খাজাঞ্চিখানা

ফজলে রেজওয়ান করিম

গাজায় টনি ব্লেয়ারকে ফিলিস্তিনি যুবকের ধাওয়া! October 22, 2009

‘গেট আউট ইউ টেররিস্ট’

গাজার পশ্চিম তীরে একটি মসজিদ পরিদর্শনে গিয়ে এক ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনি  যুবকের ধাওয়া খেলেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার (৫৬)। টনি ব্লেয়ারকে  দেখেই ‘গেট আউট ইউ টেররিস্ট (তুমি সন্ত্রাসী, দূর হও)’ বলে ওই যুবক তার দিকে ধেয়ে যান। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনায় হকচকিয়ে যান। কিন্তু নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ত্বরিত গতিতে ওই যুবককে ধরাশায়ী করে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত টনি ব্লেয়ার মঙ্গলবার পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ পরিদর্শনে গেলে এই ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের সঙ্গে মিলে টনি ব্লেয়ার আফগানিস্থান ও ইরাকে হামলায় অংশ নেয়ার এবং ইসরাইলকে সমর্থন করার কারণে ওই যুবক সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। খবর আইটিএন ও স্কাই নিউজের।
সূত্র জানায়, ওই যুবক ইব্রাহিমী মসজিদে নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন। নামাজ শেষে একটি ব্যাগ হাতে বের হয়ে টনি ব্লেয়ারকে  দেখেই তার মেজাজ বিগড়ে যায়। তিনি ধেয়ে যান ব্লেয়ারের দিকে। নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে জাপটে ধরে মেঝেতে ফেলে আটক করেন। ওই যুবক ‘ইসলামিক লিবারেল পার্টি হিজবুত তাহরির’-এর একজন সমর্থক। আটক হবার পর তিনি চেঁচিয়ে বলতে থাকেন, ‘ফিলিস্তিনে ব্লেয়ারের প্রবেশের অধিকার নেই’। বারবার তাকে বের হয়ে যেতে বলেন তিনি।
পরে টনি ব্লেয়ারকে সাংবাদিকরা মন্তব্যের জন্য ঘিরে ধরেন। ব্লেয়ার  বলেন, ‘আপনারা জানেন সে তার মতো করে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, দুই- একজনের ৰোভকে গোটা জাতির ক্ষোভ হিসেবে মনে করা হবে ভুল হিসাব।
।। ইত্তেফাক ডেস্ক ।।

 

চীনের সোং রাজত্বকাল October 16, 2009

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

সোং রাজা

সোং রাজত্বকাল (খ্রিস্টাব্দ ৯০৭-১২৭৯)। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে তখনকার চীনে ক্ষমতাবলয় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে এ রচনায় ৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তাং রাজবংশের অবসান ঘটে। উত্তর চীনে অন্তবর্তীকালীন অস্থিরকাল ছিল প্রায় তিপ্পান্ন বছর। এই অর্ধশতাব্দীর মধ্যে পরপর পাঁচটি রাজবংশের উত্থান এবং দক্ষিণে স্বতন্ত্র রাজ্যসমূহের সূচনা ঘটে।

তাং রাজত্বের শেষের দিকে দেশে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থা ক্রমাগতভাবে অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে। অবশেষে উত্তরে নানা গণ-অভ্যুত্থানের চাপে প্রশাসন একেবারে ভেঙে পড়ে। যাঁদের বিদ্রোহ দমন করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁরাই শুধু লাভবান হন। পরপর পাঁচজন আঞ্চলিক সেনাপতি ক্ষমতা দখল করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই পঞ্চাশ বত্সরের সংকটকাল পঞ্চম রাজবংশের কাল হিসেবে অভিহিত হয়।
চীনের সোং রাজত্বকালে এক বিস্ময়কর সুদক্ষ ও শ্রেণীহীন আমলাতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। কালক্রমে তা সর্বোচ্চ উত্কর্ষ সাধন করে। সুই ও তাং সম্রাটদের সময় বংশপরম্পরায় উত্তরাধিকার সূত্রে গঠিত অভিজাত শ্রেণী শিক্ষিত পণ্ডিত প্রশাসকদের কাছে প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলে। অবশ্য সমগ্র তাং আমলে আমলাতন্ত্রের নানা ফাঁকফোকরে, বিশেষ করে সুরক্ষার নামে প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গ চাকরির পরীক্ষা এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের সন্তানদের এমন সব উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়, যেসব পদের দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁদের সম্যক ধারণা ছিল না। এমনকি সোং আমলেও এ ধরনের ছলচাতুরি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। তবে এই সময় বেশির ভাগ উচ্চপদ নির্দিষ্ট ছিল তাঁদের জন্য, যাঁরা পরীক্ষায় বিশেষ সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সোং রাজত্বকালের প্রথম এক শ বছর নাকি যাঁরা ডক্টরেট-পর্যায়ের বৈদগ্ধ অর্জন করেননি তাঁদের কাউকে সংস্কৃতির অভিভাবক বা নীতির-সমালোচকের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যদিও ওই দুটো বিভাগে প্রভাব খাটিয়ে সুযোগ নেওয়ার কিছু সম্ভাবনা ছিল। সোং রাজত্বের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতা দূর হয়। এটি প্রথম রাজবংশ, যেটি নতুন রাজধানী কাইফেংকে কেন্দ্র করে দক্ষিণে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সোং আমলে প্রশাসনের উত্তরাধিকারে পণ্ডিতদের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে চীনের অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষাকল্পে পণ্ডিতবর্গের যে প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয় তার কোনো তুলনা নেই। সোং রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা পরিকল্পিতভাবে কেবল গণবিচারে উত্তীর্ণ আমলাতন্ত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন।
ষষ্ঠ রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত করে সোং সম্রাট ঝাউ কোয়াংকি স্থির করলেন যে উচ্চাভিলাষী সেনাপতিদের কেউ যেন সপ্তম রাজবংশের প্রতিষ্ঠা না করে। সীমান্ত অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত গৌণ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়ে উত্কৃষ্টতর সেনাদলকে তাঁদের নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তিনি অভিজাত শ্রেণীর প্রভাব খর্ব করার জন্য অনেক বেশি প্রশাসন-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আমলাদের ওপর নির্ভর করেন। প্রতিষ্ঠাতা-সম্রাটের ভ্রাতা এবং পরবর্তী সম্রাট ঝাউ কোয়াংকি বলেন, ‘মোটা বস্ত্রাচ্ছাদিত হূদয়ও যে জেডের গুণ বহন করতে পারে, আমাদের ধারণা সেই তথ্য তো আমাদের জানা নেই।’
সমগ্র চীনের ওপর যিনিই তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছেন তাঁর জন্য বড় জটিল বিষয় ছিল চীনের শক্তিশালী প্রতিবেশী রাজ্যগুলো। বহিরাক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে বিশাল সৈন্যবাহিনী সীমান্তে মোতায়েন রাখতে হতো। আর যেসব সেনাপতি সেই প্রতিরক্ষা-কর্মে নিয়োজিত থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠত তারা চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের হুকুম অমান্য করতে উত্সাহিত বোধ করত। ৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ঝাও কুয়াংকিন পরবর্তী ঝৌ সম্রাটের সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তাঁর ভাই ঝাও কুয়ানকি ও তাঁর পরামর্শদাতা ঝাও পিউয়ের সহযোগিতায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং উত্তর সোং রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। রাজধানী কাউফেং-এ থাকলেও তার নতুন নাম হয় দং জিং। পনেরো বছরের মধ্যে জিংকনান, শু, দক্ষিণে হান ও তাং রাজ্য পরাভূত হয়। ৯৭৮ ও ৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে চীন মোটামুটি এক-রাজ্যের পতাকাতলে সমবেত হয়। লিয়াও অবশ্য এর বাইরে থাকে।

সোং রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা-সম্রাট সেনাপতিদের আকর্ষণীয় অবসরভাতা দিয়ে সীমান্ত থেকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। অধস্তনদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার চেয়ে বর্বর প্রতিবেশীদের হাতে হয়রানি সহ্য করার জন্য সম্রাট প্রস্তুত থাকেন এবং প্রায়ই তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে প্রতিহত করেন।
প্রথম সোং সম্রাট যুদ্ধজয়ের পরিবর্তে নিজের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সংস্কারের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য তিনি নানা ব্যবস্থা নেন। পণ্ডিত-প্রশাসকরা চীনা সমাজে ও আইনি ব্যবস্থায় চিরাচরিতভাবে ব্যবসায়ীদের তেমন সম্মান না জানালেও কালক্রমে ব্যবসায়ীদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সোং রাজাদের প্রশাসনের শীর্ষে ছিল সম্রাট ও একটি রাষ্ট্রীয় পরিষদ। অব্যবহিত নিচে ছিল সচিবালয়, অর্থদপ্তর ও সামরিক দপ্তর। তিন শ’র অধিক ঝৌ তত্ত্বাবধান করত স্থানীয় সরকার এবং তাদের নিচে ছিল অধস্তন আঞ্চলিক সরকার।
সোং রাজত্বকালে শিক্ষা ও জ্ঞানগরিমার বিস্তার ঘটে। বিশেষ করে কনফুসিয়াসবাদ প্রসার লাভ করে। বৌদ্ধ ও অন্যান্য বিদেশি চিন্তাধারায় কনফুসিয়াস দর্শনের নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, ফলে তা সমৃদ্ধি লাভ করে। সেই দর্শনকে ভিত্তি করে দেশের প্রশাসনের পরীক্ষা নির্ধারিত হতো। শিক্ষিত আমলারা সম্রাটকে যুদ্ধ জয়ে তেমন অনুপ্রাণিত করতেন না। শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী এবং বারুদের জ্ঞানে সমৃদ্ধ সোং সম্রাটরা কিছু যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তাঁরা শিয়া শিয়া বা খিতান রাজ্যগুলোকে অর্থপ্রদান করে প্রতিহত করত।
আমলাদের পরীক্ষা ছিল এক স্নায়ুবিদারক ব্যাপার। পরীক্ষার্থীদের মাঝরাতে উঠে প্রত্যুষে নিজেদের উপস্থাপন করতে হতো। পরীক্ষার সময় তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য তারা ঠান্ডা ভাত ও পিঠা নিয়ে আসত। কারও বিলম্ব করার উপায় ছিল না। পরীক্ষার সময় দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে দরজা সিলগালা করে বন্ধ করা হতো। অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রত্যেকে নিজের নিজের আসনে বসত। মাঝে তিনটি দেয়াল ও ওপরে ঢালু ছাদের ব্যবধান থাকত। পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ছিল ছোট ছোট কোষ্ঠ। পরীক্ষায় যেন কেউ কোনো চাতুরী বা অন্যায় সুযোগ না নিতে পারে তার জন্য চীনের ঐতিহ্যে বেশ কড়া নিয়মকানুন মেনে চলা হতো। হান আমলে প্রশ্নপত্র কেউ যাতে আগে ভাগে জানতে না পারে তার জন্য প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্রের দিকে একটা তীর ছুড়তে হতো। যে প্রশ্নপত্র তীর বিদ্ধ হতো, পরীক্ষার্থীকে সেই পত্রের উত্তর দিতে হতো।
তীরন্দাজি বিদ্যাকে কনফুসিয়াসের সময় ভদ্রলোকের মর্যাদাময় একটা গুণ বলে গণ্য করা হতো। তাং রাজত্বকালে কোনো রকম চিহ্ন দেওয়ার আগে খালি খাতা পরীক্ষার্থীর নামের ওপরে আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে দেওয়া হতো। পরীক্ষার্থীর হাতের লেখা দেখে যাতে পরীক্ষকেরা কাউকে শনাক্ত না করতে পারে, তার জন্য নকলনবিশরা সকল পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র নকল করত। এমনকি পরীক্ষকদেরও ঘরে আটকে রেখে তাঁদের বাইরের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে দেওয়া হতো না। তাঁদেরও এক ধরনের পরীক্ষা হতো। যাঁদের তাঁরা পাস করান তাঁদের পরবর্তী কর্মকাণ্ড দেখে পরীক্ষকদের গুণাগুণ বিচার করা হতো। ফলে একটা দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠত একজন পরীক্ষকের সঙ্গে সফল পরীক্ষার্থীদের। কেউ ক্ষমতার ওপরে উঠলে তিনি অভিনন্দনব্যঞ্জক কবিতা উপহার পেতেন। উদ্বেগ প্রশমনের একটা সুযোগ ছিল। পরীক্ষার্থীরা বারবার পরীক্ষা দিতে পারতেন। কেউ কেউ পনেরোবার পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। ৭০ বছর বয়সী পরীক্ষার্থীও দেখা গেছে। নানা-নাতি একসঙ্গেও পরীক্ষা দিতেন। পরীক্ষা পাস শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, তা সমাজে এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনেও কাজে আসত। পরীক্ষায় সফলতার জন্য আবার কেউ কেউ বিশেষ রঙের পরিধেয় পরতে পারতেন। পরীক্ষা পাস করেও অনেক বিত্তবান অনুচ্চাভিলাষী নিজেদের জমিজমা দেখাশোনা ও সংস্কৃতি চর্চা করে এক সহজ ও সম্মানজনক জীবন অতিবাহিত করতেন।
কোনো সমাজেই সরকারি চাকরিতে সবাই সমান সুযোগ পায় না। সোং রাজত্বকালে সরকারের সবাই প্রায় সমান সুযোগ পায় পরীক্ষা-পদ্ধতির গুণে। যাঁদের তিন প্রজন্ম ধরে সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, তাঁদের অনেকে সোং রাজত্বকালে উচ্চপদে আসীন হন। সোং রাজত্বের প্রথম দিকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সব উচ্চপদস্থ আমলা ভাষার গদ্য ও পদ্য রীতিতে মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন। হাংকঝৌও বন্দর নগরীর দুই তীর, তাং আমলের পাই জুয়ি এবং সোং আমলের সু তংপো-র। দুই জন বড় আমলার নাম বহন করে।

১০৫২ খ্রিস্টাব্দে শীর্ষস্থানীয় পরামর্শদাতা ওয়াং আনশিহ সম্রাটকে পরামর্শ দিলেন যে, কে না জানে সীমান্তরক্ষী বা সম্রাটের রক্ষীদের ওপর দেশে শান্তি রক্ষার জন্য নির্ভর করা চলে না! শিক্ষিত লোকেরা অস্ত্রধারণকে অমর্যাদাকর মনে করে এবং যেহেতু তাদের কেউ ঘোড়ায় চড়তে বা তীর ছুড়তে জানে না এবং সামরিক অভিযান সম্পর্কে কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই, তাই ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী ছাড়া আর কাকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে? অর্থনীতিতে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য কোনো রাজ্য দখল করা হয় না বা উত্পাদনও বৃদ্ধি করা যায় না। ওয়াং আনশিহ-র মতে সরকারের ঘাটতি কেবল অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের জন্য নয়, বরং তা আয় বৃদ্ধির উপায় না জানার জন্যই। যাঁরা তাঁদের পরিবারকে সমৃদ্ধ করতে চান, তাঁরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেন। যাঁরা কেবল রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করতে চান, তাঁরা কেবল দেশ থেকে নেন এবং যাঁরা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চান তাঁরা প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আহরণ করেন। ব্যাপারটা তেমন পরিবারের মতো, যেখানে সন্তানের জন্য তার আয় বৃদ্ধি না করে পিতা তার কাছ থেকে গ্রহণ করে। পরিবার নিজেকে আরও বিত্তবান মনে করলেও সবই ঘটে পরিবারের বদ্ধ দরজার মধ্যে এবং সেখান থেকে কিছুই বাইরে আসে না। ওয়াং আনশি-র এই বক্তব্য এখনো প্রণিধানযোগ্য।

দুঃসময়ের কর্তব্য হিসেবে হাংঝৌও-এর ঝাউ মিংচেং তাঁর কবি স্ত্রী লি চিং ঝাউকে পরামর্শ দেন, ‘তুমি সব কিছু রক্ষা করতে পারবে না। প্রথমে ভারী লটবহর ফেলে দাও, তারপর কাপড়চোপড়-বিছানাপত্র, তারপর বই ও চিত্রসমূহ এবং সবশেষে প্রাচীন ব্রোঞ্জ শিল্পকর্ম। কিন্তু পোর্সিলিনের জিনিসগুলো তুমি সঙ্গে বইবে এবং তোমার সঙ্গে সেগুলো হয় রক্ষা পাবে নয় ধ্বংস হয়ে যাবে।’

মোঙ্গলীয়ান

চীনের উত্তরের শত্রুরা বড় বিপদের সম্মুখীন হচ্ছিল। মোঙ্গলদের আবির্ভাব সব কিছু পালটে দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে সোং সম্রাটরা তাঁদের পুরোনো ভ্রান্ত পথেই এগোলেন। জিন রাজ্যের বিরুদ্ধে সোং সম্রাট মোঙ্গলদের পক্ষ নেয়। কয়েক দশক ধরে নতুন প্রতিবেশীদের প্রতিহত করতে সোং রাজারা সক্ষম হলেও ১২৭৯ সালে মোঙ্গলদের কাছে তাঁরা পরাভূত হন। সর্বপ্রথম সারা চীন একজন বিদেশি বিজেতার অধীনে আসে। তিনি আর কেউ নন, কুবলাই খান

কুবলাই খান
 

মহাত্মা গান্ধী: সত্য ও অহিংসার অবতার October 16, 2009

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ  যা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়।

উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে কয়েকজন বড় নেতা ওই সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংগঠনিক অবস্থানের বাইরে থেকেও বহু বড় ব্যক্তিত্ব অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা জওহরলাল নেহরুর মতো বিরাট রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের রাজনীতিতে এমন এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, যাঁকে নেতা না বলে এক বিস্ময়কর ঘটনা বা প্রপঞ্চ বলাই ভালো। যেকোনো সমস্যা বা সংঘাত—রাজনৈতিক হোক, সামাজিক বা ধর্মীয় হোক—তা অহিংস উপায়ে সমাধানের শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। যে সত্যাগ্রহ নীতি তিনি তাঁর জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন, অবাস্তব মনে হলেও, তাঁর উদ্ভাবিত সেই সত্যাগ্রহ হলো যুদ্ধের বিকল্প।
গান্ধীজির জীবনের মূলমন্ত্র সত্য ও অহিংসা। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘পৃথিবীকে আমার নতুন কিছু শিক্ষা দেওয়ার নেই। সত্য ও অহিংসা পর্বতের মতো অতি পুরোনো জিনিস।’অতি পুরোনো অর্থাত্ শাশ্বত জিনিসকে তিনি জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন মানুষের সমাজে তার মূল্য কত বেশি।

১৮৯৩ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত গান্ধীর কর্মজীবন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তখন সেখানে বাস করত দেড় লাখ ভারতীয় শ্রমিক ও নাগরিক। ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ শাসকদের দ্বারা তারা ছিল নিপীড়িত। তাদের সামান্য উপার্জনের ওপর আরোপ করা হতো নানা রকম কর, রাস্তাঘাটে তারা হতো অপমানিত, বিচিত্র কালাকানুনে তাদের করা হতো নাজেহাল, মানবাধিকার বলে তাদের কিছু ছিল না। একটি মামলার ওকালতি করতে তিনি গিয়েছিলেন প্রেটোরিয়ায়। সেখানে তিনি ভারতীয় শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে তাদের পাশে দাঁড়ান। তাতে নিজেও নিপীড়িত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর যে মানবাধিকার আন্দোলন, এর তুলনা পৃথিবীতে বিরল।

আগেই বলেছি, প্রথাগত রাজনৈতিক নেতা তিনি ছিলেন না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফ্রিকা থেকে এসে তিনি কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে যোগ দেন। কোনো কংগ্রেস সম্মেলনে সেটিই তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা। তিনি লক্ষ করলেন, সব বড় বড় নেতা দামি পোশাক পরে গরম বক্তৃতা দিতে প্রতিযোগিতা করছেন। তিনি দায়িত্ব নেন স্থায়ী ও অস্থায়ী পায়খানাগুলো পরিষ্কার করার। ঝাড়ু ও বালতিতে পানি নিয়ে তিনি পায়খানা সাফ করতেন।

ভারতবাসীর মুক্তির সংগ্রামে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন গান্ধী। ১৯১৪ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি সারা ভারত ঘুরে মানুষের অবস্থা দেখেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী বছর দুই তিনি বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯২০ সালে বালগঙ্গাধর তিলকের মৃত্যুর পর কংগ্রেস অনেকটা নেতৃত্বে দুর্বল হয়ে পড়ে। গান্ধী এগিয়ে এলেন। এবারও তাঁর হাতিয়ার অহিংসা। ১৯২০ সালে তিনি শুরু করেন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। সে এক অভূতপূর্ব রাজনীতি। এমন এক অসহযোগ আন্দোলন, যার তুলনা উপমহাদেশের দুই হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা যায় না।

গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহ হলো অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিদ্রোহ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের স্বভাবে শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য সহজাত উপাদান রয়েছে। সেগুলোর সদ্ব্যবহারে বিশ্বে শান্তি স্থাপন ও মানুষের মুক্তি অর্জন সম্ভব।

অসহযোগ আন্দোলনের পরে তাঁর নেতৃত্বে আরেক বড় আন্দোলন ১৯৩০ সালের ‘লবণ সত্যাগ্রহ’। এরপর ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। এসব গণ-আন্দোলন ব্রিটিশ রাজত্বের ভিত্তি টলিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

১৯৩৩ সালের পর গান্ধীজি কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেন না। কিন্তু তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের পিতৃপ্রতিম শীর্ষনেতা। তবে জীবনের শেষ চার-পাঁচ বছর তিনি তাঁর সহকর্মীদের ক্ষমতার রাজনীতির মোহ লক্ষ করে হতাশ হন। ফলে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ। তখন তাঁর ভূমিকা হয়ে পড়ে মানবতাবাদী দার্শনিকের।

মহাত্মা গান্ধীর জীবনের শেষ বড় কর্মযজ্ঞ নোয়াখালী শান্তি মিশন। নোয়াখালীর দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় তিনি ১৯৪৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৭-এর মার্চ পর্যন্ত চার মাসের বেশি একনাগাড়ে অবস্থান করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭-এর পরও যে কয়েক মাস তিনি জীবিত ছিলেন, সমাজে ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

রাজনীতিবিদ হিসেবে গান্ধী হয়তো ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু মানুষ গান্ধী, মানবতাবাদী গান্ধী, শান্তিবাদী গান্ধী ও সত্যসন্ধানী গান্ধীর কোনো তুলনা উপমহাদেশে নেই। যে সত্য নিজের বিরুদ্ধে যায়, তাও তিনি অসংকোচে প্রকাশ করেছেন। তাঁর ছিল বিজ্ঞের মতো বৈষয়িক বুদ্ধি, কিন্তু শিশুর মতো সরল মন। তিনি ছিলেন অতি বিনয়ী। প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলতেন বন্ধুর আন্তরিকতা নিয়ে। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি এই মহান রাজনৈতিক সাধকের জীবনাবসান ঘটে আততায়ীর হাতে।
 

‘বাপু’ আসবেন বলে October 16, 2009

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন তৈমুর রেজা যা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়।

ক্যাসাব্লাংকার গল্প মনে আছে? ঝড়ের মুখে ডুবতে বসা জাহাজে বাবা তাকে হুকুম দিয়েছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ না আসি, তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।’ সবাই জাহাজ ছেড়ে গেল, বাবাও গেলেন। কিন্তু ক্যাসাব্লাংকা নড়ল না। বাবা বলে গেছেন, তাই অপেক্ষা করতেই হবে।

আজকের দিনে ক্যাসাব্লাংকা বা আমাদের বায়েজিদ বোস্তামীর গল্প অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু নোয়াখালীর জয়াগ গ্রামে গিয়ে আবিষ্কার করা গেল একে একে নয়জন ক্যাসাব্লাংকার গল্প। বাবার জন্য নয়, তাদের অপেক্ষা ছিল ‘বাপু’র জন্য। বাপু, মানে মহাত্মা গান্ধীর অপেক্ষায় তাঁরা কাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা জীবন। আর এই যুগের ক্যাসাব্লাংকাদের এই অপেক্ষার ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’।
সেই ক্যাসাব্লাংকারা হলেন গান্ধীর সঙ্গে শান্তির কাজে বাংলাদেশে আসা তাঁর নয়জন শিষ্য। গল্পের শুরু সেই ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি। মহাত্মা গান্ধী এলেন জয়াগের জমিদারবাড়িতে। প্রায় তিন মাস হলো নোয়াখালীতে এসে পৌঁছেছেন তিনি।
দাঙ্গার খবর পেয়ে তিনি গ্রাম পরিক্রমা করছেন। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন গান্ধী-অন্তঃপ্রাণ লোকেরা। তাঁরা গান্ধীর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন—ধর্মের, অহিংসার, শান্তির। যত দিন প্রাণ তত দিন তাঁদের যাত্রা।
গান্ধীজির গ্রাম পরিক্রমার ধারাটা অদ্ভুত। গাড়ি-ঘোড়া নেই। তিনি চলেন পদব্রজে। যেখানে রাত সেখানেই ঘুম। ভোরবেলা আবার যাত্রা। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এসে পড়েছেন জয়াগে। লোকলস্কর নিয়ে আশ্রয় নিলেন হেমন্তকুমার ঘোষের বাড়িতে।
হেমন্ত বাবু এ গাঁয়ের জমিদার। ভদ্রলোকের কপাল মন্দ। যেদিন গান্ধী পদধূলি দিলেন সেদিন তিনি বাড়িতে নেই। পরদিন সকালেই গান্ধী অন্যত্র চললেন। হেমন্ত বাবু গান্ধীর নাগাল পেলেন না। কিন্তু বাড়িতে গান্ধীর পদধূলি পড়ায় অভিভূত হয়ে গেলেন। আবেগ উথলানো হূদয়ে তিনি গান্ধীকে চিঠি লিখতে বসলেন। গান্ধীর শান্তিমিশনের কাজে তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করবেন, সব সম্পত্তি লিখে দেবেন গান্ধীকে। কিন্তু সম্পত্তি দিয়ে গান্ধী কী করবেন! স্মিত হেসে হেমন্ত বাবুর পত্রের উত্তরে বললেন, ‘আমার সম্পত্তির প্রয়োজন নেই। পারলে ওই সম্পত্তি শান্তিরক্ষার কাজে ব্যবহার করুন।’ হেমন্ত বাবু হুকুম শিরোধার্য করলেন। স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দিয়ে তৈরি করলেন ‘অম্বিকা-কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট’। আর সেই ট্রাস্টেই এসে কাজ শুরু করলেন গান্ধীর শিষ্যরা। কারণ, গান্ধীর আদেশ!
বিহারেও দাঙ্গা শুরু হওয়ার খবর পেয়ে নোয়াখালী ছেড়ে রওনা দিলেন মহাত্মা গান্ধী। ইচ্ছে ছিল আবার নোয়াখালীতে ফিরে গ্রামোন্নয়নে কাজ করার। রেলস্টেশনে এগিয়ে দিতে আসা জনাবিশেক শিষ্যকে তাই হুকুম করলেন, ‘নোয়াখালী ফিরে যাও। শান্তি আশ্রমে কাজ করতে থাকো। আমি শিগগিরই ফিরে আসব।’
গান্ধী চলে গেলেন। আর গান্ধীর আদেশ সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালীতে ফিরলেন গান্ধীর অনুসারীরা। বিপুল উদ্যমে তাঁরা শান্তি আশ্রমের কাজে ঝাঁপ দিলেন। কাজের তো আর অভাব নেই। একটা গ্রাম্য সমাজে যত রকম অসুবিধা হতে পারে, তার সব দিকে তাঁরা হাত লাগালেন। গান্ধী ফিরে আসবেন।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধী খুন হলেন। জয়াগ গ্রাম ত্যাগের ঠিক এক বছরের মাথায়। এই মৃত্যুর খবর সারা পৃথিবীতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল। নোয়াখালীর শান্তি মিশনেও পৌঁছাল এই খবর। গান্ধীর মৃত্যু এবং দেশভাগের প্রতিক্রিয়ায় আশ্রম ছেড়ে ভারতে পাড়িও জমালেন অনেক শিষ্য। কিন্তু এসব কিছুই বিন্দুমাত্র বিচলিত করল না নয়জন শিষ্যকে।
তাঁরা বিশ্বাসই করলেন না গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ! সত্যসাধক গান্ধী নিজের মুখে বলেছেন, তিনি ফিরে আসবেন। তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। সেই ফেরার পথ চেয়েই কাজ করে চললেন চারু চৌধুরী, রেড্ডি পল্লী সত্যনারায়ণেরা। কাজ করেন গ্রামের উন্নয়নে। কেউ বাচ্চাদের পড়ান, কেউ অহিংসার ব্রত শেখান। আর সত্যনারায়ণের মতো কেউ কেউ অক্লান্ত কাজ করে যান মানুষের জন্য। আজও সত্যনারায়ণের কাজের গল্প ঘুরে মানুষের মুখে। রামগঞ্জের এক বৃদ্ধ আবদুর রাজ্জাক মনে করলেন, “প্রতি রাতে এলাকার সব সাঁকোর দুই পাশে একটা করে হারিকেন ঝুলিয়ে দিতেন সত্যনারায়ণজি। কেউ যেন সাঁকো থেকে পড়ে না যায়। আমরা বলতাম, ‘এসব করে কী হবে?’ উনি হেসে বলতেন, ‘বাপু আবার আসবেন, তখন দেখবেন এসব’।” এই ‘বাপু’র পথ চেয়ে কাজ করে যাওয়ার পথটা সোজা ছিল না। পাকিস্তান সরকার তাঁদের শান্তি দিল না। ‘ভারতের এজেন্ট’ তকমা দিয়ে নানা রকম হেনস্তা শুরু হলো। এসব গান্ধীবাদী জেল খাটলেন বছরের পর বছর। তাঁরা জেলে পচে মরতে রাজি, কিন্তু গান্ধীর নির্দেশ আলগা করতে নারাজ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এঁদের মধ্যে চারজনের প্রতীক্ষা শেষ হয়ে গেল। গান্ধীর চারজন অহিংস অনুসারীকে তারা হত্যা করল। মদনমোহন চট্টোপাধ্যায় আর দেবেন্দ্রনারায়ণ সরকার ধ্যান করছিলেন। ধ্যানস্থ অবস্থায় গুলি করে মারা হলো তাঁদের।
সবচেয়ে আঁধার রাতও শেষ হয়, ভোর আসে। অবশেষে আসে স্বাধীনতা। আলো জ্বলে ওঠে। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি এক বিশেষ অধ্যাদেশবলে পুরোনো ট্রাস্ট পুনর্গঠন করে ‘গান্ধী আশ্রম বোর্ড অব ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করলেন। গান্ধীর অনুসারীরা যথারীতি আপন কাজ করতে থাকলেন। সেবাব্রত আর গান্ধীর জন্য প্রতীক্ষা। তিনি কথা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন।
গান্ধী ফিরবেন কি না, আমরা জানি না। তবে সেই মশালবাহকেরা জেনে খুশি হবেন, মশাল আজও জ্বলছে। এখনো গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট শান্তির জন্য, অহিংসার জন্য কাজ করে চলেছে। এখনো তাঁরা মানুষকে ডেকে বলেন, ‘অহিংসাই পরম ধর্ম’। এটা কি গান্ধীর প্রত্যাবর্তন নয়!
সেই নয় গান্ধীবাদী
১. রেড্ডি পল্লী সত্যনারায়ণ
২. চারু চৌধুরী
৩. দেবেন্দ্রনারায়ণ সরকার
৪. মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়
৫. সাধনেন্দ্রনাথ মিত্র
৬. বিশ্বরঞ্জন সেন
৭. রঞ্জনকুমার দত্ত
৮. অজিত কুমার দে
৯. জীবনকৃষ্ণ সাহা

 

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’র কিছু সংগ্রহীত Artical October 13, 2009

পাকিস্থান সৃষ্টির পর পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ববঙ্গ সরকারের দাসসুলভ মনোবৃত্তির কারণে করাচিতে অবস্থিত পাকিসত্দানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গকে আর্থিকভাবে বঞ্চিত করতে থাকে এবং পূর্ববঙ্গের ওপর উর্দুভাষা চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। ব্রিটিশ আমলে মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মৰেত্র ছিল ভারতবর্ষের আসাম প্রদেশে। ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে তিনি পূর্ববঙ্গে চলে আসেন এবং বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার কার্যাবলি বাংলায় পরিচালনা করার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান এবং এই দাবি নিয়ে পীড়াপীড়ি করেন। ১৯ মার্চ বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বলেন, যেসব কর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ প্রদেশ থেকে সংগ্রহ করে তার শতকরা ৭৫% প্রদেশকে দিতে হবে। এখানে উলেস্নখ যে, ব্রিটিশ আমলে বঙ্গপ্রদেশ জুটেক্স ও সেলসট্যাক্স রাজস্ব হিসেবে আদায় করত এবং এই করের ভাগ কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হতো না। পাকিসত্দান সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ সরকারের হাত থেকে এই কর ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরাই আদায় করতে থাকে যার ফলে পূর্ববঙ্গ সরকার আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। যাই হোক, মুসলিম লীগ দলের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় মুসলিম লীগের ৰমতাসীন সদস্যরা মওলানা ভাসানীর ওপর রম্নষ্ট হয় এবং তার নির্বাচনে ত্রম্নটি ছিল এই অজুহাত দেখিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করে এবং মওলানা ভাসানীকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। পরিশেষে মওলানা ভাসানী ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতদসত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর এক নির্বাহী আদেশ বলে মওলানা ভাসানীর নির্বাচন বাতিল করেন।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৩ জুন ওই কর্মিসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ কর্মিসম্মেলনে যোগদান করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান। মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রধান অতিথি। ২৩ জুন পূর্ববঙ্গের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিসত্দান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সর্বসম্মতিক্রমে এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক। ২৪ জুন আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগ গু-া দিয়ে সভা বানচাল করার চেষ্টা করে। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় খাদ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ফলে ১৩ অক্টোবর মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখা হয়। ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওই সালের ২৪ ডিসেম্বর আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে একটি বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী। সভায় যেসব প্রসত্দাব গৃহীত হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল_ ১) পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন, ২) রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি ইত্যাদি।
১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রম্নয়ারি নুরম্নল আমিন সরকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেৰিতে গুলি করে হত্যা করে কয়েকজন ছাত্রকে এবং ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন বা সমর্থক ছিলেন তাদের গ্রেফতার করে। মওলানা ভাসানীও গ্রেফতার হন। অবশ্য জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল মওলানা ভাসানীকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালে অসুস্থ শামসুল হকের স্থলে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন উপলৰে ৰমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাভূত করার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। এই যুক্তফ্রন্টের নেতা ছিলেন_ ১) মওলানা ভাসানী, ২) একে ফজলুল হক ও ৩) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। ওই ইশতেহারের মধ্যে প্রধান দাবি ছিল_ ১) লাহোর প্রসত্দাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, ২১শে ফেব্রম্নয়ারিকে শহীদ দিবস ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা, ভাষা শহীদদের স্মৃতি রৰার্থে শহীদ মিনার নির্মাণ করা ইত্যাদি।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মওলানা ভাসানী, একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক গঠিত যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। ৰমতাসীন মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হয়। তারা শুধু ৯টি আসন লাভ করে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জন করে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পাকিসত্দান পূর্ববঙ্গকে কব্জায় রাখার জন্য নানা ষড়যন্ত্র শুরম্ন করে। অবশেষে ১৯৫৬ সালে সংখ্যা-সাম্যের ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ১৩ জন এমএনএ থাকা সত্ত্বেও রিপাকলিকান পার্টির সহযোগিতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন। ওইদিকে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের কাগমারীতে একটি বিরাট সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলন ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রম্নয়ারি থেকে ১০ ফেব্রম্নয়ারি পর্যনত্দ অনুষ্ঠিত হয়। এরূপ সাংস্কৃতিক সম্মেলন যা অত্যনত্দ সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল সেরূপ সাংস্কৃতিক সম্মেলন আর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ৮ ফেব্রম্নয়ারি ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। এই সভায় মওলানা ভাসানীও বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি বলেন, পূর্ববাংলা পাকিসত্দানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী পাকিসত্দানকে সালামু আলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে। আসলে এই উক্তির অনত্দরালে স্বাধীনতার দাবি উহ্য অবস্থায় ছিল।
এর মধ্যে পাকিসত্দানের শাসকশ্রেণীর মধ্যে নানা বিভেদ-বিভাজন চলতে থাকে। সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করতে হয়। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টায় পাকিসত্দান সোহরাওয়ার্দীকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করেছিল। কার্যসিদ্ধি হয়ে গেলে তারা তাকে পরিত্যাগ করে।
১৯৫৮ সালে প্রধান সেনাপতি আয়ুব খান ২৭ অক্টোবর ৰমতা দখল করে এবং গণতন্ত্রকে অবরম্নদ্ধ রেখে ১০ বছর পাকিসত্দান শাসন করে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ছয়দফা দাবি পেশ করলে আয়ুব খান হুমকি দিয়ে বলেন যে, এর জবাব অস্ত্রের ভাষায় দেয়া হবে। ছয় দফা দাবি পেশ করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেক নির্যাতন সইতে হয় এবং কারারম্নদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরম্নদ্ধে পূর্ব পাকিসত্দানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল দ্বারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিচার কার্য আরম্ভ হয়। এই মামলাটিকে সরকার ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে বর্ণনা করতে থাকে।
পাকিসত্দানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন দমন করা। এই মামলার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝোলাতে পারলেই বাঙালির সব আন্দোলন থেমে যাবে কারণ তিনিই তাদের একচ্ছত্র নেতা। এ প্রসঙ্গে এডভোকেট সাহিদা বেগম লিখেছেন_ ‘মামলার অগ্রগতি এবং ট্রাইব্যুনালের প্রতিদিনের কার্যবিবরণী দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ফলাও করে প্রকাশিত হওয়ায় মামলাটির ব্যাপারে জনমনে প্রচ- আলোড়ন জেগে উঠতে শুরম্ন করে। মামলার বিরম্নদ্ধে ঢাকাসহ পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গণআন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে থাকে। বাইরের আন্দোলন আরও বেগবান ও উত্তপ্ত করে তোলার জন্য রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক তৎপরতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ১নং আসামি শেখ মুজিবুর রহমান তখন কাগমারীতে অবস্থানরত মওলানা ভাসানীকে বাইরের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের আহ্বান জানিয়ে অনুরোধ পাঠান। শেখ মুজিব জানতেন, জনবরেণ্য কোন নেতা এই আন্দোলনে অগ্রগামী ভূমিকা না নিলে বাইরের আন্দোলন আগুনমুখী হয়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হবে না। মওলানা ভাসানী রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাদর্শী হলেও শেখ মুজিবকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। সংবাদ পেয়ে মওলানা ভাসানী সেই সংবাদদাতার সম্মুখেই উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন ‘শেখ মুজিব বলেছে। আমাকে যেতে হবো সরকার এদের সবাইকে ফাঁসি দেবার ষড়যন্ত্র করছে।’ পরদিন থেকে মওলানা ভাসানী ঢাকার রাজপথে। পল্টনের বিশাল জনসমুদ্রের সভায় উত্তাল মানুষগুলোকে তিনি অগি্নময় কণ্ঠে আহ্বান জানালেন সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে।” সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান হবার ফলে এবং পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণহীন না হয়ে পড়ে সেই কথা বিবেচনা করে পাকিসত্দান সরকার ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রম্নয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবসহ সব অভিযুক্ত নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন। যে দুর্বার গণআন্দোলনের ফলে শেখ মুজিব বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন তার সূচনা করেছিলেন মওলানা ভাসানী।
পাকিসত্দানের সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানকে সরিয়ে দিয়ে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ৰমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন এবং পাকিসত্দানের প্রেসিডেন্ট রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। নীতিনির্ধারণী ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিসত্দানের এক ইউনিট পদ্ধতি বাতিল করেন। সংখ্যা-সাম্যনীতি বাতিল করে এক মানুষ এক ভোট পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে এই রূপ ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এই প্রতিশ্রম্নতি ইয়াহিয়া খান প্রদান করেন।
নানা পারিপাশ্বর্িক অবস্থা থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর যাতে সুবিধা হয় সেজন্য মওলানা ভাসানী তার দল ভাসানী ন্যাপকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেননি। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে মওলানা ভাসানী একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। যার ফলশ্রম্নতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিসত্দানের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত হবার পর মওলানা ভাসানী সবার আগে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন এবং মনত্দব্য করেন যে বাঙালি জনসাধারণ বাঙালির স্বার্থ রৰার জন্য সঠিক কাজটি করেছে।
অবশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েও পূর্ববঙ্গের জন্য তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। পাকিসত্দান বাঙালিকে ৰমতা দেবার জন্য কখনই ইচ্ছুক ছিল না। তাই তারা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে পাকিসত্দান থেকে তারা দুই ডিভিশন সৈন্য আমদানি করে।
জাহাজে করে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে থাকে। অবশেষে পাকিসত্দান দখলদার বাহিনী ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর ঢাকার নিরস্ত্র জনসাধারণকে হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালিয়ে বহু শিৰক, ছাত্র ও ছাত্রীকে হত্যা করে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করলে পাকিসত্দানি সৈন্যরা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় তবে রাত শেষে পুলিশের প্রতিরোধ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। হানাদার বাহিনী ইপিআর বাহিনী সদও দপ্তর পিলখানাতেও হামলা চালায়। সারা পূর্ববঙ্গে তারা হত্যাকা- আরম্ভ করে। তবে বহুস্থানেই পাকিসত্দান বাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়।
২৫ মার্চ রাতে মওলানা ভাসানী সনত্দোষে তার গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তিনি বিবিসি ও আকাশ বাণীর সংবাদ শুনতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি জানতে পারেন যে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ ও জনগণ পাকিসত্দান বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যৰ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। তবে এই প্রতিরোধ স্বল্পদিন স্থায়ী হয়েছিল।
এদিকে পাকিসত্দান বাহিনী হন্যে হয়ে মওলানা ভাসানীকে খোঁজাখুঁজি করছিল। কিন্তু তিনি তাদের দৃষ্টি এড়িযে টাঙ্গাইল ছেড়ে তার পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। পাকিসত্দান বাহিনী তার সনত্দোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। মওলানা ভাসানী মোজাফ্ফর ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে ভারত সীমানত্দ অভিমুখে রওনা হন। অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সাহায্যে মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম ১৫/১৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ সীমানত্দ অতিক্রম করে আসামের ফুলবাড়ী নামক স্থানে উপস্থিত হন। পরে তাদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়। এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে পেস্ননে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের ৫তলার একটি ফ্ল্যাটে দুটি কৰ তাদের অবস্থানের জন্য দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পৰে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া মওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যেন পূর্ববঙ্গে পাকিসত্দান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিসত্দানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদগোর্নির কাছে পাকিসত্দানি সৈন্যরা বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরম্নদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ পাকিসত্দানি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রৰার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই। ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তমস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দু’বার কোহিনুর প্যালেসে এসে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং তার পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রার্থনা করেন।
এর মধ্যে ভাসানী ন্যাপের মহাসচিব মসিউর রহমান যাদু মিয়া পাকিসত্দানি সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র মোতাবেক মওলানা ভাসানীকে অধিকৃত বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কলকাতায় এসে টাওয়ারলজ নামক হোটেলে আসত্দানা নিয়েছে। কিন্তু সার্বিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মওলানা ভাসানী যাদু মিয়ার সঙ্গে দেখা করলেন না। তখন ভগ্ন হৃদয়ে যাদু মিয়া অধিকৃত পূর্ববঙ্গে ফিলে গেলেন এবং হানাদার বাহিনীর তাঁবেদারি করতে লাগলেন। এর জন্য যাদু মিয়াকে মুক্তি সংগ্রাম চলাকালেই ভাসানী ন্যাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বদলীয় চরিত্র দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে আট সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয় যার সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। উপদেষ্টা কমিটির প্রথম সভায় মওলানা ভাসানী সবাইকে এই মর্মে সাবধান করে দেন যে, মুক্তি সংগ্রাম অপ্রতিহত গতিতে চলবে। কোনরূপ আপসকামিতাকে বরদাসত্দ করা হবে না। ওই উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন_ ১) তাজউদ্দীন আহমদ, ২) মণি সিং, ৩) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, ৪) মনোঞ্জন ধর প্রমুখ। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ওই উপদেষ্টা কমিটির সভায় এই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বাধীনতা ব্যতিরেক অন্য কোন প্রকার রাজনৈতিক সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কলকাতা ছাড়াও দেরাদুন, দিলিস্ন ও অন্যান্য স্থানে অবস্থান করেন। মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম নেতা হিসেবে ভারত সরকার মওলানা ভাসানীকে অতুলনীয় আতিথেয়তা ও সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেন। ভারতে থাকাকালীন তার জীবন রৰার্থে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে অনেকে অভিযোগ করলেও বাসত্দবে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে ভারতে থাকাকালীন তিনি নজরবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী দুইবার গুরম্নতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে দিলিস্নর অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি করে ভারত সরকার তাকে সুস্থ করে তোলেন।
দিলিস্নতে থাকাকালীন সময়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারি বাসভবনে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারত সরকার সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে এই আশ্বাস তিনি মওলানা ভাসানীকে প্রদান করেন। এই আশ্বাসের পরিপ্রেৰিতে মওলানা ভাসানী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে আনত্দরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যনত্দ মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের অতিথি হিসেবে দিলিস্নতে অবস্থান করেন এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রথম বিরোধী দল গঠন করা, ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিসত্দানের উদ্দেশ্যে সালায়মালায়কুম উচ্চারণ করা, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সূচনা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্তভাবে সামরিক কারাগার থেকে মুক্ত করা, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার দলের অংশগ্রহণ না করা ও মুক্তি সংগ্রামে দ্বিধাহীনভাবে অংশগ্রহণ করায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তার পশ্চাৎমুখী বিতর্কিত ভূমিকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার সে আসন থেকে তিনি কখনই বিচ্যুত হবেন না।
*******************************************************************************
উপরের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক সংবাদ
*******************************************************************************

আবদুল হামিদ খান ভাসানী
আবদুল হামিদ খান ভাসানী (ডিসেম্বর ১২, ১৮৮০-নভেম্বর ১৭, ১৯৭৬) বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ। যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে অন্যতম। দেশের মানুষের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসাবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাজনৈতিক জীবনের বেশীরভাগ সময় বামপন্থী মাওধারার রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তার অনুসারীদের অনেকে এজন্য তাকে “লাল মাওলানা ” নামেও ডাকতেন।তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং ষাটের দশকের শুরুতেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো।
জীবনী
১৮৮০-১৯২৯
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খান। মক্তব হতে শিক্ষাগ্রহন করে কিছুদিন মক্তবেই শিক্ষকতা করেন। ১৮৯৭ সালে পীর সৈয়দ নাসীরুদ্দীনের সাথে আসাম যান। ১৯০৩ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ইসালামিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৭-এ দেওবন্দ যান। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে আসেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তার ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহন করে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই দল সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৬-এ আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটান। ১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন।এখান থেকে তার নাম রাখা হয় ” ভাসানীর মাওলানা “।  এরপর থেকে তার নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়।
 ১৯৩০-১৯৫৯
১৯৩১-এ সন্তোষের কাগমারীতে, ১৯৩২-এ সিরাজগঞ্জের কাওরাখোলায় ও ১৯৩৩-এ গাইবান্ধায় বিশাল কৃষক সম্মেলন করেন। ১৯৩৭-এ মাওলানা ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলীম লীগে যোগদান করেন। সেই সময়ে আসামে ‘লাইন প্রথা’ চালু হলে এই নিপীড়নমূলক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন।এসময় তিনি ” আসাম চাষী মজুর সমিতি” গঠন করেন এবং ধুবরী, গোয়ালপাড়া সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে শের-এ-বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলীম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক মুসলীম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৫-৪৬ সালে আসাম জুড়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে “বাঙ্গাল খেদাও” আন্দোলন শুরু হলে ব্যাপক দাঙ্গা দেখা দেয়। এসময় বাঙালিদের রক্ষার জন্য ভাসানী বারপেটা, গৌহাটি সহ আসামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ান। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯৪৭ সালে আসামে গ্রফতার হন। ১৯৪৮-এ মুক্তি পান। এরপর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন।১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার কার্যাবলি বাংলায় পরিচালনা করার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান এবং এই দাবি নিয়ে পীড়াপীড়ি করেন। ১৯ মার্চ বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বলেন, যেসব কর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ প্রদেশ থেকে সংগ্রহ করে তার শতকরা ৭৫% প্রদেশকে দিতে হবে। এখানে উলেস্নখ যে, ব্রিটিশ আমলে বঙ্গপ্রদেশ জুটেক্স ও সেলসট্যাক্স রাজস্ব হিসেবে আদায় করত এবং এই করের ভাগ কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হতো না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ সরকারের হাত থেকে এই কর ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরাই আদায় করতে থাকে যার ফলে পূর্ববঙ্গ সরকার আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। যাই হোক, মুসলিম লীগ দলের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় মুসলিম লীগের ৰমতাসীন সদস্যরা মওলানা ভাসানীর ওপর অখুশী হয় এবং তার নির্বাচনে ত্রুটি ছিল এই অজুহাত দেখিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করে এবং মওলানা ভাসানীকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। পরিশেষে মওলানা ভাসানী ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতদসত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর এক নির্বাহী আদেশ বলে মওলানা ভাসানীর নির্বাচন বাতিল করেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলিতে রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৩ জুন ওই কর্মিসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ কর্মিসম্মেলনে যোগদান করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান। মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রধান অতিথি। ২৩ জুন পূর্ববঙ্গের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সর্বসম্মতিক্রমে এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক। ২৪ জুন আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় খাদ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ভূখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ১৯৪৯-এর ১৪ অক্টোবর গ্রেফতার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ করেন। ১৯৫০ সালে সরকার কর্তৃক রাজশাহী কারাগারের খাপরা ওয়ার্ড এর বন্দীদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন এবং ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরী হলে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সহযোগিতার কারণে গ্রেফতার হয়ে ১৬ মাস কারানির্যাতনের শিকার হন। অবশ্য জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল মওলানা ভাসানীকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৫৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি শের-এ-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামক নির্বাচনী মোর্চা গঠন করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে ২৩৭ টির মধ্য ২২৮ টি আসন অর্জনের মাধ্যমে নিরঙকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর ২৫শে মে ১৯৫৪ মাওলানা ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোল্ম যান এবং সেখানে বক্তব্য প্রদান করেন। ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্ণরের শাসন জারি করে এবং মাওলানা ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। ১১ মাস লন্ডন, বার্লিন, দিল্লী ও কলকাতায় অবস্থান করার পর তার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে ১৯৫৫-র ২৫ এপ্রিল দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পূর্ব বাংলায় খাদ্যজনিত দুর্ভিক্ষ রোধের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ১৯৫৬-র ৭ মে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে ২৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন। একই বছর ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে মাওলানা ভাসানী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করে নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করার জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করেন। কাগমারী সম্মেলনে১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। এই সভায় মওলানা ভাসানীও বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি বলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামু ওআলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে।এছাড়া কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখান করলে ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ২৫ জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর পর থেকে সবসময় বাম ধারার রাজনীতিএর সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন।  ১৯৫৭-র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১২ অক্টোবর মাওলানা ভাসানীকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকায় ৪ বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন।
১৯৬০-১৯৬৯
বন্দী অবস্থায় ১৯৬২-র ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বন্যাদুর্গতদের সাহায্য ও পাটের ন্যায্যমূল্যসহ বিভিন্ন দাবিতে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ৩ নভেম্বর মুক্তিলাভ করেন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট-এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হন। ১৯৬৩-র মার্চ মাসে আইয়ুব খানের সাথে সাক্ষাত করেন। একই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের বিপ্লব দিবস-এর উৎসবে যোগদানের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেন এবং চীনে সাত সপ্তাহ অবস্থান করেন। ১৯৬৪-র ২৯ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করে দলের সভাপতির দ্বায়িত্বভার গ্রহন করেন এবং একই বছর ২১ জুলাই ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ (কপ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৫-র ১৭ জুলাই আইয়ুব খানের পররাষ্ট্র নীতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯৬৬-তে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থাপিত ছয় দফা কর্মসূচীর বিরোধিতা করেন। ১৯৬৭-র ২২ জুন কেন্দ্রীয় সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ জারি করলে এর প্রতিবাদ করেন।  ১৯৬৭-র নভেম্বর-এ ন্যাপ দ্বি-খন্ডিত হলে চীনপন্থি ন্যাপের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে মাওলানা ভাসানী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের মুক্তি দাবি করেন। ৮ মার্চ (১৯৬৯) পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সেখানে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে সাক্ষাত করে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে একমত হন। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখান করে শ্রমজীবীদের ঘেরাও কর্মসূচী পালনে উৎসাহ প্রদান করেন। আইয়ুব খান সরকারের পতনের পর নির্বাচনের পূর্বে ভোটের আগে ভাত চাই, ইসলামিক সমাজতন্ত্র কায়েম ইত্যাদি দাবি উত্থাপন করেন।
১৯৭০-১৯৭৬
১৯৭০ সালের ৬-৮ আগস্ট বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনশন পালন করেন।অতঃপর সাধারণ নির্বচনে অংশ গ্রহনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ১২ নভেম্বর (১৯৭০) পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রান ব্যবস্থায় অংশ নেয়ার জন্য ন্যাপ প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলন এর প্রতি সমর্থন প্রদান করেন এবং ১৮ জানুয়ারী ১৯৭১ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য তার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।২৫ মার্চ রাতে মওলানা ভাসানী সন্তোষে তার গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনি পাকিস্তান বাহিনীর দৃষ্টি এড়িযে টাঙ্গাইল ছেড়ে তার পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। পাকিস্তান বাহিনী তার সনত্দোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। মওলানা ভাসানী মোজাফ্ফর ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে ভারত সীমানা অভিমুখে রওনা হন। অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সাহায্যে মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম ১৫/১৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ অতিক্রম করে আসামের ফুলবাড়ী নামক স্থানে উপস্থিত হন। পরে তাদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়। এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে প্লেনে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের ৫তলার একটি ফ্ল্যাট তাদের অবস্থানের জন্য দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পৰে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া মওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যেন পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রৰার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই। ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দু’বার কোহিনুর প্যালেসে এসে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং তার পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রার্থনা করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বদলীয় চরিত্র দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে আট সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয় যার সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। ওই উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন_ ১) তাজউদ্দীন আহমদ, ২) মণি সিং, ৩) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, ৪) মনোঞ্জন ধর প্রমুখ। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ওই উপদেষ্টা কমিটির সভায় এই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বাধীনতা ব্যতিরেক অন্য কোন প্রকার রাজনৈতিক সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কলকাতা ছাড়াও দেরাদুন, দিল্লী ও অন্যান্য স্থানে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে অনেকে অভিযোগ করেন যে ভারতে থাকাকালীন তিনি নজরবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী দুইবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে দিল্লী অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি করা হয়েছিল।  বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তির বিরোধিতা করলেও মুজিব সরকারের জাতীয়করণ নীতি এবং ১৯৭২-এর সংবিধানের এর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। ১৯৭৩ সালে খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় ১৫-২২ মে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ১৯৭৪-এর ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতি গঠন করেন। একই বছর জুন মাসে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলে টাঙ্গাইলের সন্তোষে গৃহবন্দি হন। ১৯৭৬-এর ১৬ মে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লং মার্চে নেতৃত্ব দেন। একই বছর ২ অক্টোবর খোদাই খিদমতগার নামে নতুন আর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
 মৃত্যু
১৯৭৬ খৃস্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশ বরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়। সারা দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে।
সমাজ সংস্কার
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। আসামে ৩০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কারিগরী শিক্ষা কলেজ, শিশু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষে। এছড়াও তিনি কাগমারিতে মাওলানা মোহাম্মস আলী কলেজ এবং পঞ্চবিবিতে নজরুল ইসলাম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
 প্রকাশিত গ্রন্থ
দেশের সমস্যা ও সমাধান (১৯৬২)
মাও সে তুং-এর দেশে (১৯৬৩)

 

জিন্নাহ বিতর্ক October 9, 2009

জিন্নাহ বির্তক-১
নাইর ইকবাল


সংকীর্ণতা থেকেই ভারত বিভাগ?
বিতর্কটির বয়স বাষট্টি বছর। এত বছরেও তা একেবারেই পুরোনো হয়নি। কারণ ১৯৪৭-এর ভারত বিভাগ এই উপমহাদেশে এক বিরাট মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। রাজনৈতিকভাবে যে একটি নির্দিষ্ট স্থানের ভূগোল পাল্টে দেওয়া যায়, তার নমুনা বিশ্ব দেখেছে সেই ’৪৭-এর গ্রীষ্মে। সেই গ্রীষ্ম ভারতবাসীর মনে এনেছে কিছু চিরকালীন প্রশ্ন, যার উত্তর এই বাষট্টি বছর ধরে খুঁজে চলেছে প্রতিটি উপমহাদেশবাসী। কেন সেই ভারত বিভাগ, কেন উপমহাদেশের বড় দুটি জনগোষ্ঠী হিন্দু ও মুসলমান একই সঙ্গে মিলেমিশে বাস করতে পারল না, কোন খলনায়কের কারসাজিতে উপমহাদেশ ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেল, এগুলোর উত্তর ইতিহাসবিদেরা তাঁদের ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এই উপমহাদেশের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হয়তো এসব প্রশ্নের জবাব নতুনভাবে খুঁজে চলবে।
আজ বাষট্টি বছর পর ভারত উপমহাদেশে নতুন করে বিতর্ক শুরু করেছে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ঘটনাবলি নিয়ে। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির বহিষ্কৃত নেতা যশোবন্ত সিং কিছু দিন আগে জিন্নাহ: ইন্ডিয়া-পার্টিশন-ইনডিপেন্ডেন্স নামের এক বইতে এই বিতর্ক নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন। তিনি তাঁর সদ্যপ্রকাশিত এই বইয়ের একপর্যায়ে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যত না পাকিস্তান অর্জন করেছেন, তার চেয়ে নেহরু ও প্যাটেল তাঁকে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি উপহার হিসেবে দিয়েছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ—পাকিস্তানের কায়েদে আজম—জাতির পিতা। ইতিহাস বলে, তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক, অথচ যশোবন্ত সিং কেন ও কোন উপাত্তের ভিত্তিতে বললেন, অবিভক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখা জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভ ভাই প্যাটেল তাঁকে পাকিস্তান উপহার দিয়েছেন? যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে কেবল এই মন্তব্য করেই ক্ষান্ত হননি, এর পক্ষে পুরো ৬৭০ পৃষ্ঠার সুবিশাল বইতে এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন এবং এমন কিছু ঘটনার চুম্বক তুলে ধরেছেন, যেগুলো অবশ্যই ইতিহাসবেত্তাদের ভাবনার খোরাক জোগাবে। নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণের আতস কাচের নিচে এনে দিয়েছে সেদিনকার ভারত বিভাগ নাটকের কুশীলদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং স্বাধীন ভারতে তাঁদের ক্ষমতার লিপ্সাকে। ভারতের জনগণ ও ইতিহাসবিদেরা এত দিন যে আবেগ দিয়ে দেশভাগকে দেখতেন, তা থেকে সরে এসে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে বিচার করার সুযোগ ও সময় এসেছে। এ প্রসঙ্গে ইন্ডিয়া টুডে সাময়িকীতে প্রকাশিত হু পার্টিশনড ইন্ডিয়া? নিবন্ধে ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক এস প্রসন্নরাজনের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘মানবচরিত্রের অন্ধগলিতে ইতিহাসের বিচরণ খুবই সীমিত। অবশ্যই ইতিহাসবিদরা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার নায়কদের চিন্তাজগত নিয়ে ভাবেন না।’ এই কথাটি তিনি বলেছেন কারণ সাতচল্লিশে ভারতভাগের পেছনে যে তত্কালীন নের্তৃবৃন্দের সংকীর্ণতা দায়ী, সেই সংকীর্ণতার খুব অল্প অংশই ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে উঠে এসেছে।
যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে কিছু মৌলিক ঘটনাপ্রবাহের অবতারণা করেছেন। তিনি ভারতভাগের পেছনে ‘রাজনীতিকদের সংকীর্ণতা ও ঔদ্ধত্য’কেই মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। জিন্নাহকে একজন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, জিন্নাহ দেশভাগ নয়, চেয়েছিলেন সম-অধিকার, মর্যাদা আর সম্মান। যশোবন্ত সিং জওহরলাল নেহরু ও বল্লভ ভাই প্যাটেলের ওপর ভারতভাগের দায়ভার চাপাতে চেয়েছেন। তাঁর বইয়ের অনেক জায়গায় ভারতভাগের জন্য নেহরু আর প্যাটেলের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার উচ্চাভিলাষকে দায়ী করেছেন।
একজন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ব্যক্তি হয়েও জিন্নাহ কেন শেষ পর্যন্ত তাঁর কুখ্যাত দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করতে বাধ্য করালেন ‘ব্রিটিশ শাসক’দের, তার ব্যাখ্যায় যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে এ ক্ষেত্রে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের চিন্তাকে নেহরু ও প্যাটেলের বিরুদ্ধে তাঁর (জিন্নাহর) এক অত্যাশ্চর্য পাশার চাল হিসেবেই অভিহিত করেছেন।
১৯৪৭-এর গ্রীষ্মের সেই ভারত বিভাগকে শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এক বিরাট রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করার একটা প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় যশোবন্ত সিংয়ের বইয়ে। আর জিন্নাহর বিজয় মানেই নেহরু-প্যাটেল-গান্ধী সর্বোপরি সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক পরাজয়, তা বলতে মোটেও ভোলেননি তিনি।
জিন্নাহর পাকিস্তান প্রস্তাব তড়িঘড়ি করে কোন হিসেবে নেহরু-প্যাটেল মেনে নিলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ দুজনই তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের একটা বড় অংশ অবিভক্ত ভারতের প্রশ্নে উত্সর্গ করেছিলেন। নেহরু-প্যাটেলের ভারতভাগের সম্মতি মহাত্মা গান্ধীকেও ব্যথিত এবং হতাশ করেছিল, যার ফলে গান্ধী সক্রিয় রাজনীতির সংশ্রাব ত্যাগ করেছিলেন। নেহরু-প্যাটেলের পাকিস্তান তথা ভারত বিভাগে সম্মতি এই প্রশ্ন তুলেছে যে, অধিকারের প্রশ্নে সচেতন মুসলমানদের ভারতে সম-অধিকার না দেওয়ার অন্তবর্তী কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল কি না। ইতিহাসবিদদের তা বিশ্লেষণের সুযোগ করে দিয়েছেন যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ের মাধ্যমে।
তাহলে ভারত বিভাগ কি কেবল ক্ষমতার প্রশ্নে বনিবনা না হওয়ার কারণে, নাকি নিছক সাম্প্রদায়িকতার নিগড়ে বাঁধা এক ঘটনা, তা বিশ্লেষণের ব্যাপার হলেও ১৯৩৭ সালের পর থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ক্রমান্বয়ে ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান মুখপাত্র থেকে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা নেহরু ও প্যাটেলের জন্য স্বস্তিদায়ক কিছু ছিল না—এ কথা বলাই যায়।
জিন্নাহ প্রথমে চাইলেন স্বাধীন ভারতবর্ষে মুসলমানদের সম-অধিকার, মর্যাদার প্রশ্নে অদ্বিতীয়তা। তিনি এ কথা বারবার বলতেন, ভারতীয় মুসলমানেরা সম-অধিকার পেলে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি ছেড়ে দেবে। কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের পর্যাপ্ত অংশীদারত্বই ছিল তাঁর মূল দাবি। কিন্তু জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জওহরলাল নেহরু তা চাননি। তিনি বলে এসেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের কথা, যা প্রকারন্তরে ছিল হিন্দুপ্রধান শাসনকাঠামোরই অপর নাম। জিন্নাহ ও মুসলমান সমাজ নেহরুর এই অবস্থানে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ বোধ করেনি। তখনই তিনি মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের দাবি তুলে ধরেন। এখানে নেহরু যদি ছাড় দিতেন তাহলে হয়তো ভারত বিভাগ ঠেকানো যেত। যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে এই প্রশ্নে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। নেহরুর রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ এবং মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি পাকিস্তান প্রস্তাব মেনে নিয়ে যে প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাতে একে ‘মন্দের ভালো’ ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই ‘মন্দের ভালো’ প্রস্তাব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে নেহরু-প্যাটেল নিজেদের ছাড় দেওয়ার মানসিক দৈন্যকে প্রকট করে তুলে ধরেছেন। যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে একপর্যায়ে বলেছেন, রাজনীতিবিদদের অনৈক্য ও অসংকীর্ণ আচরণ তথা ছাড় দেওয়ার মানসিকতার অভাব, স্বাধীনতার প্রশ্নে তত্কালীন ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিয়ে আসে, তাঁদেরই বিপুল উত্সাহে শেষ পর্যন্ত ভারতের অঙ্গহানির অস্ত্রোপচার হয় এবং জন্ম নেয় ‘পাকিস্তান’ নামক এক ‘ইনকিউবেটর’ রাষ্ট্র।

জিন্নাহ বিতর্ক-২

ধর্মনিরপেক্ষ, না সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক
 পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর ‘ইনকিউবেটর রাষ্ট্র’ পাকিস্তান অর্জনের মধ্য দিয়ে জওহরলাল নেহরু ও কংগ্রেসের একক মানসিকতা এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ভাবনার রাজনৈতিক জবাব দেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুসলমানদের আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের তত্ত্ব এক চিরন্তন বিতর্ক। ভারতীয় উপমহাদেশকে ভাগ করে দেওয়া তাঁর এই দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে আজ বহু বছর ধরে জিন্নাহ ভারতীয়দের কাছে একজন খলনায়ক হিসেবেই পরিচিত। জীবিত অবস্থায় তিনি ভারতীয়দের এই মনোভাব বুঝতে পারতেন। তিনি জানতেন দ্বিজাতিতত্ত্ব তাঁকে ভারতীয়দের চিরন্তন শত্রুতে পরিণত করবে। তবে এ ব্যাপারে ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে এলাহাবাদে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি সমালোচিত হতে পারি, আমি আমার বিরুদ্ধবাদীদের কাছ থেকে রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হতে পারি; তবে আমি নিশ্চিত, একটা সময় আসবে, হয়তো বা সেই সময়টি আমি দেখে যেতে পারব না, যখন আমার বিরুদ্ধবাদীরাই আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, আমি নিশ্চিত, সে দিনটি বেশি দূরে নয়।’

১৯৯৯ সালে পাকিস্তান সফরের সময় করাচিতে ভারতের তত্কালীন উপপ্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি, যিনি ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পুরোধা, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রথমবারের মতো একজন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আজ তার প্রায় এক দশক পর আদভানির দলেরই আরেকজন এক ধাপ এগিয়ে ভারত বিভাগকে প্রকারান্তরে জিন্নাহর রাজনৈতিক অধিকার হিসেবেই স্বীকার করে নিয়েছেন।
পাকিস্তানের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আয়শা জালাল আজ থেকে বহু বছর আগে লেখা তাঁর বই সোল স্পোকস্ম্যান-এ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে বলেছিলেন, উপমহাদেশ সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা আর ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ঘটনাবলির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে একজন আধুনিকমনস্ক ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি এককালে কংগ্রেসের একজন বড়মাপের নেতাও ছিলেন। কংগ্রেস থেকে বের হয়েও জিন্নাহ অনেক দিন হিন্দু-মুসলমানের সমঅধিকারের প্রশ্নে রাজনীতি করেছেন, ভারত স্বাধীন হওয়ার সময়ও তাঁর লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের সমঅধিকার। কিন্তু তাঁর এই দাবি অপাঙেক্তয় হয়ে পড়ায় তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের ফর্মুলা সামনে নিয়ে আসেন। জিন্নাহর প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে মুসলমানদের সমঅধিকার প্রশ্নে একমত করতে না পারার কারণেই দ্বিজাতিতত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসেন। নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক বিজয়কে সুনিশ্চিত করেন। এই দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে ভারতজুড়ে তিনি সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হয়ে আছেন। অথচ হিন্দু-বিরোধিতা নয়, তাঁর লক্ষ্য ছিল তাঁদের সঙ্গে সমঅধিকারের ভিত্তিতে একসঙ্গে বাস করা। স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোতে কেন্দ্রের শাসনকে সীমিত করে রাজ্যগুলোকে একেকটি স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটে পরিণত করে সবার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু কংগ্রেস তথা নেহরুর সংখ্যাগরিষ্ঠ তত্ত্বে জিন্নাহ বুঝতে পেরেছিলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসমতা। তাই এ নিয়ে নেহরুর সঙ্গে তাঁর বনেনি। ইন্ডিয়া টুডে প্রকাশিত ‘মাস্টার্স অব মিউটিলেশন’ শিরোনামের এক নিবন্ধে জিন্নাহ-গবেষক আয়শা জালাল বলেছেন, ‘নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেলই ভারতকে ভাগ করতে বেশি উত্সাহী ছিলেন। ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতকে বিভক্তি থেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছিলেন একেবারে শেষ পর্যন্ত। জিন্নাহর সমঅধিকার এবং একেকটি রাজ্যকে ইউনিটে পরিণত করার প্রস্তাবে নেহরু-প্যাটেল একমত হলেই খুব সহজে ভারত বিভাগ এড়ানো যেত। আয়শা জালাল একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে ক্ষমতার মোহ নেহরু ও প্যাটেলকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল, ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার স্বার্থে ভারতের বিভক্তিকেও তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন।
একজন কড়া ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি কেন, কিসের ভিত্তিতে তাঁর চিন্তা-চেতনা ধর্মাশ্রয়ী করলেন, তার সুন্দর বিবরণ যশোবন্ত সিং তাঁর বইয়ে দিয়েছেন নির্মোহ আবহে। তবে এত কিছুর পরও তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্ব ক্ষমতার প্রশ্নে আপস না হওয়ার কারণেই সামনে এসেছে। ইতিহাসের আবেগী ব্যাখ্যায় তিনি হয়তো ভারতের বিভাজনের প্রতীক হয়ে আছেন, কিন্তু চল্লিশের দশকের সেই নাটকীয় দিনগুলোতে জিন্নাহ যে ভারত বিভাগের বিপক্ষে ছিলেন, তা ইতিহাসের প্রমাণিত সত্য। এর পক্ষে আরও অকাট্য প্রমাণ ইতিহাসবিদেরা ভবিষ্যতে অবশ্যই বের করবেন বলে আশা করা যায়।
নেওয়া হয়েছে “প্রথম আলোয়”য় প্রকাশিত ধারাবাহিক থেকে।

 জিন্নাহ বিতর্ক-৩

একাধারে নায়ক এবং খলনায়ক
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারত বিভাগ প্রাথমিকভাবে চাননি—এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি জিন্নাহ, নেহরু তথা কংগ্রেস আর সর্দার বল্লভ প্যাটেলের নানামুখী স্বার্থচিন্তার সুযোগটাও খুব ভালোমতো নিয়েছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে মুসলমানদের আলাদা আবাসভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা জিন্নাহ সামনে এনেছিলেন যখন অন্য কংগ্রেসনেতারা মুসলমানদের সম-অধিকারের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতের কাঠামোর মধ্যে জিন্নাহর দাবিমতো স্বায়ত্তশাসন দিতে গড়িমসি করছিলেন। রাজনীতিবিদদের অনৈক্য ও স্বার্থান্বেষণ ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে অচলাবস্থা ও জটিলতার সৃষ্টি করে। ঠিক এ সময়ই ভারতের স্বাধীনতা প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভারতে আসেন ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন। মাউন্ট ব্যাটেন যেকোনো মূল্যে ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ছিলেন বদ্ধপরিকর। ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতিগোষ্ঠীগত সাম্য ও সম্প্রীতি তাঁর কাছে মুখ্য বিষয় ছিল না। তিনি একজন সাধারণ চাকুরে হিসেবেই ব্রিটিশরাজের নির্দেশমতো ব্রিটেনের রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করতেই মনোযোগী ছিলেন বেশি।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ নানা সময়ে ভারত ভাগের পেছনে তত্কালীন রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা ও বিভিন্ন রকম স্বার্থের দ্বন্দ্বকে দায়ী করেছেন।ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সাময়িকী ইন্ডিয়া টুডেতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও জিন্নাহ গবেষক আয়শা জালাল বলেছেন,‘যখন ভারতকে অখন্ড রাখার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলো এবং হিন্দুমহাসভার ভারতের দুটি প্রধান মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বাংলা ও পাঞ্জাবকে দুইভাগে ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাবকে নেহরু ও প্যাটেল সমর্থন দিয়েছেন তখনও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতেকে অখন্ড রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। যদি কংগ্রেস তথা নেহরু ও সর্দার বল্লভ প্যাটেল জিন্নাহ’র সাথে কিছু বিষয়ে একমত হতেন তাহলে হয়তো ভারতভাগ ঠেকানো যেতো।’ আয়শা জালালের এই বক্তব্য জিন্নাহ’র অখন্ড ভারতের প্রাথমিক চিন্তা সমর্থন করে। ভারতে শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনও ঠিক সেই সুযোগটিই দারুণভাবে গ্রহণ করেন। ভারতের বৃহত্তর স্বার্থে কোনো রাজনীতিবিদই নিজেদের বা একান্ত দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করেননি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতো একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সত্যিকারের জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মতো আচরণ করতে পারেনি। বরং শেষের দিকে তারা কেবল হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক অভিলাষ। রাজনীতিবিদেরা ভারতের স্বাধীনতাকেই সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরতে পারেননি। সেটা করতে পারলে মন্ত্রিসভায় কজন মুসলমানের অন্তর্ভুক্তি হলো কিংবা মুসলমানদের ‘মুখপাত্র’ হিসেবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ক্ষমতার কতটুকু স্বাদ পেলেন—এসব ব্যাপার কংগ্রেসিদের কাছে খুব একটা মুখ্য বিষয় হতো না। এসব কোনোটাই না হওয়াতে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, কংগ্রেস স্বয়ং অখণ্ড ভারতের প্রশ্নে কতটা আন্তরিক ছিল। নেহরু, প্যাটেল সবার মধ্যেই জিন্নাহকে অবজ্ঞা করার একটা প্রবণতা ছিল। জওহরলাল নেহরু জিন্নাহকে রাজনৈতিকভাবে ঈর্ষা করতেন। জিন্নাহ যখন মুসলিম লীগের একচ্ছত্র নেতা, কংগ্রেসে তখন নেহরু, মওলানা আজাদের যৌথ নেতৃত্ব। নেহরু দারুণ প্রজ্ঞাবান একজন রাজনীতিবিদ হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পুরোপুরি স্বাধীনতা তাঁর ছিল না। অপরদিকে জিন্নাহর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নেতা মুসলিম লীগে ছিল না। এ ব্যাপারটি নিয়ে নেহরুর মনের গহিনে একটা সূক্ষ্ম ঈর্ষা কাজ করত। একবার মাউন্ট ব্যাটেনকে কথা প্রসঙ্গে জিন্নাহ সম্পর্কে নেহরু বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার বাতিকে পাওয়া মাঝারি গোছের একজন উকিল বই আর কিছু নন মি. জিন্নাহ।’ ভারতীয় রাজনীতিকদের এ রকম ব্যক্তিদ্বন্দ্ব দারুণ উপভোগ করতেন মাউন্ট ব্যাটেন। এ সময় মহাত্মা গান্ধী এই দ্বন্দ্ব নিরসনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। ভারতের দুর্ভাগ্য, গান্ধী কখনোই আপদমস্তক রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি অনেকটা সাধুসন্ত ধরনের মানুষ ছিলেন। চল্লিশের দশকে রাজনীতির জটিল-কুটিল অন্ধ গলিতে তিনি বিচরণ করতে পারেননি। তার ওপর কংগ্রেসের নেতৃত্বও পুরোপুরি তাঁর হাতে ছিল না।
মোট কথা, সাতচল্লিশের ভারত ভাগ ছিল চমত্কার একটি রাজনৈতিক নাটক। এই নাটকের প্রধান কয়েকটি চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন ঐতিহাসিকেরা নানাভাবে। তাঁরা এই নাটকের প্রধান চরিত্র হিসেবে জিন্নাহ, নেহরু, প্যাটেল আর মাউন্ট ব্যাটেনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সে সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বলা যেতে পারে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্র। তিনি একাধারে সেই নাটকের প্রধান চরিত্র আবার একই সঙ্গে খলনায়ক। তিনি একই সঙ্গে ভারতকে ভাগ করতে চেয়েছিলেন আবার চাননি। তিনি কখনো ধর্মনিরপেক্ষ কখনো বা সাম্প্রদায়িক, যে জিন্নাহ একসময় ছিলেন ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের দূত’, আবার আরেক সময় নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমি পাকিস্তান দাবি করে মাউন্ট ব্যাটেনকে দিয়ে তা আদায় করেও ছাড়েন। তবে সে সময়ের কংগ্রেসনেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদও বলেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কখনোই ভারতের বিভাজন চাননি। ভারতে মুসলমানদের সম-অধিকার চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। এর পরও কেন ভারত ভাগ হলো তার কোনো সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই। এই ব্যাখ্যা বের করার দায়ভার ইতিহাসবিদদের। নেহরু চিন্তাচেতনায় কেতাদুরস্ত ব্যক্তি হলেও মনের দিক দিয়ে কখনোই উদার মনমানসিকতার কেউ ছিলেন না। তিনি যদি কেবল জিন্নাহর সঙ্গে নিয়মিত ওঠা-বসা এড়ানোর জন্য ভারত ভাগে রাজি হয়ে থাকেন, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। সব মিলিয়ে তখনকার রাজনীতিবিদদের অভাবনীয় স্বার্থচিন্তা ব্রিটিশদের ভারতের স্বাধীনতা দেওয়ার সময় অবৈজ্ঞানিক সমাধানে প্ররোচিত করে। উপমহাদেশে চিরকালের জন্য এক সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। মাত্র কয়েকজনের স্বার্থদ্বন্দ্বের কাছে হেরে যায় গোটা একটি অঞ্চলের ভূগোল। মানুষকে মেনে নিতে হয় নিদারুণ দুর্ভোগ। আজ এত বছর পর সাতচল্লিশের বিভাজন নিয়ে এই উপমহাদেশে নতুন করে কথাবার্তা, চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। অনাগত ভবিষ্যত্ অবশ্যই আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করবে সাতচল্লিশের দেশভাগের খলনায়কদের। সবকিছুর বিচারেই সাতচল্লিশের আগস্ট মাসের সেই সব ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ অধ্যায়।

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতায় যায় মহাজোট: আবদুল জলিল October 5, 2009

আওয়ামী লীগ সাংসদ আবদুল জলিল বলেছেন, মহাজোট সরকারের বিপুল বিজয় ও ক্ষমতায় যাওয়ার পিছনে ছিল বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা। লন্ডনে স্থানীয় বাংলা টিভির সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তিনি আরও বলেন, বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) সদস্যদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। এই সাক্ষাত্কারে তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করেন।

জানা গেছে, বাংলা টিভির স্টুডিওতে ধারণ করা ৪২ মিনিটের ওই সাক্ষাত্কারটি ‘জনতার মঞ্চ’ নামের অনুষ্ঠানে প্রচারের কথা ছিল। তবে বাংলা টিভি কর্তৃপক্ষ সাক্ষাত্কারটি প্রচার বন্ধ রেখেছেন। এ ব্যাপারে কোনো মহল থেকে বাধা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলা টিভির নিউজ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক শাসছুল আলম জানান, অনুষ্ঠান প্রচারম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। ঠিক কবে নাগাদ এই অনুষ্ঠান প্রচার হবে বা আদৌ প্রচার হবে কি না এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এদিকে ব্রিটেনে মার্কেন্টাইল মানি একচেঞ্জ উদ্বোধন করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। গতকাল বৃহস্পতিবার বার্মিংহামের কভেন্ট্রিতে পর্যটন ট্রাভেল গ্রুপ লিমিটেডের মানি একচেঞ্জ শাখা উদ্বোধন করতে আসলে ৭-৮ জন অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবক ট্রাভেল এজেন্টে ঢুকে আবদুল জলিলের ওপড় চড়াও হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। এ সময় তাঁরা আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে আবদুল জলিলের মন্তব্যের ব্যাখা দাবি করেন।
বার্মিংহামের কভেন্ট্রিতে অবস্থিত পর্যটন ট্রাভেল গ্রুপের পরিচালক সুলতান আহমেদ ওরফে জালাল উদ্দীন প্রথম আলোকে জানান, দুর্বৃত্তদের সবাই ছিল বাঙালি। তবে তিনি কাউকেই সনাক্ত করতে পারেননি।
জানা গেছে, ব্রিটেনের সময় আনুমানিক বিকেল তিনটার দিকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই যুবকেরা আবদুল জলিলকে লাঞ্ছিত করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আব্দুল জলিলকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, গত মঙ্গলবার লন্ডনের স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলা টিভিতে প্রচারিত সাক্ষাত্কারে আবদুল জলিলের বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থতেরা এই ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে আবদুল জলিলের এমন লাঞ্ছিত হবার পেছনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর চেয়ারম্যান সুলতান শরীফ। তিনি বলেন, আবদুল জলিল একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিতে তিনি ত্যাগী নেতা হিসাবেই পরিচিত, সেই সঙ্গে তিনি আমাদের উপদেষ্টা, তাঁর ওপর এ ধরণের আক্রমন অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি মনে করেন, আবদুল জলিলের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা এ ধরণের কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।

 

মুক্তিযুদ্ধের অন্য রকম দলিল October 5, 2009

লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন । প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক প্রথম আলো“ 
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কর্নেল তাহের তাঁর মাকে চিঠি লিখলেন। ১৯৭১ সালের কথা। চিঠিতে মাস-তারিখের উল্লেখ নেই। তবে পঁচিশে মার্চের পর নিশ্চয়। আমার ধারণা, এপ্রিল কিংবা মে মাসের প্রথম দিক। কারণ চিঠিতে ‘ধান পাকতে শুরু হয়েছে’ এমন একটা লাইন আছে। তখনকার দিনে বাংলাদেশে সাধারণত দুই প্রকারের ধান জন্মাত। আমন, আউশ। আউশ ধানটা বর্ষাকালে পাকত, বর্ষাকালেই কেটে বাড়িতে তুলতে হতো। আমন ধান কাটা হতো কার্তিকের শেষ কিংবা অগ্রহায়ণের প্রথম দিকে। তখনো বাংলাদেশে ইরি ধান আসেনি। ‘বেরো’ ধানের চাষ হতো কোনো কোনো অঞ্চলে। সেই ধান পাকতে শুরু করত চৈত্রের শেষ দিকে। কেটে গোলায় তুলতে তুলতে বৈশাখ মাস এসে যেত। আমার ধারণা, বোরো ধান পাকার কথা লিখেছিলেন কর্নেল তাহের। তাঁদের অঞ্চলে ওই ধান খুব জন্মাত।
কর্নেল তাহের জুলাই মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
তাঁর লেখা চিঠিটি ছিল এ রকম!
আম্মা,
অনেক দিন পর আপনার ও লুত্ফার চিঠি পেলাম। গত পহেলা তারিখে ঈশ্বরগঞ্জ থেকে আব্বার প্রথম চিঠি পাই ও সবার কথা জানতে পারি। এই অবস্থায় আপনারা সবাই ভালো আছেন জেনে অনেক নিশ্চিন্ত হয়েছি। গ্রামে যা আছে তা নিয়েই আপনাদের বাঁচতে হবে। আশা করি সে মতোই আপনারা ভেবে চলবেন। কবে পর্যন্ত যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলা যায় না। আজকাল অবশ্য আপনাদের বিশেষ কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নেই। মাছ পাওয়া যায়। ধান পাকতে শুরু হয়েছে। আজকাল গ্রামে অনেকে এসেছে। ছোটদের পড়াশোনা কবে শুরু হবে লিখেছেন। গ্রামে এখন এত শিক্ষিত লোক। আপনার এক বৌ ইউনিভার্সিটি পড়া, স্কুল-কলেজ বাড়িতে শুরু করে দেন। খাওয়া-দাওয়া ও পানির প্রতি খেয়াল রাখবেন। আজকাল তো আবার ডাক্তার-ওষুধ পাওয়া মুস্কিল হবে।
সৌদি আরব থেকে ভাইজানের চিঠি পেয়েছি, লন্ডন থেকে রফির চিঠি পাই, শেলী ইসলাম ও দিবা ভালো। ইসলামাবাদে ভাইজানের কাছে প্রতি সপ্তাহে যাই। ভাইজান ভালো আছেন। শেরপুর থেকে ভাবীর চিঠি পেয়েছেন। ভালো আছেন।
আব্বা কেমন আছেন? আমাদের জন্য আপনারা ভাববেন না। ভেবে কী লাভ হবে। যখনই সম্ভব হবে আমি আপনাদের কাছে পৌঁছব। খোকা, মনু, বাহার, বেলাল, ডলি-জলিকে লিখতে বলবেন। আপনারা সাহস হারাবেন না।
আব্বা ও আপনি আমার সালাম নেবেন। নীলু কেমন আছে? ওকে লিখতে বলবেন।
ইতি,
আপনার স্নেহের
তাহের

এই চিঠির সূত্র ধরে আমার মন চলে যায় ঈশ্বরগঞ্জে। আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল ওই এলাকায়। ঈশ্বরগঞ্জ বাজারের কাছাকাছি। ’৭১ সালে সে দ্বিতীয়বার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বাজারের সঙ্গেই তাদের স্কুল। সেই স্কুলে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্প করেছে। আমার বন্ধুটি অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধ করেনি কিন্তু সে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার। তাকে নিয়ে আমি একটি উপন্যাস লিখেছি। উপন্যাসের নাম জীবনপুর। সেই বন্ধুর মুখে কর্নেল তাহেরের শ্বশুরের কথা আমি শুনেছি, তাঁর স্ত্রী লুত্ফা তাহের, শ্যালিকা নীলুফারের কথা শুনেছি। কর্নেল তাহেরের শ্বশুর ছিলেন খুবই নামকরা চিকিত্সক। সেই হূদয়বান বিশাল মাপের মানুষটিকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কারণ, তাদের ধারণা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে কর্নেল তাহের তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকায় পালিয়ে আছেন। পুরো এলাকার মানুষজন, যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে একটা পুকুরপারে একত্র করেছিল পাকিস্তানি শূকরগুলো। আমার বন্ধুটিকেও ধরেছিল। তার সেই সময়কার অনুভূতির কথা একটু বলি…
‘আমরা যে পুকুরপারে বসে আছি, তার পাশেই রেললাইন। হঠাত্ রেলগাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ পাওয়া গেল। তাকিয়ে দেখি, স্টেশনের দিক থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটা মালগাড়ি। আমরা সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম। সবাই বুঝে গেছে আমাদের এখন এই মালগাড়িতে তোলা হবে। বগি ভরে নিয়ে যাওয়া হবে ময়মনসিংহের দিকে। শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের কাছে নিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে আবার লাইন করে দাঁড় করাবে। সামনে ব্রহ্মপুত্র নদ, পিছনে পাকিস্তান আর্মি। ট্যা ট্যা করে গুলি ছুড়বে আর আমরা একেকজন লুটিয়ে পড়ব ব্রহ্মপুত্রের জলে। পরদিন আমাদের লাশ ভাসতে থাকবে নদীর এদিক ওদিক। পানি সাঁতরে কুকুরেরা যাবে না সেই লাশ খেতে। ক্ষুধার্ত কাকগুলো উড়ে উড়ে গিয়ে বসবে আমাদের লাশের ওপর। আকাশ থেকে নেমে আসবে শকুন। ঠুকরে ঠুকরে খাবে আমাদের চোখ নাক ঠোঁট।’
কর্নেল তাহেরের মায়ের নাম আশরাফুন্নেসা। সেই মায়ের কথা আমার বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম এভাবে—পরের দিন কর্নেল তাহেরের মা এলেন আমাদের এলাকায়। তিনি খবর পেয়েছিলেন তাঁর বিয়াই আর বিয়াইয়ের মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারিরা। তাঁদের বাড়ি হচ্ছে শম্ভুগঞ্জের ওদিককার এক গ্রামে। সাত ছেলের জননী তিনি। অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী, দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে এমন একজন মানুষ। তিনি এসেছেন শুনে গ্রামের মানুষজন একত্র হয়েছে। সেই মানুষজনের সামনে দাঁড়িয়ে অসাধারণ কিছু কথা বললেন তিনি। আমার সাত ছেলে, সাতজনকেই যুদ্ধে পাঠিয়েছি। এ দেশের প্রতিটি যুবক আমার ছেলে। এ দেশের প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা আমার ছেলে। যদি আমার সাত ছেলের সাতজনই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়, যদি সাতজনই প্রাণ দেয় দেশের স্বাধীনতার জন্য, আমার একটুও দুঃখ হবে না। আপনাদের এলাকার যাঁর যেটুকু সামর্থ্য আছে, তা-ই নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করুন। একজনও বসে থাকবেন না। আপনারা কী করছেন? বসে আছেন কেন? যুদ্ধে যাচ্ছেন না কেন?
মানুষজন সব উদ্দীপ্ত হয়ে গেল।
তিনি বললেন, মানুষের যেমন মা-বাবার প্রতি দায় থাকে, মা-বাবার কাছে যেমন ঋণী থাকে সন্তান, দেশের কাছেও ঠিক সেই রকম ঋণ থাকে মানুষের। মনে রাখতে হবে, এই দেশের কাছে, এই মাটির কাছে আপনারা সবাই ঋণী। এই এক সুযোগ, আপনারা যুদ্ধে চলে যান। দেশ স্বাধীন করে দেশ এবং মাটির ঋণ শোধ করুন।
একজন সত্যিকার মায়ের চেহারা কেমন হয়, কর্নেল তাহেরের মাকে দেখে আমি সেদিন বুঝেছিলাম।
এসব কথা মনে পড়ছে একাত্তরের চিঠি পড়ে।
একাত্তরের চিঠি বইটির বেশির ভাগ চিঠিই মাকে লেখা। চিঠিগুলো পড়ে মনে হয়, ‘মা’ ও ‘স্বদেশ’ যেন একই শব্দ, সমার্থক। ১৯ নভেম্বর, ১৯৭১ ‘যুদ্ধখানা হইতে তোমার পোলা’ নুরুল হক ‘মা’কে লেখেন, “আমার মা, আশা করি ভালোই আছ। কিন্তু আমি ভালো নাই। তোমায় ছাড়া কীভাবে থাকি! তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। ৬ জন মারা গেছে, তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, ‘খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে’ তাই আমি পিছপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব…” (সবিনয় নিবেদন, রশীদ হায়দার, সম্পাদনা পরিষদের পক্ষে)
একাত্তরের চিঠির সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন, সালাহউদ্দীন আহমদ। সদস্যা চারজন। আমিন আহম্মেদ চৌধুরী, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ। প্রকাশক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন। ১০০ গ্রাম আর্ট পেপারে ছাপা ১২৭ পৃষ্ঠার রয়েল সাইজের বইটির মূল্য ২৫০ টাকা। জহির রায়হানের লেখা চিঠির ওপর কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ ধরিয়ে শ্রদ্ধেয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বইটির প্রচ্ছদ তাত্পর্যময় করে তুলেছেন। সবকিছু মিলিয়ে বইটি দেখলেই বুকের কাছে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে। যেন ওভাবে জড়িয়ে ধরে রাখলেই এই বইয়ের প্রতিটি শব্দ থেকে ভেসে আসবে ১৯৭১-এর সেই গৌরবময় দিনগুলো, সেই বেদনাময় দিনগুলো। আমরা উদ্দীপ্ত হব, আমরা চোখের জলে ভাসব।
একাত্তরের চিঠি পড়তে পড়তে দু-তিনটি অতি ছোট ছোট বিষয় আমার মনে হয়েছে।
১. বইটিতে কতটি চিঠি আছে এক কথায় বলা যাবে না। গুনে দেখতে হবে। এ কারণে চিঠিগুলোর নম্বর থাকলে ভালো হতো। যেমন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমীর চিঠিটা কত নম্বর পাতায় কিংবা চিঠির নম্বর কত? শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেনের চিঠিটা আছে কোথায়? চাইলেই পাঠক চট করে বের করতে পারবেন না। পুরো বই ঘাঁটতে হবে।
২. বেশির ভাগ চিঠির শেষে একটা চিকন দাগ দিয়ে তার নিচে লেখা হয়েছে, চিঠির লেখক, চিঠির প্রাপক এবং ‘চিঠিটি পাঠিয়েছেন’। পদ্ধতিটা আমার একঘেয়ে লেগেছে। এটা সহজ করে লেখা যেত, লেখক, প্রাপক, প্রেরক।
কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদের মতো রশীদ হায়দারের ভূমিকাও বইটিকে তাত্পর্যময় করেছে। ছাপা বাঁধাই নিখুঁত। ভুল বানান আমার চোখেই পড়েনি। আর বইয়ের প্রাণ, চিঠিগুলো পড়ে পাঠক নতুন করে উপলব্ধি করবেন সেই উত্তাল সময়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। কারা জীবন বাজি রেখে, বুকের রক্ত দিয়ে এনে দিয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা! কেমন ছিলেন সেই বীরেরা, কোন অনুভূতি কোন মন্ত্রবলে তাঁরা পেরেছিলেন দেশের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে! এই বই মুক্তিযুদ্ধের এক অন্য রকম দলিল। এই বই আমাদের চোখের জলে ভাসায়, এই বই আমাদের দেশপ্রেমের মহান উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়। এই বই আমাদের মাথা নত করতে শেখায়, এই বই আমাদের বলে দেয়, দেশের মাটিতে প্রতিটি পা ফেলার সময়, প্রতিটি পা তোলার সময় আমরা যেন মনে করি সেই বীর সন্তানদের কথা, যাঁদের রক্তে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। যাঁদের রক্তের বিনিময়ে এই মাটিতে আমরা সগৌরবে বসবাস করছি, জীবনযাপন করছি তাঁদের যেন দিনে একবার আমরা অন্তত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
প্রথম আলো ও গ্রামীণফোনকে কৃতজ্ঞতা একাত্তরের চিঠি প্রকাশের জন্য।

একাত্তরের চিঠি—প্রথমা প্রকাশন, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার ঢাকা-১২১৫; মার্চ ২০০৯।

 

মাওবাদী আন্দোলন October 5, 2009

ভারতের বিশিষ্ট কবি ও কলেজের অধ্যাপক ভারাভারা রাও ভাবাদর্শগতভাবে একজন নকশালপন্থী। অন্ধ্র প্রদেশে নকশাল বা মাওবাদী আন্দোলন তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সশস্ত্র বিদ্রোহ একদিন ভারতে স্বাধীনতা আনবে, যেমনটি এনেছেন মাও সে-তুং কমিউনিস্ট চীনে। ২০০৪ সালে সরকারের সঙ্গে মাওবাদীদের আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারাভারা রাও। সম্প্রতি সাংবাদিক দ্বৈপায়ন হালদারের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন সিপিআই (মাওবাদী) নেতা কোবাদ ঘেন্দির গ্রেপ্তার ও মাওবাদী আন্দোলনের ভবিষ্যত্ প্রসঙ্গে।

কোবাদ ঘেন্দির গ্রেপ্তার ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বিরাট পুরস্কার। এটা কি মাওবাদী আন্দোলনের জন্য একটি বড় আঘাত?
কোবাদ সিপিআইয়ের (মাওবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁর গ্রেপ্তার নিশ্চয়ই আন্দোলনের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তবে একজন নেতা গ্রেপ্তার হলে মাওবাদী আন্দোলনে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। তাঁর গ্রেপ্তার হওয়াটা দলের জন্য একটি আদর্শিক ক্ষতি।
আপনি কি বলতে চাইছেন তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় কৌশলগত ক্ষতির চেয়ে আদর্শিক ক্ষতি বেশি হয়েছে?
পুলিশকে দেখে মনে হচ্ছে তারা কোবাদ ঘেন্দির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে যাচ্ছে। যদি সত্যিই তারা তাঁর কাছ থেকে তথ্য পায়, তাহলে তা দলের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর হবে, সেটা বলা মুশকিল। যেকোনো দলেই কৌশলগত ও আদর্শগত ব্যাপারটা ভিন্ন। আমি এটা বলতে চাই, একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ মাওবাদী আন্দোলন থামিয়ে দিতে পারবে না।
অতীতে বহু নকশাল নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু কোবাদ ঘেন্দি গ্রেপ্তার হলে হইচইটা যেন একটু বেশি হয়েছে। সেটা কি তিনি দুন ও অক্সফোর্ডে শিক্ষিত বলে?
অবশ্যই এটা একটা কারণ। কোবাদের গ্রেপ্তারের ঘটনাটা সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রধান শিরোনাম হয়েছে। তিনি কোনো বড় করপোরেট অফিসের প্রধান হতে পারতেন। তা না হয়ে তিনি নকশাল নেতা হলেন। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের ব্যাপক আগ্রহ তাঁকে নিয়ে।
শহরাঞ্চলে নকশালবাদ কি তার আকর্ষণ হারাচ্ছে? কোবাদ ঘেন্দির মতো আর কেউ কি আসছে মাওবাদীদের সংগঠনে?
একজন কোবাদ গেছে, আরও বহু কোবাদ তৈরি হবে। দুঃখের কথা হলো, অর্থনীতির বাজারটি দখল করে রেখেছে বুর্জোয়া শ্রেণীর যুবকেরা। অন্যদিকে প্রান্তিক শ্রেণীর যুবকেরা যেমন, মুসলিম ও দলিতরা বাজার শক্তিতে পরিণত হয়নি, কারণ তারা দেখেছে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। এ জন্য তারা এই আন্দোলনের ওপর বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এখন ভারতে কোনো ক্যাম্পাস সংস্কৃতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া ছাড়াই এখন যে কেউ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারে। একটি ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। সেই সংস্কৃতি এখন মারা যাচ্ছে।
কিন্তু এখন শহরে যুবকেরা কীভাবে মাওবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, যখন মাওবাদকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
ভারতে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অন্ধ্র প্রদেশে মাওবাদী কার্যক্রম বেশি হয়। যদি আপনি নকশালপন্থী বা নকশালবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা সাধারণ একজন নাগরিক অধিকার কর্মী হন, তাহলে আপনাকে জেলে যেতে হবে অথবা সাজানো বন্দুকযুদ্ধে নিহত হবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ১৯৯২ সালে সাংবাদিক গোলাম রসুল একটি উর্দু দৈনিকে ভূমি সমস্যা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন। এর পরই পুলিশের সাজানো বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। পুলিশ তাঁকে অভিহিত করে নকশাল হিসেবে। ওই বন্দুকযুদ্ধে গোলাম রসুলের একজন বন্ধুও নিহত হন। একইভাবে যেসব চিকিত্সক সুবিধাবঞ্চিতদের চিকিত্সা করছেন বা যেসব আইনজীবী প্রান্তিক লোকজনের পক্ষে কথা বলছেন, তাঁরা জেলে যাচ্ছেন বা নিহত হচ্ছেন।
কিন্তু খোদ কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করেছে যে নকশালবাদ একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে
এগুলো হচ্ছে কেতাবি কথা। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, নকশালবাদ উদ্বেগের একটা কারণ। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ধারণাকেও সমর্থন করছেন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ফলে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। অনেক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। দেখুন না, সিঙ্গুরে কী ঘটল বা ঘটছে। এ ধরনের সমস্যার সমাধান যত দিন না হবে, তত দিন নকশালবাদ টিকে থাকবে।

ভাষান্তর: রোকেয়া রহমান। প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায়।

 

এক ব্যতিক্রমী মাওবাদী বিপ্লবী October 5, 2009

বাবা বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চবেতনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কলেজপড়ুয়া ছেলে কোবাদের জন্য তিনি একদিন শখ করে সোনার চেইনওয়ালা একটি ঘড়ি কিনে দেন। ঘড়িটি বাবার দেওয়া শখের উপহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দের ছিল তার। তাই ঘড়িটি সারাক্ষণ আগলে রাখত ছেলেটি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিবারের সদস্যরা লক্ষ করল, কোবাদের হাতে ঘড়িটি নেই। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘড়িটি কি হারিয়ে ফেলেছ?’ কোবাদ শান্ত গলায় জবাব দিল, ‘ঘড়িটি আমি পাশের বাসার কাজের ছেলেটাকে দিয়ে দিয়েছি। ওর ওটা খুব পছন্দ হয়েছিল।’ ওই দিন কোবাদের এমন জবাব শুনে পরিবারের সবাই আকাশ থেকে পড়ে। তাদের আশঙ্কা, ছেলেটা হয়তো পাগল হয়ে যাচ্ছে! অথচ তারা জানত না গরিবের জন্য দরদি এই ছেলেটার মনে রয়েছে একজন মহান বিপ্লবী।
এতক্ষণ কোবাদ নামের যে ছেলেটার কথা বলা হলো, আসলে তিনি হলেন ভারতের নকশালপন্থী বিপ্লবী নেতা কোবাদ ঘেন্দি (৫৮)। ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে—পরিবারের এমন আশঙ্কা অবশ্য শেষ পর্যন্ত সত্য হয়নি। তবে সেই কোবাদ মহাপাগল হয়েছিলেন। কোবাদের বন্ধুদের মতে, ওই মহাপাগল হতদরিদ্রদের অধিকার আদায়ে বিপ্লবের পথে নেমেছিলেন। ঘুণে ধরা সমাজে তিনি দেখেছেন কীভাবে ভূমিহীন আর দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ দিন দিন আরও দরিদ্র হচ্ছে, বিপরীতে ধনীরা কীভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। তিনি দেখেছেন বঞ্চিত কৃষক কীভাবে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে, কীভাবে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সমাজের ওই উঁচুতলার মানুষজনই নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্রকে। তারা শুধু গরিবের অধিকার আদায়ের কথা বলে, কিন্তু কাজ করে অভিজাত শ্রেণীর জন্যই। কোবাদ নিজেও ছিলেন উঁচুতলার মানুষ। তাই হয়তো হতদরিদ্রদের নিপীড়নের চিত্র খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলেন। বিলাসী সুখের জীবন ত্যাগ করে তাই একদিন নাম লেখান ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে। কোবাদ চেয়েছিলেন, মহা ঝড় তুলে সমাজকে একেবারে গুঁড়িয়ে দেবেন। এরপর সেখানে আবার গড়া হবে নতুন এক সমাজ, যেখানে থাকবে সাম্য আর ন্যায়বিচার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না তিনি। ৩০ বছর গোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ড) বিপ্লবের বীজ বুনে ২০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন এই বিপ্লবী। নকশালদের কাছে যে কোবাদ এক আদর্শের নাম!
কোবাদদের পারসি পরিবারে অভাব বলতে কিছু ছিল না। সমাজের উঁচুতলার মানুষ বলতে যা বোঝায়, কোবাদরা তাই-ই। কোবাদের এক ভাই প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সুনীল শনবাগ। সুনীল বলেন, ‘আমাদের পরিবারে কোবাদের প্রভাব স্পষ্ট। মাওবাদী রাজনীতিতে জড়ানোর পরও তাঁর জন্য আমাদের পরিবারের সমর্থনে কখনো ভাটা পড়েনি। কারণ আমরা ভালো করেই জানি, কোবাদ গণমানুষের জন্য মুক্তির সংগ্রামে নেমেছে।’
কোবাদ পড়ালেখা করেছেন অভিজাত দুন স্কুল এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এরপর উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন লন্ডনে। সেখানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পাস করেছেন ভালো ফল নিয়ে।
কোবাদের এক বন্ধু রাজনীতিক পি এ সেবাস্তিয়ান বলেন, মূলত ইংল্যান্ডে পড়ালেখার সময়ই তিনি দেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এরপর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫-৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার জরুরি অবস্থা জারি করলে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ওই সময় তিনি গড়ে তোলেন কমিটি ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইট (সিপিডিআর) নামের সংগঠন। আসগর আলী ইঞ্জিনিয়ারের মতো আরও অনেক রাজনীতিক তখন এই সিপিডিআরে নাম লেখান।
আরেক বিপ্লবী এবং কোবাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু সুসান সেবাস্তিয়ান বলেন, ‘সমাজের অভিজাত শ্রেণী থেকে আসার পরও কোবাদের মধ্যে কখনো আভিজাত্যের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। সদাহাস্য মানুষটি সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর স্ত্রী অনুরাধা শনবাগও ছিলেন যোগ্য সহযোদ্ধা। স্বামীর সঙ্গে তিনিও বেছে নিয়েছিলেন বিপ্লবের পথ। জঙ্গলে জঙ্গলে আর বনবাদাড়ে ঘুরতে ঘুরতে শরীরে ম্যালেরিয়া বাসা বেঁধেছিল তাঁর। এ অবস্থায় গত বছর মারা গেছেন তিনি। গত বছর বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে কোবাদ বলেছিলেন, ‘ভারতে এখনকার সমাজব্যবস্থাটা হলো আধাসামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক। এ সমাজকে খাঁটি গণতান্ত্রিক পথে আনতে হবে। তাই আমাদের সংগ্রাম হলো ভূমিগ্রাসী আর গরিব-দুঃখীদের ব্যবহার করে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তাদের বিরুদ্ধে। গ্রামের হতদরিদ্রদের অধিকার আদায়ের আগ পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবেই।’

মহারাষ্ট্র পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নাগপুর ও চন্দ্রপুরে কোবাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ মেলেনি।
এরই মধ্যে কোবাদ ঘেন্দির মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন প্রচার শুরু করেছে। তারা বলেছে, কিছু কিছু গণমাধ্যম কোবাদ ঘেন্দিকে ভুলভাবে তুলে ধরছে। এমন একটি সংগঠনের এক নেতা বলেন, কোবাদ কোনো রক্তলোলুপ সন্ত্রাসী নন। তিনি একজন শান্তিকামী বিপ্লবী। অথচ অনেকে তাঁকে ভুলভাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করে। এটা বড় হতাশাজনক।
সমাজকর্মী ও লেখক জ্যোতি পুণ্যানী বলেন, ‘আমরা যখন দুন স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম, তখন জানতামই না যে, কোবাদেরা এত বড়লোক। ওরলি এলাকায় তাঁদের বিশাল বাড়ি ছিল। পরে যখন বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে আসে, তখন তাঁর কাঁধে থাকত কাপড়ের একটি ঝোলা। তাতে থাকত নানা ধরনের বই। একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। অথচ ওই সাধারণ মানুষটাই সবার সঙ্গে করতেন অসাধারণ আচরণ। সবার মাঝে মিশে যেতেন তিনি অবলীলায়। করতেন হাসি-তামাশা। সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর স্ত্রীও গোটা জীবনটাই দিয়ে গেলেন হতদরিদ্র মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পেছনে। কোবাদ সম্পর্কে এ মুহূর্তে শুধু একটি কথাই বলতে চাই, তিনি কোনো মনীষী নন, বরং একজন বড় মাপের ভাবাদর্শী। গ্রেপ্তার হলেও তাঁর ওই আদর্শের মৃত্যু হবে না। এতে অনুপ্রাণিত হবে পরিবর্তনপ্রত্যাশী ভারতের লাখো বিপ্লবী।’

 

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.