে এ পথচলাটা একটু অন্য রকম বাঁক নিয়েছে বিংশ-একবিংশ শতাব্দীতে এসে। কিছুদিন আগেও সবাই ভাবত, বিজ্ঞান মানেই জানার চেষ্টা, নতুন কিছু আবিষ্কারের তাড়না। কিন্তু বর্তমানে মানুষ দেখছে, শুধু জানার চেষ্টাই বিজ্ঞান নয়, জানাটাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে নতুন এক বিজ্ঞান, নতুন এক সম্ভাবনা। নতুন এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নাম তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। রূপকথার গল্পের মতোই আইসিটি দূর-দূরান্তের সব মানুষকে সমানভাবে দিচ্ছে তথ্য, জ্ঞানসহ নানা কিছু। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিশাল অর্জন মানুষের অফুরান ভালোবাসার পর এবার পেল নোবেল পুরস্কার ২০০৯।

২০০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানীর তিনজনই এই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিপ্লবের অগ্রপথিক।

১৯৫০ থেকে ৬০ সাল। সেই সময়ের কথা। আলো নিয়ন্ত্রিতভাবে কীভাবে দূর-দূরান্তে পাঠানো যায়, সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে।

আলো পাঠানোর জন্য অনেক ধরনের মাধ্যমের মধ্যে একটা ছিল কাচ। তবে বিজ্ঞানীরা বারবার হতাশ হচ্ছিলেন। কারণ, কাচের ভেতর দিয়ে সংকেত বা আলো পাঠানো হচ্ছিল, কিন্তু তা কিছুদূর গিয়েই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ফলে সেটি আর বেশি দূর যেতে পারছিল না। বিজ্ঞানীরা দুর্বলতার অনেক কারণ ভাবলেন—কানেক্টর, কাচের জ্যামিতিক আকার-আকৃতি, আলোর উত্স ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কিছুদিন পর ১৯৬৬ সালে চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী চার্লস কে কাও এসে দেখালেন, কাচের আকার-আকৃতি বা আলোর উত্স নয়, বরং সংকেত দুর্বল হয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে কাচের মধ্যে খাদ বা ভেজাল। তখন কাও ও তাঁর সহকারীরা বিভিন্ন তথ্যপ্রবাহী কাচ বা তন্তু নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে তাদের উত্সাহিত করেন শুদ্ধ কাচ নির্মাণে, যাতে কাচে সংকেত বা আলোর শোষণ সর্বাপেক্ষা কম হয়। তাঁরা নির্মাতাদের জন্য সংকেতের এ ক্ষতির ন্যূনতম মান বেঁধে দিয়েছিলেন ২০ ডেসিবল। পরে ১৯৭০ সালে তৈরি হলো তখনকার সময়ে সর্বনিম্ন ক্ষতিসম্পন্ন আলোকবাহী কাচ, যার নাম দেওয়া হলো অপটিক্যাল ফাইবার বা আলোবাহী তন্তু, যার মধ্য দিয়েই সর্বপ্রথম সম্পন্ন হয়েছিল দূর-দূরান্তে আলো তথা সংকেত তথা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ। এ বছর নোবেল বিজয়ী তিনজনের একজন হলেন চার্লস কে কাও। তবে পুরস্কারের অর্ধেকটাই তাঁর ভাগে।পুরস্কার পাওয়ার মূল কারণ এই অপটিক্যাল ফাইবার, যার সাহায্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবী চলে এসেছে এক ছাতার নিচে।

চার্লস কে কাওয়ের গবেষণা প্রসঙ্গে তাঁর সহকর্মী স্ট্যান্ডার্ড টেলিকমিউনিকেশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী রিচার্ড এপওয়ার্থ বলেন, যানবাহনে চাকা যা করছে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে ঠিক সেটাই করছে অপটিক্যাল ফাইবার। এ ফাইবারের সাহায্যেই অনেক দ্রুতগতিতে অনেক দূরে অনেক কম শক্তি ক্ষয় করে তথ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। আগে যেখানে কিলোবাইট, মেগাবাইট ছিল, সেখানে এখন গিগাবাইট তো বটেই পেটাবাইট, এক্সবাইট গতিও চলে এসেছে। তথ্য বোধহয় এর আগে এত স্বাধীনতা পায়নি।

কাও ১৯৭০ সালে অপটিক্যাল ফাইবারে যে গতিতে সংকেত পাঠিয়েছিলেন, বর্তমানে সংকেত আদান-প্রদানের গতি তার চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি।


ক্যামেরা এখন সবার হাতে হাতে। ডিজিটাল ক্যামেরার কল্যাণে কমবেশিসবাই এখন আলোকচিত্রী! খেয়াল করুন, আগেকার দিনের ক্যামেরার দাম কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরার চেয়ে কম ছিল, এর পরও ম্যানুয়াল ক্যামেরা পারেনি পাড়ায় পাড়ায় আলোকচিত্রী তৈরি করতে। কেন? সম্ভবত ছবি তুলে ছবি প্রক্রিয়া করার ঝামেলার কারণে। সেই ক্যামেরাগুলোয় আলো এসে পড়ত ফিল্মের ওপর। পরে সেই ফিল্ম ধোয়ামোছা করে নেগেটিভ বের করে সেটা থেকে ফটো প্রিন্ট করা হলে তবেই দেখা যেত এক দিন বা এক সপ্তাহ বা এক মাস আগে তোলা ছবি। তার ওপর ছিল কয়েক দিন পরপর ফিল্ম বদলানোর ঝামেলা আর খরচ। কিন্তু ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেল কমিউনিকেশন ল্যাবরেটরিজে কর্মরত বিজ্ঞানী উইলার্ড এস বয়েল ও জর্জ ই স্মিথ সিসিডি (চার্জড কাপলড ডিভাইস) নামের একটি সেন্সর উদ্ভাবন করেন, যা আলোকে ফিল্মে বন্দী করার পরিবর্তে বিশাল সংখ্যার পিক্সেলে রূপান্তর করে, যা মূলত রঙিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু এবং ডিজিটাল ইমেজের কোষ। তারপর শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে সিসিডি আজ স্থান পেয়েছে ক্যামেরার মধ্যে, আমজনতাকে করে তুলছে আলোকচিত্রী।

১৯৬৯ সালে বেল ল্যাবরেটরিতে বয়েল ও স্মিথের আবিষ্কার ১৯২১ সালে নোবেল বিজয়ী আলবার্ট আইনস্টাইনের আবিষ্কৃত ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। শব্দের জন্য ট্রানজিস্টর যেটা করেছে, আলোর জন্য সিসিডি তা-ই করেছে। আর এই সিসিডির কারণে ছবি তোলাটাই যে শুধু সহজ হয়েছে তা নয়, ছবি আদান-প্রদানও হয়েছে অনেক সহজ এবং ব্যবহারোপযোগী।

সিসিডি, ডিজিটাল ছবির পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানেও নিয়ে এসেছে নতুন নতুন বিপ্লব ও সম্ভাবনা। আগেকার টেলিস্কোপগুলোতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মহাকাশচারীদের নিয়মিত ক্যামেরার শাটার চাপা এবং ফিল্ম বদলানোয় ব্যস্ত থাকতে হতো। বর্তমানে আর এই উটকো ঝামেলা নেই। যেমন, হাবল টেলিস্কোপে ছয়টি সিসিডি আছে। বয়েল ও স্মিথ এ সিসিডি আবিষ্কার করেছিলেন মহাকাশ গবেষণাসংক্রান্ত কাজে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাকে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে। তাঁদের এই উদ্ভাবন ছাড়া মঙ্গল গ্রহের ছবি সংগ্রহ কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এ দুই বিজ্ঞানীই আলো ও কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর (অপটিক্যাল ও স্যাটেলাইট) যোগাযোগ, ডিজিটাল ও কোয়ান্টাম ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটিং ও রেডিও অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ করেছেন।

সভ্যতার শুরু থেকে বিজ্ঞানীরা নানাভাবে জীবন সহজ ও আনন্দময় করে তোলার চেষ্টা করছেন এবং পৃথিবীকে ছোট করে সবাইকে কাছাকাছি করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি বোধহয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম। সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের তথ্যপ্রযুক্তিকে বিশাল সম্মান জানানোর মাধ্যমে শুধু বিজ্ঞানের নয়; জয় হলো মানবতার, জয় হলো ভালোবাসার।

প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায়।

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.