খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

মাইকেল মুর December 24, 2009

Filed under: People — rezowan @ 4:56 pm

ফারেনহাইট ৯/১১-এর নির্মাতাআশরাফুল হক

দৃশ্য-১

যুক্তরাষ্ট্রের ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগাম খবর—জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। প্রচারিত হচ্ছে ফক্স নিউজ চ্যানেলে।
দৃশ্য-২
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নারকীয় ঘটনার ভয়াবহ দৃশ্য। বুশকে জানানো হয়, একটু আগে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে একটি বিমান আঘাত করেছে। দেখা যায়, এ খবর পেয়ে বাচ্চাদের একটি স্কুলে অবস্থানরত বুশ একটুও বিচলিত হননি। আরও একটি বিমান আঘাত করেছে—এ খবর পেয়েও তিনি নির্বিকার। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় প্রায় সাত মিনিট ধরে বুশ বাচ্চাদের একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।
দৃশ্য দুটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত ও ব্যবসাসফল রাজনৈতিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ফারেনহাইট ৯/১১-এর। উল্লিখিত প্রথম দৃশ্যটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যে স্বচ্ছ ছিল না, তা-ই বোঝাতে চেয়েছেন নির্মাতা। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের হামলাকে একমাত্রিকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় দৃশ্যের মাধ্যমে সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন নির্মাতা। ১২২ মিনিটের ফুটেজভিত্তিক প্রামাণ্য এ চলচ্চিত্রে নির্মাতা গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকাসহ আরও অনেক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। রাজনীতিসচেতন চলচ্চিত্রপ্রেমীমাত্রই ছবিটি দেখে থাকবেন। এ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির নির্মাতা মাইকেল ফ্রান্সিস মুর, যিনি চলচ্চিত্রজগতে মাইকেল মুর নামে অধিক পরিচিত। মাইকেল মুর একই সঙ্গে অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, লেখক ও উদারপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি ১৯৫৪ সালের ২৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেন। ফারেনহাইট ৯/১১ ছাড়াও মাইকেল মুর নির্মিত আরও বেশ কয়েকটি আলোচিত ও ব্যবসাসফল প্রামাণ্য চলচ্চিত্র রয়েছে। এর মধ্যে বোলিং ফর কলম্বাইন (২০০২), সিকো (২০০৭), ক্যাপিটালিজম: এ লাভ স্টোরি (২০০৯) অন্যতম।
মাইকেল মুর বিভিন্ন সময় বিশ্বায়ন, বেশ কয়েকটি বৃহত্ করপোরেট প্রতিষ্ঠান, মারণাস্ত্র, ইরাক যুদ্ধ, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতি বিষয়ে খোলাখুলি মন্তব্য করে আলোচিত হয়েছেন। এসবই তাঁর নির্মিত বেশির ভাগ চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়।
মাইকেল মুর নির্মিত বোলিং ফর কলম্বাইন ২০০৩ সালে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার জয় করে। ২০০৭ সালে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের মনোনয়ন লাভ করে সিকো। এ ছাড়া তিনি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৪ সালে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে ফারেনহাইট ৯/১১ ছবিটি প্রদর্শিত হয়। তখন সবাই ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করে। উত্সবের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ সময়। বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের (২০০৫) মতে, মাইকেল মুর বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যতম।
 তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

 

দিনভর ঘুরেও স্বাধীনতা পদক বিক্রি করতে পারলেন না মোস্তাক আলতাব হোসেন December 14, 2009

Filed under: People — rezowan @ 3:40 am
স্বাধীনতা পদক হাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক আহমেদ

সব অর্থেই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ মোস্তাক আহমেদ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। দেশে-বিদেশে ৮০০ মিটার থেকে শুরু করে ১০ হাজার মিটার ম্যারাথন দৌড়ের রেসে টানা কয়েক দফায় প্রথম হয়েছেন তিনি। ১৯৭৩ থেকে ’৭৭ সাল পর্যন্ত অ্যাথলেটিক্সে টানা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবও রয়েছে তার দখলে। অ্যাথলেটিক্সের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে ৬৯টি পুরস্কার পেয়েছেন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ১৯৭৭

সালে প্রথম স্বাধীনতা পদক। ১৯৮৯ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার।
অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নিয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে। এখনো বেঁচে আছেন তার ১২০ বছর বয়সী বাবা তকলিম আলী। মোস্তাক আহমেদ তার বড় ছেলেকে পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এতো সফলতা অর্জন খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জোটে। এ অর্থে একজন ব্যতিক্রমী সফল মানুষ ছাড়া আর কী বলা যায় মোস্তাক আহমেদকে।
বিশাল গর্বের এসব অর্জনের পরও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক আহমেদ বর্তমানে দারুণ অর্থকষ্টে রয়েছেন। সাড়ে তিন লাখ টাকার ঋণের দায় এড়াতে বাড়িছাড়া হয়েছেন বহু আগে। ১৯৮৫ সালে সরকার থেকে অস্থায়ী লিজ পাওয়া ৪৫ শতাংশ জমি থেকেও উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চলছে তার বিরুদ্ধে, এমনকি হয়েছে সরকারি জমি দখলের মামলা। এসব কারণে সংসার থেকে অনেকটা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মোস্তাক আহমেদ। কিন্তু পেটের খিদে তো আর পালিয়ে বেড়ানো বোঝে না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন মোস্তাক আহমেদ। জীবনের বড় অর্জন স্বাধীনতা পদক ও ৬৯টি পুরস্কার বিক্রির জন্য সোমবার ঢাকায় আসেন তিনি। দুপুরের দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পদক বিক্রির জন্য ঘুরেছেন। কিন্তু তাকে ঘিরে মানুষের জটলা বেধেছে ঠিকই, কিন্তু কেউ এ পদক কিনতে রাজি হননি। বিকালের দিকে শাহবাগ মোড়ে দেখা হয় এ বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। হঠাৎ আষাঢ়ের আলো ঝলমল রোদে ঝলসে ওঠে স্বাধীনতা পদকটা। সোনারঙা ঝকঝকে মেডেলটার দিকে বারবার তাকিয়ে দুই চোখে জল চলে আসে তার। আনমনে মেডেলের দাম বলতে পারেন না তিনি। শুধু হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন মোস্তাক আহমেদ। কোনো কথাই স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
১৯৭০ সালে ইপিআরে যোগ দিয়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথমে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরে চার নাম্বার সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা সিআর দত্তের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন মোস্তাক আহমেদ। মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক আহমেদের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারের বারুই গ্রামে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১১। বৃদ্ধ বাবা তকলিম আলী, মা মায়ারুন নেছা (৬৫) এখনো বেঁচে আছেন। ২০০২ সালে সেনাবাহিনী থেকে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নিয়েছেন তিনি। মাসে অবসর ভাতা পান সাড়ে তিন হাজার টাকা। তা দিয়ে ১১ সদস্যের সংসার চলে না মোস্তাক আহমেদের।
২০০৩ সালে ঋণ করে বড় ছেলে মাসুদ আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। এতে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। অবসর নেয়ার সময় পেনশন পান প্রায় চার লাখ টাকা। পেনশনের পুরো টাকা দিয়েও ঋণের টাকা শোধ হয়নি। ভাবছিলেন ছেলে উপার্জন করে পরিবারের অভাব মেটাবে। কিন্তু ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সব স্বপ্নই ভেস্তে গেছে। বিদেশের মাটিতে মরতে বসলেও ছেলের কোনো খোঁজ নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। উল্টো ঋণের সাড়ে তিন লাখ টাকার জন্য বাড়িছাড়া হয়েছেন তিনি। চার ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে দুই ছেলে ও এক মেয়ে বিবাহিত। অর্থভাবে ছেলেমেয়েদের মাত্র নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করাতে পেরেছেন। মেজো ছেলে মামুন আহমেদ (২৬) ও চতুর্থ ছেলে হাবিব আহমেদ (২২) বিয়ানীবাজারে ছোট একটা ব্যবসা করেন। তৃতীয় ছেলে রুবেল আহমেদ বেকার। বড় মেয়ে রোকসানা আক্তার বিবাহিত। ছোট মেয়ে ফারজানা আক্তার বাড়িতেই আছে। এছাড়া বাবা ও সৎ মা মায়ারুন নেছা বেঁচে থাকায় তাদের ব্যয়ভারও তাকেই বহন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় পতিত মোস্তাক আহমেদের তিন ভাই থাকলেও তারাও বাবা-মা ও ভাইয়ের কোনো খোঁজ নিতে পারেন না।
সংসারের অভাব-অনটন দূর করার জন্য ১৯৮৫ সালে বিয়ানীবাজারে ৪৫ শতাংশ জমি অস্থায়ীভাবে তাকে লিজ দেয় সরবকার। ওই জমিতেই হোটেল করে ব্যবসা করেন মোস্তাক আহমেদের দুই ছেলে। বর্তমানে ওই জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে। অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও দেয়া হয়েছে বিয়ানীবাজার থানায়। মোস্তাক আহমেদ বলেন, আমার সব কাগজপত্র আছে। ১৯৮৫ সালে আমাকে এ জমি সরকার অস্থায়ীভাবে লিজ দিয়েছে। তা দখল করতে এখন নানা মহল উঠেপড়ে লেগেছে।
নিয়েছি পদ্মা পাড়ের মানুষ হতে

 

এসকর্ট December 14, 2009

Filed under: History(Dhaka),People — rezowan @ 2:50 am

খবর:The weekly sheershakhabar

বিশেষ প্রতিবেদন

কলগার্লরা পতিতালয় নির্ভর নয়। তারা চলমান এবং অদৃশ্য। দেখা যায়, কিন্তু জানা যায় না। ঢাকার কলগার্ল বিজনেস খুবই সুসংগঠিত। এ পেশাটি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের নেটওয়ার্কও শক্তিশালী। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এরা ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। অথচ প্রশাসন এদের বিরম্নদ্ধে কোন ব্যবস’া নেয় না। ঢাকার কলগার্লদের এই নেটওয়ার্কের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকার এসকর্ট এজেন্সিগুলো(scort service)। আর বাকী অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন কলগার্ল এজেন্টদের মাধ্যমে।
এজেন্ট আর ক্লায়েন্টের সম্পর্কটা এখানে ত্রিভুজের মতো। ক্লায়েন্ট-কলগার্ল এবং এজেন্ট একটা সুক্ষ্ম সম্পর্কে আবদ্ধ। সমসত্ম লেনদেন হয় এজেন্টের মাধ্যমে। এজেন্ট তার নিজের কলগার্লদের এবং ক্লায়েন্টের ডিমান্ড সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকে। এজেন্ট টারমনোলজিতে ডিমান্ডের অর্থ হল কলগার্লটির ‘ভ্যালুয়েশন।’ অর্থাৎ কলগার্লের সৌন্দর্য, স্বাস’্য এবং গস্নামার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সংযোগের মোট মূল্য (শহুরে, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, শিড়্গিত এবং সমাজের উঁচুতলার মানুষের সঙ্গে পরিচিত)। ‘এজেন্ট’ই অধিকাংশ সময় প্রোগ্রাম তৈরি করেন। ক্লায়েন্টের চাহিদা এবং টাকা খরচ করার ড়্গমতার উপর নির্ধারিত হয় প্রোগ্রাম কেমন হবে। একটা প্রোগ্রাম আয়োজনের ‘সময়’ এবং ‘স’ান’ সি’র হয় ক্লায়েন্ট এবং কলগার্ল উভয়ের সুবিধা মত। ঢাকার এক একজন এজেন্টের অধিনে শতাধিক কলগার্ল রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। আবার এই পেশায় অনেক দিন আছেন এমন কলগার্লরা নিজেই এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন- এমন উদাহরণও বিরল নয়। ঢাকার ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, বনানলী, সেগুনবাগিচা এলাকায় ফ্যাট বাসা নিয়ে চলছে কলগার্ল বিজনেস। মডেল প্রোভাইডার হিসেবে পরিচিত অনেক প্রযোজক, পরিচালক এবং এক সময়ের নামি অভিনেত্রীরা এই কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। সচারচর কোন কলগার্লের বয়স বেশি হয়ে গেলে বা চাহিদা কমে আসলে তারা তখন এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরম্ন করেন। কথা হয় ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন এমন একজন কলগার্লের সাথে। মনিকা নামের এই কলগার্ল নিজেই এখন এজেন্ট। নিজের ফ্ল্যাটেই অফিস খুলে বসেছেন। তার আন্ডারেই রয়েছে ২০ জনেরও বেশি কলগার্ল। ঢাকার বেশ কয়েকটি নামি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মেয়েও যে তার সাথে কাজ করনে -এ কথা জানান তিনি। মনিকা জানান, এরা কখনোই নিজে কোন ক্লায়েন্টের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে প্রোগ্রামে অংশ নেয় না। কারণ হিসেবে নিজেদের গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এমনটি বলে জানান তিনি। এ প্রতিবেদক ইডেন এবং তিতুমীর কলেজে পড়ে এমন দু’জন কলগার্লের সাথে ফোনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ করেন। তবে দু’জনই তাদের এই গোপন অভিসারের কথা অস্বীকার করেন। এদের একজনের সেলফোন নম্বর আবার ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটে সংরড়্গিত আছে। ওয়েব পেজে তার পরিচিতিতে কলগার্ল কথাটির সাথে আবেদনময় আহ্বান রয়েছে। ওয়েব সাইটটিতে তার ছবিও আপলোড করা। ওয়েবে থাকা স্টিল ফটোগ্রাফটি নিজের বলে স্বীকার করলেও তিনি যে কলগার্ল ধরনের কিছু নন, তা বারবার বোঝাতে চেষ্টা করেন। এই প্রতিবেদক তাকে বাংলায় প্রশ্ন করলেও চটপটে ইংরেজিতে উত্তর দেন মেয়েটি। কলগার্ল না হলে সেলফোন বন্ধ করে দিচ্ছেন না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সনেত্মাষজনক কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এখানে এজেন্ট কলগার্ল সম্পর্কটা চমকে দেয়ার মতো। এজেন্টরা নিজেদের কলগার্লদের ব্যাপারে অনেক যত্নশীল। ঢাকায় এই কলগার্লরা কখনও কখনও বাইরে গিয়েও প্রোগ্রাম করেন। ডিমান্ডেবল কলগার্লদের আনত্মর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। ওয়েব সাইট ঘেঁটে দেখা যায়, এসকর্ট এজেন্সিগুলো সারা বিশ্বে একটা নেটওয়ার্ক হয়ে কাজ করে। ফলে অনেক সময় কলগার্লদের দেশের বাইরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
যেভাবে কলগার্ল ঃ
উচ্চাকাঙড়্গা পূরণ করার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হলো কলগার্ল বনে যাওয়া! টেলিভিশন ও সিনেমার পরিচালক-প্রযোজকের লোভনীয় অভিনয়ের সুযোগ বাসত্মবায়ন করতে, মডেল হওয়ার খায়েশ পূরণ করতে, সখের বসে এমনকি উচ্চবিত্ত গৃহবধূ একাকিত্ব দূর করতে তার বন্ধুর মাধ্যমে জড়িয়ে পড়ে এই ধরনের পেশায়। তবে শুধু টাকার অভাবে এই পেশায় নাম লিখিয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। কলগার্ল সুমা (ছদ্ম নাম) জানান, তার স্বামীর অন্য সম্পর্ক ছিল। সে অনেক চেষ্টা করেও তাকে না ফেরাতে পেরে জিদের বসে নিজে এমন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। কলগার্লরা নেটওয়ার্কে ঢোকেন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সিনেমা-টেলিভিশন পরিচালক-প্রযোজক, বিউটি পার্লার, ড্যান্স স্কুল এবং অন্যান্য লোকজনের মাধ্যমে। বাড়তি রোজগারের লোভে, ভাল ক্যারিয়ারের আশায়, কারোর কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে কিংবা স্বামীর অবহেলায় কানত্ম হয়ে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, নামকরা মডেল বা অভিনেত্রী হওয়ার আশায় এই শহরে গোপনে গোপনে ‘কলগার্ল’ হয়েছেন অনেকেই। এই পেশায় সিনেমা-টেলিভিশনের অভিনেত্রী থেকে শুরম্ন করে উঠতি গায়িকা, উচ্চাকাঙড়্গী মডেল ছাড়াও আছেন মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়েরা। এদের অনেকেই আবার সমাজে পরিচিত। অর্থাৎ তারকা হিসেবে তাদের ফেসভ্যালু রয়েছে। এসব তারকাদের যে কোন প্রোগ্রাম আয়োজনে থাকে কঠোর গোপনীয়তা। আর এড়্গেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে এজেন্ট কর্তৃপড়্গ। আর ক্লায়েন্টের তালিকায় আছেন মূলতঃ ব্যবসায়ীরা। বিদেশী ক্লায়েন্টদেরও মনোরঞ্জন করে থাকেন ঢাকার কলগার্লরা। যাদের কাঁচা টাকা ওড়াতে কোন বাধা নেই, কেবল তারাই কলগার্লদের নিয়ে মেতে ওঠেন কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার এই জমকালো আয়োজনে। তবে সাধারণ মানুষও যে নেই, তাও নয়। তবে সে সংখ্যা একেবারেই হাতে গোণা।
কলগার্ল হওয়ার পাশাপাশি এদের অন্য একটা পরিচিতিও রয়েছে। সেই পরিচিতিই এদেরকে সমাজে আড়াল করে রাখে। কেউ স্টুডেন্ট, কেউ বিউটিশিয়ান, কেউ ম্যাসিউজ, কেউ প্রাইভেট টিউটর, কেউ বুটিক চালান, কেউ অভিনেত্রী। আছেন গৃহবধূরাও। এরা যেন চেনামুখের আড়ালে অচেনাজন।
যারা ঢাকার কলগার্ল ঃ
দ্ব এরা কোনও নির্দিষ্ট পতিতালয় নির্ভর নন।
দ্ব এরা চলমান মহিলা যৌনকর্মী। একা বা কোন এজেন্ট দ্বারা নিজেদের পরিচালিত করেন।
দ্ব প্রত্যেকটি প্রোগ্রাম (যৌনকর্ম) আয়োজনে থাকে গভীর গোপনীয়তা। সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই কিংবা তিনটি প্রোগ্রামে অংশ নেন একজন কলগার্ল।
দ্ব প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ হোটেল, রিসর্ট, প্রাইভেট ফ্ল্যাট ও ম্যাসেজ পার্লারে।
দ্ব এরা সকলেই শিড়্গিত এবং বাংলা-ইংরেজিতে পারদর্শী। এছাড়াও কেউ কেউ হিন্দিতেও অনর্গল কথা বলতে পারেন।
দ্ব এদের বেশিরভাগ উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। উচ্চাভিলাসী মধ্যবিত্তের সংখ্যাও কম নয়। বাইরের থেকে দেখে কোনভাবেই বোঝা যাবে না এরা কলগার্ল।
দ্ব বেশিরভাগই এ পেশার বাইরেও অন্য কাজ করে থাকেন, যেখান থেকে আয়-রোজগারও যথেষ্ট।
কাদের ডিমান্ড এখানে ঃ
জানা যায়, ক্লায়েন্টদের কাছে কম বয়সী স্কুল এবং কলেজের মেয়েদের চাহিদা বেশি। ফলে এই সব এসকর্ট এজেন্সিগুলোর নজর থাকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের সাথে সাথে স্বনাম ধন্য ঢাকার স্কুল কলেজগুলোর দিকে। এসকর্ট এজেন্টগুলো বিভিন্নভাবে ফাঁদ পেতে স্কুল-কলেজের মেয়েদের কৌশলে কলগার্লের খাতায় নাম লেখিয়ে নিচ্ছে। অর্থের লোভ দেখিয়ে নতুন নতুন মেয়েদের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে পারঙ্গম এরা। তবে এরা পতিতালয়ের তথাকথিত ‘পিম্প’ বা দালালদের মতো নয়।
এসকর্ট এজেন্সি এবং কলগার্ল ঃ
ঢাকার এসকর্ট এবং কলগার্ল এখন একে অপরের পরিপূরক শব্দ। বৈধতার সনদ দেখিয়ে এরা প্রকাশ্যে কলগার্ল বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছে। ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করতে কলগার্ল বিষয়ে যাবতীয় তথ্য, ছবি এবং কলগার্লের রেট দিয়ে ওয়েব সাইটের মাধ্যমে যাবতীয় তথ্য অনলাইনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কলগার্ল বুকিং দেয়া যায়। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে- এসব ওয়েব সাইটে তরম্নণীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলে নতুন নতুন কলগার্ল হওয়ার জন্য আহ্বান রয়েছে। সেই সাথে ক্লায়েন্ট এবং কলগার্লদের জন্য যাবতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার কথা ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ঢাকার এসকর্ট এজেন্সিগুলোর প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব কলগার্ল ডেটাবেজ। ছবিসহ এসব ডেটাবেজে গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়। আবার সব কলগার্লের ছবি ওয়েবে থাকে না। কারণ স্টার কিংবা সেলিব্রেটি কলগার্লরা ওতটা প্রকাশ্যে প্রচার হতে রাজী হয় না। চাহিদা মতো এসকর্টের কলগার্ল পেতে কায়েন্টকে বেশ কিছু শর্ত পালন করতে হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে- এসকর্ট এজেন্সিকে ক্লায়েন্টের পাসপোর্ট অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর প্রদান, যোগাযোগের জন্য একটা কন্ট্যাক্ট নম্বর (মোবাইল/টেলিফোন), কোন হোটেলে এসকর্ট আয়োজন করতে চাইলে তা কমপড়্গে থ্রিস্টার হোটেল হতে হয় এবং ফ্যাটের ড়্গেত্রেও হতে হয় মানসম্মত। ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ঢাকা এসকর্ট এজেন্সি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা ভিত্তিক এইভাবে উন্মুক্ত কলগার্ল ব্যবসাকে বৈধ বলে দাবি করেন এসকর্ট কর্তৃপড়্গ। ঢাকা এসকর্টের আজাদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কলগার্লের এই বিজনেস প্রফেশনালি বৈধভাবে করে থাকেন তারা। আর এ প্রতিবেদক নিজেকে একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে পরিচয় দিলে তাদের বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস সম্পর্কে বিসত্মারিত জানিয়ে মেইল করেন। আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কলগার্লদের রেট যৎসামান্য কমতে পারে বলেও তিনি জানান। ঢাকা এসকর্টের ওয়েব সাইটে দেখা যায়, ফেডারেল লেবেয়িং এন্ড রেকর্ড কিপিং ল’ (১৮ ইউএসসি ২২৫৭) অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম বৈধ এবং কর্তৃপড়্গ অনুমোদিত। কিন’ একাধিক আইনজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই আইনের দোহাই দিয়ে যৌন ব্যবসা বৈধ করার কোন সুযোগ নেই। এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসকর্ট এজেন্সি খুলে কলগার্ল ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ গুলশান জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনভাবেই যৌন ব্যবসা বৈধ হতে পারে না। উলেস্নখিত আইনের কথাও এর আগে শোনেননি বলে জানান তিনি। আর ওয়েব সাইটের মাধ্যমে একেবারে প্রকাশ্যে এই ধরনের যৌনব্যবসা চলছে শুনে তিনি বিস্মিত হন।
কলগার্ল হতে ইচ্ছুক ঃ
এসকর্ট এজেন্সিগুলো কলগার্ল হতে ইচ্ছুকদের ওয়েব সাইটের মাধ্যমে আহ্বান জানায়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়-য়া সুন্দরী মেয়ে, গৃহিনী এবং কম বয়সী তরম্নণীদের লোভনীয় প্রসত্মাবের মাধ্যমে আকৃষ্ট করার প্রবণতা লড়্গ্য করা যায়। গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ এবং কম বয়সে লাখপতি হওয়ার সুযোগ। এ রকম নানা প্রলোভনে কলগার্ল হওয়ার প্রসত্মাব দিয়ে থাকে এসব এসকর্ট এজেন্সিগুলো। তবে অধিকাংশ ড়্গেত্রে সরাসরি এজেন্টরা নতুন কলগার্ল নিতে ডিল করে না। মাধ্যম হিসেবে তৃতীয় একটি পড়্গকে ব্যবহার করে থাকে। ফলে কেউ কলগার্লের খাতায় নাম লেখালে সেড়্গেত্রে এজেন্সিকে দায়ী করা যায় না।
রেট ঃ
সাধারণতঃ ৪ ক্যাটাগরির কলগার্ল পাওয়া যায়। বয়স, ফিগার এবং ইন্টেলেকচুয়াল-এর ওপর ভিত্তি করে ক্যাটাগরি নির্ধরণ করা হয়। এলিট ‘এ’, এলিট ‘বি’, প্রিমিয়াম ‘এ’ এবং প্রিমিয়াম ‘বি’। ক্যাটাগরি অনুযায়ী কলগার্লদের পেতে টাকা খরচের অঙ্কেও পরিবর্তন আসে। এলিট ক্যাটাগরির কলগার্লদের স্বল্প সময়ের জন্য বুকিং দেয়া যায় না। প্রিমিয়ার ক্যাটাগরির কলগার্লদের আধা ঘণ্টার জন্য বুকিং দিলে কমপড়্গে ৪০ ডলার গুনতে হয়। আর এলিট শ্রেণীর সর্বনিম্ন রেট ২০০ ডলার (প্রতিঘণ্টা)। তবে সময় বাড়লে রেটে কিছুটা তারতম্য হয়। পুরো রাতের জন্য এ লেবেলের এলিট কলগার্লদের রেট ৮০০ থেকে ১০০০ ডলার। প্রতি তিন সপ্তাহ অনত্মর কলগার্লদের ডাক্তারী পরীড়্গা করা হয়। ফলে কলগার্লদের সংস্পর্শে ক্লায়েন্টদের কোন প্রকার যৌনবাহিত রোগ হবে না বলেও নিশ্চয়তা দেয় এজেন্টরা। পছন্দের কলগার্লকে নিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। হিল ট্রাক্টস্‌, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এমনকি দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আর সেড়্গেত্রে দরকার শুধু টাকা। এলিট কলগার্লদের প্রায় সকলেরই পাসপোর্ট রয়েছে। পছন্দসই এসকর্ট অর্ডার দেয়ার পর ঢাকা হলে এসকর্ট আয়োজনে সময় লাগবে সর্বোচ্চ একঘণ্টা। সিলেট, চট্টগ্রাম ১২ ঘণ্টা এবং দেশের বাইরে তিনদিন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের নতুন, পুরানো অনেক মডেল, টেলিভিশন ও সিনেমার বেশ কয়েকজন অভিনেত্রী এমনকি প্রাইভেট চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকাও কলগার্লের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তবে এদের রেট প্রচলিত রেটের চেয়ে অনেক বেশি। এদের সাথে প্রোগ্রাম কিংবা এসকর্টে অংশ নিতে হলে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরম্ন করে ২ লাখ টাকা পর্যনত্ম খরচ করতে হয়। অগ্রিম টাকা নেয়া হয় না। সে ড়্গেত্রে নতুন ক্লায়েন্ট হলেও প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকে না বললেই চলে। কলগার্ল অর্ডার দেয়ার পর তাকে দেখে পছন্দ না হলে অর্ডার বাতিল করা যায়। বিভিন্ন দেশের প্রচলিত মুদ্রায় বিল পরিশোধ করা যায়। তবে এ ড়্গেত্রে টাকার সাথে সাথে ডলার, পাউন্ড এবং ইউরোকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রাইভেসির জন্য শুধুমাত্র নগদ ক্যাশে বিল দিতে হয়। চেক কিংবা ডেবিট, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিশেষে ঃ
কলগার্ল হচ্ছে মুখোশের আড়ালে চালিয়ে যাওয়া একটি পেশা। দেশে ঠিক কতজন কলগার্ল আছে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। আর এটা এমন একটা পেশা যেখানে পেশাজীবী থাকেন আড়ালে, গোপনে। এখানে যেমন যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি জানাজানি হলে পারিবারিক ও সামাজিক অশানিত্মও অপেড়্গা করছে। ফলে সবার অলড়্গে প্রতিদিন কতজন মেয়ে এই পেশায় নাম লেখাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন’ যারা কলগার্ল নিয়ে ব্যবসা করে তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ সংখ্যাটি একেবারেই কম নয়। আর যদি সত্যি সত্যিই তেমনটি হয়ে থাকে, তবে তা যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ। কেননা, তাহলে যে মুখশের আড়ালে হারিয়ে যাবে বিবেকের এবং চিরচেনা বাংলার সবুজ নারী।

আরো একটা খবর পদ্মা পাড়ের মানুষ হতে
শাহজাহান আকন্দ শুভ ও হাসান জাকির:
ওয়েবসাইটে কলগার্ল ব্যবসা৷ তাও গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই৷ রাজধানীর বনানীতে ‘এসকর্ট এজেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ব্যবসা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ এ ব্যাপারে তারা ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে কলগার্লদের যৌন আবেদনময়ী ছবি এবং সেলফোন নাম্বার দেয়া হয়েছে৷ এছাড়াও আছে কলগার্লদের শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা এবং তাদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার নিয়ম-কানুন৷ এছাড়াও দেহ ব্যবসা করে রাতারাতি লাখপতি হওয়ার লোভনীয় সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে এসকর্টের ওয়েবসাইটে৷

জানা গেছে, আজাদ রহমান নামে এক ব্যবসায়ী এসকর্টের কলগার্ল ব্যবসা পরিচালনা করেন৷ গতকাল ফোনে তিনি জানান, ‘নিছক দুষ্টুমি করার জন্যই ওয়েবসাইটটি খোলা হয়েছে৷ মেয়েদের ছবি এবং সেলফোন নাম্বার দিয়ে কেন এই দুষ্টুমি করছেন_ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো অপরাধ নয়৷’
এসকর্টের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, কলগার্লদের নিয়ে তাদের রয়েছে বিশাল ডাটাবেজ৷ গ্রাহক হওয়ার পরই কেবল এসব ডাটাবেজে প্রবেশ করা যায়৷ ডাটাবেজে কলগার্লদের ছবিসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে৷ অভিযোগে প্রকাশ, ৪ ক্যাটাগরির কলগার্ল নিয়ে ব্যবসা করছে এসকর্ট৷ এলিট-এ, এলিট-বি, প্রিমিয়াম-এ এবং প্রিমিয়াম-বি৷ বয়স, ফিগার এবং বুদ্ধিমত্তার ওপর ভিত্তি করে তারা ক্যাটাগরি নিধর্ারণ করেছে৷ এলিট ক্যাটাগরির কলগার্লদের স্বল্প সময়ের জন্য বুকিং দেয়া যায় না৷ প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির কলগার্লদের আধ ঘণ্টার জন্য বুকিং দিলে কমপৰে ৪০ ডলার গুণতে হয়৷ আর এলিট শ্রেণীর সর্বনিম্ন রেট হচ্ছে প্রতি ঘণ্টা ২০০ ডলার৷ পুরো রাতের জন্য এলিট কলগার্লদের রেট ৮০০ থেকে ১০০০০ ডলার৷ প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর কলগার্লদের ডাক্তারি পরীৰা করা হয় এবং কলগার্লদের সংস্পর্শে এলে ক্লায়েন্টদের কোনো যৌনবাহিত রোগ হবে না বলেও ওয়েবসাইটে প্রচারণা চালাচ্ছে এসকর্ট৷
রাজধানী ঢাকার নামিদামি হোটেল, ফ্ল্যাট এবং ম্যাসেজ পারলারে এসকর্ট ক্লায়েন্ট-কলগার্ল প্রোগ্রাম সম্পন্ন করে৷ তবে টাকা হলে পছন্দের কলগার্লকে ঢাকার বাইরে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এমনকি দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে৷
ওয়েবসাইটে পরিচিতি, ছবি এবং সেলফোন নাম্বার থাকা ঢাকার দু’জন কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তারা গোপন অভিসারের কথা অস্বীকার করেন৷ এদের একজন ওয়েবে থাকা স্টিল ফটোগ্রাফটি নিজের বলে স্বীকার করলেও তিনি যে কলগার্ল ধরনের কিছু নন, তা বারবার বোঝাতে চেষ্টা করেন৷ এসকর্ট যে বৈধভাবে এই ব্যবসা করছে তার সপৰে তারা ওয়েবসাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল লেবেলিং অ্যান্ড রেকর্ড কিপিং ল’ (১৮ ইউ.এস.সি. ২২৫৭)-এর একটি রেফারেন্স তুলে ধরেছে৷ কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের ব্যবসা কোনোক্রমেই বৈধ হতে পারে না৷ শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, সরকারের অনুমোদিত যৌনপলস্নী ছাড়া আর সব জায়গাতেই দেহ ব্যবসা অবৈধ৷

 

Living to tell the Tale December 14, 2009

Filed under: People — rezowan @ 1:47 am

লিখেছেন: jotil
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের আত্মজীবনীমূলক বই ” Living to tell the tale “
২০০৪ সালে পড়েছিলাম , মজার বিষয় হচ্ছে এই প্রখ্যাত লেখকের কুমারত্ব বিসর্জনের ঘটনাটি ঘটেছিল একজন পতিতার কাছে , ভদ্রভাবে যাদের আমরা যৌনকর্মী বলি । ঘটনাটি এরকম যে , মার্কেজের বাবা ডাক্তার এবং তার কিছু পাওনা টাকা বাকী ছিল সেই বিশেষ যৌনকর্মীর কাছে । তো তিনি মার্কেজকেই পাঠালেন , বয়সে তখন প্রায় কৈশোরে পড়েছেন তখন মাত্র । তো সেখানে গিয়েই ঘটনাচক্রে নিজেকে অভিজ্ঞ প্রমাণ করতে গিয়ে কুমারত্ব বিসর্জন দেন । আর অভিজ্ঞ যৌনকর্মী ঠিকই বুঝে ফেলেন যে এটাই ছিল সেই অবুঝ কিশোরের প্রথমবার ।
মজাটা অন্যখানে , সেই মহিলা জানিয়েছিলেন মার্কেজের ছোটভাই এ কাজ অনেক আগেই করেছেন এবং সেই ছোটভাই এর প্যান্ট দেখিয়ে বললেন সে যেন তা নিয়ে যায় ।
আমি এই অংশটি পরে অনেক হেসেছিলাম বেচারীর মনের অবস্থা বুঝে ।
এরপর দিন গড়িয়েছে , বেড়েছে সচেতনতা । আর আমার বাস্তবতার পালকেও জুটেছে সেরকম কিছু অভিজ্ঞতা তার মধ্যে আজকের অভিজ্ঞতাটা লিখব যৌনকর্মীদের নিয়ে ।
প্রথমে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি একজন ডাক্তার আপুকে , যিনি বয়সে অনেক বড় , আর তার সাথে প্রথম দেখা দেশের বাইরে আমার এক আত্মীয়ার সাথে তিনি ছিলেন এক বিশেষ ট্যুরে । আমি সেদিন তেমন সময় দিতে না পারলেও যোগাযোগ রয়েছে এরপর থেকেই ।
পাবলিক হেলথ এর উপর এক জরিপ এবং এক NGO এর সাথে তার বর্তমান কাজের সুবাদে আমি বলেছিলাম যেন পরবর্তিতে কোন প্ল্যান থাকলে আমাকে ডাকেন , অবশেষে সেই সুযোগ এসেছিল ।
হঠাৎ এক কলেই জানান যে স্বল্প সময়ের ট্যুর কয়েকটি নিষিদ্ধ পল্লীতে , সাথে থাকবেন তার সহকর্মী , দুজনেই ডাক্তার এবং বিশেষভাবে জড়িত STD প্রতিরোধমূলক কর্মকান্ডে । আমি যাব বলেছিলাম জন্যে আমার জন্যেও বিশেষ কার্ড এর ব্যাবস্থা ছিল , যাতে আইনত আমি সেই NGO এর একজন হয়ে গিয়েছিলাম ।
তো মাথা উঁচু করে নিষিদ্ধ পল্লীতে যাবার একটা মওকা পেয়ে যাওয়াতে আমি অনেক উৎফুল্ল হয়ে গিয়ে রাজী হবার কারণে দেখলাম বিশাল আর একটা ভ্রমনের ধাক্কা পোহাতে হল ।
তো এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক ,
নিষিদ্ধ পল্লীভ্রমন
টার্গেটেড স্পটগুলোর মাথা কয়েকজনের সাথে আগেই সব ঠিক করা ছিল বলে কোন সমস্যা হয়নি । প্রথমেই যাওয়া হয় মহাখালী । বিশেষ একটি আবাসিক হোটেল এ প্রথম যাওয়া । আমি ভেতরে ভেতরে একটু অবাক হবার মত অবস্থায় ছিলাম , তবে এটা ছিল নির্দ্বিধায় একটা চরম সুযোগ বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করার ।
ঢোকার সময় সব স্বভাবিকই মনে হল , কিন্তু তৃতীয়তলায় গিয়ে বুঝলাম ভেতরের আসল অবস্থা । চাপা গুমোট পরিবেশ , সেখানে আবার সিকিউরিটি চেক আপ হচ্ছে যারা নতুন যাচ্ছে । আমরা কোনকিছু ছাড়াই ভেতরে গেলাম এবং যা দেখলাম তাতে অবাক হয়ে যাওয়ার পালা । প্রথম দেখায় মনে হবে একটা রুমে সারিবেধে মেয়েরা বসে আছে কোন কনফারেন্স এর জন্যে । কিন্তু দেখলাম যে কাস্টমার বা খদ্দেরবেশীরা সেখানে গিয়ে শুধু ইশারা দিয়েই ডেকে নিচ্ছে । এটাই সেখানের বৈশিষ্ট্য , যে কাউকে পছন্দ করে নিলেই হল , যৌনকর্মীদের এখানে কোন বলার কিছু নেই । তারা শুধু চুপ করে বসে থাকে । বিষয়টি আমাকে পরিষ্কার করে দিয়েছে গাইড পরবর্তিতে ।
সেখানে গিয়েই একটা বসার ব্যাবস্থা করা হল শর্ট কনফারেন্সের । আপু আর ভাইয়া তাদের পেপারস দিয়েদিলেন উপস্থিত সব যৌনকর্মীদের এবং এইডসের উপর সচেতনতা ছাড়াও আরো এই সংশ্লিষ্ট রোগ এবং সম্ভাবনার কথা বলা শুরু করলেন । আমি প্রথমে তাদের চেহারা গুলো আর গঠন এবং নিজেকে সাজানোর ধরন একনজর দেখলাম এরপর গাইড কে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম । জানতে চাইলাম এখানের নিয়মগুলো , সে আমাকে মোটামুটি বিষদ্ভাবেই জানালো সব এবং আমার নম্বর টিও নিয়ে নিল এইফাঁকে ।
জানতে পারলাম , বয়সভেদে আলাদা আলাদা রুম আছে সবরকমের যৌনকর্মীদের , এবং সে যেভাবে চোখ টিপে বলল অল্প বয়সের মেয়েও আছে , আমি একটু অবাক হলাম । বয়স জানতে চাইলে বলল , ১২-১৫ ক্যাটাগরীর মেয়েরাও আছে আর ১৮-২৪ এর মেয়েদের ক্যাটাগরীও আছে । উলেখ্য যারা দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে শুধু তারাই আছে কনফারেন্স এ আর বাকীরা দেহ বিলিয়ে দিতে ব্যাস্ত । হাতে সময় আছে ১৫ মিনিটের মত । আমি পরখ করার জন্যে বললাম দেখব আমি ।
সে বলল একটু পাশের একটা রুমে যেতে , যাবার সময়েই দেখলাম একটা পিচ্চি মেয়ে একজন যুবক কে নিয়ে রুমে গেল আর দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে আমাদের কে তাকিয়ে একনজর দেখল । তার বয়স ১৫ এর উপরে কখনোই নয় ।
রুমে যেতেই সেই গাইড ওরফে অন্যতম দায়িত্ববান দালাল কাকে যেন ডাক দিয়ে বলল একজন কে আনতে । একটু পরই যাকে নিয়ে এল তার বয়স বড়জোর ১৪-১৬ । ফুটফুটে এরকম একজন কে এই পরিবেশে দেখতে হবে এটা আমার মাথাতেও ছিল না । আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল একদম ফ্রেশ তথা নতুন আমদানী , আমি এইকথার উত্তর দেবার ও প্রয়োজন বোধ করলাম না । অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকলাম সেই মেয়েটিকে ।
ভাবতে চাইলাম আসলেও এটা বাংলাদেশ কি না !! পরে নিজেকে বুঝালাম এটা চরম বাস্তবতা ।
ইচ্ছে হল পিচ্চির সাথে কথা বলতে । তাকে বললাম এবং সেটা বলতেই দালাল মিয়া পিচ্চিকে ধমকের মত বলল … স্যার যা বলবে ঠিকমত শুনবি … বলেই তাকে বাইরে যেতে বলে কথা বলতে বলতে দরজা ভেজাতে গিয়ে উঠলাম , ফেরত হতেই উলটো দিকে তাকিয়ে দেখি পিচ্চি ততক্ষনে কাপড়খুলে বিছানায় জুবুথুবু হয়ে বসে আছে !!!
মাথা নিচু করা , কৈশোর তখনো ভালকরে দেখা হয়নি তার , এই বয়সে কিভাবে সম্ভব এসব তা আমার মাথায় ঢুকল না !! তবে অবস্থা দেখে বুঝলাম ট্রেনিং এরমধ্যেই কিছু দেয়া হয়ে গিয়েছে ।
তার সামনে চেয়ার টেনে বসতেও নিজেরই অপ্রস্তুত বোধ হচ্ছিল , মাথা গরম , কান দিয়ে ধোয়াও বের হচ্ছিল মনে হচ্ছিল !! নগ্ন দেহ অপরিচিত নয় কিন্তু এই বয়সের টা অবশ্যই অপরিচিত । তার ন্যুড পোর্ট্রেট আঁকাটাও পাপের পর্যায়ের চিন্তাভাবনা , আর অতখানি পেডোফাইল ও নই যে তাকে দেখেই আমার হার্ড অন হয়ে যাবে । আর যদি ভাবা হয় তার মাল্টিপল অর্গাসমের কথা !!! অসম্ভব ।
শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম বাসা কোথায় , উত্তর পেয়েছিলাম কাজীপাড়া । মাথানিচু করে ছিল , আমি মোটামুটি ধাক্কা কাটিয়ে উঠেছি । মনে পড়ল পকেটে একটা চকোলেট বার আছে , যা কিছুক্ষন আগে যাত্রাপথে আপু দিয়েছিল । সেটাই এগিয়ে দিলাম ।
তার দিকে কাপড় এগিয়ে দিয়ে বলেছিলাম বাসায় যেতে , কোন কিছু না ভেবেই । সে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল । সেই প্রথম তার চোখের দিকে ভাল করে তাকানোর সুযোগ হয় । আর থাকতে পারিনি । দ্রুত বের হয়ে গিয়েছিলাম সেই রুম থেকে ।
আমি জানি , এই মেয়ে হয়ত কোনদিন ব্রিটিশ চকোলেট আর চোখেও দেখবে না , হয়ত একের পর এক নিষ্পেষিত হবে সেখানে , হয়ত সেদিনই সে হয়েছে , হয়ত ভবিষ্যতেও হতে হবে , হয়তবা এই বাস্তবতার খেলায় হারিয়ে যাবে এক কৈশোর , সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকবে কঠোর যৌনকর্মীর প্রতিমূর্তি যে নিজের দেহকে বিলীন করতে শিখে যাবে অন্যসবার মতই , রংমাখা ঠোঁটে বসে থাকবে আর সবার মত আর এই বয়সেও তোতাপাখির মত বলে যাবে যে ” আমার বয়স আঠারো ” !!
এখন যেটা মনে হয় এদের কে নিয়ে কবিতা লেখাটা তাদের প্রতি অসম্মান স্বরুপ , এবং তাদের মহৎ করতে গিয়ে দুইপক্ষই ছোট হয়ে যায় ।
এর একটু পরেই আপু আর ভাইয়াও বের হয়ে আমাকে নিয়ে আবার বের হল । একদিনে মোট চারটা স্পটে যাওয়া হল । আমি কোন কথা বলিনি তেমন এরপর , আর এটা দেখে আমাকেও আপু সেরকম কিছু জিজ্ঞেস করেননি । আমি আড়ালে বলেছিলাম ভাইয়াকে যেন যৌনকর্মীদের কে ফেলাশিও করতে নিষেধ করা হয় , মুখমেহনের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে রোগ যদি মুখে ক্ষত থাকে ।
অন্যসব স্পটের মাঝেও প্রায় একই চিত্র , কোথাও ভীড় বেশি কোথাও কম । তবে এক্ষেত্রে আমার প্রাপ্তি কয়েকটা ফোন নম্বর , অবশ্যই তা গাইডরুপী দালালদের এবং একজন যৌনকর্মীর নম্বর ও আছে এর মাঝে ।
আসল কথা কিছুই বলা হয়নি এখনো , তবে মনে হচ্ছে পোস্ট অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে , তাই পরবর্তীতে আর একটা পোস্ট দিব এই নিয়ে । সেখানে এসব যৌনকর্মীদের ক্লাসিফিকেশন , সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকার দরুন তাদের ধরন , স্মার্ট কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু এরকম এবং অনলাইনে তাদের কিছু কার্যক্রম নিয়ে তথ্য থাকবে ।
বলা যেতে পারে এটা একটা ট্রিভিয়া এর মত হবে ,
বিষয়টা নিয়ে নিজের মতই লিখছি এবারও , কারণ এখানে পেশাদার লেখিয়েদের মত অত কিছু লেখার নেই । হয়তবা আমি লিখতেও পারিনা সেভাবে ।
আর এসবের পেছনে মানবিক , ব্যাবসায়িক , জমজমাট অনেক গল্প থাকলেও সেসব নিয়ে সব লেখা হয়ত সীমিত পরিসরে একদমই সম্ভব নয় ।
একটু দেরীতে লেখার জন্যে ক্ষমা চাচ্ছি , তবে জানিনা কতটুকু চাহিদা পূরণ করতে পারব ।

সেফ থেকে জেনারেল , জেনারেল থেকে ওয়াচ , এরপর আবার জেনারেল আবার কখন হয়ত ব্লকড হয়ে যাব , কোন না কোন ইশারায় , অন্ততঃ একটু আগেও এরকম খেলা দেখলাম আমার এই ব্লগ জীবনে দ্বিতীয় বারের মত ।
তাই লিখেই শেষ করি ।
বাচ্চাদের মত মডুদের প্রতি একটু হলেও ঘৃণা আছে ভেতরে সেটাকে সেখানেই পুষে রাখি ।

…………………………..

এই পেশা বা পল্লী আইনত কি বৈধ !! ??

উত্তরটা , হ্যাঁ সূচক ।
মার্চ এর প্রথমার্ধে , ২০০০ সালেই বাংলাদেশে এই পেশাটাকে বৈধ বলে ঘোষণা দেয়া হয় ।

ছবিটা জুলাই ১৯৯৯ সালের যেদিন টানবাজারের কর্মীরা মাঠে নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের উচ্ছেদের বিষয়ে । সেদিন পথে নেমেছিলেন প্রায় ৩,৫০০ যৌনকর্মী !!

আর এই ব্যাপারে অনেক আলোচনা করেছিলেন সিগমা হুদা একটি প্রবন্ধে আর এখানেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি তার মতামত ব্যাক্ত করেছিলেন

উল্লেখ্য , ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে টানবাজারের গোরাপত্তন হয়েছিল ।
আর শুরু সালের একটা ছোটখাট সংখ্যাতত্বের হিসেব করি ফাজলামী হিসেবে …
১+৮+৮+৮=২৫ ; ২+৫=৭ , অর্থাৎ শুরুর নম্বরটা যেহেতু ৭ তাই এর প্রভাব নিজস্ব ক্ষেত্রে শুভই হবার কথা !!
কিন্তু অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়েও ১৯৯৯ এর সেদিন তারা আর পারেনি , উচ্ছেদ হয়ত হয়েছিল , কিন্তু আইনতঃ বৈধকরনের জন্যে হয়তবা এই প্রতিষ্ঠানের সেইসব কর্মীদের জোর গলারই অবদান রয়েছে ।
আর এখানে , ১+৯+৯+৯=২৮ ; ২+৮= ১০ । অর্থাৎ ১ যার মান সংখ্যাতত্বে সবকিছুর উর্দ্ধে !!!

অফটপিক তথ্যঃ খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৪ সনে গ্রীসের এথেন্সে প্রথম নিষিদ্ধপল্লীর তথ্য পাওয়া যায় , যা লিপিবদ্ধ আছে ।

আর , বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড রেডলাইট এই অঞ্চল আছে ১৮ টি গত বছরের শুরুর দিকের হিসেবে , এবং অ-রেজিস্টারকৃত এর সংখ্যা ছোট ছোট ক্ষেত্র হিসেবে ধরলেও ঢাকাতেই শতকের আশেপাশেই ।

দেশের বৃহত্তম রেজিস্টার্ড নিষিদ্ধপল্লী হচ্ছে দৌলতদিয়ায় , যেখানে ১৬০০ মহিলা প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ জনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন । প্রায় ২০ বছর আগে উন্মোচিত এই নিষিদ্ধ পল্লীর উপর একটি প্রতিবেদন যদি শুনতে ইচ্ছে করে তাহলে এখানে ক্লিক করে শুনে নিন । রিপোর্ট টি ১৪ই জানুয়ারী ২০০৮ এর ।

…………………………………………….

এবার কিছু কথাঃ

সংখ্যায় যদিও সঠিক তথ্য জানা সম্ভব নয় , তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫,০০০ শিশু যৌনকর্মী সারাদেশে বিদ্যমান ।
কি !
সংখ্যাটা দেখে তাজ্জব না হয়ে জেনে রাখা দরকার প্রায় ২০,০০০ শিশুর জন্ম ১৮ টি রেজিস্টার্ড নিষিদ্ধপল্লীতে আর অজানা অচেনা গুলোতে …
নিষিদ্ধপল্লীতে জন্ম নেয়া মেয়ে শিশুরা বয়স ১২ হতে না হতেই মায়ের দেখা দেখি এই পেশাতে জ়ড়াতে বাধ্য হয় আর ছেলেরা হয়ে ওঠে দালাল তথা খদ্দের শিকারী । হয়ত মেনে নেয়াটা অনেক কষ্টকর কিন্তু বাস্তবতা এটাই ।

যেখানে ২০০০ সালেই NGO দের হিসেবে ১,৫০,০০০ যৌনকর্মী ছিল বর্তমানে কত তা আমি অনুমান করে লিখতে পারছিনা ।
আর তাদের জীবনের ছন্নছাড়া গল্পগুলো কিভাবে লেখা যায় সেটাও হয়ত একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে ।

………………………….

যারা অডিও ক্লিপটি শুনেছেন তারা ইতিমধ্যে হয়ত বেশ কিছু শুনলেন ।
তবে এটা ঠিক যে অধিকাংশ যৌনকর্মীর ইতিহাসই এখন শুরু হয় , অতি নিম্নবিত্তের পরিবার থেকে , যেখানে খাওয়া পরার চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে গিয়ে তাদের বাবা অথবা মা কে ভালকাজের লোভ দেখিয়ে পরে নিয়ে যাওয়া এবং পাচার করে দেয়া হয় নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে যে দালাল এর সাথে কথা বলেছিলাম , সে আফসোস করছিল নতুন অল্পবয়সী মেয়েদের চাহিদার তুলনার স্বল্পতার কথা ভেবে । দ্রুত কিভাবে আনা হবে সেই ব্যাবস্থা করতেই সে ব্যস্ত ।
মাত্র ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ এর মধ্যে মেয়ে বিক্রী হয়ে যায় , আর এখানে তাদের দৈনিক গড় আয়ের পরিমান তুলনামূলকভাবে অনেক কমই ।

গার্মেন্টস এর কর্মীদের কে সেখানে এখন সহজলভ্যভাবেই পাওয়া যায় , যা রীতিমত আশঙ্কাজনক হারে শুধু বাড়ছেই ।
অর্থনৈতিক মন্দা যদি সেভাবে আরো বৃদ্ধিপায় , এই সংখ্যা যে আরো বেড়ে যাবে সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই ।

তবে , এটা ঠিক যে এখন স্বাধীনভাবে অনেকেই এই পেশায় পার্টটাইম হিসেবে চলে আসে !!! শুধু অর্থাভাবই হয়ত মূল কারণ নয় , অনেকে শুধু মজার জন্যেই একাজ করে থাকেন । স্কুল-কলেজের মেয়েদেরকেও দেখা যায় , কোননা কোন ভাবে ম্যানেজ করে ফেলতে , আর তারা সকালে এসে সকালেই চলে যায় মোটামুটি মানের নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ।

আর , ভিন্নপরিস্থিতিতে দেখা যায় অনেকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে খরচ যোগাড়ের জন্যে এই পথে নেমে আসে । তারা ক্লাস মেইন্টেইন তথা নিজেদের অবস্থানকে একটু রেখে ঢেকে চলতে পারে কিন্তু দূর্লভ নয় , চেনার চোখ থাকলেই চেনা যায় এদেরকে ।

এরকম একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল । প্রথমে সবই ঠিক , তবে খেয়াল করেছিলাম যে সে যেভাবেই হোক না কেন একটা নির্দষ্ট সময় অনলাইনে থাকত । নক করলে কিছু বলত না ।
এরপর হঠাৎ একদিন জানিয়েছিল তার একটা সিচুয়েশনের কথা যেখানে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে সাহায্য করাটাই খুব স্বাভাবিক ছিল ।
অনেক কথা বলার পর বেরিয়ে এসেছিল বেশ কিছু অনাকাংখিত তথ্য ।
সত্য মিথ্যার সংমিশ্রনে আর তার চটুল অবস্থানের কারণে একটু উদ্ভটভাবে পরবর্তীতে আসল তথ্য জানাটা ছিল বেশ হতাশার ।

মাঝখানে একটা ওয়েবসাইট পেয়েছিলাম গতবছর , এস্কর্টসদের নিয়ে ।
সেখানে থাকা প্রোফাইল দেখে ভূয়া ভেবেছিলাম প্রথমে ।
মনে করেছিলাম , হয়ত ফাজলামী করে কেউ করেছে এসব ।
তো দেশের বাইরে থেকেই প্রথম কয়েকটা নম্বরে কল দিয়েছিলাম , এবং এরপর যা হয়েছিল সেটা আমাকে আসলেও বেশ অবাক করেছিল সেদিন , মিষ্টি অভিবাদন জানিয়ে সাড়া দেয়া … এরপর বলেছিলাম ” কোথায় পাওয়া যাবে ? ” সে উত্তরে বলেছিল ঢাকা চট্টগ্রাম দু’জায়গাতেই সম্ভব আর তাকে কত দিতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল আলোচনা সাপেক্ষ ।

এরপর অনলাইনে যাদের কে এ্যাড করেছিলাম , এরমধ্যে বেশ কয়েকটি খুব ভাল রেস্পন্স করেছিল ।
একজন ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে বলেছিল ।
গুলশানের গৃহবধু বলে নাকি এটাই তার জন্যে সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা ! প্রথমে আস্বস্ত হবার জন্যে একটু বাজিয়ে দেখেই পরে ঝটপট বলেছিল একটি নির্দিষ্ট মেইল এ্যাড এ মেইল দিতে তার প্রোফাইলের জন্যে ।
আমি মেইল দেবার আধা ঘন্টার মধ্যেই রিপ্লাই পেয়েছিলাম । $১০০ এর প্রোফাইল !!
উল্লেখ্যঃ এরা ছদ্মনাম ব্যাবহার করে এটাও যেমন ঠিক , আবার অনেকে একটু ফ্রী হলেই বিশ্বস্ততার উপরে নির্ভর করতে পারলে আসলটাও জানিয়ে দিতে দ্বিধা করেনা ।
মেইলের ভেতরে যে প্রোফাইল ছিল সেখানে কিছু কিছু শর্তাবলীও ছিল এরকম
মাইক্রোসফটের ওয়ার্ড ফাইলে একটা নাম পেলাম জনৈক মোঃ মজিবুর রহমান । হয়ত সেই ব্যক্তির কম্পিউটারে লেখা অথবা সেই লোকই রচয়িতা হয়তবা সেই লোকই দালাল !! কে , জানে !!

এভাবেই সমাজের বিভিন্ন স্তরেই রয়েছে এই এক বিশেষ গোষ্ঠী । জীবিকার তাগিদে তাদের ভারসাম্য আনতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ।
দেহের মূল্য কত এই প্রশ্নটি এখানে অবিবেচ্য ।
কারণ , এর চেয়ে অনেক বেশি কিছুই জড়িয়ে আছে এর সাথে ।

………………………………………

ঢাকায় ঘোষিত নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পুলিশের চাঁদাজনিত আনাগোনায় ব্যাস্ত থাকে বলে কেউ যদি দেখার জন্যেও যেতে চান , একটা পরিচয় নিয়ে যাওয়া ভাল যাতে কেউই না থামিয়ে উলটো সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয় ।

আর দেশে যে প্রচলিত আইন আছে তার তিনটি ধারা নিম্নরূপঃ
“ Section 364A – Whoever, kidnaps or abducts any person under the age of ten, in order that such a person may be or subjected to slavery or to the lust of any person shall be punished with death or with imprisonment for life or for rigorous imprisonment for a term which may extend to 14 years and may not be less than 7 years. ”
“ Section 366A – Whoever, by any means whatsoever, induces any minor girl under the age of eighteen years to go from any place or to do any act with the intent that such a girl may be or knowing that it is likely that she will be, forded or seduced to illicit intercourse with another person shall be punishable with imprisonment which may extend to 10 years and shall also be liable to fine. ”
“ Section 373 – Whoever buys, hires or otherwise obtains possession of any person under the age of eighteen years with the intent that such person shall at any age be employed or used for the purpose of prostitution or illicit intercourse with any person or knowing it likely that such person will at any age be employed or used for such purpose with imprisonment of either description for a term which may extend 10 years and fine. Any prostitute or any person keeping or managing a brothel, who buys, hires or otherwise obtains possession of a female under the age of 18 years, shall until the contrary is proved, be presumed to have obtained possession of such female with the intent that she shall be used for the purpose of prostitution. ”

আইন থাকলেও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ এখনো হয়না , আর এরপরেও যে হারে সব তোয়াক্কা করে দেশে শিশু এবং নারী যৌনকর্মী এবং তাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে তা নিজ চোখে দেখলেও হয়ত ভেতর টা অনুভব করা সম্ভব নয় ।

……………………………………………

Inside the slave trade শিরোনামের এই প্রামাণ্য প্রতিবেদনটি বেশ তথ্য সমৃদ্ধ
এখানে বাংলাদেশের পতিতাবৃত্তি নিয়ে কিছু হাল্কা গবেষণামূলক লেখা আছে
এখানেই আপাততঃ শেষ করছি ।
এই বিষয়টা নিয়ে আর কিছু লেখার থাকলেও , তা আর কোনদিন লিখবনা ।
এই লেখা লিখতে হয়তবা যত্নের ঘাটতি ছিল , সেজন্যে পাঠকের কাছে আগেই নিজে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি ।

ছবিটা জুলাই ১৯৯৯ সালের যেদিন টানবাজারের কর্মীরা মাঠে নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের উচ্ছেদের বিষয়ে । সেদিন পথে নেমেছিলেন প্রায় ৩,৫০০ যৌনকর্মী !!
আর এই ব্যাপারে অনেক আলোচনা করেছিলেন সিগমা হুদা একটি প্রবন্ধে আর এখানেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি তার মতামত ব্যাক্ত করেছিলেন
উল্লেখ্য , ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে টানবাজারের গোরাপত্তন হয়েছিল ।
আর শুরু সালের একটা ছোটখাট সংখ্যাতত্বের হিসেব করি ফাজলামী হিসেবে …
১+৮+৮+৮=২৫ ; ২+৫=৭ , অর্থাৎ শুরুর নম্বরটা যেহেতু ৭ তাই এর প্রভাব নিজস্ব ক্ষেত্রে শুভই হবার কথা !!
কিন্তু অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়েও ১৯৯৯ এর সেদিন তারা আর পারেনি , উচ্ছেদ হয়ত হয়েছিল , কিন্তু আইনতঃ বৈধকরনের জন্যে হয়তবা এই প্রতিষ্ঠানের সেইসব কর্মীদের জোর গলারই অবদান রয়েছে ।
আর এখানে , ১+৯+৯+৯=২৮ ; ২+৮= ১০ । অর্থাৎ ১ যার মান সংখ্যাতত্বে সবকিছুর উর্দ্ধে !!!
অফটপিক তথ্যঃ খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৪ সনে গ্রীসের এথেন্সে প্রথম নিষিদ্ধপল্লীর তথ্য পাওয়া যায় , যা লিপিবদ্ধ আছে ।
আর , বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড রেডলাইট এই অঞ্চল আছে ১৮ টি গত বছরের শুরুর দিকের হিসেবে , এবং অ-রেজিস্টারকৃত এর সংখ্যা ছোট ছোট ক্ষেত্র হিসেবে ধরলেও ঢাকাতেই শতকের আশেপাশেই ।

দেশের বৃহত্তম রেজিস্টার্ড নিষিদ্ধপল্লী হচ্ছে দৌলতদিয়ায় , যেখানে ১৬০০ মহিলা প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ জনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন । প্রায় ২০ বছর আগে উন্মোচিত এই নিষিদ্ধ পল্লীর উপর একটি প্রতিবেদন যদি শুনতে ইচ্ছে করে তাহলে এখানে ক্লিক করে শুনে নিন । রিপোর্ট টি ১৪ই জানুয়ারী ২০০৮ এর
…………………………………………….
এবার কিছু কথাঃ
সংখ্যায় যদিও সঠিক তথ্য জানা সম্ভব নয় , তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫,০০০ শিশু যৌনকর্মী সারাদেশে বিদ্যমান ।
কি !
সংখ্যাটা দেখে তাজ্জব না হয়ে জেনে রাখা দরকার প্রায় ২০,০০০ শিশুর জন্ম ১৮ টি রেজিস্টার্ড নিষিদ্ধপল্লীতে আর অজানা অচেনা গুলোতে …
নিষিদ্ধপল্লীতে জন্ম নেয়া মেয়ে শিশুরা বয়স ১২ হতে না হতেই মায়ের দেখা দেখি এই পেশাতে জ়ড়াতে বাধ্য হয় আর ছেলেরা হয়ে ওঠে দালাল তথা খদ্দের শিকারী । হয়ত মেনে নেয়াটা অনেক কষ্টকর কিন্তু বাস্তবতা এটাই ।
যেখানে ২০০০ সালেই NGO দের হিসেবে ১,৫০,০০০ যৌনকর্মী ছিল বর্তমানে কত তা আমি অনুমান করে লিখতে পারছিনা ।
আর তাদের জীবনের ছন্নছাড়া গল্পগুলো কিভাবে লেখা যায় সেটাও হয়ত একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে ।
………………………….
যারা অডিও ক্লিপটি শুনেছেন তারা ইতিমধ্যে হয়ত বেশ কিছু শুনলেন ।
তবে এটা ঠিক যে অধিকাংশ যৌনকর্মীর ইতিহাসই এখন শুরু হয় , অতি নিম্নবিত্তের পরিবার থেকে , যেখানে খাওয়া পরার চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠতে গিয়ে তাদের বাবা অথবা মা কে ভালকাজের লোভ দেখিয়ে পরে নিয়ে যাওয়া এবং পাচার করে দেয়া হয় নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে যে দালাল এর সাথে কথা বলেছিলাম , সে আফসোস করছিল নতুন অল্পবয়সী মেয়েদের চাহিদার তুলনার স্বল্পতার কথা ভেবে । দ্রুত কিভাবে আনা হবে সেই ব্যাবস্থা করতেই সে ব্যস্ত ।
মাত্র ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ এর মধ্যে মেয়ে বিক্রী হয়ে যায় , আর এখানে তাদের দৈনিক গড় আয়ের পরিমান তুলনামূলকভাবে অনেক কমই ।
গার্মেন্টস এর কর্মীদের কে সেখানে এখন সহজলভ্যভাবেই পাওয়া যায় , যা রীতিমত আশঙ্কাজনক হারে শুধু বাড়ছেই ।
অর্থনৈতিক মন্দা যদি সেভাবে আরো বৃদ্ধিপায় , এই সংখ্যা যে আরো বেড়ে যাবে সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই ।
তবে , এটা ঠিক যে এখন স্বাধীনভাবে অনেকেই এই পেশায় পার্টটাইম হিসেবে চলে আসে !!! শুধু অর্থাভাবই হয়ত মূল কারণ নয় , অনেকে শুধু মজার জন্যেই একাজ করে থাকেন । স্কুল-কলেজের মেয়েদেরকেও দেখা যায় , কোননা কোন ভাবে ম্যানেজ করে ফেলতে , আর তারা সকালে এসে সকালেই চলে যায় মোটামুটি মানের নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ।

আর , ভিন্নপরিস্থিতিতে দেখা যায় অনেকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে খরচ যোগাড়ের জন্যে এই পথে নেমে আসে । তারা ক্লাস মেইন্টেইন তথা নিজেদের অবস্থানকে একটু রেখে ঢেকে চলতে পারে কিন্তু দূর্লভ নয় , চেনার চোখ থাকলেই চেনা যায় এদেরকে ।

এরকম একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল । প্রথমে সবই ঠিক , তবে খেয়াল করেছিলাম যে সে যেভাবেই হোক না কেন একটা নির্দষ্ট সময় অনলাইনে থাকত । নক করলে কিছু বলত না ।
এরপর হঠাৎ একদিন জানিয়েছিল তার একটা সিচুয়েশনের কথা যেখানে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে সাহায্য করাটাই খুব স্বাভাবিক ছিল ।
অনেক কথা বলার পর বেরিয়ে এসেছিল বেশ কিছু অনাকাংখিত তথ্য ।
সত্য মিথ্যার সংমিশ্রনে আর তার চটুল অবস্থানের কারণে একটু উদ্ভটভাবে পরবর্তীতে আসল তথ্য জানাটা ছিল বেশ হতাশার ।

মাঝখানে একটা ওয়েবসাইট পেয়েছিলাম গতবছর , এস্কর্টসদের নিয়ে ।
সেখানে থাকা প্রোফাইল দেখে ভূয়া ভেবেছিলাম প্রথমে ।
মনে করেছিলাম , হয়ত ফাজলামী করে কেউ করেছে এসব ।
তো দেশের বাইরে থেকেই প্রথম কয়েকটা নম্বরে কল দিয়েছিলাম , এবং এরপর যা হয়েছিল সেটা আমাকে আসলেও বেশ অবাক করেছিল সেদিন , মিষ্টি অভিবাদন জানিয়ে সাড়া দেয়া … এরপর বলেছিলাম ” কোথায় পাওয়া যাবে ? ” সে উত্তরে বলেছিল ঢাকা চট্টগ্রাম দু’জায়গাতেই সম্ভব আর তাকে কত দিতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল আলোচনা সাপেক্ষ ।

এরপর অনলাইনে যাদের কে এ্যাড করেছিলাম , এরমধ্যে বেশ কয়েকটি খুব ভাল রেস্পন্স করেছিল ।
একজন ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে বলেছিল ।
গুলশানের গৃহবধু বলে নাকি এটাই তার জন্যে সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা ! প্রথমে আস্বস্ত হবার জন্যে একটু বাজিয়ে দেখেই পরে ঝটপট বলেছিল একটি নির্দিষ্ট মেইল এ্যাড এ মেইল দিতে তার প্রোফাইলের জন্যে ।
আমি মেইল দেবার আধা ঘন্টার মধ্যেই রিপ্লাই পেয়েছিলাম । $১০০ এর প্রোফাইল !!
উল্লেখ্যঃ এরা ছদ্মনাম ব্যাবহার করে এটাও যেমন ঠিক , আবার অনেকে একটু ফ্রী হলেই বিশ্বস্ততার উপরে নির্ভর করতে পারলে আসলটাও জানিয়ে দিতে দ্বিধা করেনা ।
মেইলের ভেতরে যে প্রোফাইল ছিল সেখানে কিছু কিছু শর্তাবলীও ছিল এরকম
মাইক্রোসফটের ওয়ার্ড ফাইলে একটা নাম পেলাম জনৈক মোঃ মজিবুর রহমান । হয়ত সেই ব্যক্তির কম্পিউটারে লেখা অথবা সেই লোকই রচয়িতা হয়তবা সেই লোকই দালাল !! কে , জানে !!

এভাবেই সমাজের বিভিন্ন স্তরেই রয়েছে এই এক বিশেষ গোষ্ঠী । জীবিকার তাগিদে তাদের ভারসাম্য আনতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ।
দেহের মূল্য কত এই প্রশ্নটি এখানে অবিবেচ্য ।
কারণ , এর চেয়ে অনেক বেশি কিছুই জড়িয়ে আছে এর সাথে ।

………………………………………

ঢাকায় ঘোষিত নিষিদ্ধপল্লীগুলোতে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পুলিশের চাঁদাজনিত আনাগোনায় ব্যাস্ত থাকে বলে কেউ যদি দেখার জন্যেও যেতে চান , একটা পরিচয় নিয়ে যাওয়া ভাল যাতে কেউই না থামিয়ে উলটো সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয় ।

আর দেশে যে প্রচলিত আইন আছে তার তিনটি ধারা নিম্নরূপঃ
“ Section 364A – Whoever, kidnaps or abducts any person under the age of ten, in order that such a person may be or subjected to slavery or to the lust of any person shall be punished with death or with imprisonment for life or for rigorous imprisonment for a term which may extend to 14 years and may not be less than 7 years. ”
“ Section 366A – Whoever, by any means whatsoever, induces any minor girl under the age of eighteen years to go from any place or to do any act with the intent that such a girl may be or knowing that it is likely that she will be, forded or seduced to illicit intercourse with another person shall be punishable with imprisonment which may extend to 10 years and shall also be liable to fine. ”
“ Section 373 – Whoever buys, hires or otherwise obtains possession of any person under the age of eighteen years with the intent that such person shall at any age be employed or used for the purpose of prostitution or illicit intercourse with any person or knowing it likely that such person will at any age be employed or used for such purpose with imprisonment of either description for a term which may extend 10 years and fine. Any prostitute or any person keeping or managing a brothel, who buys, hires or otherwise obtains possession of a female under the age of 18 years, shall until the contrary is proved, be presumed to have obtained possession of such female with the intent that she shall be used for the purpose of prostitution. ”

আইন থাকলেও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ এখনো হয়না , আর এরপরেও যে হারে সব তোয়াক্কা করে দেশে শিশু এবং নারী যৌনকর্মী এবং তাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে তা নিজ চোখে দেখলেও হয়ত ভেতর টা অনুভব করা সম্ভব নয় ।
……………………………………………
Inside the slave trade শিরোনামের এই প্রামাণ্য প্রতিবেদনটি বেশ তথ্য সমৃদ্ধ
এখানে বাংলাদেশের পতিতাবৃত্তি নিয়ে কিছু হাল্কা গবেষণামূলক লেখা আছে

এখানেই আপাততঃ শেষ করছি ।
এই বিষয়টা নিয়ে আর কিছু লেখার থাকলেও , তা আর কোনদিন লিখবনা ।
এই লেখা লিখতে হয়তবা যত্নের ঘাটতি ছিল , সেজন্যে পাঠকের কাছে আগেই নিজে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি ।
মন্তব্য:
তামিম ইরফান বলেছেন, : আমি আমার ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি। জার্নালিজম কোর্স করার সময়(আমাদের ইংলিশে ডিপার্টমেন্টের এইটা বাধ্যতামুলক কোর্স) আমার এ্যাসাইনমেন্ট টপিক ছিলো প্রষ্টিটিউশন।তখন কাজ কারার সময় বিভিন্ন পতিতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো।

একজন নীচের লেভেলের পতিতার আয় গড়ে প্রতিদিন ১৫০-২০০ টাকা(রেট ৩০০ টাকা।এখান থেকে ১০০ টাকা যায় হোটেল মালিকের কাছে,৫০ টাকা দালালের কমিশন,৫০ টাকা পুলিশ ও অন্যান্য,প্রতিদিন ৫-৮ জন গ্রাহক)
এর একটু উপরের লেভেলের আয় ৩৫০-৪৫০ (রেট ৭০০-১৫০০)….।এদের বিভিন্ন রেস্ট হাউজে দেখা যায় বিশেষ করে বারিধারা।
হাই লেভেলের রেট (৩ জনের সাথে কথা বলার সুযোগ হইছিলো।এদের মধ্যে একজন ছিলো বিশিষ্ট একজন শিল্পপতির মেয়ে…..টাকার অভাব নাই তার কিন্তু সে পেশায় আসছে কারন এটা কে একটা এ্যাডভেন্জ্ঞার মনে করে…..তার বোরিং লাইফে এইটা একটা বিনোদন)৫০০০-১০০০০০।এখানে বাংলা সিনেমার নায়িকা,মডেলও আছে।
১২০ পেজের একটা এ্যাসাইনমেন্ট ছিলো।কাজটা করতে গিয়ে এমন সব অভিজ্ঞতা হইছে যে আমার সারাজীবনও এমন অভিজ্ঞতা হবে কি না সন্দেহ আছে।

 

৩০০ টাকার জন্য প্রাণ দিতে হলো মুক্তিযোদ্ধাকে December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 4:32 am

গ্রামে গ্রামে ঘুরে আতর ও টুপি বিক্রি করতেন তিনি। অবসরে বুনতেন মাছ ধরার জাল। এই জাল তৈরি করে দিতে এক ব্যবসায়ী ৩০০ টাকা দিয়েছিলেন তাঁকে। এটিই হলো তাঁর কাল। সময়মতো জাল দিতে পারেননি তিনি, ফেরত দিতে পারেননি ওই টাকাও। শেষে জীবনের বিনিময়ে তাঁকে মূল্য শোধ করতে হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ওই ব্যবসায়ীর লাঠিপেটায় আহত হয়ে তিনি রাতে মারা যান। জীবন দেওয়া এই মানুষটি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক (৬৫)। ঝিনাইদহ শহরের আদর্শপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি।
আবদুল খালেকের মেজ ছেলে হাবিবুর রহমান জানান, এক মাস আগে শহরের হামদহ এলাকার (৩ নম্বর পানির ট্যাংকপাড়া) ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জাল তৈরির জন্য তাঁর বাবাকে ৩০০ টাকা দেন। কিন্তু তাঁর বাবা সময়মতো জাল তৈরি করতে পারেননি। অভাবের সংসারে ওই টাকাও খরচ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মুক্তিযোদ্ধা খালেক একটি দোকান থেকে পান খেয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় নাসির উদ্দিন তাঁর পথ রোধ করে টাকা চান। টাকা দিতে খালেক সময় চাইলে নাসির ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। শুরু হয় দুজনের মধ্যে বাগিবতণ্ডা। একপর্যায়ে নাসির খালেককে লাঠিপেটা করতে থাকেন। এতে গুরুতর আহত হন খালেক। তাঁকে প্রথমে শহরের আল-ফালাহ হাসপাতাল ও পরে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতে অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিত্সকেরা তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। যশোর নেওয়ার পথে বিষয়খালীতে রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান। ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল মর্গে তাঁর মরদেহের ময়না তদন্ত হয়েছে। এ ঘটনায় হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে গতকাল ঝিনাইদহ সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
খবর পেয়ে গতকাল শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের মহাসচিব সালাউদ্দিন আহম্মদসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা খালেকের বাড়িতে যান। তাঁরা আবদুল খালেকের মরদেহ নিয়ে শহরে মৌন মিছিল করেন। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁর মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক মকবুল হোসেন বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য হামদহ এলাকায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের বাড়িতে গেলে দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। আশপাশের লোকজন জানান, ঘটনার পর থেকে নাসির উদ্দিন পলাতক।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান জানান, তাঁরা দ্রুত আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

 

একবিংশ শতকের ডারউইন December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 4:28 am

লিখেছেন : মুহাম্মদ

আগামী ১২ই ফেব্রয়ারি সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী এবং তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ “অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস” এর ১৫০তম প্রকাশবার্ষিকী। বিবর্তনবাদ নিয়ে আজ পৃথিবীর কোন জীববিজ্ঞানীর মধ্যেই সংশয় নেই। তবে এর প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় আছে। সেটা নিয়েই বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীরা এখন সবচেয়ে বেশী গবেষণা করছেন। এই প্রেক্ষিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা “সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান” তাদের জানুয়ারি ২০০৯ সংখ্যাটি বিবর্তনবাদ নিয়ে করেছে। প্রথম প্রবন্ধটির অনুবাদ করে সচলায়তনে প্রকাশ করেছিলাম। মুক্ত-মনা ১২ই ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে বিশেষ ওয়েবপেইজ করছে যেখানে প্রবন্ধটি থাকবে। এর পাশাপাশি সিসিবি-তেও লেখাটি প্রকাশ করলাম।
——————————————————————————–
মূল প্রবন্ধ – Darwin’s Living Legacy
লেখক – Gary Stix
সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান, জানুয়ারি ২০০৯
বাংলা শিরোনাম – একবিংশ শতকের ডারউইন
——————————————————————————–
১৮৩৫ সালে বিগল জাহাজে চড়ে চার্লস ডারউইন গালাপাগোস দ্বীপে গিয়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। দ্বীপের বেশ কিছু পাখি তার নজর কেড়েছিল। সেই পাখিগুলোর নামের সাথে তাই ডারউইনের নাম জড়িয়ে আছে। এখনও এগুলোকে ডারউইনের ফিঞ্চ (finch) নামে ডাকা হয়। প্রকৃতিবিদরা এ ধরণের অনেকগুলো ফিঞ্চকে আগে গ্রসবিক (grosbeak) ভেবে ভুল করতেন। বর্তমানে সে ধরণের সংশয় অনেকটাই দূর হয়েছে। এই ফিঞ্চগুলোর আবিষ্কারের কাহিনীও বেশ মজার। ডারউইনের সময় ইংল্যান্ডে জন গুল্ড নামে একজন পক্ষীবিশারদ ও চিত্রকর ছিলেন। ডারউইনরা অনেক ধরণের পাখির নমুনা নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে এসেছিলেন। গুল্ড এই সংরক্ষিত নমুনাগুলো থেকে কয়েকটির ছবি আঁকা শুরু করেন। ছবি আঁকতে গিয়ে লক্ষ্য করেন, এগুলো সবই ফিঞ্চের বিভিন্ন প্রজাতি।

আমাদের স্বশিক্ষিত প্রকৃতিবিদ ডারউইন গুল্ডের ছবিগুলো দেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পেরেছিলেন: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ফিঞ্চদের ঠোঁটের আকার পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন দ্বীপের ফিঞ্চরা বিভিন্ন আকারের দানা ও পোঁকা খেত। খাদ্যের আকার অনুযায়ীই তাদের ঠোঁটের আকার পরিবর্তিত হয়েছে। এই বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ডারউইন তার “দ্য ভয়েজ অফ দ্য বিগল” (১৮৩৯) বইয়ে লিখেছেন, “নিবিঢ়ভাবে সম্পর্কিত এক শ্রেণীর পাখির মধ্যে এই গঠনগত ক্রমবিন্যাস ও বৈচিত্র্য দেখে যে কেউ বিস্মিত হবেন। অনেকের মনে হতে পারে, এই দ্বীপপুঞ্জের স্বল্পসংখ্যক পাখি প্রজাতির কোন একটিকে নির্বাচন করা হয়েছে এবং সেই প্রজাতির বিভিন্ন পাখিকে বিভিন্নভাবে বদলানো হয়েছে।”
এর ২০ বছর পর ডারউইন ফিঞ্চদের অভিযোজন প্রক্রিয়ার একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন যা “বিবর্তনবাদ” হিসেবে পরিচিত। এতে বলা হয়েছিল, ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের কারণেই এক প্রজাতির একেক পাখি একেক ভাবে অভিযোজিত হয়েছে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের শক্তিই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কেবল পরিবেশ উপযোগী বৈশিষ্ট্যগুলোকে টিকিয়ে রেখেছে। ডারউনের তত্ত্ব বিজ্ঞানী ও ধার্মিক উভয় সমাজের কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছে। কিন্তু এই তত্ত্ব একটি অতি সমৃদ্ধ গবেষণাক্ষেত্রের সূচন-বিন্দু মাত্র, সেই গবেষণা আজ অব্দি চলছে, এর যেন কোন শেষ নেই। বর্তমানকালের বিজ্ঞানীরাও সেই তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। জীববিজ্ঞানীরা এখনও আণবিক জগতে বিবর্তনের কার্যক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বোঝার চেষ্টা করছেন, ঠিক কিভাবে আণবিক স্কেলে প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে এবং তার মাধ্যমে কিভাবেই বা নতুন প্রজাতির জন্ম হয়।
ডারউইনের সেই বিখ্যাত ফিঞ্চ পাখিরা এখনও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। গবেষকরা ধারণা করে নিয়েছেন, বিবর্তন প্রক্রিয়া খুব ধীরে ঘটে, এতই ধীরে যে মানুষের জীবদ্দশায় তার প্রমাণ পাওয়ার কল্পনাও করা যায় না। কোন মানব পর্যবেক্ষকের পক্ষে তাই বিবর্তন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ফিঞ্চদের নিয়ে উৎসাহ কমেনি, এমনকি এদেরকে আদর্শ গবেষণা বস্তু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কারণ এই প্রজাতির পাখিরা অপেক্ষাকৃত দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং তারা সচরাচর এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যায় না।
১৯৭০-এর দশকে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী পিটার আর গ্র্যান্ট ও বি রোজম্যারি গ্র্যান্ট গালাপাগোস দ্বীপকে এক জান্তব গবেষণাগার বানিয়ে ফেলেছিলেন। দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ২০,০০০ ফিঞ্চ পাখি ছিল তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু। তারা দেখেছিলেন, এল নিনো আসে আর যায়, এর সাথে পরিবেশ এক সময় সিক্ত হয়, অন্য সময় আবার শুষ্ক হয়ে উঠে। আর এরই সাথে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মে ফিঞ্চদের ঠোঁট ও দেহের আকার পরিবর্তিত হয়। এমনকি তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের ফিঞ্চদের আকার-আকৃতি কেমন হবে তার সফল ভবিষ্যৎবাণীও করেছিলেন।
গ্র্যান্টদের মত আরও অনেক বিজ্ঞানী বাস্তব পরিবেশে বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এ ধরণের গবেষণাগুলোতে সবসময়ই ইয়নের বদলে বছর দিয়ে বিবর্তনের সীমারেখা টানা হয়েছে। কিন্তু এটা ডারউইনের ধীর-স্থির বিবর্তন বিষয়ক মূল স্বীকার্যের পরিপন্থী। এ ধরণের পরীক্ষাগুলো অনেক প্রাণীর উপরই করা হয়েছে। যেমন, আফ্রিকার গ্রেট লেকের সিকলিড মাছ, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ার Eleutherodactylus ব্যাঙ ইত্যাদি।
মানুষ কিন্তু অনেক আগে থেকেই বিবর্তন নিয়ে চিন্তা করত। এমনকি সক্রেটিসেরও আগে থেকে তারা যোগ্যতমের টিকে থাকার প্রক্রিয়া নিয়ে ভেবে আসছে। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে জীবনের বেড়ে ওঠা নিয়ে অনেক ধারণার জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে ডারউইনের পিতামহ ইরাসমাস ডারউইনের (১৭৩১-১৮০২) ধারণাগুলোও উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু ডারউইনীয় বিবর্তনবাদই প্রথমবারের মত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। উনবিংশ শতকের পর থেকে শুরু হয়ে আজ অব্দি সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বর্তমানে পরীক্ষা হচ্ছে সূক্ষ্ণ সব যন্ত্রপাতি দিয়ে। ক্যামেরা, কম্পিউটার আর ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের মত সূক্ষ্ণ যন্ত্র আজ বিজ্ঞানীদের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বিগল জাহাজের কুঠুরীর সাথে কি আর এর তুলনা চলে। কিন্তু এতসব যন্ত্র দিয়ে করা সুনিপুণ পরীক্ষাগুলো দিন দিন সেই বিগল যাত্রীর পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। জৈব প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ফরেনসিক মেডিসিন পর্যন্ত সকল ব্যবহারিক বিজ্ঞানই আজ বিবর্তনের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। আজ তাই ডারউইন দিবস উদ‌যাপনের জন্য নব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ১২ই ফেব্রুয়ারি ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী এবং তার জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ “On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favored Races in the Struggle for Life.” এর ১৫০তম প্রকাশবার্ষিকী। বিশ্বের সব বিজ্ঞানী একাট্টা হয়েছেন, ধুমধামের সাথে এই দিবসটি পালন করার জন্যে।

ডারউইনের তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের একটি প্রধান খুঁটি। বিজ্ঞানের মূলভিত্তির কথা চিন্তা করলে তাই বিবর্তনবাদ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সাথেই থাকবে। কোপের্নিকুস যেমন সৌরকেন্দ্রিক মতবাদের মাধ্যমে পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিলেন, ঠিক তেমনি ডারউইন তার তত্ত্বের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু থেকে মানুষকে বিতাড়িত করেছেন। তিনি এর জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনকে দায়ী করেছেন, একেই চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। “ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, আরভিন”-এর বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী ফ্রান্সিস্কো জে আয়ালা এই চালিকাশক্তিকে বলেছেন “design without a designer”। এখনও যেসব ধর্মতাত্ত্বিকেরা বিবর্তনবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন, আয়ালা এ কথাটি তাদের উদ্দেশ্য করেই বলেছেন। ২০০৭ সালে আয়ালা আরও বলেন, “ডারউইন কোপের্নিকুসীয় বিপ্লবকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তিনি জীববিজ্ঞানে এক নবতরঙ্গের সূচনা ঘটিয়েছেন যেখানে প্রকৃতিকে একটি ন্যায়সঙ্গত শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি এমন এক ন্যায়সঙ্গত শক্তির সন্ধান দিয়েছেন যাকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষকে কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির দ্বারস্থ হতে হয় না।”

এই বার্ষিকীতে ডারউইন গবেষণার বন্যা বয়ে যাবে। সবগুলো গবেষণার সূচন-বিন্দু হবে স্বয়ং ডারউইনের রচনা। এই বছর আমরা আবার ভেবে দেখব, গত ১৫০ বছরে কিভাবে বিবর্তনবাদ পরিশোধিত ও বিকশিত হয়েছে। আমরা দেখব, কিভাবে ডারউইনের মৌলিক তত্ত্বের সাথে আধুনিক জিনতত্ত্বের সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। যে জিন সম্পর্কে ডারউইনের জ্ঞান প্রাচীন বিজ্ঞানীদের মতই ছিল, সেই জিন কিভাবে মানবতার খোলস উন্মোচন করেছে, কিভাবে শৌখিন বিজ্ঞানী ডারউইনকে আধুনিক সভ্যতার নায়ক বানিয়েছে তা দেখে আমরা আবারও বিস্মিত হব।

বিবর্তনবাদ নিয়ে আমাদের সাধারণ প্রশ্নগুলো এরকম: প্রাকৃতিক নির্বাচন কতটা স্বাভাবিক? জিনের আণবিক স্তরে প্রাকৃতিক নির্বাচন কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে? যে জিন বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে তার উৎপত্তি কোত্থেকে? প্রাণী, উদ্ভিদ বা অণুজীবের বিচ্ছিন্ন জিন, পুরো একটা অঙ্গ বা পুরো একটা শ্রেণীর মধ্যেই কি ফিটনেস টেস্ট চলে, নাকি কোন বাছবিচার আছে? মানুষ যদি পরিবেশ বা নিজেদের দেহের উপর এক ধরণের অকাট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তবে কি তাদের ক্ষেত্রেও এরকম বিবর্তন ঘটবে?

একজন স্বভাবজাত প্রকৃতিবিদ

আলবার্ট আইনস্টাইন এবং এরকম অনেক বিজ্ঞানীর মত ডারউইনও জন্মসূত্রে মেধাবী ছিলেন। প্রকৃতিবিজ্ঞান বিষয়ে তার কোন উঁচুমানের ডিগ্রি ছিল না। ইংল্যান্ডের এক মফস্বলের বেশ সচ্ছল পরিবারের তার জন্ম। ছাত্র হিসেবে মাঝারি গোছের ছিলেন, সবসময়ই প্রথাগত শিক্ষাকে ঘৃণা করতেন। শিক্ষাক্রমে ক্লাসিক সাহিত্য ও সাধারণ জ্ঞানের আধিক্য তার মোটেই ভাল লাগতো না। (আইনস্টাইনও ডানপিটে ছাত্র ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনার দিকে তার খুব বেশী মনোযোগ ছিল না।) বাবার ইচ্ছায় মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু লাশ ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে মেডিক্যালের উপর তার সব আগ্রহ চলে যায়, সে পড়াশোনা আর শেষ করেননি। কিন্তু শিকারের সময় পাখি ও ছোট ছোট প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলত তার তেমন কোন কষ্টই হতো না। এমনকি জীবজন্তু পর্যবেক্ষণ আর ছোট ছোট প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করা তার শখের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

এক সময় বাবা রবার্ট ডারউইন বুঝতে পারলেন তার এই ছেলেকে দিয়ে বিশেষ কিছু হবে না। তাই তাকে ধর্মবেত্তা হওয়ার জন্য ইউনিভার্সিটি অফ ক্যামব্রিজে ভর্তি হতে আদেশ করলেন। মজার বিষয়, যার কাজকে অনেক ধর্মবেত্তা ধর্মের চূড়ান্ত অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করেছেন সেই ব্যক্তিই স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছিলেন ধর্মতত্ত্বে। অবশ্য তিনি কোনক্রমে সেই ডিগ্রি পেয়েছিলেন, পরীক্ষার ফলাফল মোটেই ভাল ছিল না।

একসময় বাবার অসম্মতি সত্ত্বেও ডারউইন বিগল জাহাজে প্রকৃতিবিদ হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। বিগল ছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জরিপ জাহাজ যা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে জরিপ কাজ চালাতো। এই নৌ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তীতে ডারউইন বলেছেন, “আমার প্রথম প্রকৃত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ”। পাঁচ বছর তিনি জাহাজে চড়ে পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন। তখন তার হাতে চিন্তা করার মত যথেষ্ট সময়ও ছিল। এসময়ই প্রাকৃতিক বিশ্ব ডারউইনের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতাই তার সকল গবেষণাকর্মের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

বিগল জাহাজের ৫ বছরের যাত্রাপথে অনেকগুলো স্থানের পরিবেশ ও প্রাণীকূল ডারউইনের পরবর্তী গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ক্রান্তীয় ব্রাজিলের বৈচিত্র্যময় প্রজাতিসমূহ, বুয়েনোস আইরেসের ৪০০ মাইল দক্ষিণে একটি বিশাল শ্লথের জীবাশ্ম আবিষ্কার (এছাড়াও বেশ তিনি বেশ কিছু জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছিলেন)। জীবাশ্ম আবিষ্কারের পর তিনি এই প্রাণীগুলোর বিলুপ্তির কারণ নিয়ে ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার প্যাম্পাস অঞ্চলে গাউচোদের হাতে সেখানকার আদিবাসীদের হত্যার ঘটনা জানার পর তিনি মানুষ নামক প্রাণীটির ভৌগলিক প্রভাব বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেন। আদ্যিকালে মানুষ নতুন ভূমিতে গিয়ে কি করত সেটাও তিনি এর মাধ্যমে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটির কথা আসে, সেই গালাপাগোস দ্বীপ যেখানে ডারউইন পাঁচ সপ্তাহ ছিলেন। এই দ্বীপে যখন বিগল পৌঁছুল তখন সেখানে প্রচণ্ড গরম ছিল। ডারউইনের মন অবশ্য শীতলই ছিল। তিনি কচ্ছপ ও হরবোলা পাখির দুটি পরস্পর সম্পর্কিত প্রজাতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, এই দুটি প্রজাতিই আশপাশের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে এমনভাবে উপনিবেশ স্থান করেছে যাতে মনে হয়, তারা একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে এই পর্যায়ে এসেছে।

পানিতে থাকার সময়ও ডারউইন বই পড়ায় ব্যস্ত ছিলেন। জাহাজে বসেই তিনি চার্ল লায়েলের “Principles of Geology” বইটি পড়ছিলেন। এই বইয়ে উল্লেখ ছিল, বর্তমানে যে হারে ভূমিক্ষয় ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে এবং পলি জমছে অতীতেই ঠিক একই হারে হতো। এই ধারণাকে বলা হয় “uniformitarianism”। এই বইয়েই লায়েল “catastrophism” প্রকল্পকে অস্বীকার করেছিলেন। এই প্রকল্পে বলা হতো, আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাত বা কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাবেই পৃথিবীর ভূভাগ গঠিত হয়েছে। আন্দিসের একেবারে অভ্যন্তরভাগে অভিযাত্রীরা একটি সুপ্রাচীন সামুদ্রিক তলানি উদ্ধার করেছিল, যা প্রাকৃতিক কোন কারণে মাটির ৭,০০০ ফুট নিচ থেকে উপরে উঠে এসেছে। এই আবিষ্কারই লায়েলের তত্ত্বকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

ডারউইন ধারণাও করতে পারেননি যে, তার এই অভিযান জৈব বিজ্ঞানে আমূল পরিবর্তন এনে দেবে। ৫৭ মাসের এই অভিযানে কিন্তু আকাশের চাঁদ হাত পেয়ে যাওয়ার মত কোন ঘটনা ঘটেনি। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন যেমন তার “annus mirabilis” গবেষণাপত্রে হঠাৎ করেই বিশেষ আপেক্ষিকতা, ব্রাউনীয় গতি ও এ ধরণের আরেকটি ধারণার জন্ম দিয়ে রাতারাতি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী বনে গিয়েছেন, তেমন কিছু ডারউইনের ভাগ্যে জোটেনি। এই অভিযানকে তাই ক্ষণিকের বিস্ফোরণ না বলে পাঁচ বছরের এক অমূল্য তথ্যভাণ্ডার বলতে হয়। এই তথ্যভাণ্ডারে ছিল: প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ক উপলব্ধি নিয়ে লেখা ৩৬৮ পৃষ্ঠা, ৭৭০ পৃষ্ঠার একটি ব্যক্তিগত ডায়রি- এর সাথে ছিল অ্যালকোহল ভর্তি বোতলে ১,৫২৯টি প্রজাতির নমুনা, ৩,৯০৭টি শুষ্ক নমুনা- আর গালাপাগোস দ্বীপ থেকে ধরে আনা জীবন্ত কচ্ছপের কথা তো না বললেই নয়।

১৮৩৬ সালের অক্টোবরে বিগল ইংল্যান্ডে ভিড়ার আগেই ডারউইনের লেখা চিঠিগুলো সেখানকার বিজ্ঞানী মহলে ছড়িয়ে পড়েছিল। চিঠিগুলোর সুবাদে তিনি ইতিমধ্যেই পণ্ডিত বনে গিয়েছিলেন। এই খ্যাতি তার বাবার ধর্মবেত্তা বানানোর ইচ্ছাকেও দমিয়ে দিয়েছিল। এর কয়েক বছরের মধ্যেই ডারউইন তার আপন চাচাতো বোন এমা ওয়েজউডকে বিয়ে করে শহরের বাইরে একটি এস্টেটে চলে যান। এই বাড়ির সাথে লাগোয়া বাগান ও গ্রিনহাউজকে তিনি জীবন্ত গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সম্পত্তির কারণেই তিনি এভাবে জীবনযাপন করতে পেরেছিলেন। বিগল অভিযান থেকে ফেরার পরই ডারউইন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ১৮৮২ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তই তিনি অসুস্থ ছিলেন, যদিও এর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। মাথা ব্যথা থেকে শুরু করে হৃদরোগ, মাংসপেশীর খিঁচুনি ইত্যাদি সব ধরণের লক্ষণই তার মধ্যে দেখা গিয়েছিল। এসব কারণেই ডারউইন পরবর্তীতে আর কোন অভিযানে বেরোতে পারেননি।

একটি তত্ত্বের উৎপত্তি

১৮৩০-এর দশকের শেষার্ধেই ডারউইন তার তত্ত্ব প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। প্রকাশ করেছেন আরও দুই দশক পর, তাও প্রতিযোগী বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের চাপাচাপিতে। এত পরে প্রকাশ করার কারণ, তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে, তার তথ্য ও স্বীকার্যে কোন খুঁত নেই।

এই তত্ত্বে পৌঁছাতেও তিনি কোন তাড়াহুড়ো করেননি। লায়েলের বই থেকেই প্রথমে জেনেছিলেন যে, পৃথিবীর স্থলভূমি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে এই পর্যায়ে এসেছে, কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে নয়। এখান থেকে তিনি ভাবলেন, তবে জীবকূলেরও তো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে এই পর্যায়ে আসার কথা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবকূলের এক প্রজাতিই অন্য প্রজাতির জন্ম দেয়। জীববিজ্ঞানের এ ধরণের পরিব্যক্তির ধারণা সে সময় আরও কয়েকজন বিপ্লবী চিন্তাবিদের মাথায় ছিল। কিন্তু তারা একে “scala naturae” তথা “জীবকূলের মহাশিকল” আকারে কল্পনা করতেন। এই মহাশিকল প্রকল্পে বলা হতো, পৃথিবীর সকল প্রাণী বা উদ্ভিদের ভিন্ন ভিন্ন পূর্বপুরুষ আছে এবং প্রত্যেকে তার পূর্বপুরুষ থেকে নির্দিষ্ট পথে বিকশিত হয়েছে। এই প্রকল্পে আরও বলা হতো, প্রত্যেক প্রজাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্নিহিত পদার্থগুলোকে গ্রহণ করেছে এবং দিন দিন অপেক্ষাকৃত জটিল ও নিপুণ হয়েছে।

ডারউইন এই সহজ-সরল বিকাশ প্রকল্পকে বর্জন করলেন এবং আমাদের সুপরিচিত শাখাসমৃদ্ধ বিবর্তন তত্ত্ব গ্রহণ করলেন। এই শাখা-প্রশাখা তত্ত্বে বলা হয়, পৃথিবীর সকল প্রজাতিই একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিকশিত হয়েছে, বিভিন্ন প্রজাতি বিভিন্ন স্থানে এসে বিকাশের ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে। কিন্তু মহাশিকল প্রকল্পে বলা হতো, কে কোন প্রজাতি থেকে বিকশিত হবে তার একটা সীমা আছে। সকল প্রজাতি কেবল একটি পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হতে পারে না। এক্ষেত্রে ডারউইন গালাপাগোস দ্বীপে দেখা হরবোলা পাখির তিনটি প্রজাতিকে স্মরণ করলেন। এই তিনটি পাখি প্রজাতিই লাতিন আমেরিকার একটিমাত্র প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। “অরিজিন অফ স্পিসিস” বইয়ে কেবল একটি ছবি ছিল, “জীবনবৃক্ষ” নামের সেই ছবির মাধ্যমে ডারউইন বিবর্তনের শাখাসমৃদ্ধ চিত্রটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

এই জীবনবৃক্ষ প্রবর্তনের পরই কিন্তু ঝামেলা শুরু হয়। কারণ এই বৃক্ষ সৃষ্টির পেছনে কোন কারণ দেখাতে না পারলে তো চলবে না। কারণ সন্ধান করতে গিয়েই ডারউইন “প্রাকৃতিক নির্বাচন” নামক বিপ্লবী ধারণার জন্ম দিলেন। তিনি টমাস ম্যালথাসের বইয়ে পড়েছিলেন, বরাদ্দকৃত সম্পদ সীমিত থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যা খুব দ্রুত বেড়ে চলে। এছাড়া প্রাণী ও উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল, কৃষি বাজারে গিয়ে নিয়মিতই উদ্ভিদ তালিকা সংগ্রহ করতেন।

১৮৩৮ সালে ডারউইন একটি মজার বিষয় বুঝতে পেরেছিলেন: গবাদি পশুর বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমরা ইচ্ছা করেই কেবল উপযোগী বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দেই, কিন্তু বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে জীবজগতের একটি নিজস্ব পন্থা আছে যা একটু ভিন্ন। একটি বাস্তুতান্ত্রিক সাম্যাবস্থা যখন কোন কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তখনই কেবল এই পন্থাটি সক্রিয় হয়ে উঠে। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া এমন জীবগুলোকে ছেটে ফেলে যেগুলোর অভিযোজনক্ষম বৈশিষ্ট্য অপেক্ষাকৃত কম। অর্থাৎ একই প্রজাতির অপেক্ষাকৃত অনুপযোগী জীবগুলো ঝরে পড়ে। এটিই প্রকৃতপক্ষে আয়ালার “design without a designer”। এমনকি, একই প্রজাতির দুটি জীবের একটিকে মরু অঞ্চলে এবং আরেকটিকে পর্বতাঞ্চলে রেখে দিলে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তারা সম্পূর্ণ পৃথক দুটি প্রজাতির জন্ম দিতে পারে- এমন দুটি প্রজাতি যাদের মধ্যে যৌন জননও সম্ভব হবে না।

১৮৫৯ সালে ডারউইন তাড়াহুড়ো করে “অরিজিন অফ স্পিসিস” ছাপিয়ে দিলেন। কারণ, তিনি শুনতে পেয়েছিলেন, ওয়ালেস নাকি একই ধরণের সিদ্ধান্তে এসেছেন এবং তার পাণ্ডুলিপিটি অচিরেই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। বইয়ের মুখবন্ধ ছিল ১৫৫,০০০ শব্দের। এই বিশাল মুখবন্ধের ১,২৫০ কপি খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ডারউইনের বক্তব্য ছিল বেশ সহজ এবং পরিষ্কার। এ নিয়ে তাই কোন সরস সংলাপের জন্ম হয়নি, আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রকাশের পর যেমন বলা হচ্ছিল- আইনস্টাইন ছাড়া পৃথিবীর আর মাত্র তিন জন এই তত্ত্ব বুঝে।

ডারউইনের বাড়ি ছিল লন্ডন শহর থেকে ১৬ মাইল দক্ষিণে Downe নামক স্থানে। অরিজিন অফ স্পিসিস প্রকাশের পর তিনি বাড়ির আঙিনায় অর্কিড অন্যান্য গাছের মাধ্যমে সরাসরি প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। মৃত্যুর পর অন্যদের কাছে তার এই গবেষণার তদারকির ভার ন্যাস্ত করে গিয়েছিলেন। বইটি প্রকাশের পর যে বিতর্কের জন্ম হয়েছিল তা আজও চলছে। সৃষ্টিবাদী নামে পরিচিত কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আজও ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকে মিথ্যা আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে, স্কুলের পাঠ্যবইকেও তারা প্রভাবিত করেছে। ১৮৬০ সালের ১১ই আগস্ট সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান এর একটি প্রবন্ধে এক সম্মেলনের কথা বলা হয়েছিল, “ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস” এর সম্মেলন। সেই সম্মেলনে “স্যার বি ব্রডি” নামক এক ব্যক্তি এই বলে ডারউইনের প্রকল্পকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, “মানুষের আত্ম-সচেতনতা বলে একটি শক্তি আছে- বস্তুজগতে অন্য কোন কিছুর মধ্যেই এটা নেই। নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীতে কিভাবে এই চেতনা তৈরী হতে পারে তা ডারউইন খেয়ালই করেননি। মানুষের এই একক অনন্য ক্ষমতা কেবল স্বর্গীয় বুদ্ধিমত্তার সাথেই তুলনীয়।” কিন্তু তখনও বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকে ডারউইনের হয়ে কথা বলেছিলেন। সেই একই সম্মেলনে বিখ্যাত ব্যক্তিতব জোসেফ হুকার একটি সাময়িকী প্রকাশের প্রেক্ষিতে অক্সফোর্ডের বিশপকে বলেছিলেন, “এই ধর্মবেত্তার ডারউইনের লেখা সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই।”

অরিজিন অফ স্পিসিস বইয়ে মানুষের বিবর্তন নিয়ে কিছু লেখা হয়নি। কিন্তু ডারউইন “The Descent of Man, and Selection in Relation to Sex” নামে একটি সম্পূর্ণ বই-ই লিখেছেন। এই বইয়ে মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে আদ্যিকালের বানরদের নাম করা হয়েছে। এই বই অনেকের মর্মমূলে আঘাত করেছে এবং এ নিয়ে ডারউইনকে অনেক ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছে, অনেক পত্র-পত্রিকায় মানুষকে অর্ধেক বানর-অর্ধেক মানুষ হিসেবে আঁকা হয়েছে। এমনকি ১৮৬০-এর দশকেও ডারউইনের চাচাতো ভাই ফ্রান্সিস গাল্টন অন্যদের সাথে মিলে বলা শুরু করেছিল, “আধুনিক সমাজ তার অযোগ্য সদস্যদেরকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কবল থেকে রক্ষা করে”। আর নাৎসি আদর্শচ্যুত আদর্শবাদী থেকে শুরু করে নব্য-উদারতাবাদী অর্থনীতিবিদ হয়ে জনপ্রিয় সাহিত্য- সর্বত্র ডারউইনবাদের যে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা তো বলাই বাহুল্য। মার্কিন ঔপন্যাসিক কুর্ট ভনেগাট একবার বলেছিলেন, “ডারউইন আমাদের শিখিয়েছেন, যারা মারা যায়, মৃত্যুবরণ করাই তাদের জন্য উপযুক্ত ছিল। তিনি আমাদের বুঝিয়েছেন, মরদেহ উৎকর্ষের প্রতীক।”

বর্তমান পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় প্রজাতিগুলো যে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে শাখা-প্রশাখা বিস্তারের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে, এই ধারণা মানুষ বেশ দ্রুতই গ্রহণ করেছে। কিন্তু এর কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বিজ্ঞানী সমাজেও অনেক দেরিতে তৈরী হয়েছে। এ নিয়ে দ্বিধারও যথেষ্ট কারণ ছিল। ডারউইন তার গবেষণায় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর সঞ্চারণ নিয়ে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তিনি অনুমান করে নিয়েছিলেন, মানব দেহে “gemmules” নামে এক ধরণের বস্তু আছে যা প্রতিটি কোষ থেকে নিসৃত হয়ে যৌন অঙ্গে যায় এবং সেখানে সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই বস্তুগুলোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তথ্য বহনের কাজ করে। এই অনুমান প্রথমে খুব বেশী সমর্থন পায়নি। তাই ১৯৩০-৪০ এর দশকের আগে প্রাকৃতিক নির্বাচন কেবলই একটি প্রকল্প হিসেবে নড়বড়ে কাঠামোর উপর দাড়িয়ে ছিল। কিন্তু ৩০-৪০ এর দশকেই প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে চলে আসা সংশয়ের অবসান ঘটে।

এরপর আধুনিক সংশ্লেষণ পদ্ধতি বিকশিত হতে শুরু করে। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদকে গ্রেগর মেন্ডেল প্রবর্তিত জিনতত্ত্বের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে পরীক্ষা করা হয়। ১৯৫৯ সালে যখন অরিজিন অফ স্পিসিস বইয়ের ১০০তম প্রকাশবার্ষিকী পালিত হয়, ততদিনে প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন সংশয় অবশিষ্ট ছিল না।

কিন্তু এর পরের বছরগুলোতে বিবর্তনবাদের যতটা প্রসার হওয়ার কথা ছিল, কিছু প্রশ্নের কারণে ততটা প্রসার হয়নি। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীদের জন্য এই প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নগুলো এরকম: বিবর্তন প্রক্রিয়া কি সবসময়ই সমভাবে চলমান নাকি অনেকদিন নিশ্চল থাকার পর হঠাৎ জোরেশোরে শুরু হয়? দৈব পরিব্যক্তি কি হরহামেশাই ঘটতে থাকে নাকি কখনও কখনও বিকাশ বা বিলয় বাদ দিয়ে বংশানুগতিক বিচ্যুতি (genetic drift) প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রতিটি জৈব বৈশিষ্ট্যই কি বিবর্তনমূলক অভিযোজনের ফল নাকি কিছু বৈশিষ্ট্য নিছক বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপজাত হিসেবে তৈরী হয়?

আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, মাঝে মাঝে একটি জীবগোষ্ঠীর সবার মাঝে কিছু পরার্থবাদী বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেগুলোকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে খুব ভালভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আর প্রজাতির উৎপত্তিতে বংশানুগতিক বিচ্যুতি কি ভূমিকা রাখে সেটা চেখে দেখার তো কোন বিকল্পই নেই। আরেকটি সমস্যা আছে: এককোষী জীবগুলো অনেক সময় একে অন্যের সাথে জিন বিনিময় করে, দুয়েকটি জিন না, বরং সবগুলো জিনই তারা বদল করে। এই জিন বিনিময়ের ঘটনা প্রজাতির মৌলিক সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। একই প্রজাতির এক জীব অন্য জীবের সাথে যৌন জনন ঘটাতে পারে। ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এ ধরণের জিন বিনিময় তাই নতুন সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু, এ নিয়ে বিতর্ক যতই তীব্র হচ্ছে, বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞান ততই বিকশিত হচ্ছে, সেই সাথে ডারউইনের যুগান্তকারী আবিষ্কারের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে চলেছে।

বিবর্তনবাদ: ডারউইনের আগে ও পরে

৬১০-৫৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – দার্শনিক আনাক্সিমান্দ্রোস বলেন, সকল জীব সামুদ্রিক মাছ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্থলে আসার পর তাদের গুণগত পরিবর্তন হয়েছে।
১৭৩৫ – কার্ল লিনিয়াস “Systema Naturae” বইয়ের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যার সূচনা ঘটে। পরে তিনি বলেছিলেন উদ্ভিদ একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিকশিত হয়েছে।
১৮০৯ – ইংল্যান্ডের শ্রুসবারিতে ডারউইন জন্মগ্রহণ করেন।
১৮৩০ – চার্লস লায়েল “Principles of Geology” নামক বইটি প্রকাশ করেন। এই বই দ্বারা ডারউইন প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রকৃতির সবকিছু ধীরে ধীরে এই পর্যায়ে এসেছে বলে যে ধারণার জন্ম তিনি দিয়েছিলেন তা এই বই থেকেই অনুপ্রাণিত। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন তার নজর কেড়েছিল।
১৮৩১ – ডারউইন পাঁচ বছরের সমুদ্রে ভ্রমণে বেরোন। বিগল জাহাজে চড়ে তার বিশ্ব ভ্রমণ শুরু হয়।
১৮৩৮ – চার্লস ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব প্রণয়ন করেন যা আরও ২০ বছর পর জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়।
১৮৫৯ – “অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস” প্রকাশিত হয়।
১৮৬৫ – চেক সন্ন্যাসী গ্রেগর মেন্ডেল উত্তরাধিকারের উপর করা গবেষণা প্রকাশ করেন। কিন্তু আরও ৩৫ বছর পর্যন্ত তার গবেষণা স্বীকৃতি পায়নি।
১৮৭১ – “দ্য ডিসেন্ট অফ ম্যান” বইয়ে ডারউইন মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রাইমেটদের নাম করেন। এ কারণে তিনি প্রচণ্ড বিতর্কিত হন।
১৮৮২ – ডারউইন মৃত্যুবরণ করেন।
১৯২৫ – “দ্য স্কোপ্‌স মাংকি ট্রায়াল” এর মাধ্যমে স্বর্গীয় সৃষ্টিতত্ত্বকে অস্বীকার করে এমন কোন কিছু স্কুলে পড়ানো যাবে না বলে আইন পাশ করা হয়।
১৯৩৬-৪৭ – আধুনিক সংশ্লেষণ পদ্ধতিতে ডারউইনের বিবর্তনবাদকে মেন্ডেলীয় জিনতত্ত্বের সাথে মেলানো হয়।
১৯৫৩ – জেম্‌স ডি ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে বিবর্তনের আণবিক জীববিজ্ঞান অধ্যয়ন সম্ভব হয়।
বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় – জিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে কয়েক হাজার বছর আগেও মানুষের বিবর্তন হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০০৯ – এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান প্রকৃতিবিদ ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী এবং তার সবচেয়ে বিখ্যাত বইটির ১৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বিশ্বব্যাপী জাঁকজমকের সাথে এ দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

 

সর্বকালের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রকার December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 4:18 am

http://www.theyshootpictures.com/gf1000_top100directors.htm
১। অরসন ওয়েলস – যিনি চল্লিশের দশকে মার্কিন দর্শক ও ক্রিটিকদের ছয়টি ইন্দ্রিয়কে একসাথে আঘাত করেছিলেন। অর্ধ শতকের প্রচেষ্টায় নির্মিত সুরম্য অট্টালিকার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন শিল্পের এক নতুন প্রাসাদ। “সিটিজেন কেইন” (১৯৪১)- ইতিহাসের সবচেয়ে ইনোভেটিভ সিনেমা- এর পরিচালক হিসেবেই তিনি পরিচিত। কারণ এই সিনেমার ভাষা, সিনেমাটোগ্রাফি, থিম সবকিছুই ছিল একেবারে নতুন। এটাতেই প্রথম “ডিপ ফোকাস” দেখেছিলাম। পরে অনেক সিনেমাতেই ডিপ ফোকাসের ব্যবহার দেখেছি, কিন্তু সিটিজেন কেইনের সাথে কোনটারই তুলনা চলে না।

২। আলফ্রেড হিচকক – সাসপেন্স এবং রহস্যের জাদুকর, মানুষকে নিয়ে যিনি পিয়ানোর মত খেলতে পারতেন। থ্রিলার-সাসপেন্স জাগানোর নাকি পাঁচটি প্রধান সিনেমাটিক টেকনিক আছে। একমাত্র হিচককই এই পাঁচ টেকনিক একসাথে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছেন। হিচককের সিনেমা দেখতে হয় পুতুলের মতো- নিজেকে শিশু মঞ্চের পুতুল ভেবে রাশ দুটো ছেড়ে দিতে হবে হিচককের হাতে, তিনি যেভাবে নাচান সেভাবেই নাচতে হবে, এখানে হিচককের ভূমিকা অনেকটা ঈশ্বরের মতো।

৩। ফেদেরিকো ফেলিনি – জীবনকে কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করার ধারা তিনিই শুরু করেছিলেন। কাব্যিক হওয়ার কারণেই ফেলিনির সিনেমায় বাস্তবতা আর স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য খুব কম। তার “এইট অ্যান্ড আ হাফ” সিনেমায় তো পার্থক্যটা একেবারেই লোপ পেয়েছে।

৫। স্ট্যানলি কুবরিক – আমার প্রিয় চলচ্চিত্রকার। তিনি চলচ্চিত্রের ঈশ্বর। ঈশ্বর যেমন সর্বদ্রষ্টা, সর্বনিয়ন্তা, কুবরিকও তার সিনেমার সেটে তেমনি সর্বদ্রষ্টা এবং সর্বনিয়ন্তা- একেবারে চূড়ান্ত পারফেকশনিস্ট। একই শট ১১৮ বার নিয়ে তিনি বিশ্ব রেকর্ড করেছেন। নির্দিষ্ট কোন জনরাঁর প্রতি তার ঝোঁক নেই। তার অধিকাংশ সিনেমাকেই কোন জনরাঁতে ফেলা যায় না। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত- তিনি মানুষের মনকে খুব একটা নাড়াতেন না; মনোবিজ্ঞান নয় সমাজবিজ্ঞানই ছিল তার সিনেমার ভিত্তি। ভবিষ্যতে যখন মহাকাশ যুগ শুরু হবে, তখন মহাকাশের নাবিকেরা এই একজন শিল্পীর প্রতি তাদের ঋণের পরিমাণটা বুঝতে শুরু করবে, এখন সেটা বোঝা সম্ভব না। মানুষকে তিনি দেখছেন একজন মানবিক ঈশ্বরের দৃষ্টিতে।

৭। আকিরা কুরোসাওয়া – আরেক পারফেকশনিস্ট। যুদ্ধের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া একটি দেশকে বুকে ধারণ করে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। তাই তার সিনেমার অনেকটা জুড়ে থাকে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, হিংস্রতা, বিশ্বাসঘাতকতা। আত্মপীড়নও মাঝেমাঝে দেখা যায়। এই কষ্ট থেকেই বোধহয় তিনি শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডিগুলোকে সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল শেক্সপিয়ারিয়ান চলচ্চিত্রকার।

৮। ইংমার বারিমান – সুইডেনে ধর্ম পালনের হার সবচেয়ে কম হলেও বারিমান বড় হয়েছেন কড়া ধর্মীয় পরিবেশে। সবাই আত্ম-আত্মা, জীবন-মরণ, সসীম-অসীম নিয়ে প্রশ্ন করে। ছোটবেলায় তিনি বোধহয় এই প্রশ্নগুলোর খুব কড়া জবাব পেয়েছিলেন যা তার অতিরিক্ত সংবেদনশীল মনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। সিনেমা আর মঞ্চ নাটক দিয়ে আজীবন সেই মন পুনরায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে গেছেন। তার “গড ট্রাইলজি”-তে এক অদ্ভুত ঈশ্বরানুভূতির সন্ধান পাই। বারিমানকে বলতে হবে চলচ্চিত্রের দার্শনিক এবং দর্শনের চলচ্চিত্রকার।

৯। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা – যুদ্ধ কাকে বলে?- এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই দর্শন আর সমাজবিজ্ঞানের কাছে হাত পাততে হবে, কিন্তু উত্তরটা উপলব্ধি করতে হলে দেখতে হবে কপোলার “অ্যাপোক্যালিপ্‌স নাউ”। এখন পর্যন্ত নির্মীত সেরা যুদ্ধবিরোধী সিনেমা। দেবতা-অসুর, অক্ষশক্তি-মিত্রশক্তি যাই বলি না কেন- যুদ্ধ মানে খেলাচ্ছলে নিজের অপরূপ সৃষ্টিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া। এই খেলা আমরা দেখেছি গডফাদারে। আর খেলা শেষের ভাঙা খেলাঘর দেখেছি অ্যাপোক্যালিপ্‌স নাউ-এর শেষ ৩০ মিনিটে।

১০। জঁ লুক গোদার – নিয়ম ভাঙার কারিগর। সিনেমার জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রথাবিরোধী- নির্মাণ কৌশল এবং রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি- দুদিক দিয়েই। হলিউডের গতানুগতিক ঘ্যাচাং-ঘ্যাচাং অ্যাকশন-কমেডিকে ব্যাঙ্গ করে গেছেন আজীবন। তৎকালীন ফ্রান্সের তথাকথিত মূল্যবোধকে ময়লা ভেবে ঝেড়ে ফেলেছেন। সতীর্থদের সাথে মিলে জন্ম দিয়েছেন সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র আন্দোলনের- নুভেল ভাগ বা ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ বা ফরাসি নবতরঙ্গ।

১১। চার্লি চ্যাপলিন – হাসিমুখে যিনি চপেটাঘাত করতে পারতেন। পৃথিবী থেকে চলচ্চিত্র শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেলেও নাকি যার শিল্পকর্ম টিকে থাকবে। মুখমণ্ডলে যিনি ভয়ংকর সমাজ-সচেতনতা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।

১২। বিলি ওয়াইল্ডার – শক্তিশালী সিনেমাটোগ্রাফির বদলে যিনি শক্তিশালী চিত্রনাট্য ও পরিপূর্ণ কাহিনীকে গুরুত্ব দিতেন। রাজনীতির ও সমাজের বদলে তিনি ছিলেন মানব সচেতন। গতানুগতিক বিনোদনের মধ্যেও তিনি শিল্পের জন্ম দিয়েছিলেন। তার “সাম লাইক ইট হট” অনেকের মতে সর্বকালের সেরা কমেডি সিনেমা।

১৪। মার্টিন স্করসেজি – তার সিনেমার চরিত্রগুলো খুব সাধারণ কিন্তু দুর্লভ স্বপ্নের খোঁজে ছুটে বেড়ায়। কিন্তু বাস্তব ছুটে বেড়ানোটাই আমরা দেখতে পাই। তার চরিত্রগুলো প্রচণ্ডভাবে অস্তিত্বশীল। স্করসেজি স্বপ্নপূরণের সহিংস এবং বেদনাদায়ক পথকেই শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। আর আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, শেষে গিয়ে চরিত্রগুলো যেই অসীমে ছিল সেই অসীমেই রয়ে গেছে। ট্যাক্সি ড্রাইভারের শেষ দৃশ্য স্বপ্ন না বাস্তব- এটা তাই আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়ে উঠেনি, রেইজিং বুলের শেষ দৃশ্যে রবার্ট ডি নিরোর শৈল্পিক ঘুষাঘুষি কোন দ্রোহের প্রতীক সেটাও আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। এই বুঝতে না পারার ব্যঞ্জনাই স্করসেজি দর্শকদের তাড়িয়ে বেড়ায়।

১৮। ফ্রিডরিশ ভিলহেল্ম মুর্নাউ – যার উচ্চাভিলাষ সকল পর্বতের চূড়া ছাড়িয়ে গেছে। অকাল মৃত্যু না হলে তিনি যে কত কি করে দেখাতেন সেটা ভাবতে গিয়ে একালের সিনেমোদীদের দম বন্ধ হয়ে আসে। ড্রাকুলা নিয়ে করা প্রথম সিনেমা তার, নাম নসফেরাতু (১৯২২)- জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের সর্বোৎকৃষ্ট উপহারগুলোর একটি। শুধু ছবি দিয়ে কথা বলতে চাইলে আমাদের বারবারই তার কাছে ফিরে যেতে হবে।

২১। ফ্রিৎস লাং – মাস্টার অভ ডার্কনেস। তার “মেট্রোপলিস” (১৯২৭) নির্বাক যুগের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা। এত ব্যয় করেছিলেন কেবল মানব সভ্যতার ডার্কনেস তুলে ধরার জন্য। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক সভ্যতার রূপ তিনি সেকালেই উপলব্ধি করেছিলেন; মেট্রোপলিসের শিল্প কারখানার আন্ডারগ্রাউন্ড যেন সভ্যতার অন্ধকার ভিত্তিভূমিকেই নির্দেশ করে। ইনিই হলিউডী ফিল্ম নয়ারের জনক। সিনেমাটগ্রাফিক স্টাইলের মাধ্যমে মানুষের অন্ধকার দিক তিনিই প্রথম তুলে ধরেছিলেন, “এম” (১৯৩১) সিনেমাতে।

২৩। ফ্রঁসোয়া ত্রুফো – নুভেল ভাগের আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা। তার সিনেমা যেন তার জীবনেরই প্রতিধ্বনি। এরকমটা একটা জীবন না পেলে “দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোস” এর মত সিনেমা বানাতে পারতেন কি-না কে জানে। উল্লেখ্য ত্রুফো জীবন শুরু করেছিলেন চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে। সিনেমার বিখ্যাত “ওটার তত্ত্ব” তাদেরই (তৎকালীন ফরাসি ক্রিটিক গোষ্ঠী) দেয়া।

২৫। ডেভিড লিন – লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া এবং ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই এর নির্মাতা হিসেবে ডেভিড লিনের সাথে অনেকেই পরিচিত। এপিক সিনেমা বানাতে তার জুড়ি নেই। মানব জীবনের মহিমা রূপায়নে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

৩০। স্টিভেন স্পিলবার্গ – স্পিলবার্গ সর্বকালের সেরা এন্টারটেইনিং চলচ্চিত্র শিল্পী। বক্স অফিসে দুর্দান্ত সাফল্য এবং সমালোচক মহলে প্রশ্নাতীত গ্রহণযোগ্যতা কজনার ভাগ্যে জোটে? তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী চলচ্চিত্রকারও- সিনেমা বানিয়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কামিয়েছেন। ৭০-৮০-৯০ এই তিন দশকের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি তিনটাই তার করা: জস, ইটি এবং জুরাসিক পার্ক। ইটির শিল্পমূল্য এবং শিন্ডলার্স লিস্টের মানবতাবোধই তাকে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছে।

৩২। ভিত্তোরিও দে সিকা – মানুষের আত্মাকে যিনি ভিডিও করতে পারতেন। আত্মা নিয়ে অনেকে গবেষণা করলেও আত্মার সন্ধান খুব কম চলচ্চিত্রকারই পেয়েছে- দে সিকা সেই কয়েকজনের মধ্যে সেরা। নগ্ন বাস্তবতা দিয়েও যে শিল্প সৃষ্টি করা যায়, “বাইসাইকেল থিফ” (১৯৪৮) এ আমরা সেটাই দেখেছি। টু উইমেন (১৯৬০) এর ধর্ষণ দৃশ্যের আর্তনাদ ডি সিকার কারণেই আমাদের কাছে মানবতার আর্তনাদ হিসেবে ধরা দিয়েছে। উল্লেখ্য ডি সিকা ইতালিয়ান নিওরিয়েলিজম আন্দোলনের পথিকৃৎ।

৩৫। সত্যজিৎ রায় – যার সম্পর্কে লিখে শেষ করা যাবে না। রাসা-ভক্ত সত্যজিৎ ক্লোজ-আপ এর মাধ্যমে মানুষের মুখমণ্ডলে মানবতা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। তার সিনেমার অদ্ভুত তারল্য ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের সকল সিনেমোদীর কাছে আপন করে তুলেছে। তার “অপু ত্রয়ী” সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্ল্যাসিকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সত্যজিৎ পুরো একটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের মেরুদণ্ড নির্মাণ করেছেন। পরিচালনা, চিত্রনাট্য, আবহ সঙ্গীত, চিত্রগ্রহণ, পোস্টার তৈরী, শিল্প নির্দেশনা সব দিকেই ছিলেন সমান পারঙ্গম।

৩৭। উডি অ্যালেন – প্রেম এবং কামের চলচ্চিত্রকার। তার অ্যানি হলেই বোধহয় আমরা প্রথমবারের মত সেক্স-কমেডি দেখেছি। মানব-মানবীরা যতদিন প্রেম করবে ততদিনই উডি অ্যালেনের সিনেমা জীবন্ত থাকবে।

৪০। রোমান পোলানস্কি – মানুষের নিঃসঙ্গতা তীব্র আবেদন নিয়ে ধরা দিয়েছে যার সিনেমাতে। মানুষকে তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমন সব জায়গায় নিয়ে গেছেন যেখানে প্রেম-দ্রোহ-শিল্পের জন্ম হয়।

৪৩। ফ্রাংক কাপরা – হলিউডের স্বর্ণযুগের মানুষ। স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে যে কজন পরিচালক শিল্পমুল্য ধরে রেখেছিলেন তাদের মধ্যে কাপরা সেরা। তার রোমান্টিক এবং সামাজিক কমেডিগুলোতে আবহ সঙ্গীতের যথার্থ প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় যা সেকালের হলিউডে ছিল না বললেই চলে। তার “ইট হ্যাপেন্ড ওয়ান নাইট” (১৯৩৪) আমার অল টাইম ফেভারিট। কাপরার ক্যামেরায় কেবল সুখী মানুষেরাই স্থান পেয়েছে- যারা ক্ষেত্রবিশেষে দুঃখ অনুভব করলেও একসময় পরিপূর্ণ সুখের সন্ধান পায়। “ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ” (১৯৪৬) সেদিকটাই তুলে ধরে।

৪৬। সের্জিও লেওনে – মানুষের অতি সূক্ষ্ণ সব অনুভূতিকে অতি সূক্ষ্ণ উপায়ে তুলে ধরার একটা উপায় তিনি আবিষ্কার করেছিলেন- সেটা হল বিগ ক্লোজ আপ। তার সিনেমার অনেক দৃশ্যে কেবল এক জোড়া চোখ দেখা যায়, পুরো স্ক্রিন জুড়ে। মার্কিন সভ্যতার বিবর্তন নিয়ে তার আগ্রহের কারণেই আমরা ডলার্স ট্রাইলজির মত অসাধারণ ওয়েস্টার্ন পেয়েছি। ওয়ান্স আপোন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্টের মাধ্যমে ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতির পতন প্রত্যক্ষ করেছি। আর ওয়ান্স আপোন আ টাইম ইন অ্যামেরিকাতে দেখেছি- নব্য সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মানুষ জেগে উঠছে। লেওনে আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেন- তার চরিত্রগুলো যত হিংস্রই হোক- সবাই হোমো স্যাপিয়েন্স।

৫০। বেরনার্দো বেরতোলুচ্চি – বলা যায় মাস্টার অভ ভয়ারিজম। ভয়ারিজম মানে ঈক্ষণকাম, অর্থাৎ লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যের রতিকর্ম উপভোগ করা। সমাজের সবচাইতে গোপন যৌন সম্পর্কগুলো তিনি নির্লজ্জের মত সবার সামনে তুলে ধরেন। ড্রিমার্স সিনেমায় তিনি নিজেই বলেছেন, “চলচ্চিত্রকার মানে ভয়ারিস্ট, ক্যামেরা হল তার গোপন বাইনোকুলার”। তিনি ইনসেস্ট তথা অজাচারের মত বিতর্কিত বিষয়েরও বস্ত্রহরণ করেছেন। তবে এই ভয়ারিজমের আড়ালে তিনি জটিল মনস্তত্ত্বের ছাপ রেখে দেন, একটু লক্ষ্য করলেই যা বোঝা যায়। এজন্য অনেক বিতর্কের পরও তিনি সম্মানিত, কারণ তিনি শিল্পী।

৫২। রিডলি স্কট – শুধু “ব্লেড রানার” করে মারা গেলেও যাকে আমরা আজীবন মনে রাখতাম। কুবরিকের “২০০১: আ স্পেস অডিসি” যে ভিজ্যুয়াল স্টাইলের জন্ম দিয়েছিল সেটার পুনরুত্থান ঘটেছে ব্লেড রানারে যা পরবর্তীতে অনেক পরিচালককে প্রভাবিত করেছে। ব্লেড রানারে এত বেশি থিমের সার্থক সমন্বয় ঘটেছে যে আজ থেকে লক্ষ-কোটি বছর পরও এটার প্রয়োজনীয়তা ফুরাবে না। তবে ইদানিং রিডলি স্কট আমাদের বেশ হতাশ করছেন।

৫৬। জর্জ কিউকর – সুনীল বলেছিলেন, হলিউডের আমাদেরকে দেয়া সেরা উপহার হচ্ছে মিউজিক্যাল সিনেমাগুলো। কিউকরের “মাই ফার্স্ট লেডি” দেখার পর সে কথার মর্ম বুঝেছি।

৬১। ভের্নার হের্‌ৎসগ – জার্মান নিউ ওয়েভের প্রতিনিধি। যিনি মানুষের মনে অ্যাডভেঞ্চার জাগিয়ে তুলেন। যিনি স্রোতহীন নদীর স্লো শট দেখিয়েও আমাদের মনকে আন্দোলিত রতে পারেন। তার “আগির্‌রে, ডের ৎসর্ন গটেস” (১৯৭২) আমার দেখা সেরা ট্র্যজেডি এবং অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা। তার ছবিতে অসম্ভব স্বপ্নকে তাড়া করে বেড়ানো নায়ক চরিত্র এবং খুব সাধারণ কোন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অনন্য গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।

৬২। ডেভিড লিঞ্চ – অবচেতনের পরাবাস্তব শিল্পী। আধুনিক চলচ্চিত্রে প্রথম যুগের শৈল্পিক মাধুর্য্য ফিরিয়ে এনেছেন তিনি, তবে এক্সপ্রেশনিজম বা ইমপ্রেশনিজমের বদলে সাররিয়েলিজমের মাধ্যমে। তার সিনেমাতেও বাস্তব-অবাস্তবের সীমারেখা ঝাপসা। ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন থেকে তিনি শিল্পের অনুপ্রেরণা পান। তাকে বলা যায় এ যুগের পাগলা ডিরেক্টর। মানুষের “ভীতি” এবং “সম্মান” তার সিনেমার প্রধান বিষয়বস্তু।

৭০। উইলিয়াম ওয়াইলার – তার একটা সিনেমাই আমি দেখেছি: রোমান হলিডে- আমার জীবনে দেখা সেরা রোমান্টিক কমেডি। পুরো সিনেমা জুড়ে এতসব মনকাড়া দৃশ্যের পর হৃদয় বিদারক সমাপ্তিটাই আমাকে রোমান হলিডের সাথে যুক্ত করে রেখেছে। এই মোহ থেকে কোনদিন মুক্তি পাব না, মুক্তি পেতে চাইও না।

৭১। আব্বাস কিয়ারোস্তামি – যিনি কোন নিয়ম ভাঙারও ধার ধারেননি। সব ফেলে দিয়ে একেবারে নতুন ভাষা তৈরী করেছেন। সিনেমাকে এক নতুন রূপ দিয়েছেন। কিয়ারোস্তামির সিনেমা হল নতুন যুগের সিনেমা, পরিচালক এবং দর্শকের সিনেমা। তার সিনেমায় আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। ফেলিনির কাব্যিকতাকে পূর্ণতা দেয়ার মাধ্যমে তিনি এক দিক দিয়ে ইরানী কবিতা আন্দোলনকেই পূর্ণ করেছেন। তিনি হলেন চলচ্চিত্রের কবি এবং কবিতার চলচ্চিত্রকার। সেদিক থেকে তার সিনেমার আয়ুই বোধহয় সবচেয়ে বেশি।

৭৫। মিলশ ফরমান – সমাজরূপী পাগলা গারদ থেকে কেবল একজনই পালাতে পেরেছিল- ওয়ান ফ্লু ওভার দ্য কুকুস নেস্ট অন্তরে গেঁথে নেয়ার মত সিনেমা। একজন পূর্বে, আরেকজন পশ্চিমে যায়- কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম সবদিকেই দাড়িয়ে থাকে সমাজ। পালিয়ে যায় একজন, সমাজ ছেড়ে দূরে কোথাও। মোৎজার্টের জীবনী নিয়ে করা তার “আমাদেউস” সিনেমাটা দেখার খুব ইচ্ছা কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না।

৮১। কুয়েন্টিন টারান্টিনো – সহিংসতাকে যিনি নৈসর্গ্যিক রূপ দিয়েছেন। টারান্টিনো হয়ত একদিন হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবী থেকে কোনদিন সহিংসতা যাবে না। কিন্তু শিল্পী হয়ে এই সহিংসতার সাথে সহবাস করার উপায় কি? নিজেই সে উপায় বের করেছেন। সহিংসতা যখন যাবেই না, তখন বরং এটা নিয়ে রং-তামাশা করে সুখে থাকি। সেই থেকে তার সিনেমা বানানো শুরু। তাকে বলা যায় আর্টিস্ট অভ এক্সট্রিম ভালোলেন্স।

৮২। ডেভিড ক্রোনেনবার্গ – যার থ্রিলার অনেক দিক দিয়ে হিচককের চেয়ে আলাদা। তার মতে, হিচকক তার দর্শকদেরকে পুতুল মনে করতো আর তিনি তার দর্শকদের মানুষ মনে করেন। তার থ্রিলারে যে নগ্ন সহিংসতা দেখা যায় সেটার মানবিক গভীরতা হিচককের সাইকটিক সিনেমাগুলোর সাথে তুলনীয়। ক্রোনেনবার্গের আরেক বড় পরিচয় বডি হররের জনক হিসেবে। গুলির আঘাতে বিধ্বস্ত মুখমণ্ডল, ছুরি দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে গলা কাটা- এগুলো তিনি ক্লোজ-আপ এর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

৮৩। জোল কোয়েন এবং ইথান কোয়েন – ব্ল্যাক কমেডির প্রবাদ পুরুষ- একজন না অবশ্য দুজন। দুই ভাই মিলে অসাধারণ কিছু সিনেমা বানিয়েছেন যার অন্তত তিনটিকে মডার্ন ক্ল্যাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বার্টন ফিংকে (১৯৯২) যে শিল্প বিশ্লেষণ দেখা গেছে সেটা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ব্ল্যাক কমেডির পাশাপাশি কোল্ড থ্রিলারেও তারা সিদ্ধহস্ত। তবে তাদের কমেডি-থ্রিলারের অন্তরালে থেকে যায় সমাজ সচেতনতা এবং মানবিক উৎকর্ষতা।

৮৬। ক্লিন্ট ইস্টউড – অন্য কোন অভিনেতা পরিচালক হিসেবে এত নাম করতে পারেনি। তার মূল পরিচয় ষাটের দশকের ওয়েস্টার্ন হিরো নাকি এ যুগের অন্যতম সফল পরিচালক সেটা নিয়েই আমাদের দ্বিধায় পড়তে হয়। তার সফলতার পরিচয় বহন করছে দুই দুইবার অস্কার জয়- আনফরগিভেন (১৯৯৩) এবং মিলিয়ন ডলার বেবির (২০০৫) জন্য। তিনি মানুষের ভালো দিকটাকে খুব বেশী বিশ্বাস করেন। ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতি থেকেই বোধহয় এই চেতনা এসেছে। কাঁদতে চাইলে ইস্টউডের সিনেমা দেখার বিকল্প নেই।

৯১। সিডনি লুমেট – প্রথম সিনেমা দিয়েই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন। “টুয়েলভ অ্যাংগ্রি মেন” (১৯৫৭) সিনেমাটা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভাল লাগার মতো। সিনেমায় সবগুলো চরিত্র সমান গুরুত্বের সাথে ফুটিয়ে তুলতে ওস্তাদ তিনি। তার সবগুলো চরিত্রই নিজের হয়ে কথা বলে।

৯২। ব্রায়ান ডি পালমা – জনপ্রিয় ধারার সিনেমাই বেশি করেছেন। “স্কারফেস” (১৯৮৩) ভোলার মত না। রিমেইক সিনেমাও এত নাম করতে পারে, স্কারফেস না দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না। আল পাচিনোর এই রূপ অন্য কোথাও দেখিনি। তবে ইদানিং স্কট সাহেবের মত পালমাও বেশ হতাশ করছেন।

৯৫। জর্জ লুকাস – স্টার ওয়ার্সই তাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এছাড়া তিনি ইন্ডিয়ানা জোন্স সিরিজের লেখক। এন্টারটেইনার হিসেবে স্পিলবার্গের পরই লুকাসের অবস্থান। স্টার ওয়ার্সের প্রথম দিককার সিনেমাগুলোর শিল্পমূল্য লক্ষ্য করার মত- বিশেষত সেগুলোতে ডিপ ফোকাসের ব্যবহার।

লেখাটা শেষ করছি একজন নারী চলচ্চিত্রকারের কথা বলে। অন্য সব পেশা মত এখন অনেক নারী চলচ্চিত্রকার হিসেবেও নাম কুড়াচ্ছেন। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার মেয়ে সোফিয়া কপোলা, মোহসেন মাখমালবফের মেয়ে সামিরা মাখমালবফ, হলিউডের ন্যন্সি মায়ার্স বা নিউ ফ্রেঞ্চ এক্সট্রিমিটির রূপকার Catherine Breillat উল্লেখযোগ্য। তবে সর্বকালের সেরা ১০০-র মধ্যে নারী কেবল একজন। তার নাম Chantal Akerman, বেলজিয়ামের; অবস্থান ৯৯। তার কোন সিনেমাই দেখিনি, সুতরাং কিছু বলতে পারছি না। নেট ঘেটে দেখলাম তার সবচেয়ে বিখ্যাত সিনেমা “Jeanne Dielman, 23 quai du Commerce, 1080 Bruxelles”- তিন দিন ধরে একজন মা-র দৈনন্দিন কাজ কারবার দেখানো হয়েছে এতে, ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিটের সিনেমা।

 

মাদার তেরেসা December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 4:11 am

লিখেছেন : মুহাম্মদ

মাদার তেরেসা(Mother Teresa)ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা মানবতাবাদী ও মানবসেবী। গোঁড়া ধর্মীয় মনোভাব এবং রাজনৈতিকি অপোরচুনিজম এর কারণে সমালোচিত হলেও তার অনবদ্য মানবসেবা নিয়ে কেউ সন্দেহ পোষণ করে না।

আলবেনীয় ভাষায় তার নাম: Nënë Tereza, ন্যন্য টেরেজা
মেসিডোনীয় ভাষায়: Агнес Гонџа Бојаџиу (Agnes Gonxhe Bojaxhiu) – আগনেস গঞ্জা বয়াজু
জন্ম – ২৬শে আগস্ট, ১৯১০
মৃত্যু – ৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭
মাদার তেরেসা তৎকালীন উসমানীয় (অটোমান তুর্কী) সাম্রাজ্যে জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় রোমান ক্যাথলিক মিশনারি কর্মী। তিনি সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ১৯৫০ সালে ভারতের কলকাতায় “মিশনারিস অফ চ্যারিটি” প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তাঁর এই মানবসেবার সূচনা ঘটে। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি দরিদ্র, অসুস্থ, এতিম ও মুমূর্ষু মানুষের সেবা করেছেন। সেই সাথে মিশনারির বিকাশ ও উন্নয়নে অক্লান্ত পরীশ্রম করেছেন। প্রথমে ভারত ও পরে সমগ্র বিশ্বে তাঁর এই মিশনারি কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৭০-এর দশকে মানবতাবাদী কর্মী এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সুহৃদ হিসেবে বিশ্বব্যাপী তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। ম্যালকম মাগারিজের “সামথিং বিউটিফুল ফর গড” নামক প্রামাণ্য চিত্র ও বইয়ের মাধ্যমেই তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল। মানবতাবাদী কার্যক্রমের জন্য তেরেসা ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ভারতরত্ন লাভ করেন। মিশনারিজ অফ চ্যারিটি বিস্তৃত হতে থাকে। তাঁর মৃত্যুর সময় ১২৩টি দেশে মোট ৬১০টি মিশনের মাধ্যমে এই মিশনারি তাঁর কাজ করে যাচ্ছিল। মিশনারির পাশাপাশি তারা এইডস, কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্তদের জন্য আবাসন, সুপ কিচেন, শিশু ও পরিবার পরামর্শ কেন্দ্র, এতিমখানা ও অসংখ্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল।
মৃত্যুর পর পোপ জন পল ২ মাদার তেরেসাকে স্বর্গীয় বলে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁর নাম দেন কলকাতার স্বর্গীয় তেরেসা (Blessed Teresa of Calcutta, ব্লেসেড তেরেসা অফ ক্যালকাটা)। ২০০৩ সালে অর্থাৎ তার মৃত্যুর ৬ বছর পর পোপ তাকে “সেইন্ট” ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ক্যাথলিক ধর্মমত অনুসারে কাউকে সেইন্ট ঘোষণা করতে হলে তার মৃত্যুর পর বেশ কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথম ধাপ হচ্ছে “বিটিফিকেশন” (Beatification)। আর সেইন্ট ঘোষণার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্যননাইজেশন। মাদার তেরেসার বিটিফিকেশন ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে হয়তো তিনি ক্যাননাইজেশন শেষে সেইন্ট উপাধি পাবেন, যেভাবে সেইন্ট উপাধি পেয়েছিলেন ফ্রান্সের সেইন্ট তেরেসা। এই সেইন্ট তেরেসার নামই মাদার তেরেসা গ্রহণ করেছিলেন।
প্রাথমিক জীবন
মাদার তেরেসার আসল নাম আগ্নেস গঞ্জা বয়াজু (আ-ধ্ব-ব: ‘agnɛs ‘gɔndʒa bɔ’jadʒu)। আলবেনীয় ভাষায় আগনেস গঞ্জা শব্দের অর্থ “গোলাপকুঁড়ি”। তাঁর জন্ম ১৯১০ সালের ২৬শে আগস্ট বর্তমান মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানী স্কোপিয়েতে। বাবা নিকোলা বয়াজিউ আলবেনীয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। মায়ের নাম দ্রানাফিল বয়াজিউ। বয়াজিউ পরিবারের মূল বাসস্থান ছিল আলবেনিয়ার Shkodër (শকড্যর) নামক স্থানে। আগনেস ছিলেন পরিবেরের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। ১৯১৯ সালে এক রাজনৈতিক সমাবেশে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই অসুখেই তিনি মারা যান। তখন আগনেসের বয়স ছিল আট। বাবা মারা যাওয়ার পর মা তাকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে বড় করতে থাকেন। ছোটবেলাতেই রোমান ক্যাথলিক মিশনারি ও সাধু-সন্ন্যাসীদের কাহিনী শুনে তিনি মুগ্ধ হতেন। ১২ বছর বয়সেই বুঝতে পারেন, তাকে ধর্মীয় আদর্শে জীবন পরিচালনা করতে হবে। ১৮ বছর বয়সে ধর্মীয় কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য সিস্টার্‌স অফ লোরেটো-তে মিশনারি হিসেবে যোগ দেন। এর পর আর কোন দিনই নিজের মা এবং বোনদের সাথে তার দেখা হয় নি।
মিশনারি জীবনের প্রথমেই আগনেস আয়ারল্যান্ডের রাথফার্নহামের “লোরেটো অ্যাবি”-তে যান ইংরেজি ভাষা শেখার জন্য। কারণ সিস্টার্‌স অফ লোরেটোর মিশনারিরা ভারতের স্কুলগুলোতে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এই ভাষাই ব্যবহার করতো। ১৯২৯ সালে প্রাথমিক অধ্যয়ন শেষে হিমালয় পর্বতমালার পাশে দার্জিলিং শহরে নবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩১ সালের ১৪ই মে মঠবাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথের সময়ই “তেরেসা” নামটি বেছে নেন। উল্লেখ্য রোমান ক্যাথলিক মিশনারির প্যাট্রন সেইন্ট “Thérèse de Lisieux” (১৮৭৩-৯৭) এর নামানুসারেই তিনি এই নাম পছন্দ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ই মে তেরেসা চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন। এ সময় কলকাতার পূর্বাঞ্চলের এক লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।
স্কুলে পড়াতে তেরেসার বেশ ভাল লাগত। কিন্তু তার আশপাশের দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব আর বিশৃঙ্খলা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। তিনি সাধারণ মানুষের দুর্দশা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতেন। ১৯৪৩ সালে বঙ্গ অঞ্চলে গুরুতর দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। কলকাতার অনেক মানুষ এতে মৃত্যুবরণ করে। ১৯৪৬ সালে হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। এ সময় ভীতি ও হতাশা শহরটিকে গ্রাস করে। তেরেসার উপর এই পরিবেশের বিশাল প্রভাব পড়েছিল।
মিশনারিস অফ চ্যারিটি
১৯৪৬ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর ধর্মীয় নির্জনবাসের জন্য দার্জিলিং যাওয়ার সময় তার মধ্যে এক গভীর উপলব্ধি আসে। এই অভিজ্ঞতাকে পরবর্তীতে “the call within the call” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এ নিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন,
কনভেন্ট ত্যাগ করে দরিদ্রদের মাঝে বাস করা এবং তাদের সহায়তা করা আমার জন্য আবশ্যক ছিল। এটা ছিল এক সরাসরি আদেশ। এই আদেশ পালনে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ছিল বিশ্বাস ভেঙে ফেলা।
১৯৪৮ সালে কনভেন্ট ত্যাগের অনুমতি নিয়ে দরিদ্রের মাঝে মিশনারি কাজ শুরু করেন। প্রথাগত লোরেটো অভ্যাস ত্যাগ করেন। পোশাক হিসেবে পরিধান করেন নীল পারের একটি সাধারণ সাদা সুতির বস্ত্র। এ সময়ই ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বস্তি এলাকায় কাজ শুরু করেন। প্রথমে মতিঝিলে (পশ্চিমবঙ্গের) একটি ছোট স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষুধার্ত ও নিঃস্বদের ডাকে সাড়া দিতে শুরু করেন। তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে থাকেন। তার এই কার্যক্রম অচিরেই ভারতীয় কর্মকর্তাদের নজরে আসে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
প্রথম দিকের এই দিনগুলো তার জন্য বেশ কষ্টকর ছিল। এ নিয়ে ডায়রিতে অনেক কিছুই লিখেছেন। সে সময় তার হাতে কোন অর্থ ছিল না। গরীব এবং অনাহারীদের খাবার ও আবাসনের অর্থ জোগাড়ের জন্য তাকে দারে দারে ঘুরতে হতো। ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হতো। এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়ই হতাশা, সন্দেহ ও একাকিত্ব বোধ করেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, কনভেন্টের শান্তির জীবনে ফিরে গেলেই বোধহয় ভাল হবে। ডায়রিতে লিখেছিলেন:
Our Lord wants me to be a free nun covered with the poverty of the cross. Today I learned a good lesson. The poverty of the poor must be so hard for them. While looking for a home I walked and walked till my arms and legs ached. I thought how much they must ache in body and soul, looking for a home, food and health. Then the comfort of Loreto [her former order] came to tempt me. ‘You have only to say the word and all that will be yours again,’ the Tempter kept on saying … Of free choice, my God, and out of love for you, I desire to remain and do whatever be your Holy will in my regard. I did not let a single tear come.
১৯৫০ সালের ৭ই অক্টোবর তেরেসা “ডায়োসিসান কনগ্রেগেশন” (বিশপের এলাকার মত সমাবেশ) করার জন্য ভ্যাটিকানের অনুমতি লাভ করেন। এ সমাবেশই পরবর্তীতে মিশনারিস অফ চ্যারিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য তেরেসার নিজের ভাষায় বললেই ভাল শোনাবে:
Its mission is to care for the hungry, the naked, the homeless, the crippled, the blind, the lepers, all those people who feel unwanted, unloved, uncared for throughout society, people that have become a burden to the society and are shunned by everyone.
কলকাতায় মাত্র ১৩ জন সদস্যের ছোট্ট অর্ডার হিসেবে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এর অধীনে ৪,০০০ এরও বেশি নান কাজ করছেন। চ্যারিটির অধীনে এতিমখানা ও এইডস আক্রান্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাপী শরণার্থী, অন্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, বয়স্ক, মাদকাসক্ত, দরিদ্র, বসতিহীন এবং বন্যা, দুর্ভিক্ষ বা মহামারিতে আক্রান্ত মানুষের সেবায় চ্যারিটির সবাই অক্লান্ত পরীশ্রম করে যাচ্ছেন।
১৯৫২ সালে মাদার তেরেসা কলকাতা নগর কর্তৃপক্ষের দেয়া জমিতে মুমূর্ষুদের জন্য প্রথম আশ্রয় ও সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দিরকে কালিঘাট হোম ফর দ্য ডাইং-এ রূপান্তরিত করেন। এটি ছিল দরিদ্র্যদের জন্য নির্মীত দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে রাখেন “নির্মল হৃদয়”। এই কেন্দ্রে যারা আশ্রয়ের জন্য আসতেন তাদেরকে চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হয় এবং সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণের সুযোগ করে দেয়া হয়। মুসলিমদেরকে কুরআন পড়তে দেয়া হয়, হিন্দুদের গঙ্গার জলের সুবিধা দেয়া হয় আর ক্যাথলিকদের প্রদান করা হয় লাস্ট রাইটের সুবিধা। এ বিষয় তেরেসা বলেন,
A beautiful death is for people who lived like animals to die like angels — loved and wanted.
এর কিছুদিনের মধ্যেই তেরেসা হ্যানসেন রোগে (সাধারণ্যে কুষ্ঠরোগ নামে পরিচিত) আক্রান্তদের জন্য একটি সেবা কেন্দ্র খোলেন যার নাম দেয়া হয় “শান্তি নগর”। এছাড়া মিশনারিস অফ চ্যারিটির উদ্যোগে কলকাতার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশ কিছু কুষ্ঠরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এই কেন্দ্রগুলোতে ঔষধ, ব্যান্ডেজ ও খাদ্য সুবিধা দেয়া হয়।
মিশনারি শিশুদের লালন-পালন করতো। এক সময় শিশুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় তেরেসা তাদের জন্য একটি আলাদা হোম তৈরীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই অনুভূতি থেকেই ১৯৫৫ সালে “নির্মল শিশু ভবন” স্থাপন করেন। এই ভবন ছিল এতিম ও বসতিহীন শিশুদের জন্য এক ধরণের স্বর্গ।
অচিরেই মিশনারিস অফ চ্যারিটি দেশ-বিদেশের বহু দাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়। এর ফলে অনেক অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে ভারতের সর্বত্র চ্যারিটির অর্থায়ন ও পরিচালনায় প্রচুর দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র, এতিমখানা ও আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের বাইরে এর প্রথম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে ভেনিজুয়েলায়। মাত্র ৫ জন সিস্টারকে নিয়ে সে কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৮ সালে রোম, তানজানিয়া এবং অস্ট্রিয়াতে শাখা কোলা হয়। ১৯৭০-এর দশকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েক ডজন দেশে শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক কার্যক্রম
১৯৮২ সালে বৈরুত অবরোধের চূড়ান্ত প্রতিকূল সময়ে মাদার তেরেসা যুদ্ধের একেবারে ফ্রন্ট লাইনের হাসপাতালে আটকে পড়া ৩৭ শিশুকে উদ্ধার করেন। ইসরায়েলী সেনাবাহিনী ও ফিলিস্তিনী গেরিলাদের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধ বিরতি ঘটিয়ে পরিবেশ কিছুটা অনুকূলে এনেছিলেন। এই সুযোগেই রেড ক্রসের সহায়তায় যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলে যান। বিধ্বস্ত হাসপাতালগুলো থেকে কম বয়সের রোগীদের সরিয়ে আনেন।
সমাজতান্ত্রিক শাসনের সময়ে পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশেই মিশনারি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯৮০-’র দশকে ইউরোপের সে অংশ তুলনামূলক উদার হয়ে উঠে। এ সময়েই মাদার তেরেসা মিশনারিস অফ চ্যারিটির কাজ পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। কয়েক ডজন প্রকল্পের মাধ্যমে তার কাজ শুরু হয়েছিল। এ সময় গর্ভপাত এবং বিবাহবিচ্ছেদ-এর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের কারণে অনেকে তার সমালোচনা করেন। কিন্তু তেরেসা সব সময় বলতেন,
No matter who says what, you should accept it with a smile and do your own work.
মাদার তেরেসা ইথিওপিয়ার ক্ষুধার্তদের কাছে যেতেন, ভ্রমণ করতেন চেরনোবিল বিকিরণে আক্রান্ত অঞ্চলে। আমেরিকার ভূমিকম্পে আক্রান্তদের মাঝে সেবা পৌঁছে দিতেন। ১৯৯১ সালে মাদার তেরেসা প্রথমবারের মত মাতৃভূমি তথা আলবেনিয়াতে ফিরে আসেন। এদেশের তিরানা শহরে একটি “মিশনারিস অফ চ্যারিটি ব্রাদার্স হোম” স্থাপন করেন।
১৯৯৬ সালে পৃথিবীর ১০০ টিরও বেশি দেশে মোট ৫১৭টি মিশন পরিচালনা করছিলেন। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে যে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে তা কয়েক হাজারে পৌঁছোয়। তারা সবাই বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৫০টি কেন্দ্রে মানবসেবার কাজ করে যাচ্ছিল। গরিবদের মধ্যেও যারা গরিব তাদের মাঝে কাজ করতো এই চ্যারিটি, এখনও করে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চ্যারিটির প্রথম শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্ক্‌স বরোর দক্ষিণাঞ্চলে। ১৯৮৪ সালের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে চ্যারিটির প্রায় ১৯টি শাখা সক্রিয়ভাবে কাজ করা শুরু করে।
চ্যারিটি দাতব্য কাজের জন্য যে অর্থ পেতো তার ব্যবহার নিয়ে বেশ কয়েকজন সমালোচনা করেছেন। ক্রিস্টোফার হিচেন্স ও স্টার্ন সাময়িকী সমালোচনা করে বলেছে, গরীবদের উন্নয়নের কাজে চ্যারিটিতে যত অর্থ আসে তার কিছু অংশ অন্যান্য কাজেও ব্যয় করা হয়।
স্বাস্থ্যহানি ও মৃত্যু
১৯৮৩ সালে পোপ জন পল ২ এর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে রোম সফরের সময় মাদার তেরেসার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ১৯৮৯ সালে আবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর তার দেহে কৃত্রিম পেসমেকার স্থাপন করা হয়। ১৯৯১ সালে মেক্সিকোতে থাকার সময় নিউমোনিয়া হওয়ায় হৃদরোগের আরও অবনতি ঘটে। এই পরিস্থিতিতে তিনি মিশনারিস অফ চ্যারিটির প্রধানের পদ ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু চ্যারিটির নানরা গোপন ভোটগ্রহণের পর তেরেসাকে প্রধান থাকার অনুরোধ করে। অগত্যা তেরেসা চ্যারিটির প্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে পড়ে গিয়ে কলার বোন ভেঙে ফেলেন। অগাস্টে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। এর পাশাপাশি তার বাম হৃৎপিণ্ডের নিলয় রক্ত পরিবহনে অক্ষম হয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালের ১৩ই মার্চ মিশনারিস অফ চ্যারিটির প্রধানের পদ থেকে সরে দাড়ান। ৫ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
কলকাতার আর্চবিশপ Henry Sebastian D’Souza বলেন, তেরেসা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনি এক ধর্মপ্রচারককে এক্সরসিজম করতে বলেছিলেন। কারণ তার ধারণা ছিল, কোন শয়তান তেরেসাকে আক্রমণ করেছে।
মৃত্যুর সময় মাদার তেরেসার মিশনারিস অফ চ্যারিটিতে সিস্টারের সংখ্যা ছিল ৪,০০০; এর সাথে ৩০০ জন ব্রাদারহুড সদস্য ছিল। আর স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ছিল ১০০,০০০ এর উপর। পৃথিবীর ১২৩টি দেশে মোট ৬১০টি মিশনের মাধ্যমে চ্যারিটির কাজ পরিচালিত হচ্ছিল। এসব মিশনের মধ্যে ছিল এইডস, কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্র, সুপ কিচেন, শিশু ও পরিবার পরামর্শ কেন্দ্র, এতিমখানা ও বিদ্যালয়।

মাদার তেরেসার সমালোচনা
মা তেরেসার দর্শন ও প্রায়োগিক দিক নিয়ে বেশ কিছু সমালোচনা হয়েছে। অবশ্য সমালোচকরা খুব বেশি তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে পারে নি। একথা স্বীকার করে নিয়েই ডেভিড স্কট বলেন,
মাদার তেরেসা স্বয়ং দারিদ্র্য বিমোচনের বদলে ব্যক্তি মানুষকে জীবিত রাখার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এছাড়া কষ্টভোগ বিষয়ে তার মনোভাবও সমালোচিত হয়েছে। অ্যালবার্টার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি মনে করতেন, কষ্টভোগের মাধ্যমে যীশুর কাছাকাছি যাওয়া যায়। এছাড়া ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ও দ্য ল্যান্সেট পত্রিকায় তার সেবা কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই এক হাইপোডার্মিক সূচ একাধিক বার ব্যবহারের কথা বলেছেন। কেন্দ্রগুলোর জীবনযাত্রার নিম্ন মানও সমালোচিত হয়েছে। তার উপর চ্যারাটির অ-বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পদ্ধতিগত রোগ-নিরূপণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল।
তেরেসার সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্য সমালোচক, প্রমাণ্য চিত্র নির্মাতা ও লেখক “ক্রিস্টোফার হিচেন্স”। হিচেন্স মাদার তেরেসার রাজনৈতিক আদর্শকে Opportunist আখ্যা দেন। তিনি বলেন, তেরেসা দারিদ্র্য দূরীকরণের কাজ করেন নি এবং সেটা করতে কাউকে উদ্বুদ্ধও করেন নি; বরং দারিদ্র্য কিভাবে সহ্য করতে হয় তা শিখিয়েছেন। ক্যাথলিক ধর্মের সবচেয়ে গোঁড়া প্রচারণাগুলো কাজে লাগিয়েছেন। দারিদ্র দূরীকরণের কোন কাঠামোগত প্রচেষ্টা বা অর্থনৈতিক গবেষণাকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন নি। হিচেন্স মাদার তেরেসার একটি উক্তিকে বেশ প্রধান্য দেন- ১৯৮১ সালের এক সাংবাদিক সম্মেলনে তেরেসা বলেছিলেন,
I think it is very beautiful for the poor to accept their lot, to share it with the passion of Christ. I think the world is being much helped by the suffering of the poor people.
ক্রিস্টোফার হিচেন্স তেরেসার কড়া সমালোচনা করে একটি বই লিখেছেন, বইটির নাম “The Missionary Position: Mother Teresa in Theory and Practice”। ধারালো যুক্তি থাকলেও গবেষণামূলক কর্ম হিসেবে বইটি খুব বেশি প্রশংসিত হয় নি। তেরেসার অপোরচুনিস্ট কর্মকাণ্ড তুলে ধরার জন্য যে ধরণের গবেষণামূলক তথ্য প্রয়োজন তা এই বইয়ে ছিল না। তারপরও সার্বিকভাবে অনেকে বইয়ের প্রশংসা করেছেন। তারিক আলির সাথে মিলে হিচেন্স এ সম্পর্কিত একটি প্রামাণ্য চিত্রও তৈরি করেছেন, নাম “Hell’s Angel”। ইউটিউব থেকে দেখতে পারেন:



বাংলাদেশী হিসেবে তেরেসার প্রতি আমাদের ঋণ
ব্যক্তিগতভাবে আমি “সেক্যুলার হিউম্যানিজম” এর ভক্ত। মানুষ হয়ে জন্মে আরেক জন মানুষকে বা সমগ্র মানবতাকে ভালোবাসার জন্য ঐশ্বরিক বিশ্বাসের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কিন্তু তারপরও সবার উপরে মানবতাকে স্থান দেই। যে যে বিশ্বাস থেকেই মানবতার জন্য কাজ করুক না কেন তিনি আমার কাছে পরম শ্রদ্ধেয়। জন্ম নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় বিশ্বাস, গর্ভপাত ইত্যাদি বিতর্কিত অনেক বিষয়ে মাদার তেরেসার সাথে হয়তো আমার মিলবে না, তারপরও একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবতাবাদী হিসেবে এই মহিয়সী নারীকে শ্রদ্ধা করে যাব আজীবন।
একজন বাংলাদেশী হিসেবেও তেরেসার প্রতি আমাদের অনেক ঋণ। তিনি পুরো মানবতাকেই ঋণী করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর শরণার্থী এবং অবকাঠামো সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা ছিল বীরাঙ্গণা সমস্যা। অনেকে অনেক কথা বললেও সুনির্দিষ্ট কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিল না। আর চোখের নিমেষে বড় বড় সব উদ্যোগ নিয়ে ফেলার ক্ষমতা কার আছে তা তো আমরা জানিই। মাদার তেরেসা কি করেছিলেন তা অমি রহমান পিয়ালের জবানিতেই শোনা যাক,
বীরাঙ্গনা সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। দিশে পাচ্ছে না কোনো। একটা চুপ চুপ ভাব চারদিকে। মেরে ফেলা হবে না আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হবে- এমন নক্সায় ব্যস্ত সমাজপতিরা। মাদার এলেন। ঢাকার বুকে ৫টি বাড়ি ভাড়া নিয়ে খুললেন বীরাঙ্গনাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র।
মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতদের বঙ্গবন্ধু যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছিলেন। তাদেরকে বীরাঙ্গণা নামে আখ্যায়িত করে তাদের বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক যুবক তাদের বিয়ে করতে এগিয়ে এসেছিল যদিও তাদের অধিকাংশই এসেছিল অর্থের লোভে। মাদার তেরেসা এসব প্রত্যক্ষ করেছেন। গর্ভপাতের বিপক্ষে থাকার পরও সরকারের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছেন। তারপরও বীরাঙ্গণা সমস্যার সহজ সমাধান হয় নি। অধিকাংশ বীরাঙ্গণাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাদের অনেকেই অবলম্বন করেছেন মাদার তেরেসাকে।
তথ্যসূত্র
অনেক দিন আগে বাংলা উইকিপিডিয়াতে মাদার তেরেসা নিবন্ধটি লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। জীবনী পুরোটা লিখেছিলামও, মূলত ইংরেজি উইকিপিডিয়ার অনুবাদের মাধ্যমে। জানি উইকিপিডিয়া বেশি নির্ভরযোগ্য না। তাই সবগুলো তথ্যই গ্রহণযোগ্য সূত্রের সাথে মিলিয়ে দেখেছি। আজ ৫ই সেপ্টেম্বর মা-র ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে উইকিপিডিয়ার সেই লেখাটাই সিসিবি-তে প্রকাশ করলাম। তবে উইকির লেখায় কিছু পরিবর্তন করেছি, অনেক কিছু যোগ করেছি এবং বানান শুদ্ধ করেছি। উইকিপিডিয়ার লেখাটা পরিবর্তিত হয়ে গেলেও যেন ব্লগের এই লেখাটা মাদার তেরেসার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে টিকে থাকে…

 

জঁ ভিগো December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 3:59 am
লিখেছেন : মুহাম্মদ

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যপ্রতিভার রহস্য এখনও কেউ ভেদ করতে পারে নি। সুকান্ত একই সাথে আমাদের মাঝে বিস্ময় ও বিষাদ এর অনুভূতি জাগিয়ে গেছেন। তার অসাধারণ কাব্য সুষমা জাগিয়েছে বিস্ময়, আর তার অকালমৃত্যু আমাদেরকে চিরদিনের জন্য করে গেছে দুঃখী। অনেক সমালোচকের মতে রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে বেশি ভাবতে গিয়েই কবি ও কাব্য সমালোচকরা সুকান্তর প্রকৃত প্রতিভার প্রতিটি পাঁপড়ি মেলে দেখতে পারেন নি। সুকান্ত মাত্র ২১ বছর বয়সে মারা গেছেন। এই বয়সে মারা গেলে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব কবিই ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হয়ে যেতেন। কিন্তু সুকান্তের এই ২১ বছর আমরা ধারণা করতে পারি কোনদিন বাংলার ইতিহাস থেকে মুছে যাবে না।

[ছবি: জঁ ভিগো]

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য অবশ্য সুকান্ত নয়। কয়েকদিন আগে এক ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালকের সিনেমা দেখতে গিয়ে সুকান্তর কথা মনে হল। তার নাম জঁ ভিগো (Jean Vigo)। সিনেমাটার নাম “জিরো ফর কন্ডাক্ট” (Zéro de conduite – জেরো দ্য কোঁদুইত) (১৯৩৩)। সিনেমা দেখার পর নেটে ভিগোর জীবনী ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম, তিনি অনেকটা আমাদের সুকান্তর মতই। মাত্র চারটি সিনেমা করে ২৯ বছর বয়সে মারা গেছেন জঁ ভিগো। এই সিনেমা চারটির মধ্যে আবার একটি প্রামাণ্য চিত্র, আর একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য। অনেকের মতে তার মাস্টারপিস একটাই, L’Atalante. আমি তার মাস্টারপিসটা দেখিনি, কিন্তু জিরো ফর কন্ডাক্ট দেখেই মুগ্ধ। সুকান্তর সাথে তার মিল কেবল স্বল্পায়ুর ক্ষেত্রেই না, সুকান্তর মত তিনিও ছিলেন বিপ্লবী। সুকান্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী আর ভিগো অ্যানার্কিস্ট।

ইতিহাসের অনেক অ্যানার্কিস্ট চরিত্র আমার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। সে যুগে অ্যানার্কিজম এর পত্তন না হলেও ভলতেয়ার কে আমি মাঝেমধ্যে অ্যানার্কিস্ট হিসেবে দেখি। আর বিংশ শতকের অধিকাংশ বস এর মধ্যেই তো অ্যানার্কিজমের প্রভাব ধারণাতীত। এডওয়ার্ড সাইদ, নোম শমস্কি, জাক দেরিদা- কে অ্যানার্কিস্ট না? ভিগোর অ্যানার্কিস্ট হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ পারিবারিক প্রেক্ষাপট। তার বাবা ছিলেন সামরিক অ্যানার্কিস্ট। ফরাসি সরকার ও আইন-কানুনের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি জেল খেটেছেন এবং ১৯১৭ সালে জেলেই তার মৃত্যু হয়েছে। জঁ ভিগো তখন কেবল ১২ বছরের কিশোর। বাবার মৃত্যুর কারণে সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ ভিগোর ভাগ্যে কখনোই জোটে নি। ১২-র পর জীবন কাটিয়েছেন বিভিন্ন বোর্ডিং স্কুলে। বোর্ডিং স্কুলের অসহনীয় জীবন তার সিনেমা ক্যারিয়ারে অনেক ছাপ ফেলেছে।

বোর্ডিং স্কুলে থাকা এবং বাবার অকাল মৃত্যু দিয়েই ভিগোর অ্যানার্কিজমের শুরুটা বোঝা যায়। তবে মহান ব্যক্তিদের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট দিয়ে তাদের জীবনাদর্শের শুরুটা বোঝা গেলেও তার পরিপক্কতা বোঝা যায় না। সেটা বুঝতে হয় তাদের কর্ম দিয়েই। ভিগোর “জিরো ফর কন্ডাক্ট” দেখলে এই বলিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার রূপটা ধরা পড়ে। কতোটা দৃঢ়তার সাথে একজন মানুষ নিবর্তনমূলক যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরে এসে আপামর মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন তার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত এই সিনেমা। ফরাসি সরকার ও স্কুল কর্তৃপক্ষের যে বিদ্রুপাত্মক সমালোচনা এতে করা হয়েছে তা একই সাথে দর্শকদের উত্তেজিত করে তুলেছে আর ক্ষেপিয়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। যথারীতি ১৯৩৩ সালে মুক্তি পাওয়ার পরপরই ফ্রান্সে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এটা। ১৯৪৫ এর আগে আর প্রেক্ষাগৃহের মুখ দেখেনি জিরো ফর কন্ডাক্ট। দেখা যাক, এতে এমন কি ছিল যা কাউকে স্থির থাকতে দেয় নি, যা ফরাসি সিনেমার ইতিহাসে একটি নতুন প্রতিভার জন্ম দিয়েছে-

জিরো ফর কন্ডাক্ট মাত্র ৪২ মিনিটের সিনেমা। কাহিনী একটি বোর্ডিং স্কুলে ছাত্রদের বিদ্রোহ নিয়ে। প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় ছুটি শেষে ট্রেনে করে দুই ছাত্র স্কুলে ফিরছে। এখান থেকে সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য অনন্য। ট্রেনের যে কামরাটি দেখানো হয় তাতে প্রথমে কেবল দুজন যাত্রী থাকে, একজন ছাত্র আর আরেকজন ঘুমন্ত লোক যার পরিচয় আমরা পড়ে জানবো। পরের স্টেশনে আরেকটি ছাত্র উঠে। বাসা থেকে মজার কি কি এনেছে তা একজন আরেক জনকে দেখাতে থাকে। অধিকাংশই জাদুর সামগ্রী, কিংবা সং সাজার উপকরণ। ট্রেন ভ্রমণের কোন দৃশ্যেই পুরো ট্রেনটা দেখা যায় না। এমনও হতে পারে এটা স্টেজে করা, প্রকৃত ট্রেন ব্যবহারই করা হয়নি। ট্রেনের চাকা বা বাইরের দৃশ্য না দেখিয়েও এত সুন্দর ট্রেন ভ্রমণ দেখানো সম্ভব সেটা আমার ধারণাতেও ছিল না। এ যেন কোন ক্লাসিক উপন্যাসের পরিশীলিত শৈল্পিক বর্ণনা। প্রথম ১ মিনিট দেখেই বোঝা যায় পরিচালক কত নৈপুণ্যের সাথে কাজ করেছেন।

ট্রেন থেকে নামার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ সব ছাত্রকে লাইন ধরে দাড় করায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ট্রেনের ঘুমন্ত লোকটির পরিচয় জানতে পারি। তার নাম উগে (Huguet), স্কুলের নতুন শিক্ষক। ধীরে ধীরে স্কুলের সবার সাথে আমাদের পরিচয় হয়। স্কুলের শিক্ষক ও প্রশাসকদের ভিগো যেভাবে তুলে ধরেছেন সেটাই ছিল সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। ইয়া লম্বা দাড়িওয়ালা বামন টাইপের হেডমাস্টার যার কণ্ঠস্বর আবার বাচ্চাদের মত, বিশাল ভুড়িওয়ালা বিজ্ঞান শিক্ষক, এক শিক্ষক আবার ছাত্রদের খাবার চুরি করে খায়, সবচেয়ে অত্যাচারী চরিত্র হিসেবে দেখা যায় হাউজ মাস্টার কে। শিক্ষকদের মধ্যে এক জনকে কেবল ছাত্রদের পক্ষে দেখা যায়। পক্ষে না বলে ছাত্রদের বন্ধু বললে বেশি ভাল শোনায়, তিনি হলেন নতুন শিক্ষক উগে।

উগে চরিত্রটি বেশ রহস্যময়। কর্তৃপক্ষের মাঝেও যারা মানবতাবাদী হন তাদের চরিত্র ভিগো কিভাবে দেখেন তা এখান থেকে বোঝা যায়। উগে ছাত্রদের সাথে একেবারে বন্ধুর মত ব্যবহার করে, ছাত্ররা মাঝেমাঝে তাকে বিদ্রুপও করে, কিন্তু সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করে না। তার চরিত্রটা অনেকটা ক্লাউনের মত, এক ছাত্রকে তাকে লুজার ও বলতে শোনা যায়। উগে একটি দৃশ্যে চার্লি চ্যাপলিন-এর “ট্র্যাম্প” চরিত্রের অনুকরণ করে, সব ছাত্ররা বেশ মজা পায়। আমরা দেখি খেলার মাঠ এর উগে এবং শ্রেণীকক্ষের উগের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সব জায়গাতেই তিনি হাস্যোজ্জ্বল ও সদাচারী। শ্রেণীকক্ষে পড়ানোর বদলে তিনি দুই পা উপরে তুলে কসরৎ দেখান। সে অবস্থাতেই হাত দিয়ে স্কেচ করেন এক সার্কাস ক্লাউন। ধরা পড়েন সিনিয়র শিক্ষকের কাছে। উগের আঁকা সেই ছবিটিই তখন জীবন্ত হয়ে উঠে। সিনিয়র শিক্ষক ও উগের দৃষ্টিপটে নাচতে শুরু করে খাতায় আঁকা ছবিটি। ছবির এই নাচন দৃশ্যটি আমার জীবনে দেখা অন্যতম সেরা সাররিয়েল তথা পরাবাস্তব দৃশ্য। উগে-ই যে একমাত্র জীবিত চরিত্র এখানে তারই ইঙ্গিত করা হয়েছে, শুধু উগে নয় উগের কাজও জীবন্ত।

[জিরো ফর কন্ডাক্ট: উগে-র আঁকা ছবিটি হঠাৎই জীবন্ত হয়ে ওঠে।]

এরকম পরাবাস্তব উপমা সিনেমায় আরও আছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-তে জঁ ভিগো সম্পর্কে লেখা হয়েছে,

French film director whose blending of lyricism with realism and Surrealism, the whole underlined with a cynical, anarchic approach to life, distinguished him as an original talent.

ব্রিটানিকা আসলেই সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ। এক বাক্যে ভিগোর পরিচয় দেয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল বাক্য আর কিছু হতে পারে না। এই বাক্যটি থেকে আমরা বুঝতে পারি: ভিগো বাস্তবতা এবং পরাবাস্তবতা কে এত সুন্দরভাবে মিশিয়েছেন যে সিনেমাটা হয়ে উঠেছে গীতিধর্মী। এটা অবশ্যই মিউজিক্যাল সিনেমা না, সিনেমার এডিটিং স্টাইলটা সঙ্গীতের মত। এরকম লিরিক্যাল ন্যারেটিভ সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা নেই, সত্যজিতের কাঞ্চনজঙ্ঘা তে হয়ত কিছুটা টের পেয়েছিলাম। আর বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার এত সুন্দর মিলন আর একটা সিনেমাতেই দেখেছি, স্ট্যানলি কুবরিকের “আইস ওয়াইড শাট”।

[বালিশ ছোড়াছুড়ির দৃশ্যটি হঠাৎ ব্যঙ্গাত্মক ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে।]

বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার এমন গীতিধর্মী মিশ্রণ আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়। হোস্টেল রুমে ছাত্ররা বিদ্রোহ শুরু করে, বালিশ, তোষক সবকিছু ছুড়ে ফেলতে থাকে, পুরো রুম জুড়ে উড়তে থাকে তুলা। এক কোণায় দেখা যায় অসহায় হাউজ মাস্টারকে। খবর পেয়ে এক সিনিয়র শিক্ষক রুমে ঢোকার চেষ্টা করেন, কিন্তু এত তুলা ও কোলাহলে তার মত প্রবীণদের টিকে থাকার উপায় নেই, ক্যাপ নাড়িয়ে চলে যান তিনি। এর পরই ছাত্রদের বিদ্রোহ দৃশ্য চলে যায় স্লো মোশনে। এক ছাত্র ডিগবাজি খায়, সবাই এ সময় ঘুমানোর পোশাক পরে ছিল যার নিচে কিছু নেই। তাই ডিগবাজি খাওয়ার পর তার নিম্নাঙ্গের সবকিছু দেখা যায়, তবে রুমভর্তি তুলার কারণে খানিকটা আবছাভাবে। ডিগবাজি খেয়ে সে বসে চেয়ারে। চেয়ার শুদ্ধ তাকে বয়ে নিয়ে যায় বাকি ছাত্ররা, অনেকের হাতে থাকে নিশান। আবহ সঙ্গীত দেয়া হয় ভারিক্কি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মত। সার্বিকভাবে ছাত্রদের বিদ্রোহটি হয়ে উঠে এক ভারিক্কি রিলিজিয়াস প্রসেশন। ধর্মীয় প্রশাসনকে ব্যঙ্গ করার এর চেয়ে ভাল কোন উপায় ছিল না, লক্ষ্য করতে হবে এই দৃশ্যে এক কিশোরের পেনিস-ও দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অবশ্য ভিগো প্রথম থেকেই বেশ খোলামেলা ছিলেন।

আর শেষ দৃশ্য সম্পর্কে তো কিছু না বললেও চলে। শুরুতে যে গানটি হচ্ছিল শেষেও সেই গান শোনা যায়। ছাত্রদের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয় ফ্রান্সের “কোমেমোরেশন দিবস” উদযাপনের সময়। কোমেমোরেশন উপলক্ষ্যে গভর্নর আসে, ছাত্ররা ছাদের উপর থেকে সবার ওপর যা তা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। সব শেষে চার ছাত্র স্কুলের ছাদ দিয়ে হেঁটে যায়। বিজয়ীর বেশে হাত নাড়াতে থাকে। শটটা দেখানো হয় তাদের পেছন থেকে, তারা দূরে যেতে যেতে এক সময় থেমে যায়। গানের তালেই শেষ হয় সিনেমা।
[শেষ দৃশ্য]
শুরু এবং শেষ ছাড়া আরেকটি দৃশ্যে গান শোনা যায়। এই দৃশ্যটাও চমৎকার। উগে সব ছাত্রকে নিয়ে দৈনিক ড্রিল হিসেবে হাঁটতে বেরোয়। ছাত্ররা সমবেত স্বরে এই গান গাইতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে ছাত্ররা একে একে ছুটে যেতে থাকে। শেষে দেখা যায় উগে এক দিকে চলে গেছে, ছাত্রদের কেউ এদিকে কেউ বা ওদিকে, কোন ঠিক ঠিকানা নেই। ফ্রঁসোয়া ত্রুফো তার অতি বিখ্যাত “লে কাত্র সঁ কু” (The 400 Blows) সিনেমায় এই দৃশ্যের হুবহু অনুকরণ করেছিলেন। ফোর হান্ড্রেড ব্লোস এ দেখা যায় পিটি করতে করতে ছাত্ররা দলছুট হতে থাকে। এক সময় ড্রিল প্রশিক্ষকের পেছনে মাত্র দুই তিনজন থাকে। জঁ ভিগো যে ফরাসি নবতরঙ্গ আন্দোলনের বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছেন সেটাও এর মাধ্যমে বোঝা যায়। ত্রুফো এবং জঁ-লুক গদার দুজনেই ভিগোর সিনেমা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ফরাসি নবতরঙ্গে যে স্বাধীন চেতনা ও উঁচু মূল্যবোধ দেখা যায় জঁ ভিগোই তার ভিত্তি রচনা করেছিলেন।
এন্টি-অথরিটারিয়ান অ্যানার্কিস্ট সিনেমা হিসেবে “জেরো দ্য কোঁদুইত” অমর হয়ে থাকবে, তার গীতিধর্মী চিত্রায়ন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হবে শত শত চলচ্চিত্রকার।

 

স্ট্যানলি কুবরিক December 13, 2009

Filed under: People — rezowan @ 3:57 am

সিনেমা বিষয়ে স্ট্যানলি কুবরিক এর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। হাই স্কুল শিক্ষা যখন শেষ করেন তখন আমেরিকায় মন্দা চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই দেশে নিয়ম করা হয়েছিল, ৬৭% এর উপর নম্বর না থাকলে কেউ কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। তাই হাই স্কুলের পর আর কুবরিকের পড়াশোনা করা হয় নি। পরবর্তীতে মন্তব্য করেছিলেন যে, স্কুল তাকে কিছুই শেখাতে পারে নি, এমনকি স্কুলের কোনকিছুতে তিনি কোনদিন উৎসাহও পান নি। ছোটবেলা থেকে শখ ছিল ছবি তোলা, ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ানোটা তার জন্য একটা নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনা থেকে মুক্তি পেয়ে তাই বেরিয়ে পড়েন ক্যামেরা হাতে। শুরু হয় কুবরিকের ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফি জীবন। সমাজ-বাস্তবতার শৈল্পিক রূপায়ন তার এই জীবনকে বেশ সার্থক করে তোলে, অচিরেই সেকালের বিখ্যাত ‘লুক’ ম্যাগাজিনের নজরে পড়ে যান। লুক এর জন্য তিনি পরবর্তীতে প্রায় ৫-৬ হাজার ছবি তুলেছিলেন। এই ফটোগ্রাফি জীবনই তাকে সিনেমা বানাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। লুক এর পর তার পৃষ্ঠপোষক হয়েছে হলিউডের স্টুডিওগুলো। কিন্তু কুবরিক পুরো সময় জুড়ে একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন, অনেকে তাকে পৃথিবীর প্রথম স্বাধীন চলচ্চিত্রকার হিসেবে আখ্যায়িত করে। তার সিনেমায় স্টুডিওর বলার কিছু ছিল না, অর্থ যোগান দেয়া ছাড়া তাদের আর কোন কাজ ছিল না।

এ কারণেই কুবরিকের সিনেমায় সমাজ-সচেতনতা এবং সভ্যতার অবক্ষয় মূর্ত হয়ে উঠেছে। আধুনিক জনপ্রিয় শিল্প এবং সংস্কৃতিকে তিনি মেনে নিতে পারেন নি, এগুলোকে অবক্ষয়ের চিহ্ন হিসেবে দেখেছেন। সিনেমার মাধ্যমে এর মর্মমূলে আঘাত করতে চেয়েছেন। বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালকরা সাধারণত মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন, কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম কুবরিক, যিনি মনোবিজ্ঞানের বদলে বেছে নিয়েছিলেন সমাজবিজ্ঞান। কোন সিনেমার থিম মাথায় আসার পর কুবরিক গবেষণায় লেগে যেতেন। সিনেমা বানাতে প্রায় ৪-৫ বছর লাগতো, গবেষণার জন্যই বরাদ্দ থাকতো একটা বড় সময়। তার সিনেমার প্রায় প্রতিটি চরিত্রই সমাজের একটা বৃহৎ অংশের প্রতিনিধিত্ব করতো। কিন্তু চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি এক্সপ্রেশনিস্ট ধারা মেনে চলতেন। অর্থাৎ, সমাজে চরিত্রগুলো যেভাবে আছে সেভাবে ফুটিয়ে না তুলে, সেগুলোর একটি কাল্পনিক সংস্করণ সৃষ্টি করতেন, নিজের মনের মত করে। আর এই সৃষ্টির উদ্দেশ্য থাকতো চরিত্রগুলোকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করা। যাতে তাদেরকে দেখে করূণা হয়, উপহাস করতে ইচ্ছে হয়, ভলতেয়ার এর মত ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসতে মন চায়।

কুবরিকের তেমনি একটি চরিত্র বিশ্লেষণের জন্য এই লেখা শুরু করেছি। চরিত্রটির নাম “ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ”। সিনেমার নামও এই চরিত্রের নামে। তবে সিনেমাটির একটা বড় নাম আছে: “Dr. Strangelove: or How I Learned to Stop Worrying and Love the Bomb”।

(ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ)

যার নামে সিনেমার নাম তাকে কিন্তু মাত্র বিশ মিনিটের জন্য দেখা যায়, শেষের ২০ মিনিট। সিনেমাটা দেখার পর তাই অনেককেই প্রশ্ন করতে দেখা যায়, এই চরিত্রের এতো তাৎপর্য কেন? তার নামেই কেন সিনেমার নাম রাখা হল? তার চরিত্রকে এভাবে সাজানোর অর্থই বা কি?

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর একটু রহস্য করে দেয়া যায়। সিনেমার পুরো নামের মধ্যেই উত্তরটি দেয়া আছে। or how I learned to stop worrying and love the bomb. এখানে “I” মানেই ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ। তিনিই এক মহান উপায় বের করেছেন, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবী বোমার তোড়ে ধ্বংস হয়ে গেলেও অসুবিধা নেই, নো টেনশন। কাহিনীটা এমন: আমেরিকা-রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের ডামাডোলে পুরো পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। পতিত হয় বললে ভুল হবে, বলা যায় একটু পরেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু মার্কিন ও রুশ নেতারা এখনও দুই দেশের আধিপত্যের প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত। মারা যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তেও কি কোনভাবে প্রমাণ করে যাওয়া যায় না যে, আমরাই বস আর তোমরা গান্ধা। উপায় বাতলে দেন ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ, তার কথার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারি, এই মহাবিলয়ের যুগেও তিনি কিভাবে এতো শান্তিতে আছেন, যদিও তার কালো গ্লাভস পরা হাত দুটো তাকে পুরো শান্তি দিচ্ছে না। বোমা নিয়ে চিন্তিত না হয়ে তিনি উল্টো তাকে ভালোবেসেই ফেলেছেন। কেন? তার পরিকল্পনা হল, কোবাল্ট-থোরিয়াম জি এর অর্ধায়ু ৯৩ বছর। তার মানে ৯৩ বছরের মত পুরো পৃথিবী ঘন ধূলি ও আবর্জনার কুয়াশায় ঢেকে যাবে, পৃথিবী পৃষ্ঠে কোন মানুষ বাস করতে পারবে না, সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু আমেরিকার গভীর গভীর খনিগুলো কাজে লাগালেই আর চিন্তা নেই। গভীর খনিগুলোর তলদেশে হাজার খানেক মানুষের বাসস্থান করা যাবে অনায়াসে। তবে তার মতে, এই মাইন শ্যাফ্টগুলোতে ছেলে:মেয়ে অনুপাত হতে হবে ১:১০। ছেলেদের নির্বাচন করা হবে যোগ্যতা ও আমেরিকাকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে, আর মেয়েদের নির্বাচন করা হবে যৌন উর্বরতার উপর ভিত্তি করে। এসব নির্বাচনের ভার নির্দ্বিধায় ছেড়ে দেয়া হবে কম্পিউটারের হাতে। বাস আর কে পায়! ১০০ বছর পর পৃথিবীর বুকে উঠে এসে এক ঝাপ্টায়ই পুরো পৃথিবীতে আবার রাজত্ব বিস্তার করে ফেলতে আমেরিকা। মাস্টার প্ল্যান, হা হা হা… আর এই ১:১০ অনুপাতই কিন্তু বোমাকে ভালোবাসার মূল কারণ। বোমার তোড়ে পুরো পৃথিবী ভেসে না গেলে কি আর স্ট্রেঞ্জলাভের যৌনলিপ্সা-র কোন হিস্যা হতো? ও বেচারা বোমাকে ভালোবাসবে না কেন বলুন?

এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা না যে, এই ব্ল্যাক কমেডির প্রতিটি চরিত্রই পাগল কিছিমের। কুবরিক দেখিয়েছেন, আমরা কিভাবে আমাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এসব পাগলের হাতে সঁপে দিয়ে বসে আছি। ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ হল পাগলা বিজ্ঞানী। এমন পাগলের উদাহরণ কিন্তু পৃথিবীতে বিরল নয়? অসংখ্য বিজ্ঞানীর একাগ্রতা এবং অক্লান্ত পরীশ্রম না থাকলে পারমাণবিক বোমা বানানো কি সম্ভব হতো? হয়তো বা বলতে পারেন, ম্যানহাটন প্রজেক্ট এ যে ৫৫,০০০ মানুষ কাজ করতো তাদের কেউই এতো ডিটেল জানতো না। কিন্তু মূল পরিকল্পনা ও ইনস্টলেশনের দায়িত্বে যে বিজ্ঞানীরা ছিলেন তাদের দায় কে নেবে? পাগলা সেনানায়ক, পাগলা রাষ্ট্রপ্রধান আর পাগলা বিজ্ঞানীর সুমহান সম্মিলন না ঘটলে কি দেশকে এগিয়ে নেয়া যায় বলুন? আমেরিকা তো এইসব পাগলের সফল সম্মিলনের বিস্ময়কর রূপায়ন। কুবরিক কিন্তু তার ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ কে তৎকালীন আমেরিকার এমন পাগলা বিজ্ঞানীদের আদলেই তৈরি করেছেন। চরিত্রের একটু খুটিনাটি বিশ্লেষণ করলেই সেটা বেরিয়ে আসবে। আসুন শুরু করি:

নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির আদলে কি ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ চরিত্র সাজানো হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সমালোচকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন। উঠে এসেছে সন্দেহভাজন চার জনের নাম যাদের মধ্যে এই পাগলা বিজ্ঞান, অমানবিকতা ও জাতীয় অহংবোধের প্রাবল্য ছিল:

- হেনরি কিসিঞ্জার (প্রাক্তন হার্ভার্ড অধ্যাপক, নিক্সন ও ফোর্ড সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
- ভের্নার ফন ব্রাউন (প্রাক্তন নাৎসি রকেট বিজ্ঞানী যে যুদ্ধের পর মার্কিন সরকারের হয়ে কাজ শুরু করে)
- এডওয়ার্ড টেলার (হাঙ্গেরীয় পদার্থবিজ্ঞানী যে আমেরিকার প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ করেছিল)
- হারমান কান (র‌্যান্ড কর্পোরেশনের নিউক্লীয় যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ও মিলিটারি স্ট্র্যাটেজিস্ট)

হেনরি কিসিঞ্জারের পক্ষে যুক্তিগুলো হল: সে জন্মসূত্রে জার্মান, তার অ্যাকসেন্ট স্ট্রেঞ্জলাভ এর খুব কাছাকাছি। তাছাড়া প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স কিসিঞ্জারের ক্যারিয়ারকে pathology of a serial killer এর সাথে তুলনা করেছেন যা স্ট্রেঞ্জলাভের পাগলা সহিংসতার সাথে মিলে যায়। কুবরিক এ নিয়ে যেহেতু অনেক গবেষণা করেছেন সুতরাং তিনি নিশ্চয়ই বিখ্যাত কাউকেই স্ট্রেঞ্জলাভ বানাতে চাইবেন, সেদিক দিয়ে কিসিঞ্জার কে সন্দেহ করা যায়। কিন্তু কথা হলো, কিসিঞ্জার তখনও (১৯৬৪) এতোটা বিখ্যাত হয়ে উঠেনি যে তাকে নিয়ে প্যারডি বানানো যায়। তাই কিসিঞ্জার-স্ট্রেঞ্জলাভ মেলবন্ধনের নিশ্চয়তা দেয়া যায় না।

ভের্নার ফন ব্রাউনের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে: সে জার্মান, শুধু প্রাক্তন নাৎসি নয়, যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সে নাৎসিদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল এবং সে অনেক বিখ্যাতও ছিল। ফন ব্রাউন সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় মানবতা ধ্বংসের প্রচণ্ড রকমের ইনোভেটিভ সব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিতো। তার বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার কাছে নৈতিকতার কোন মূল্যই ছিল না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ফন ব্রাউন নিউক্লীয় বিজ্ঞানী ছিল না, তার তত্ত্বগুলোর সাথে নিউক্লীয় যুদ্ধের কোন সম্পর্কও ছিল না। তাই শক্তিমান আমেরিকার এই সুমহান চামচাকেও খুব একটা প্রশ্রয় দেয়া যায় না।

এডওয়ার্ড টেলার এর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে ম্যানহাটন প্রজেক্ট এবং ওপেনহাইমার অ্যাফেয়ার এর সাথে সক্রিয় সংযুক্তি। সে আজীবন হাইড্রোজেন বোমা তৈরি এবং এর মাধ্যমে মানুষ মারার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে গেছে। সে অনেকদিন লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি-র এর প্রধান ছিল। ম্যানহাটন এর প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার পারমাণবিক আঘাতের ফলাফল নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ায় এই টেলারই রাজনীতিবিদদের বুঝিয়েছিলেন যে, ওপেনহাইমার পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য এক বিরাট ঝুঁকি। সে-ই রোনাল্ড রেগান কে বলেছিল যে, স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ ভাল ফল দেবে। বিখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ম্যানচেস্টার বলেছিলেন, টেলারকেই ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের সবচেয়ে নিখুঁত জান্তব মডেল ধরে নেয়া যায়। টেলার এর অ্যাকসেন্ট ইংরেজ না, সেদিক দিয়েও তাকে স্ট্রেঞ্জলাভের সাথে তুলনা করা যায়।

কিন্তু চলচ্চিত্র সমালোচক ব্রায়ান সায়ানো-র মতে, ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে হারমান কান। কান ছিল বহুল আলোচিত র‌্যান্ড করপোরেশন এর প্রথম দিককার কর্মকর্তা। এই করপোরেশন প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীকে কৌশলগত পরামর্শ দেয়ার জন্য। সিনেমাতেও দেখা যায়, ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ ব্ল্যান্ড করপোরেশন নামের এক প্রতিষ্ঠানের সাথে পুরো পৃথিবী ধ্বংসের কলা-কৌশল উদ্ভাবনের কাজ করে। হেরমান কান সামরিক কুশলবীদদের সবচেয়ে নিখুঁত আইকন এর স্রষ্টা: সিনিয়র আর্মি অফিসারদের মত নির্বিকার, যেখানে যেই মারা যাক কোন বিকার নেই, সবার যে প্রশ্ন করতে আত্মা কাঁপে নির্দ্বিধায় সেই প্রশ্ন উত্থাপনের মানসিকতা, সাধারণ মানুষ যা কল্পনাও করতে পারে না সেটা বাস্তবায়নের চিন্তা করা। যুদ্ধে মানুষের মারা যাওয়াটা যেন খুব সিরিয়াস কিছু মনে না হয় এজন্য কান মৃতের সংখ্যার আগে “only” শব্দ যোগ করার প্রচলন করেছিল। ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভে এই শব্দের ছড়াছড়ি দেখা যায়: only 10 million deaths, tops, no more… কত কম দেখেন? ২০ মিলিয়নও তো মারা যেতে পারতো, আমরা তো নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি যাতে ২০ এর বদলে মাত্র ১০ মিলিয়ন মারা যায়…

তাছাড়া ইদানিং এত গণহারে মানুষ মারা যাচ্ছে যে মিলিয়ন টিলিয়ন বলে দাঁত ব্যথা হয়ে যায়। এজন্যই হারমান কান “মেগাডেথ” (Megadeath) নামে একটি এককের প্রচলন করেছিল যার অর্থ যথারীতি ১ মিলিয়ন মৃত্যু। মার্কিন উত্তরাধুনিক রাজনীতি-বিদ্রোহী মেটাল ব্যান্ড “মেগাডেথ” (Megadeth) এই একক থেকেই তাদের নাম নিয়েছিল। তবে নামটা নিতে গিয়ে তারা ইচ্ছা করে বানান ভুল করেছে, death কে লিখেছে deth, বিদ্রোহের চিহ্ন হিসেবে।

হেরমান কান এর একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম “On Thermonuclear War” (১৯৬০), সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান এই বইয়ের রিভিউ করতে গিয়ে বলেছে, “a moral tract on mass murder; how to plan it, how to commit it, how to get away with it, how to justify it.” আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে সিনেমায় স্ট্রেঞ্জলাভ যে মাইন শ্যাফ্ট এবং ১:১০ অনুপাতের কথা বলে কান এর ও এই ধরণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল। কুবরিক এসব আকাশ থেকে আনেন নি। এসব প্ল্যান দিয়েই কান মহান ফিউচারিস্ট খ্যাতি পেয়েছিল। তবে কান কে নিয়ে ঘাপলা আছে। কান এর কোন জার্মান সংশ্রব নেই, সে একেবারে বিশুদ্ধ আমেরিকান। তাকে একবার ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ নিয়ে প্রশ্নও করা হয়েছিল। তার উত্তর ছিল: “Dr. Strangelove would not have lasted three weeks at the Pentagon… he was too creative.”

এটুকু ব্যাখ্যার পর ক্রিটিক ব্রায়ান সায়ানো যা বলেছেন তার সাথেও আমি একমত। কুবরিক হয়ত হেরমান কান এর চরিত্র থেকেই সবচেয়ে বেশী উপাদান নিয়েছিলেন। কিন্তু ডিটেল এর দিকে যার এত নজর তিনি নিশ্চয়ই অন্যান্য চরিত্রের কিছু উপাদান মেশানোর সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। কুবরিক ঠিক এ কাজটাই করেছেন। উপর্যুক্ত চারটি চরিত্র থেকেই কিছু উপাদান নিয়েছেন। এই পাঁচমিশালীর মাধ্যমে সম্ভাব্য সবচেয়ে ভয়ানক চরিত্রটি উপস্থাপন করেছেন। তার সাথে যোগ করেছেন কিছু অতিপ্রাকৃত ও স্পিরিচুয়াল বৈশিষ্ট্য। পাগলা বিজ্ঞানীদের এ ধরণের সুযোগসন্ধানী পাগলা গবেষণা যে ঈশ্বরের স্থান দখল করতে পারে সেটা ফুটিয়ে তোলার জন্য স্ট্রেঞ্জলাভ চরিত্রে আরও হাজার টা গুণাগুণ মেশানো হয়েছে। সে নাৎসিদের হয়ে কাজ করতো। তার মূল নাম Merkwürdigliebe যার ইংরেজি অর্থ strange-love, হিটলার এর পর মার্কিন সরকারের পোষা বিজ্ঞানীতে পরিণত হওয়ার পর সে নাম পরিবর্তন করে রেখেছে স্ট্রেঞ্জ লাভ। সত্যিই বড় অদ্ভুত এই ভালোবাসা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি কি ভালোবাসা দেখেন, নারীর প্রতি ভালোবাসার চেয়ে কোন অংশেই কম না।

প্রথম সফল কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র বোধহয় ফ্রিৎস লাং এর মেট্রোপলিস (১৯২৭)। এই সিনেমাতেও এক পাগলা বিজ্ঞানীর চরিত্র ছিল। C. A. Rotwang নামক এই চরিত্রের এক হাত ছিল কাটা, কাটা অংশে মেকানিক্যাল হাত লাগানো হয়েছিল। ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ এর এক হাতে একটি কালো গ্লোভস আছে যা তার কথা শুনে না। এই অবাধ্য হাত যেন আরেকটি পৃথক সত্ত্বা যে তার পাগলা চিন্তায় বারবার বাঁধার সৃষ্টি করছে। এর মাধ্যমে যেন কুবরিক বোঝাতে চাইছেন, নিজের সাথে যুদ্ধ করে হলেও সে মানবতা ধ্বংসের কাজ করে যাবে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে অবাধ্য অংশের রং ও কালো। বোঝাই যায়, এর মাঝে মেট্রোপলিস এর অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ও কিন্তু এমন একটা পাগলা বিজ্ঞানীর চরিত্র তৈরি করেছিলেন, “হীরক রাজার দেশে” সিনেমায়, তবে আরও দুই দশক পরে। এই সিনেমাতেও পাগলা বিজ্ঞানীর যন্তর-মন্তর ঘর দেখেছি, বুঝেছি এমন বিজ্ঞানীরা অন্ধ গবেষণার তোড়ে উন্মাদ হয়ে গেছে, যে তাকে উদ্ভাবনের সুযোগ করে দেবে সে তার হয়েই কাজ করবে। যথারীতি শক্তিমান সমাজ এমন বিজ্ঞানীকে পুষবে, যত টাকাই লাগুক…

সিনেমার শেষ কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতে ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ পঙ্গু, হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সিনেমার শেষে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে সে হাঁটতে পারছে। হুইলচেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে বলে, “Mein Führer! I can walk!” তার এই চিৎকারের পরই পৃথিবী ধ্বংসের খেলা শুরু হয়। পুরো পৃথিবী জুড়ে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে। এই অনবদ্য ধ্বংস দৃশ্যের সাথে অনেকে গ্রুপ সেক্স এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। স্ট্রেঞ্জলাভ পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দিয়েছে, কারণ এছাড়া তার পক্ষে শত শত রমণীর সাথে চিরন্তন রমণে রত হওয়া সম্ভব না। পৃথিবী ধ্বংসের এই মন্টাজ যেন ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভের অর্জি-রই রূপায়ন। ১:১০ পৃথিবীতে শিশ্ন-চর্চায় রত এক সুমহান বিজ্ঞানী যে নিজের স্বাভাবিক জীবন উৎসর্গ করেছিল পুরো পৃথিবী ধ্বংসের তাগিদে।

তথ্যসূত্র

- A Commentary on Dr. Strangelove by Brian Siano

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.